সন্তোষ সেন
বসন্তের রং লেগেছে আকাশে বাতাসে। ফাগুনের হাওয়া মনে দিয়েছে দোলা। সেই হাওয়ায় ভর করে অনেকেই ঘুরে এসেছেন দিঘা, তাজপুর বা মন্দারমণি। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন কেমন আছে এই উপকূল অঞ্চল, কোন ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে বিস্তীর্ণ দিঘা উপকূল?
বর্তমানে আমরা যেখানে দলবেঁধে হইহুল্লোড় করে আসি, প্লাস্টিকে প্লাস্টিকে ছয়লাপ করে আসি, বিপর্যস্ত করে দিই স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশকে, কয়েকশো বছর আগেও সেই প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁথি-দিঘা উপকূল ছিল সমুদ্রের গর্ভে। সমুদ্রের পলি, বালি জমে ধীরে ধীরে বর্তমান উপকূল এলাকা গড়ে উঠেছে। তারপর থেকেই ভ্রমণপিপাসু মানুষ (নাকি পর্যটক বাহিনি?) সমুদ্রোপকূলের সৌন্দর্যের টানে ছুটে যায় বারবার। পর্যটক বাহিনির চাপ আর উন্নয়নের জোয়ারে উপকূল আজ হাঁসফাঁস করছে, মুক্তি চাইছে। ফিরে পেতে চাইছে তার প্রাকৃতিক স্বাস্থ্য।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রকৃতিকে ভালবেসে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে ভ্রমণ এখন শিল্পে পর্যবসিত। এমন এক শিল্প, যাতে পুঁজি বিনিয়োগ করা যায়। পুঁজির মালিকদের লক্ষ্মীলাভ হয়। তাই টুরিস্ট বাবু বিবিদের বেশি বেশি করে টেনে আনতে তাঁদের বিলাসের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক নামিদামি হোটেল, রিসর্ট, রেস্তোরাঁ। এখনো চলছে নানা উন্নয়ন প্রকল্পের জোয়ার। এ জোয়ারে ভাঁটা নেই, শুধুই ফুলে ফেঁপে ওঠা। ইকো-টুরিজমের নাম করে এ জিনিস ছড়িয়েছে তাজপুর, শংকরপুর, মন্দারমণিতেও। সমুদ্রের একেবারে তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বহু বেআইনি ইমারত। সম্প্রতি আবার ভক্তদের মনোরঞ্জনের জন্য মন্দিরও বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হল বলে। এসবের ফল বিষময়।
পর্যটন শিল্প আর প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক বাহিনির চাপে কেমন আছে মনমোহিনী দিঘা উপকূল? উপকূল এলাকার পরিবেশ নিয়ে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন রামনগরের এক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রীতিরঞ্জন মাইতি। তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্য জানাচ্ছে ‘শুধু উপকূল অঞ্চল নয়, কাঁথি ও এগরা মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকাও ‘ব্ল্যাক জোন’ তালিকাভুক্ত। অথচ ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। হোটেল, রেস্তোরাঁর রান্না এবং অসংখ্য পর্যটকের পানীয় জল, স্নানের জলের জন্য যথেচ্ছভাবে মাটির তলা থেকে জল তুলে নেওয়া হচ্ছে।’ পর্যটন শিল্পের লাগামছাড়া চাহিদা মেটাতে পাম্প চালিয়ে প্রতিদিন গ্যালন গ্যালন জল তুলে নেওয়ার কুফল ফলছে হাতেনাতে।
কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মাটির তলা থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে জীবনের স্পন্দন জারি রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান জল। ফলে অদূর ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে পানীয় জলের আকাল দেখা দেবে। মাটির নিচের জলস্তর দ্রুত নিচে নামছে। অন্যদিকে সমুদ্র সংলগ্ন অঞ্চল হওয়ায় সেই ফাঁকা জায়গায় মিষ্টি জলের সঙ্গে মিশছে লবণাক্ত জল, যার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। গবেষক ও পরিবেশবিদদের আশঙ্কা – ভূগর্ভস্থ জলের দেদার ব্যবহারের ফলে আর ১৫-২০ বছরের মধ্যে উপকূল এলাকা জুড়ে পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেবে। জলে লবণের পরিমাণ দিন দিন বেড়ে যাওয়ার ফলে মাটির উর্বরতাও কমছে, ফলে কৃষিকাজও বিঘ্নিত হবে। লক্ষ লক্ষ উপকূলবাসী জলের জন্য হাহাকার করবেন। হয়ত এক ফোঁটা জলের জন্য চাতকের মত আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে হবে তাঁদের। এক বিষময় ভবিষ্যতের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। অথচ সেই ভয়ঙ্কর আগামীর জন্য স্থানীয় মানুষগুলোর প্রায় কোনো দোষ নেই।
যেখানে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে চিংড়ি ভেড়ি। বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী। ভাল গুণমানের গলদা, বাগদা রফতানি হয়ে যাচ্ছে বিদেশে, ভেড়ির মালিকদের পকেট ভারি হচ্ছে। কিন্তু এই চিংড়ি চাষে রাসায়নিক মিশ্রিত ওষুধ ও খাবার ব্যবহৃত হচ্ছে বহুল পরিমাণে। সেই রাসায়নিকের একটা বড় অংশ শেষপর্যন্ত গিয়ে মিশছে খাল, বিল, নদী, জলাভূমি হয়ে সমুদ্রে। মিষ্টি জল বিষাক্ত ও দূষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামুদ্রিক প্রাণিদের স্বাস্থ্যহানিও ঘটছে, বিষাক্ত হচ্ছে মাটি। জলের সংকট আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী হচ্ছে। শুধু কি তাই?
