ভবতারণ কুমার

সদ্য বিবাহিত কিশোরীর চুলের মুঠি ধরে মেঝেতে আছড়ে বিকট গলায় হুঙ্কার দিয়ে বলা হচ্ছে ‘বল শালি তুই কে? কী করতে আসেছিস (এসেছিস)? বল যাবি ন নাই?’ মেয়েটি যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে ছেড়ে দেওয়ার করুণ মিনতি করে চলেছে। কে শোনে কার কথা! মটরু ওঝার হুঙ্কারে নিশুতি রাতে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ঘর বাখ্লের মায়া ছ্যালা (পাড়া প্রতিবেশী নারী পুরুষ) সবাই ভিড় করেছে ফুচনাদের আনগায় (আঙিনায়)। মটরু ওঝার বাম হাতে তখন হাঁটু গেড়ে বসা কিশোরীর চুলের মুঠি, ডান হাতে তিন জোড়া হলুদ। বলছে ‘তোরা আগুন কর ,হামি আজ দেখব মটরু ওঝার কাছে ই শালির বিদ্যা কতক্ষণ টেকে।’

কোন মাসে আলি বিটি?
চৈত মাসে আলি মায়।
কিসে করে আলি বিটি?
কাঁধে কাঁধে আলি মায়।
কিসে করে যাবি?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

‘ই শালি ঝাড়া ডাইনি মটরু ওঝার মন্ত্র কাটান মন্ত্র চালে! দেখব আজ তোর কত বিদ্যা আছে…’

আঙিনায় নারী পুরুষের মধ্যে ফিসফিসিয়ে কথা শুরু হয়েছে ‘কত বড় ডাইনি লো! মটরু ওঝাকেও টেক্কা দিয়ে যাছে? ঐ আঁটকুড়িই বটে, ফুচনার বহুকে (বউ) বাঁধে (পুকুরে) কেমন কুঁদরায় ভালতে ছিল (বড় বড় চোখে তাকানো) দেখলি নাই?’

মটরু ওঝা আবার মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করেছে
সাত সমুদ্র তেরো নদী পারে
উঠল মন্ত্র মায়ের পায়ে।
সেই মন্ত্রে কে ঝাড়ে?
মা কামরু কামাক্ষ্যার আদেশে গুরু ঝাড়ে
সেই মন্ত্রে কে ঝাড়ে?
গুরু আদেশে হামি ঝাড়ি।
কার দোহাই?
মা কামরু কামাখ্যার দোহাই।
কার দোহাই রাঙা হাঁড়ি বিসাই চন্ডির দোহাই।
কার দোহাই…
মন্ত্রের বাঁধুনি
এই মন্ত্র যদি টলে…

‘খাটে শুয়া, দে আগুনটা।’

কিশোরীকে খাটে (কাঠ ও দড়ির বুননি দিয়ে তৈরি) শোয়ানো হল, নিচে বিছানা দেওয়া হল না, মাথা পর্যন্ত ঢাকা দেওয়া হল পুরু কাঁথা। ওঝার আদেশে জনা চারেক শক্তসমর্থ পুরুষ ওই অবস্থায় শুয়ে থাকা রুগ্ন কিশোরীকে শক্ত করে ধরে রেখেছে, যেন উঠতে না পারে। খাটের নিচে আগুন দেওয়া হল, আর আগুনে দেওয়া হল মন্ত্রপুত ওই তিন জোড়া হলুদ। হলুদ পোড়া ধোঁয়ায় গোটা ঘর তখন ভর্তি, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। রুগ্ন মেয়েটি উঠতে চাইছে, কিন্তু শক্তসমর্থ চারজন পুরুষের সঙ্গে পেরে উঠছে ন।

এই মন্ত্র যদি টলে
তবে হিন্দু গরু খায়
এই মন্ত্র যদি টলে
মুসলমানে শুয়র খায়
এই মন্ত্র যদি টলে
গণপতি গণেশের মস্তক খসে পড়ে।

মটরু ওঝা মন্ত্র জপতে জপতে খাটটি প্রদক্ষিণ করছে আর মাঝে মাঝে মন্ত্র থামিয়ে বলছে ‘ভাল করে ধরবি তোরা, ভালো করে গোটা শরীরে ধোঁয়াটা ভেদতে দে আগে, তারপর ছাড়বি।’

একটু পরে ছটফট করতে করতে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কিশোরী তাদের বাঁধন ভেঙে উঠে হুড়মুড়িয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল, পিছু পিছু ২-৩ জন যুবক। তারপর মটরু ওঝা কিছু দূর যেতে না যেতেই মাটিতে পড়ে গেল মেয়েটি। ওঝা দূর থেকে হাঁক ছাড়ল ‘বাঁ দিকে পড়েছে রে?’

