সকাল হতেই দৌড়। নতুন ‘শ্বশুরবাড়ি’ থেকে। সোজা বাড়ি। তারপর স্কুল। দিদিমণিকে সবটা জানানো। কিন্তু হয়েছিল কী?
বিয়েতে নারাজ ছিল ক্লাস সেভেনের এক ছাত্রী। নিমরাজি ছিলেন তার মা-ও। তবে যৌথ পরিবারের মেয়েটার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঠাকুমার বাড়ি নিয়ে গিয়ে। যদিও আটকানো যায়নি মেয়েকে। জেদ নিয়েই সে ফিরেছে স্কুলে। বাতিল হয়েছে বিয়ে। এখন সে ক্লাস এইট।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তার ক্লাসরুম থেকে কয়েকটা ঘর এগোলেই ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন হওয়া দেওয়াল পত্রিকায় লেখা, “এই বাল্যবিবাহের জন্য অনেক মেয়েদের জীবন নষ্ট হয়ে যায়। আমরা আমাদের জীবন নষ্ট হতে দেব না। এই অন্যায় আমরা মানব না”। লেখা হয়েছে হলুদ চিরকুটে, লাল কালিতে। স্কুলের দেওয়াল পত্রিকার ঠিক মাঝামাঝি। নীচে লেখা ‘মোসাঃ মুসকান’, ব্র্যাকেটে রোমান হরফে পাঁচ।
পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়া মুসকান একজন মীনা। কিন্তু মীনা কে? স্কুলের সব মেয়েই। চওড়া হেসে হাত তুলছে ক্লাস সেভেন এ, সিক্স বি, ক্লাস এইটের গোটা ঘর।
মুসকান আরও লিখেছে “আমরা মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াব।…আমরা মেয়ে, আমাদের অধিকার আছে ইচ্ছে (মতো) বাঁচার। আমরা পড়ব, আমাদের অধিকার আছে। আমরা বয়স না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে করব না। আমরা স্বাধীনভাবে নিজেদের মতো করে বাঁচব”।

প্রতিটা শব্দে আরও স্পষ্ট হচ্ছে উচ্চারণ।
স্কুলের নাম দেবকুণ্ড সেখ আব্দুর রাজ্জাক মেমোরিয়াল গার্লস হাই মাদ্রাসা। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা ব্লকের এই স্কুলের ছাত্রীরা হয়ে উঠছে একেকজন মীনা। কিন্তু মীনা কে? উত্তর দিয়েছে একজন মীনাই। তার নাম নাজনিন খাতুন। দুই হাত নিজের দিকে দেখিয়ে বলেছেন “মীনা আমাদের মতই গ্রামের মেয়ে। সে নিজের কাজ নিজে করে। আর সমাজের কাজ করে। ভাল করে”।
কিন্তু ভাল কাজ যখন করে তখন সমাজের খারাপ বিষয়েরও মোকাবিলা করে। পাশ থেকে জানাচ্ছে আরেক মীনা – আরফিন পারভিন। কিন্তু কীভাবে? এই মীনারাই গতবছর শীতের সময়ে প্রধানশিক্ষিকার কাছে এনে দিয়েছিল একটা খবর – পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে এক সহপাঠীর দিদিকে। সেও ওই স্কুলেই পড়ে, ক্লাস নাইন। এটা তো হতে দেওয়া যায় না। অগত্যা ডাক পড়ে অভিভাবকের। পেশায় খেতমজুর অভিভাবক প্রধানশিক্ষিকার সঙ্গে দেখা করার পর লিখিতভাবে জানিয়েছেন, আঠারোর আগে মেয়ের বিয়ে দেবেন না।
প্রতিমাসেই এইরকম খোঁজ আনছে মীনারা। বন্ধুদের, দিদিদের বোঝাচ্ছে – বিয়ে ভেঙে দিয়ে স্কুলে আসতে হবে। বাবা, মাকেও বুঝিয়ে বলতে হবে। না হলে ভরসা সেই স্কুল। কিন্ত অনেক মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় আত্মীয়ের বাড়ি নিয়ে গিয়ে। সেই সমস্যার সমাধানও বের করেছে মীনারা। প্রতিদিনই স্কুলে চলে গুনতি। পরপর বেশ কয়েকদিন কেউ না এলে জানানো হয় শিক্ষিকাদের। স্কুলে ডাক পড়ে অভিভাবকদের। তবে শিক্ষিকাদের আক্ষেপ, কোভিড পরবর্তী সময়ে ফের বাড়ছে বাল্যবিবাহের সংখ্যা।
মুর্শিদাবাদ জেলায় বাল্যবিবাহ গুরুতর সমস্যা। এর ফলে মা হয়ে যাচ্ছে বহু কিশোরী। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের মাতৃমা পোর্টাল থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদ জেলার গ্রামীণ এলাকার মায়েদের ২৫ শতাংশই কিশোরী। ‘টিন এজ প্রেগনেন্সি’র হিসাবে রাজ্যে ২৭ স্বাস্থ্য জেলার মধ্যে মুর্শিদাবাদের স্থান ২৫। এই সময়কালে নথিভুক্ত গর্ভবতী মহিলার সংখ্যা ১,৩৫,৩৮৯। যার মধ্যে ৩৪,২৮৩ জনই কিশোরী। এদের চিহ্নিত করা হয়েছে “টিডাব্লু (টিনএজ) প্রেগনেন্ট” মহিলা হিসাবে।
