মৌতুলি নাগ সরকার

গত বছরের শেষদিক থেকে আজ পর্যন্ত কয়েকটি ঘটনায় ‘দলিত’ শব্দটা নতুনভাবে উঠে এসেছে। তেহট্টের ঝিটকা গ্রামে একটি দলিত পরিবারকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করে শাসক দলের ঘনিষ্ঠরা। দু’কামরার মাটির ঘর, বাঁশ দিয়ে ভিত গড়া। সেই ঘর ভেঙে ফেলে শাসক দলের সোনার ছেলেরা। বাধা দিতে গেলে পরিবারের মহিলাদের উপর চড়াও হতেও ছাড়েনি। ঘর ভেঙে সেখানে মন্দির বানানো হবে। কীর্তন-টির্তন ও হবে। কিন্তু উচ্ছেদ করে কেন? উত্তর আসে, যেখানে মন্দির হবে তার পাশে দলিতদের বাস সম্ভব নয়। থানা, পুলিস, পঞ্চায়েত প্রধান – অনেক জল গড়িয়ে আজও পরিবারটি লড়ে যাচ্ছে।

নদিয়ারই কালীগঞ্জে দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে। মসজিদ কমিটি মসজিদ সংলগ্ন চাষের জমির দখল নিতে আগ্রাসী। যার জমি সে জমির উপর দখলদারির বিরুদ্ধে মামলা করলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করানো হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তৃতীয় ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। বর্ধমানের কাটোয়ার গীধগ্রামে গীধেশ্বর শিবমন্দিরে দাস সম্প্রদায়ের মানুষকে শিবরাত্রিতে শিবের মাথায় জল ঢালতে বাধা দেয় পাশের পাড়ার ঘোষরা। মন্দির কমিটি, যা ঘোষদের নিয়ন্ত্রণে, তাদের যুক্তি হল তিন শতক ধরে উচ্চবর্ণের ঘোষ সম্প্রদায় নির্মিত মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল যে দাসদের। হঠাৎ আজ কেন তারা সেখানে ঢুকবে?

সকালবেলার কাগজে খবরটা দেখে চিনতে অসুবিধা হয় নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গকে। হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে থাকা রাজ্যগুলোর পাশে কি পশ্চিমবঙ্গও জায়গা করে নিচ্ছে? শিবরাত্রিতে দাস সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীদের গীধেশ্বর শিবমন্দিরে ঢুকতে দিতে কেন আপত্তি জানিয়েছিল ঘোষপাড়ার বাসিন্দারা? কারণ যে দাসপাড়ার বাসিন্দারা ‘জাতে নিচু’।

আমরা দাসপাড়ায় পৌঁছতে মহিলা, পুরুষ, এমনকি শিশুরাও শিবের মাথায় জল দিতে না পারাকে কেন্দ্র করে যে অসম্মানের শিকার হয়েছেন সেকথা বলতে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দা সুশান্ত দাস জানান যে এই অবমাননা আজকের নয়। বাপ-ঠাকুর্দার আমল থেকেই অস্পৃশ্যতার গ্লানি নিয়ে চলতে হয়েছে তাঁদের। সংবিধান খাতায় কলমে অস্পৃশ্যতা নির্মূল করেছে, কিন্তু তা রয়ে গেছে আমাদের রক্তে। শিবরাত্রির অপমান সহ্য করতে না পেরে তাঁরা এসডিও ,এসডিপিও, ডিএমকে জানালে এসডিও দুই পাড়ার বাসিন্দাদের আলোচনায় ডাকেন। সেই আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় – গীধগ্রামের গীধেশ্বর শিবমন্দিরে ওই গ্রামের দাস পরিবারের সকলে প্রবেশ করে পুজো দিতে পারবেন। সেই সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রেখে ৭ মার্চ দাসপাড়ার চারজন মহিলা দীর্ঘদিনের গ্লানি কাটিয়ে পুজো দিতে যান। কিন্তু তাঁরা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরে তালা লাগিয়ে দেন মন্দির কমিটির সদস্যরা। পাশাপাশি বাস দুই পাড়ার। দ্বিতীয়বার এই অবমাননাকর ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। দুই পাড়ার মানুষ জড়ো হলে দেখা যায়, ঘোষপাড়ার বাসিন্দা সহ মন্দির কমিটির সদস্যরা দাসপাড়ার লোকেদের নানা অজুহাতে মন্দিরে ঢুকতে দিতে চাইছেন না। দাসপাড়া থেকে পুজো দিতে যাওয়া লক্ষ্মী দাসের অভিযোগ, ঘোষপাড়ার লোকেরা লাঠি নিয়ে তাঁদের তাড়া করেন, শুরু হয় ধস্তাধস্তি। এমনকি তাঁদের বলা হয় ‘দাসরা পুজো দিতে এলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে।’

অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘোষপাড়া দাসপাড়ার চাইতে বর্ধিষ্ণু। এই কারণেই তারা বরাবর আধিপত্যকারী শক্তি হিসাবে প্রভাব খাটিয়ে এসেছে। মন্দিরে পুজো দিতে না পারার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা আসলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও বটে। দাসপাড়ার মানুষের কথায়, ভঙ্গিমায় তা স্পষ্ট। অর্থনৈতিকভাবে, শিক্ষাগত ও সামাজিকভাবে পশ্চাদপর দাসরা অর্থনৈতিকভাবে ঘোষদের উপর নির্ভরশীল। উচ্চবর্ণের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এই নির্ভরশীলতাকে ব্যবহার করতে কোপ শুধু জাতের উপর নয়, ভাতের উপরও দেওয়া হয়। ঘোষদের জমিতে চাষ করতে দাসদের কাজে নেওয়া বন্ধ করে দেয় ঘোষরা। দাসপাড়ার গোয়ালাদের থেকে দুধ নেওয়াও বন্ধ করা হয়।

ঘোষপাড়ার বাসিন্দা ও মন্দির কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে বসে আমরা প্রথমেই যে অনাগ্রহের মুখোমুখি হই, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে তাঁরা ধরেই নিয়েছেন আমরা তাঁদের প্রতিপক্ষ। মন্দির সকলের, তাই সেখানে সবাইকেই ঢুকতে দেওয়া উচিত – এই ভাষ্যে কথা শুরু হতেই ঢুকতে না দেওয়ার পক্ষে তাঁরা যে যে যুক্তি হাজির করেন সেগুলো এইরকম – ১) মন্দির তৈরি করতে কয়েক কোটি টাকা খরচ হয়েছে। দাসরা আগে পয়সা দিক, তারপর ঢুকবে। ২) আমরা ৫,০০০ আর ওরা ২,০০০। আমরা কেন ওদের এমন আবদার শুনব, যা এতদিন কেউ করার সাহস পায়নি? ৩) মন্দিরের পুরোহিতরা বলেছেন, দাসরা মন্দিরে ঢুকলে তাঁরা আর পুজো করবেন না, ৪) সংবিধানে যা-ই থাক, যা এতকাল হয়নি তা এখন হতে পারে না।

উপরের প্রত্যেকটি যুক্তির মধ্যে যে ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির দম্ভ রয়েছে তা স্পষ্ট। একথাও পরিষ্কার যে, প্রশাসনিক এবং সামাজিক চাপে দাসদের মন্দিরে ঢুকতে দিতে বাধ্য হলেও আসলে রক্তের মধ্যে জাতপাতের যে মোটা দাগের বিভাজন রেখা আছে তা ঘোষদের মন থেকে সহজে মোছার নয়। উপরন্তু দাসদের মন্দিরে ঢোকা ঘোষদের কাছে পরাজয়ের সমান।

চতুর্থ ঘটনা হিসাবে উঠে আসে নদিয়ার কালীগঞ্জ থানার অর্ন্তগত বৈরামপুর গ্রামের ঘটনা। এখানেও দাসদের প্রবেশ নিষিদ্ধ উচ্চবর্ণ (এক্ষেত্রে মুলত কায়স্থ) নির্মিত শিবমন্দিরে। দাসরা গাজনে সন্ন্যাসীও হতে পারবেন না। কারণ একটাই – তাঁরা নিচু জাতের। বাংলায় গাজন নিম্নবর্ণেরই উৎসব হিসাবে স্বীকৃত হলেও দাসরা নিচুরও নিচু। তাই হালদার, কামার, কুমোর সকলেরই (নিচু জাত হলেও) গাজনে অংশগ্রহণ ও মন্দিরে প্রবেশ করার অধিকার আছে, কিন্তু দাসদের নেই। বৈরামপুরের দাসরা এই অবমাননা মেনে নিতে পারেননি। ফলত সংকট তৈরি হয়। এখানে এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে নিম্নবর্ণের সম্প্রদায়গুলির মধ্যেও বিভাজন করা হয়েছে। ফলে দাসরা বিচ্ছিন্ন হয়েছেন তাঁদেরই জাতভাইদের থেকে।