আরো পড়ুন জলবায়ু পরিবর্তনে শ্রমিক, কৃষকের ক্ষতি এবং পরিত্রাণের উপায়
এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপকূলীয় বৃক্ষ নিধন। দিঘা থেকে খেজুরি পর্যন্ত উপকূল জুড়ে বালিয়াড়ির গাছপালা কেটে একের পর এক মাছের ভেড়ি গজিয়ে উঠছে। একেবারে সোনায় সোহাগা। জলের অপরিমিত ব্যবহার ও অপচয় সম্বন্ধে উপকূলীয় অঞ্চলের রামনগর-১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির সাফাই ‘আমরা হোটেল তৈরির অনুমোদন দিয়ে থাকি। কিন্তু মাটির তলার জল তোলার কোনো অনুমতি আমরা দিই না।’ এ তো বড় রঙ্গ যাদু! তাহলে অনুমতি আসে কোথা থেকে? অনুমতি না মিললেও, পার্টির নেতা, মন্ত্রী ও প্রশাসনের চোখের সামনে কী করে চলছে এইসব কার্যকলাপ?
প্রশ্নের উত্তর তো জনপ্রতিনিধিদেরই দিতে হবে। তাঁরা কি ব্যবসা বাণিজ্যের স্বার্থে কানে দিয়েছেন তুলো, পিঠে বেঁধেছেন কুলো? কবে, আর কবে পুলিস প্রশাসন ও সরকারি কর্তাব্যক্তিরা সজাগ, সচেতন ও সক্রিয় হবেন? আর কবে ঘুম ভাঙবে পর্যটকদের? নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে ছুটে যান দিঘা, মন্দারমণি, তাজপুর, বকখালি, সাগরদ্বীপে। কিন্তু শুধু হুল্লোড়ে না মেতে দয়া করে একটু ভাবুন প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ রক্ষার কথা। অন্তত আপনার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান-সন্ততির দুঃসহ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করুন। শেষ গাছটা কাটা পড়লে, শেষ নদীটা শুকিয়ে গেলে, শেষ জলাভূমিটা বোজানো হয়ে গেলে আমরা যে ডাঙায় তোলা কইমাছের মতো ছটফট করতে করতে মারা যাব! টাকা, ডলার, পেট্রোল, ডিজেল বা আপনার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের তখন কিন্তু আর কোনো মূল্য থাকবে না।
শুধু দিঘা উপকূল বা সাগরদ্বীপ কিম্বা পুরী উপকূলেই যে জলের সংকট ও দূষণ হচ্ছে তা কিন্তু নয়। এই সমস্যা রাজ্য, দেশের সীমা ছাড়িয়ে আজ সারা পৃথিবীর। আসুন, ভারতের জল সংকটের সার্বিক চিত্রটা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব যত প্রকট হচ্ছে, ভারতবর্ষ সহ দুনিয়া জুড়ে জলসংকট তত বাড়ছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও জলসংকট ক্রমে তীব্রতর হচ্ছে। ২০২৪ সালের তীব্র গরমে দিল্লি, বেঙ্গালুরু সমেত ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তীব্র জলকষ্টে ভুগলেন। পানীয় জলের আধারগুলো নিঃশেষিত। বেঁচে থাকার জন্য শ্বাসবায়ু এবং পরিশুদ্ধ পানীয় জলের মত অপরিহার্য আর কিছু নেই। সেখানেই গেরো। সমস্যার শিকড় কোথায়?