উত্তর ‘হ হ, বাঁদিকেই বটে।’

‘যা-ই হোক, এবার নিয়ে আয়। আপদ পালায়ঁছে (পালিয়েছে)।’

এটা আদ্যিকালের কোনো ঘটনা নয়, নয় কোনো রূপকথার গল্প। এই ঘটনা আজও পুরুলিয়ার গ্রাম, ডি, পাড়া, টোলা, বস্তি, এমনকি শহরের বুকেও ক্রমাগত ঘটে চলেছে। এখনো ডাইনি সন্দেহে নির্যাতন চলে, ওঝাদের কেরামতি চলে। কিন্তু আর কতদিন চলবে এই বর্বরতা?

কী কী লক্ষণ দেখা গেলে ডাইনি ভর করেছে বলে একাংশের মানুষ ভাবতে শুরু করে?

ক) প্রবল জ্বর, মাথা ব্যথা, গায়ে ব্যথা।

খ) জ্বরের প্রকোপে ঘোরের মধ্যে থাকা, বেহুঁশ হয়ে যাওয়া।

গ) জোরালো আলোর দিকে তাকাতে না পারা।

ঘ) ভুল বকা, অর্থাৎ অন্য ভাষায় অন্যভাবে কথা বলা। সেসব কথার প্রায়শই কোনো মাথামুণ্ডু থাকে না।

ঙ) স্বভাববিরুদ্ধ আচরণ করা। যেমন স্বামী, শশুর বা শাশুড়িকে নাম ধরে ডাকা বা অন্য কোনো আত্মীয় বলে ভুল করা। নিজের নাম ধরে কেউ ডাকলে নিজের পরিচয় অস্বীকার করা ইত্যাদি।

চ) ভয় পেয়ে চমকে চমকে ওঠা।

এই লক্ষণগুলোর মধ্যে গ, ঘ ও ঙ ডাইনি ভর করার অকাট্য প্রমাণ বলে ধরা হয়। অথচ এই লক্ষণগুলো মূলত অপুষ্টি, ভীতি, অশিক্ষা, ভাল করে ঘুম না হওয়া এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারলে দেখা দেয়।

কিন্তু মানুষ এইসব লক্ষণ দেখে ওঝাকে ডাকে। ওঝা এসেই রোগীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ধমক, হুঙ্কার, চড় থাপ্পড় মারা, চুলের মুঠি ধরে কাবু করার মত কাজকর্ম শুরু করে। নিজে কত বড় ওস্তাদ তা প্রমাণ করতে এবং রোগীর বাড়ির লোকজনকে সাহস দিতে বিভিন্ন মন্ত্র, মড়ার মাথার খুলি, হাড় ইত্যাদি ঘরের চারদিকে বাঁধে, অর্থাৎ ওদের ভাষায়, রক্ষা কবচ বা লক্ষ্মণরেখা টানে।

সংশ্লিষ্ট রোগী কতখানি আচ্ছন্ন, তার উপর নির্ভর করে ঘোর কাটাতে কী ব্যবহার করা হবে। প্রথমে ধুনা-হলুদ-লঙ্কা-বামর যথাক্রমে দেওয়া হয়। অনেকসময় হাতে আগুনও দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ওঝাদের অসচেতনতা এবং আসল রোগের কার্যকারণ ও পরিমাণ সম্পর্কে ধারণার অভাবে নানা বিপত্তি হয়। হাত পুড়ে যায়, মারপিট চলার ফলে রোগী ব্যথা পায়, এমনকি গর্ভপাত হয়ে যাওয়ার মত মারাত্মক ঘটনাও ঘটে।

কারা ডাইনি অপবাদে এরকম অত্যাচারের শিকার হয় বেশি?