দাসদের প্রতিই কেন এই বৈষম্য? আসলে এই দাস সম্প্রদায়ের উৎস চমর বংশ থেকে, যাঁরা ছিলেন মুচি। রুইদাস, রবিদাস, ঋষিদাস সহ মোট ১১৬টি পদবিতে এঁরা বিভক্ত। এই বিভাগ শুধু আঞ্চলিক ভাষা ও এলাকার নিরিখে, সম্প্রদায়গতভাবে এঁরা দাস বলেই পরিচিত। বৈরামপুরের সাড়ে চারশো পরিবার এই সম্প্রদায়ের। তাঁরা গত তিনবছর ধরে মন্দিরে প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। গ্রামের সালিশি সভা, প্রশাসনিক সভা তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারায় অবশেষে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। হাইকোর্ট তাঁদের প্রাপ্য অধিকার দিয়েছে।

কিন্তু এসব ঘটনায় যা সবচেয়ে শ্রুতিকটু তা হল ‘নিচু জাত’, ‘অস্পৃশ্য’ – এইসব শব্দের ব্যবহার। এস সি, এস টি, ওবিসি – এসব কথার সঙ্গে আমাদের রোজকার ওঠাবসা হলেও ওই শব্দগুলো সচরাচর কানে আসে না। আজ নতুন করে যেভাবে শব্দগুলো উঠে আসছে, তার কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নেই এমন হতে পারে না। হিন্দুত্ববাদের হাওয়ায় নতুন করে জাতপাত নিয়ে গোঁড়ামি মাথাচাড়া দিচ্ছে।

একুশ শতকে দাঁড়িয়েও এই বাংলায় ধর্ম, জাতপাত, আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থা বহাল আছে – একথা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। সংবিধানস্বীকৃত ধর্মাচরণের অধিকার যে আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, উপরের ঘটনাগুলি তারই প্রমাণ। উচ্চবর্ণের মানুষ ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার জিইয়ে রেখেছে নিম্নবর্ণের মানুষের উপর নিজেদের আর্থসামাজিক আধিপত্য বজায় রাখতে। অন্যদিকে জাতপাতের ভিত্তিতে বিভাজিত সমাজে উচ্চবর্ণের শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণের সহজাত ক্ষোভ থেকেই দাস সম্প্রদায়ের মানুষ তিন শতকের বস্তাপচা রীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, দাসরা নিজেরা একটা মন্দির বানিয়ে পুজো করছে না কেন? কেন গীধেশ্বর শিবমন্দিরেই তাদের পুজো দিতে যেতে হবে? প্রশ্নটা যত সহজভাবে করা যায়, তার উত্তর ততটা সহজ নয়। নিম্নবর্ণ ও উচ্চবর্ণের জন্য আলাদা আলাদা মন্দির তৈরি করলেই ধর্মাচরণের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং তা বর্ণবাদকেই টিকিয়ে রাখে একই সমাজের আলাদা আলাদা খোপ তৈরি করে। এই খোপগুলি ভাঙতে চেয়েই দাস সম্প্রদায়ের মানুষ গীধেশ্বর শিবমন্দিরে প্রবেশের অধিকারের জন্যে লড়ছেন।

হিন্দুধর্মের মধ্যে ও বর্ণ আর জাতের যে বিভাজন তা হঠাৎ এমনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ভাবলে ভুল হবে। দলিতদের মধ্যে যে উপগোষ্ঠীগুলি সামাজিক সিঁড়িতে কয়েক ধাপ উঠেছেন, তাঁরা সুপ্রাচীন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের সচেতন করবেন, সংগঠিত করবেন এটাই স্বাভাবিক। মূলধারার ধর্মের মধ্যে নিচু জাতের প্রতি উঁচু জাতের এই ব্যবহার কেবল বর্ণবাদী ভাবনায় চালিত হচ্ছে না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের স্বার্থও এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। মধ্য কৃষক জমির মালিক আর জমিতে কাজ করা ভূমিহীন কৃষক বা কৃষি শ্রমিকের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব থাকে, এই ঘটনায় তার সঙ্গে জাতি দ্বন্দ্ব যুক্ত হয়ে শোষণের মাত্রা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আর্থসামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তথাকথিত প্রগতিশীল বাংলার এইসব ঘটনা নতুনভাবে এখানকার সমাজের যে বর্ণবাদী চরিত্র দেখিয়ে দিচ্ছে, তা ধর্মীয় আধিপত্যবাদের আশঙ্কাকে উস্কে দিচ্ছে। এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

