ফয়েজ আনোয়ার
আমাদের সম্প্রদায়ের সামনে এমন অনেক মুহূর্ত এসে উপস্থিত হয়, যখন একইসঙ্গে আশা ও আশঙ্কার সঞ্চার হয়। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সাসপেন্ড হওয়া বিধায়ক হুমায়ুন কবীর প্রস্তাবিত, মুর্শিদাবাদে এক লক্ষ লোকের কোরান শরীফ পাঠ তেমনই একটা মুহূর্ত। প্রস্তাবটা নতুন, কিন্তু আলোড়ন সৃষ্টিকারী। হাজার হাজার মানুষ একত্রে ঈশ্বরনের কেতাব পাঠ করবেন, এক কণ্ঠে দৈববাণী উচ্চারিত হবে – এ দৃশ্য কল্পনা করে যে কোনো মুসলমানের মন উজ্জীবিত হতে পারে। একজন বিশ্বাসী এর বেশি আর কী চাইতে পারে? কিন্তু মুশকিল হল, এই আধ্যাত্মিক প্রতিশ্রুতির উপরে ছায়া ফেলেছে রাজনীতি। এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে মুর্শিদাবাদে এক নতুন বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করার ঠিক পরেই এবং সেই প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায় শুরু হওয়ার ঠিক আগে। ঘটনাটা ঘটানো হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন পশ্চিমবঙ্গ আবেগের দিক থেকে এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থির অবস্থায় রয়েছে।
শুধু তাই নয়, এর আয়োজক এমন একজন রাজনীতিবিদ যাঁর অতীত নিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকেই সন্দিহান। ইনি এমন একজন, যিনি নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে অতীতে সেই পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন যে পার্টি আসল বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্যে দায়ী।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সুতরাং মুর্শিদাবাদে লক্ষ লোকের কোরান শরীফ পাঠের আয়োজন নিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অস্বস্তি, তা নেহাত বাতিক নয়। এর পিছনে সত্যিকারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বহুবছর ধরে হুমায়ুনের রাজনৈতিক অবস্থানকে এই সম্প্রদায়ের মানুষ সন্তর্পণে খেয়াল করেছেন। তাঁর বদলাতে থাকা রাজনৈতিক আনুগত্য, সাম্প্রতিক সাসপেনশন এবং যেখানে যখনই পাদপ্রদীপের আলো পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় তখনই সেখানে পৌঁছে যাওয়ার প্রবণতা স্বভাবতই হুমায়ুনকে সন্দেহের পাত্র করে তোলে।
এমন নয় যে তাতে কোরান শরীফ পাঠের উদ্যোগ অবৈধ হয়ে যায়। কিন্তু অবশ্যই এতে প্রমাণ হয় যে মুসলমান সমাজের এই কর্মসূচি নিয়ে দুর্ভাবনার কারণ তাঁদের জলজ্যান্ত অভিজ্ঞতা, স্রেফ অমূলক সন্দেহ নয়। তবু একথা বলতেই হবে যে কোরান শরীফ পাঠের জন্য একত্রিত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু হুমায়ুনের রাজনীতি এই মুহূর্তটা নিয়ে অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলেছে, এতে নানা স্তর যোগ করেছে এবং ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার হয়ে পড়েছে।
মনে রাখা ভাল, ইসলাম ধর্মে যে কোনো উপাসনামূলক অনুষ্ঠানকে বিচার করা হয় একটা সর্বজনগ্রাহ্য জিনিস দিয়ে, সেটা হল উদ্দেশ্য (‘নিয়ত’)। হাদিশের প্রামাণ্য সংগ্রহ বুখারি অ্যান্ড মুসলিম-এ বলা হয়েছে ‘Actions are judged only by intentions, and every person will have only what they intended.’ অর্থাৎ কাজকে শুধুমাত্র উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করা হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি শুধু তাই পাবে যা পাওয়া তার উদ্দেশ্য ছিল।
