ফওজিয়া খোন্দকার ইভা

কদিন ধরেই খুব বেদনা বুকে নিয়ে আছি। না, শব্দটি বোধহয় তাও নয়। আসলে আমি কান্নার তিমিরে ডুবে আছি। আমার বুকের ভেতরে শব্দ ও স্রোতহীন এক নদী কুলু কুলু বয়ে যাচ্ছে । প্রায় তিনমাস আগে হঠাৎ করেই তাঁর ফোন। তাঁর ফোন যে আমার জন্যে নতুন তা নয়। মাঝে মাঝেই তাঁর সাথে কথা হত। তবে গত দেড় বছরে এই অতিমারির কালে উনি খুব একটা ফোন করেননি। আমিই কথা বলতাম মাঝে মাঝে। সেই তিনি হঠাৎ বললেন “তোমার একটু সময় হবে?” তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, তাঁর জন্যে আমার হৃদয়ের কুঠুরীতে কতোটা জায়গা ছিল। তিন মাস আগে জানিয়েছিলেন তাঁর শরীরের কথা। লিভার এ একটি অ্যাবসেস পাওয়া গেছে। তিনি তখনও জানেন না সেটি কী পর্যায়ে আছে। তাঁকে প্রায় ২৬ বছরের বেশি সময় ধরে আমি চিনতাম। খুব কাছ থেকে দেখেছি, কী অসাধারণ মনোশক্তির এক আধার। তিনি ভালোটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু বিধাতা যে লিখে রেখেছেন অন্য কিছু। তিনি লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। আর তিন মাসের মধ্যেই আমাদের সবাইকে রিক্ত করে চলে গেলেন। গত ২৫শে সেপ্টেম্বর চলে গেছেন এই উপমহাদেশের নারীবাদী নেত্রী, লেখক, জেন্ডার প্রশিক্ষক, গান রচয়িতা, আমাদের অনেকের মেন্টর, বন্ধু কমলা ভাসিন। কিন্তু যখন ছিলেন আমি সবসময়েই বিস্মিত হয়েছি এবং সোচ্চার ভাবে বলেছি “তোমার মতো হাজারো কমলা ভাসিনের দরকার” এ পৃথিবীতে।

এই মানুষটির কাছে আমি বারবার ফিরে আসি। আমি নমিত হই। আমার হৃদয়ের গভীর থেকে একটু শ্রদ্ধা, একটু প্রণাম জানাতে চাই। নিশ্চয়ই তিনি তা জানতেন। কিন্তু আজ যে সব ভেঙে পড়ছে। তাই কলম নিয়ে বসলাম। হাজারো স্মৃতি তাঁর সাথে। কোথা থেকে যে শুরু করবো জানি না। হঠাৎ করেই জীবনের জলছবিটা পাল্টে গেল। এই তো ২৪শে এপ্রিল তাঁর ৭৫তম জন্মদিন গেল। এ উপলক্ষে ছোট্ট একটি আয়োজনও করে ফেললাম অনলাইনে। তখন কি জানি এক কঠিন বাস্তবতা হৃদয়ের একুল ওকুল ভাসিয়ে নিয়ে যাবে?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রায় ২৬ বছর আগে এক অসাধারণ মানুষের সাথে পরিচয় হয়। এমন মানুষ পৃথিবীতে সবসময় জন্ম নেয় না। অন্তত আমি তা-ই মনে করি। তাঁর বন্ধুত্ব, স্নেহ ,জীবনাচার আমাকে এক ধাক্কায় কতটা সংগ্রামী, কতটা আত্মবিশ্বাসী করেছিল তা হয়ত আমার জানানো দরকার। আর তা শুধু আমার একান্ত ব্যক্তিগত বা একক অভিজ্ঞতা নয়। এটিকে নারী আন্দোলনের বা নারীবাদী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী দিক হিসাবে আমি দেখি। তাঁর সান্নিধ্যে যারাই এসেছে, একবাক্যে এই মানুষের গভীর ছায়া পড়েছেই। তারাই পাল্টে গেছে, তারাই পরবর্তীকালে নারীর উপর নির্যাতন বন্ধে, নারী পুরুষের সমতার জন্য কাজ করতে উৎসাহী হয়েছে। সেই বীজ তিনি আমাদের মাঝে বপন করেছেন স্বার্থহীনভাবে। তিনি আমাদের নারী-পুরুষের সমতা আনয়নের জন্য যে লড়াই দরকার, তা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এই লড়াইয়ের জন্য নিজেকে তৈরি করা, অন্য নারীর হাত ধরার কৌশলটি শিখিয়েছেন। তিনি পুরুষকে নয়, পিতৃতন্ত্রকে প্রশ্ন করেছেন। তিনি মনে করেছেন কাঠামো হয়ত বা ভাঙ্গা যায়, কিন্তু যে নেতিবাচক মতাদর্শ পিতৃতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছে তা পরিবর্তন করা সহজ কাজ নয়। তাই নানা মাধ্যমে তিনি তা করে গেছেন। কখনো তিনি ব্যবহার করেছেন গান, কখনো কবিতা, কখনো স্লোগান। আর প্রশিক্ষণ ও আলোচনার মাধ্যমে তো বটেই।