আরো পড়ুন স্বকণ্ঠে পশ্চিমবঙ্গের দলিত মুসলিম বয়ান

ভূমি সংস্কার বাংলার কৃষকদের জমির উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে খানিকটা সফল করলেও পরবর্তীকালে দেখা গেছে, নিম্নবর্ণের মানুষের হাত সেই অধিকারকে কার্যত ছুঁতে পারেনি। অবিভক্ত বাংলায় তফসিলি জাতির মধ্যে প্রতিনিধিত্বকারী উপবর্ণ হিসাবে নমশূদ্র এবং রাজবংশীরাই পুরোভাগে ছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দলিতদের মধ্যে যে সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়, তাতেও নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্বকারী ভূমিকায় এই দুই উপবর্ণই ছিল। পশ্চিমবঙ্গে তফসিলি জাতির ৬০টি উপবর্ণের মধ্যে মূলত এই দুই উপবর্ণই সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে। ফলত, দলিতদের মধ্যেও এই দুই উপবর্ণের আধিপত্য রয়েছে। বৈরামপুরের ঘটনায় তার প্রমাণ মিলেছে। এর বাইরে যে প্রান্তিক দলিতরা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে দাসরা অন্যতম। ভূমি সংস্কারকে সফল বলে প্রমাণ করতে গিয়ে ১৯৮০ সালে রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, রাজ্যে মাত্র দুটি বর্ণ আছে – ধনী ও দরিদ্র। মন্ডল কমিশনের রিপোর্টের জবাবে তাঁর এই ঘোষণা আসলে বাংলায় তফসিলি জাতির মধ্যে থাকা প্রতিনিধিত্বহীন উপবর্ণগুলির আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করেছিল। সম্ভবত একই কারণে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বর্ণগত আদমশুমারির বিরোধিতা করেছেন। আধিপত্যকারী বর্ণদুটিকে সামনের সারিতে রেখে প্রতিনিধিত্বহীন উপবর্ণগুলির অস্তিত্বকেই কার্যত অস্বীকার করেছেন এঁরা। আসলে এর পরিণতিতেই ভূমি সংস্কারের সুফল দাসরা নিতে পারেননি। সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই সম্প্রদায়ের মানুষ ভূমিহীনই থেকে গেছেন। অন্যদিকে তফসিলি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে চাকরিতেও পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীগুলির প্রতিনিধিত্ব ২-৩ শতাংশে আটকে থেকেছে। কৃষক আন্দোলনে শ্রেণি হিসাবে যখন তফসিলি জাতিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে, সেখানেও এই প্রতিনিধিত্বহীন দাসরা পিছনের সারিতে ছিলেন।

ভারতের সমগ্র দলিত জনসংখ্যার দশ শতাংশের বেশি বাংলায় বাস করেন। চাকরির ক্ষেত্রে ২২% সংরক্ষণ থাকলেও চাকরি ও শিক্ষায় এই সম্প্রদায় বৈষম্যের শিকার। যে ২%-৩% চাকরির সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের শ্রেণিগত পরিবর্তন হলেও সেই পরিবর্তন সামগ্রিক হয়নি। তাই বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের বোঝা দাস সম্প্রদায়ের ঘাড় থেকে নামেনি। তফসিলি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেকার বৈষম্য বুঝতে না পারলে এবং স্বীকার করতে না পারলে এই বোঝা হয়ত আরও কয়েক দশক টেনে নিয়ে যেতে হবে আমাদের। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতিতে একদিকে বর্ণহিন্দুদের দাপট, অন্যদিকে তফসিলি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেকার দুটি এগিয়ে থাকা বর্ণের আধিপত্য। এই দুয়ের মধ্যে আটকে পড়েছেন আধিপত্যহীন, প্রতিনিধিত্বহীন সম্প্রদায়গুলির মানুষ। প্রতিনিধিত্বহীন দাস সম্প্রদায়কে মন্দিরে প্রবেশের অধিকার না দেওয়া আসলে এই আধিপত্যবাদেরই দৃষ্টান্ত। তাই মন্দিরে প্রবেশের অধিকারের জন্যে আওয়াজ তোলার ঘটনাগুলি আসলে এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জেহাদ, যা নতুন করে বাংলায় দলিত আন্দোলনের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। সমস্যা হল, জাতি, বর্ণ ও শ্রেণি বৈষম্যকে যথার্থ মর্যাদা সহকারে বিবেচনা না করে রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলি (মূলত শাসক দল ও বিরোধী দল) বৈষম্যকেই হাতিয়ার করেছে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার কাজে।

জাতপাত, বর্ণবাদ ও ধর্মের সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সংযোগ এবং হস্তক্ষেপের আসল উদ্দেশ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়, বরং বৈষম্য জিইয়ে রাখা। ভুলে যাই কী করে যে শোষিতের ঐক্য আসলে যন্ত্রণার ঐক্য, বঞ্চনার ঐক্য। হিন্দুত্ব ও নরম হিন্দুত্বের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এই ঐক্যে যে ফাটল ধরিয়েছে তাকে চিনতে পারা শুধু জরুরি নয়, তা নির্মূল করার দায়ও আমাদের।

নিবন্ধকার মানবাধিকার কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.