এনএইচএফএস-৫ (The 2019-20 National Family Health Survey – NFHS-5)-এর সঙ্গে এই তথ্য মেলালে উদ্বেগের চিত্রটা পরিষ্কার হয়। মুর্শিদাবাদ জেলায় ২০১৯-২০ সালের এনএফএইচএস-৫ তথ্য অনুযায়ী ২০-২৪ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে ৫৫ শতাংশেরই নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ২০১৫-১৬ সালের এনএফএইচএস-৪-এ এর হার ছিল ৫৩.৫%। পশ্চিমবঙ্গের এনএইচএফএস-৫-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে এই হার ৪৮%।
কিশোরীদের গর্ভবতী হওয়া নিয়েও উদ্বেগের ছবি রয়েছে এনএইচএফএস-৫ রিপোর্টে। রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫-১৯ বছর মেয়েদের মধ্যে ২০.৬ শতাংশই হয় গর্ভবতী, নয় সন্তানের জননী। আগের রিপোর্টে এই হার ছিল ২৯.৫%। এনএইচএফএস-৫-এ রাজ্যে এই হার ১৬.৪%।
যে বেলডাঙা ব্লকে এই মাদ্রাসা অবস্থিত, সেখানেও কমবয়সীদের মধ্যে বিয়ে ও গর্ভবতী হওয়ার প্রবণতা জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই ব্লকে ১ এপ্রিল ২০২৩ থেকে ১ মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী গর্ভবতী মহিলাদের ২৭.১৮ শতাংশই কিশোরী। মোট নথিভুক্ত গর্ভবতী মহিলার সংখ্যা ৬,৪৩২। এর মধ্যে ১,৭৫০ জনই কিশোরী। এনএইচএফএস-৫-এর সঙ্গে স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য মিলিয়ে দেখলে উদ্বেগের ছবিটা প্রতিদিন আরও গভীর হচ্ছে।
বাল্যবিবাহের ঝোঁক বেড়েছে, একথা দেবকুণ্ড সেখ আব্দুর রাজ্জাক মেমোরিয়াল গার্লস হাই মাদ্রাসার প্রধানশিক্ষিকা মুর্শিদা খাতুনও বললেন। তাঁর অভিজ্ঞতা হল, স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতি, খেলাধুলোর চর্চা বাড়িয়ে ছাত্রীদের সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু কোভিডকালে ছেদ পড়েছে সবকিছুতেই। শিক্ষিকা বলছেন, আগে নবম, দশম শ্রেণির মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছিল। এখন অষ্টম শ্রেণি, সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়াদেরও বিয়ের কথা জানা যাচ্ছে। এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। অতিমারী কেটে গেলেও শিক্ষার পরিবেশ আর আগের মত নেই। ছাত্রীদের পরিবারগুলোকে আবার নতুন করে সব বোঝাতে হচ্ছে। তবে এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে মীনা মঞ্চের মেয়েরা।
আরো পড়ুন পকসো আইন পরিবর্তন হবে অভিযুক্তের মর্জি অনুযায়ী?
মীনা মঞ্চের কাজ নিয়ে আশাবাদী স্বাস্থ্য প্রশাসনও। মুর্শিদাবাদের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সন্দীপ সান্যাল মনে করছেন, এইরকম সামাজিক উদ্যোগ, ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগের মধ্য দিয়েই বাল্যবিবাহের মত সমস্যা রোধ করা যাবে।
২০২৩-২৪ সালের রাজ্য বাজেটে পশ্চিমবঙ্গের অর্থ দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন, মুর্শিদাবাদ জেলার ১০৩টি মাদ্রাসার ৫০,০০০ পড়ুয়াকে নিয়ে কাজ করছে মীনা মঞ্চ।
বেলডাঙার খুশিনা খাতুন, সুহানা সুলতানা ক্লাসের মেয়েদের বোঝাচ্ছেন বাল্যবিবাহে না বলতে হবে। নিজেদের পড়াশোনাটা আগে বুঝে নিতে হবে। কিন্তু বাড়ির স্কুলপড়ুয়া দিদিরা, স্কুলের বন্ধুরাই বিয়ের কথা ভাবলে তার প্রতিকার কী?
