ভুলে যান যে উনি একজন কিংবদন্তী। এ কথাও মনে না রাখলে চলবে যে উনি ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার, যাকে সারা পৃথিবীর কয়েক লক্ষ ক্রিকেটভক্ত ‘ভগবান’ বলত। এসবের চেয়ে অনেক বড় অভিধা হল ভারতরত্ন, যা আমাদের দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার। শচীন তেণ্ডুলকার ভারতরত্ন। তাই শচীনের, তাঁর সহধর্মিণী অঞ্জলির এবং শচীনের শ্বশুরমশাই আনন্দ মেহতার নাম প্যান্ডোরা পেপার্স থেকে প্রকাশিত হওয়া আমাদের ক্রিকেট আইকনের জীবনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্ত। ফাঁস হওয়া কাগজপত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে তাঁরা সাস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির মালিকানায় যুক্ত ছিলেন। ২০১৬ পানামা পেপার্স প্রকাশিত হওয়ার পর তড়িঘড়ি সে কোম্পানির লিকুইডেশন হয়। সে সময় ওঁরা তিনজনেই ফের কোম্পানির শেয়ারগুলো কিনে নেন।

শচীনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে লিকুইডেশন আয়কর বিভাগকে জানিয়েই করা হয়েছে। এই বিশ্বব্যাপী তদন্তমূলক সাংবাদিকতায় যুক্ত ভারতের একমাত্র সংবাদমাধ্যম দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে প্যান্ডোরা পেপার্সে কোনো সম্পত্তির হদিশ আছে মানেই, তা বেআইনি তা-ও নয়। কিন্তু প্যান্ডোরা পেপার্স থেকে যা দেখা যাচ্ছে, তা হল কীভাবে সারা পৃথিবীর অতি ধনী ব্যক্তি এবং পরিবারগুলো আইনের ফাঁক খুঁজে নিয়ে একযোগে ট্রাস্ট আর অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে নিজের দেশের বাইরে এমনভাবে সম্পত্তি ও বিনিয়োগ রাখে, যাতে আয়কর বিভাগ বা অন্য কোনো নিয়ামক সংস্থার হাত সেখানে পৌঁছতে না পারে। অতএব এই তালিকায় নাম আসা মানে শচীনের নীতিবোধ এবং দেশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মজার কথা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের ওই কোম্পানি লিকুইডেট হওয়ার সময় শচীনের চেয়ে অঞ্জলি বেশি মূল্যের শেয়ার কিনে নিয়েছিলেন। অঞ্জলি এমন একজন ডাক্তার, যিনি বিয়ের আগে চিকিৎসা করতেন, কিন্তু বিয়ের পর থেকে গৃহবধূ। শচীন হয়ত সত্যিই বলছেন — লিকুইডেশন আয়কর বিভাগকে জানিয়েই করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, তিনি যদি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মত ট্যাক্স হ্যাভেনে কর দিয়ে টাকা রাখতে পারেন, তাহলে ভারতের কোনো ব্যাঙ্কে রাখতে অসুবিধা কোথায়? উপরন্তু শচীন একটি মিউচুয়াল ফান্ডের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। তাদের বিজ্ঞাপনে তিনি নিজের ভক্তদের মিউচুয়াল ফান্ডে লগ্নি করতে বলেন। হিন্দি পাঞ্চ লাইনটি হল “মিউচুয়াল ফান্ডস সহি হ্যায়।” তা ভারতের ক্যাপিটাল মার্কেট যদি এতই নিরাপদ হয়, তাহলে শচীন নিজের টাকা অফশোর অ্যাকাউন্টে রেখেছিলেন কেন? যে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁকে ক্রিকেটার হিসাবে, মানুষ হিসাবে এবং অনুসরণযোগ্য ব্যক্তি হিসাবে ভালবাসেন, তাঁদের বিশ্বাসের প্রতি কি সুবিচার করেছেন শচীন?

অবশ্য তিনি যে এই প্রথম নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা নামিয়ে আনলেন তা নয়।

কয়েক বছর আগে তথ্যের অধিকার আইন (RTI Act) অনুসারে ইনকাম ট্যাক্স অ্যাপেলেট অথরিটি আয়কর বিভাগকে বলেছিল শচীনকে জিজ্ঞেস করতে, নিজের আয়কর সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আনতে তাঁর কোনো আপত্তি আছে কিনা। শচীন রাজি হননি।

এই প্রশ্নের কারণ ছিল নতুন দিল্লির অধিবাসী আইনজীবী প্রাণেশের একটি RTI আবেদন। প্রাণেশ ভারতের রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, শচীন ভারতরত্ন পেয়েছেন কোন পেশার লোক হিসাবে? নিজের আয়কর রিটার্নে তিনি নিজেকে কী হিসাবে দেখান? একজন ক্রিকেটার হিসাবে নাকি একজন অভিনেতা (শিল্পী) হিসাবে? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এই প্রশ্ন যুক্তিযুক্ত। কারণ ২০০৮-০৯ সালে শচীন বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন করে আয় করা টাকায় আয়কর ছাড়ের আবেদন করেছিলেন ইনকাম ট্যাক্স ট্রাইবুনালের কাছে। সেই আবেদনে দাবি করেছিলেন, বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছেন বলে তিনি একজন অভিনেতা। তাই ওই ছাড়ের যোগ্য। বেশকিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল, তবে শেষপর্যন্ত একজন অভিনেতা হিসাবে শচীন সেই কেস জিতেছিলেন। ২০১১ সালে ইনকাম ট্যাক্স ট্রাইবুনাল একটি অর্ডার পাস করে বলেছিল, শচীন একজন অভিনেতা বা শিল্পী হিসাবে বিজ্ঞাপন থেকে যা আয় করেছেন তাতে ছাড় পেতে পারেন।

কিন্তু প্যান্ডোরা পেপার্স দেখিয়ে দিল, ওসব ছিল হিমশৈলের চূড়া।

তথ্যসূত্র:

১) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
২) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Leave a Reply