নারীবাদের মতো একটি জনপ্রিয়তাহীন বিষয়কে জলের মত সহজ করেছেন তিনি। তাঁর একটি প্রধান উক্তি ছিল “যেদিন পিতৃতন্ত্রের সূচনা হয়েছে, একজন নারীবাদীর জন্ম হয় সেদিনই।” এ কথা তিনি আমাদের মাঝে বুনে দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে তিনি প্রথম আসেন ১৯৭৮ সালে। এরপর বিভিন্ন সময়ে এসে বাংলাদেশে জেন্ডার প্রশিক্ষণে নতুন নতুন ডিসকোর্স তিনি যুক্ত করেন। কমলার সাথে আমার কাজের সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তখন বাংলাদেশের একটি বড় সংগঠন ‘প্রশিকা’-তে আমি কাজ করি। তখনও জেন্ডার প্রশিক্ষক হয়ে উঠিনি। সেই সময় প্রশিকা এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান ছিল যে সেখানে প্রায় ১০,০০০ কর্মী কাজ করতেন। তাঁদের ভেতর প্রায় ৮০ ভাগ ছিলেন পুরুষ। সেই পুরুষদের জেন্ডার সংবেনশীল করার যাত্রাটি শুরু হয় কমলা ভাসিনকে দিয়ে। আমি এ কারণেই এ কথাটি বলছি, যে জেন্ডার বিষয়ে বিশেষ করে পুরুষদের সচেতন করার কাজটি বাংলাদেশে তিনি শুরু করেন। পিতৃতন্ত্র এবং নারীবাদ — এই বিষয়গুলোকে প্রশিক্ষণে যুক্ত করা শুরু করেন তিনি। এমন একজন প্রশিক্ষক ছিলেন যে যখন সেশন নিতেন, তিনি শুধু বলেই যেতেন। তাঁর অন্য কোনো পদ্ধতি বা কাগজ, কলম কিছুই লাগত না। মন্ত্রমুগ্ধের মত সবাই শুনতেন, আর তার একটি প্রধান কারণ, তিনি বিশ্বাস থেকে বলতেন। ভালবেসে বলতেন। নিজের এবং আশপাশের জীবনের সাথে মিলিয়ে উদাহরণ দিতেন। আর এই কাজটি করার জন্যে কমলাই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। শুরু হল কমলার সাথে আমার যোগাযোগ।

এরও প্রায় ১০ বছর আগে বাংলাদেশে এলেও এবং জেন্ডার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলেও, পরবর্তীকালে তাঁকে আমরা প্রশিক্ষক হিসাবে দেখতে পাইনি। প্রায় এক যুগ পরে তিনি এলেন।

১৯৯৬ সালের পর আমি তাঁর মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হই ১৯৯৭ সালে। সেটি দক্ষিণ এশিয়ার জেন্ডার ও উন্নয়ন বিষয়ক অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণ হিসাবে সুপরিচিত। প্রশিক্ষণে দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা অংশগ্রহণ করত। আমার চোখের দরজা খুলে দেয় এই প্রশিক্ষণ। পিতৃতন্ত্র, নারীবাদ, জেন্ডার, নারীর ক্ষমতায়ন — এসব বিষয় এত সুন্দর ও সহজ করে এর আগে কখনো কেউ বলেননি। একইসাথে নারীর যৌন অধিকার, নারীর নিজস্ব পরিচিতি — এই উন্নয়ন ডিসকোর্সগুলো তিনি সামনে নিয়ে আসেন। সবাই তাঁর সাথে কথা বলার জন্যে, বেদনা ভাগ করার জন্যে উদগ্রীব হয়ে থাকত। তাঁর মাধ্যমেই দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী আন্দোলন গতি পায়। তিনি চেয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন, চেয়েছিলেন শান্তি। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো বিভাজন হোক তা তিনি কখনোই চাননি। তাই তাঁর স্লোগান ছিল “We want peace in south Asia, not pieces of south Asia”। তিনি মনে করতেন নারীমুক্তির অন্যতম উপাদান হল নারীর অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন। আর সে কারণেই নারীদের সংগঠিত করার কথা আর কাজ করার তাগিদেই তিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে গেছেন।