মানে এক লক্ষ লোকের কোরান শরীফ পাঠ পৃথিবীর মাটিতে দারুণ লাগতেই পারে, কিন্তু জন্নতে তার ওজন বিচার হবে একনিষ্ঠতা দিয়ে, কত বড় জমায়েত হয়েছে তা দিয়ে নয়। এক হাজার লোকের ভোজ মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারে, কিন্তু আল্লাহ ওতে সন্তুষ্ট হবেন না, যদি না শুদ্ধ মনে কাজটা করা হয়ে থাকে। কোরান শরীফ নিজেই আমাদের সাবধান করেছে যে ধর্মীয় আড়ম্বরের সঙ্গে ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে গুলিয়ে ফেলা চলে না। মসজিদ ধিরারের কাহিনিতে আল্লাহ বলেন ‘Never stand (to pray) there. A mosque founded on righteousness from the first day is more worthy of your standing’ (Qur’an 9:108). অর্থাৎ ওখানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা কোরো না। ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটা মসজিদ প্রথম দিন থেকে তোমার প্রার্থনার জন্যে বেশি উপযুক্ত।
এই শিক্ষা চিরকালীন। এর অর্থ হল, কোনো কাজ দেখে পবিত্র মনে হতে পারে। কিন্তু তার আত্মা বলে কিছু থাকবে না, যদি আসল উদ্দেশ্য হয় জাগতিক লক্ষ্যপূরণ। নবী জোরালো ভাষায় আমাদের এ ব্যাপারে সাবধান করেছেন ‘Whoever does a good deed to show off, Allah will expose his intentions on the Day of Judgement’(SahihBukhari). অর্থাৎ যে লোককে দেখানোর জন্যে ভালো কাজ করে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার উদ্দেশ্য ফাঁস করে দেবেন।
আরো পড়ুন মমতা যা করেছেন তাতে তিনি জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না পশ্চিমবঙ্গে
যে আকারের অনুষ্ঠান মুর্শিদাবাদে করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, অস্বস্তিকর রাজনৈতিক ইতিহাসসম্পন্ন যে নেতা এই অনুষ্ঠান করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তা উপরিলিখিত সাবধানবাণীগুলোকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। হুমায়ুনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। একমাত্র আল্লাহই মানুষের মনের কথা জানতে পারেন, কিন্তু ‘নিয়ত’-এর প্রশ্ন এসেই যাচ্ছে।
আজ মুসলমান সমাজ স্পর্শকাতর, আহত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে রয়েছে। প্রত্যেকটা জমায়েত, প্রত্যেকটা বিবৃতি, প্রত্যেকটা প্রতীকের নিজস্ব ওজন আছে। আমাদের পথপ্রদর্শক গ্রন্থ কোরান শরীফ প্রতিক্রিয়া, শত্রুতা বা রাজনৈতিক নাটুকেপনার অঙ্গ হয়ে গেলে তা মুসলমানদের জন্যে ভালো হবে না। এই লক্ষ কণ্ঠে কোরান পাঠ যদি সত্যিই আল্লাহর জন্যে হয়, তাহলে কামনা করি তা যেন অভূতপূর্ব আশীর্বাদ বয়ে আনে। কিন্তু যদি এটা স্রেফ নিজেদের সংখ্যা জাহির করা, মানুষকে একজোট করার কৌশল হয় অথবা কলকাতার ব্রিগেড মাঠের গীতাপাঠের জমায়েতের পালটা কর্মসূচি হয়, তাহলে আমাদের থমকে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত – কোরান শরীফ কি আমাদের কাছ থেকে এমন কাজ দাবি করে?
যদি এক লক্ষ মানুষ সত্যিকারের বিশ্বাস নিয়ে একত্র হন, তাহলে ফরিশতারা নেমে আসতে পারে। কিন্তু যদি এক লাখ লোক দৃশ্য তৈরি করার জন্যে জড়ো হয়, তাহলে কেবল ক্যামেরা আসবে। বড় জমায়েত করায় কোনো অন্যায় নেই, কিন্তু আসল কথা হল সেই জমায়েতের মাধ্যমে কী করতে চাওয়া হচ্ছে।
আল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্যকে চালনা করুন, আমাদের সমাজকে রক্ষা করুন এবং তাঁর গ্রন্থের প্রত্যেক পাঠকে এই পৃথিবীর মাটিতে আলোকবর্তিকা করে তুলুন, রাজনীতির মরশুমে খবরের শিরোনাম নয় – এই কামনা করি।
আমীন।
ইনিউজরুম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল নিবন্ধ থেকে ভাষান্তরিত। নিবন্ধকার পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