ভারতবর্ষে কৃষিতে সেচের কাজে ৮০ শতাংশের বেশি মিষ্টি জল ব্যবহৃত হয়। এর মূলে রয়েছে কর্পোরেট দ্বারা হাইব্রিড চাষ। অন্যদিকে শিল্পক্ষেত্রেও জলের অস্বাভাবিক ব্যবহার ও অপচয় আটকাতে সঠিক নীতি প্রণয়ন জরুরী। একাধিক শিল্পে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল তুলে ব্যবহার করা হয়। আবার শিল্পক্ষেত্রের দূষণের গেরোয় গ্রামবাংলার নদনদী সমেত জলের বহু উৎস কার্যত ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে উঠছে। পাশাপাশি জলাশয় বুজিয়ে বহুতল তৈরি হচ্ছে। তাই নির্দিষ্ট সরকারি নীতি যেমন চাই, তার পাশাপাশি কর্পোরেটের থেকে চড়া হারে শুল্ক আদায় করে প্রকৃতির মেরামতিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি হয়ে পড়ছে। আরেকটা কথা খেয়াল রাখা দরকার। আর সব প্রাকৃতিক সংস্থানের মতই জলের উৎসগুলোও চিরকাল গোষ্ঠীগত সম্পত্তি হিসাবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। জনগোষ্ঠীগুলো জলের সঠিক ব্যবহার করেছে, জলাশয়গুলোকে রক্ষা করেছে পরমাত্মীয়ের মত। তাই জলসম্পদকে গোষ্ঠীর হাতে রাখাই বাঞ্ছিত এবং প্রকৃতির পক্ষে মঙ্গলজনক।
অথচ বর্তমান ভারতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মত জল পাওয়ার অধিকারের ক্ষেত্রেও চরম অসাম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জলসংকট কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা জলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে প্রচুর পরিমাণে। বিত্তবানরা বেশি টাকা দিয়ে সেই জল কিনে খেতে পারছে। কিন্তু গরিব মানুষ, যাদের দিন আনি দিন খাই অবস্থা, তারা জল পাচ্ছে ছিটেফোঁটা। জীবনদায়ী জলও তাহলে বিত্তবানদের কুক্ষিগত হতে চলল? দিন-রাতের একেকটা আইপিএল ম্যাচে কত গিগাওয়াট বিদ্যুৎ আর কত হাজার গ্যালন জল খরচ হয় তার হিসাব কে রাখে? বাবুদের বিলাসবহুল গাড়ি ধুতে কত লিটার পানীয় জল নষ্ট হয় তার হিসাবও কেউ রাখে না।
জলসংকটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল বহুজাতিক কোম্পানির অধিক মুনাফার বোতলবন্দি জল আর ঠান্ডা পানীয়ের ব্যবসা। মাটির নিচ থেকে লক্ষ লক্ষ গ্যালন জল তুলে নেওয়া এবং বনাঞ্চল কমে ধূসর কংক্রিটের জঙ্গল বাড়ায় প্রাকৃতিক জলচক্রের স্বাভাবিক নিয়মই ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্নবীকরণ প্রক্রিয়াও বাধাপ্রাপ্ত। যদিও কথা ছিল, পানীয় ব্যবসায়ীরা বছরে ৮৪ হাজার ঘনমিটার জল মাটিতে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু প্রকৃতি মেরামতির কথা ভাবতে গেলে টান পড়বে তাদের মুনাফায়। পুঁজির মালিক বা তাদের সেবাদাস সরকার বাহাদুর – কেউই তা চায় না। তাই ২০১২ সালের পর থেকে ভারতবর্ষে আর জল নীতির কোনো সংস্কার হয়নি। ২০১৮-১৯ থেকে নতুন জাতীয় জল নীতি প্রণয়নের যে পরিকল্পনা ছিল তাও বিশ বাঁও জলে।
এই প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে পর্যটন শিল্পের কল্যাণে উপকূল অঞ্চলে তৈরি হওয়া জলসংকট ও জলদূষণকে। বাজার অর্থনীতির জালে বন্দি হয়ে প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন মননে নতুন করে ঘা মারতে হবে। মনে রাখা কর্তব্য, প্রকৃতি না বাঁচলে মানুষের অস্তিত্ব থাকবে না।
মনে রাখবেন, পৃথিবীর মানুষকে প্রয়োজন নেই। কিন্তু মানুষের পৃথিবী ছাড়া গতি নেই।
নিবন্ধকার বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক। তথ্য লেখকের, মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