মীনা মঞ্চের সদস্য রেবেকা সুলতানার কথায়, ‘চাকরির আশা জাগাতে হবে’। অর্থাৎ ছাত্রীকে বোঝাতে হবে যে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। ক্লাস এইটের রেবেকা নিজে বড় হয়ে পুলিস অফিসার হতে চায়। তবে রেবেকা মীনা মঞ্চের সদস্য হিসাবে নিজের কাজকে পড়াশোনার থেকে আলাদা করতে নারাজ। পড়াশোনার পাশাপাশি এই কাজকে নিজেদের দায়িত্ব বলেই মনে করছে আরেক মীনা রুমানা সুলতানা। রুমানা নিজে একজন কবাডি খেলোয়াড়। মুর্শিদাবাদ থেকে খেলতে গিয়েছে বীরভূম, কৃষ্ণনগর, হুগলী।
বুঝিয়ে বলার কাজকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে কেউ আঁকছে কার্টুন, কেউ করছে অভিনয়। মীনা মঞ্চের সভায় সদস্যরা শুধু ভিডিওতেই নাটক দেখেছে তা নয়। সেই নাটক আবার নিজেরাই অভিনয় করেছে ক্লাসঘরে। তবে মীনা মঞ্চের সদস্যা নাজনিন খাতুনের অভিযোগ, মীনা মঞ্চ নিয়ে বাংলায় যত ভিডিও পাওয়া যায় সবই বাংলাদেশের ভিডিও। তাই দেখে দেখেই অভিনয় শিখতে হয়।
মীনা মঞ্চ শুধু যে ছাত্রীদের বিয়ে রুখতে শেখাচ্ছে তাই নয়। বাড়ছে ছাত্রীদের মধ্যে দায়িত্ব, স্কুল নিয়ে ভালোবাসা, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ। এমনটাই বলছেন স্কুলে মীনা মঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষিকা নাজমা পারভিন। খাতায় কলমে তিনি মীনা মঞ্চের ‘সুগম কর্তা’। তাঁর দায়িত্ব প্রতি মাসে মীনা মঞ্চের মিটিং করা। কিন্তু নাজমা জানাচ্ছেন, ছাত্রীদের আগ্রহে আর একটা সভার পর একমাস অপেক্ষা করতে হয় না। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই হচ্ছে মিটিং। সেই মিটিংয়ের রেজোলিউশন লিখছে ছাত্রীরাই। যারা আক্ষরিক অর্থে মীনা মঞ্চের সদস্য নয়, তারাও একেকজন মীনা হয়ে উঠছে।
মীনার কাজ করতে করতে মেয়েদের মনোবলও বাড়ছে। তাই বিয়ে ভেঙে ক্লাসে ফিরছে কেউ কেউ। কেউ আবার কারোর বিয়ে দেখলেই লিখে রাখছে খাতার শেষ পাতায়। সকালে স্কুলে এসেই চিরকুটে লিখে জমা দিতে হবে শিক্ষিকাদের। মীনা মঞ্চের উদ্যোগে স্কুলে কখনো আলোচনা হয়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে, কখনও বাল্যবিবাহ নিয়ে। মানসিক স্বাস্থ্য থেকে অবাঞ্ছিত স্পর্শ – সবকিছু নিয়ে মন খুলে কথা বলছে ছাত্রীরা। ফলে সমাধানও মিলছে। শিক্ষিকারা আশাবাদী, স্কুলের বাইরেও সমাজে, পরিবারে বাল্যবিবাহ রোখার কাজে আরও বড় ভূমিকা নেবে মীনা মঞ্চের সদস্যরা। তবে নাজমা পারভিনের আক্ষেপ, সমাজের সব অংশ থেকে সমান সাড়া মিলছে না।
এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে স্কুলের মেয়েরাই। এই স্কুলের মীনা মঞ্চ, কন্যাশ্রী ক্লাব, স্কুলের ক্যাবিনেট – সবাই বসে ঠিক করেছে যে এবার যাওয়া হবে বিডিও অফিসে, থানায়, গ্রাম পঞ্চায়েতে। ব্লক স্তরের সরকারি আধিকারিক থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান, প্রতিনিধি সবাইকে নিয়েই বাল্যবিবাহ আটকানোর অভিযানে নামবেন ছাত্রী থেকে শিক্ষিকারা। পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান আর পুলিশ প্রশাসনকেও নিজেদের কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে স্কুলের ছাত্রীরা। পরিকল্পনাও তৈরি।
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