ক) অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা মানুষ।

খ) কিশোরী বা সদ্যযুবতী।

গ) সদ্যবিবাহিত মেয়ে।

ঘ) যার সম্পর্কে প্রচার আছে যে সে ডাইনি।

এই ধরনের সমস্ত ঘটনায় দেখা যায়, সেই রোগী আগে থেকে জানে আশেপাশে কারা কারা ডাইনি এবং সেই ডাইনিদের মধ্যে আগের ২-৩ দিনে স্নান করতে গিয়ে, জল তুলতে গিয়ে কিংবা সরু গলির মধ্যে মুখোমুখি দেখা, ছোঁয়াছুঁয়ি বা কথা কাটাকাটি হয়েছে। এর থেকে পরিষ্কার যে

মানুষের মনের তিনটে স্তর – সচেতন, অবচেতন, অচেতন। অবচেতন মনের ভয় যখন সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন রোগী যে মহিলাকে ডাইনি বলে জেনে এসেছে, তার মত আচরণ করতে শুরু করে। তার অবচেতন মনে এই ধারণাও বদ্ধমূল হয়ে থাকে যে ওঝার মন্ত্রই তাকে উদ্ধার করতে পারে। তাই সে ওঝার উপর ভরসা করে। ওঝা এমন পরিস্থিতিতে ঘোর কাটাতে বিভিন্ন ধরনের ধোঁয়া, ধমক, চমক দিয়ে রোগীকে একটা জোর ঝাঁকুনি দেওয়ার চেষ্টা করে।

আরো পড়ুন দ্য সাবস্ট্যান্স: নয়া অভিব্যক্তিবাদ বা স্রেফ নারীবাদী রূপকথা

এই ব্যাপারটার একটা অন্য দিকও আছে। ডাইনি বলে সাধারণত চিহ্নিত করা হয় সমাজের অসহায় মহিলাদের। দেখা গেছে, বিধবা, নিঃসন্তান বৃদ্ধা, তথাকথিত কুৎসিতদর্শন মহিলা, স্বামী বা সন্তান অপঘাতে মারা গিয়েছে – এমন মহিলাদেরই ডাইনি বলে চিহ্নিত করে দেয় লোকে। একই ব্যবহার অনেকসময় পুরুষদের সঙ্গেও করা হয়। তাদের বলা হয় ‘বকস’। কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস থেকে এই অভিশপ্ত ব্যবহারের জন্ম। কিন্তু সবক্ষেত্রেই কুসংস্কার নয়, অনেক ক্ষেত্রে অসাধু লোকদের কুমতলবও থাকে এর পিছনে। তারা সচেতনভাবেই কোনো মহিলার জমি হাতানোর জন্যে বা সে দাসীবৃত্তি করতে চায়নি বলে অথবা দেহ ভোগ করতে দেয়নি বলে গায়ের ঝাল মেটাতে ডাইনি বলে দেগে দেয়। তারপর সেই মহিলার উপর চলে নির্যাতন। ঘরছাড়া হতে হয় অনেককে, জরিমানা দিতে গিয়ে সর্বস্বান্তও হতে হয়। এই অপবাদে খুন করা, উলঙ্গ করে এলাকায় ঘোরানোর মত জঘন্য অত্যাচার আজও খবরের শিরোনামে উঠে আসে।

তথাকথিত ডাইনি ভর যে আসলে একটা মানসিক রোগ মাত্র – এই কথাটা প্রচার করার মত লোকের অভাব আজও পূরণ হল না। এর চেয়ে আক্ষেপের বিষয় আর কী হতে পারে? চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির যুগে দাঁড়িয়েও ডাইনি, ওঝা ইত্যাদিতে মানুষের বিশ্বাস কিসের ইঙ্গিত বহন করে? এখনো বান মারা, বাটি চালা, তুকতাক, ঝাড়ফুঁকের মত প্রাচীন বর্বরতা রমরমিয়ে চলছে কীভাবে?

সমাজের সর্বস্তর থেকে কুসংস্কার দূরীকরণে স্বাধীন ভারতে রাষ্ট্র কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে? সাধারণ অপুষ্টিতে ভোগা অচেতন মনের ক্রিয়া যুগ যুগ ধরে ডাইনির ভর বলে পরিচিত। তাই নিয়ে আজও যে কাণ্ড আমাদেরই সমাজে ঘটে চলেছে তা কি গোটা দেশের লজ্জা নয়?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.