১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলদেশে তিনি একটি কর্মশালা পরিচালনা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় জেন্ডার বিষয়ে যে প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে তা পর্যালোচনা করা। সেখান থেকেই গড়ে ওঠে ‘The South Asian Network of Gender Activist and Trainers’ (SANGAT)। তার আগে তিনি Food and Agriculture Organization (FAO)-তে কাজ করতেন। দক্ষিণ এশিয়ার নারী পুরুষের সমতা, নারীমুক্তি নিয়ে কাজ করার প্রয়াসে ইউনাইটেড নেশনসের সেই কাজটি তিনি ছেড়ে দেন।

তিনি ছিলেন একাধারে একজন কবি, লেখক, গান রচয়িতা, নারী অধিকার আদায় কর্মী, জেন্ডার উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, কী নয়? তাঁর বই দক্ষিণ এশিয়ায় অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এর প্রধান কারণ সহজ ভাষায় উপস্থাপনা, যাতে উন্নয়ন বা নারী অধিকার কর্মীরা বিষয়টি বুঝতে পারেন।

কর্মজীবনের বাইরেও তিনি আমার খুব কাছের স্বজন এবং বন্ধু হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন আমার গুরু, শিক্ষক, বন্ধু, কখনো বড় বোন। ঢাকায় কাজে এলেই আমার ও আমাদের আরেক বন্ধু খুশি কবিরের বাসায় থাকতে পছন্দ করতেন। যখন তিনি বাংলাদেশে আসতেন, তখন যাঁরা তাঁকে প্রশিক্ষণ দিতে আহ্বান জানাতেন তাঁরা হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করলে তিনি পছন্দ করতেন না। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি ঘরই ছিল তাঁর ঘর। সেই সুবাদে তাঁর ব্যক্তিজীবনের কাছাকাছি যাবারও আমার সুযোগ হয়েছে। খুবই সাধারণ জীবনযাপনে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। তবে তাঁর ছিল নিজস্ব একটি স্টাইল। বাংলাদেশের গামছা ছিল তাঁর খুব প্রিয়। জীবনের ব্রতই ছিল ভালবাসা। তাই তিনি ভালবাসার ক্ষমতায় বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতার ভালবাসায় নয়।

ঢাকায় এবং বাংলদেশে তাঁর প্রচুর অনুরাগী ও বন্ধু আছে। তিনি এলেই গান, গল্প, আড্ডা, আলোচনায় সরব হয়ে উঠত এনজিওগুলোর নারী কর্মীবৃন্দ। কমলা মানেই আনন্দ, কমলা মানেই কিছু না কিছু শেখা। তিনি মানেই গান, কবিতা। আর তিনি ঢাকা আসছেন শুনলেই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তাম কী করে তাঁকে, তাঁর বার্তা সবাইকে শোনাব সেই ব্যবস্থা করতে। এক পর্যায়ে নারীবাদী আড্ডা শুরু করি। তিনি প্রতিবারই বলতেন “আমি তোমাদের এ পাগলামী খুব পছন্দ করি।” আমাদের কাছেও মনে হত তিনি মানেই উৎসব।

তাঁর বেশকিছু ছোট ছোট বই আমি অনুবাদ করি। তাঁর কিছু গান ও কবিতাও অনুবাদ করি। এই কাজটি করতে যেয়ে দেখেছি কী অসীম ধৈর্য তাঁর। প্রতিটি শব্দ তাঁকে পড়ে শোনাতে হত। তিনি বাংলা শিখেছিলেন। আমি তাঁকে একটা-দুটো রবীন্দ্রসংগীত শিখিয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথের অনেক গান অনুবাদ করে শোনাতাম। তিনি মন দিয়ে শুনতেন।

আজ তিনি নেই। চোখের আড়াল মানে মনের আড়াল — আমি বিশ্বাস করি না। মানুষের মৃত্যু হয়,আদর্শের নয়। আদর্শের কোনো ক্ষয় নেই। তিনি আমাদের মাঝে রেখে গেছেন তাঁর স্বপ্ন। শত শত ফুল ফুটিয়ে গেছেন। তাই তিনি থাকবেন আমাদের কাজের মাঝে। আমাদের অঙ্গীকারে, আমাদের ভালোবাসায়। তিনি থাকবেন আমাদের ছায়া হয়ে ,মায়া হয়ে।

“সে চলে গেলেও, থেকে যাবে তার

স্পর্শ আমারই হাতের ছোঁয়ায়।

নুয়ে পড়বেই স্মৃতিরা যেখানে,

দেবদারু তার কপাল নোয়ায়।”

প্রবন্ধকার বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের কর্মী। কমলা ভাসিনের সাথে বহু বছর কাজ করেছেন।এছাড়াও তিনি একজন আবৃত্তি শিল্পী এবং লেখালেখির সাথে যুক্ত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.