মানতাশা আহমেদ
ভারত সরকার প্রত্যেক নতুন স্মার্টফোনে সঞ্চার সাথি অ্যাপ প্রিলোড করার পরিকল্পনা আপাতত প্রত্যাহার করেছে। বলা হয়েছিল, এই পদক্ষেপ নিতে চাওয়া হচ্ছে দুটো বড় সমস্যার মোকাবিলা করতে – ক্রমবর্ধমান সাইবার প্রতারণা আর পরিচিতি চুরি। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছিল, এ আসলে কোটি কোটি ভারতীয়ের পকেটে নজরদারির যন্ত্র ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। সরকারের দাবি অনুযায়ী, এই অ্যাপ থাকলে চুরি যাওয়া ফোন চট করে ব্লক করে ফেলা যাবে, ভুয়ো IMEI (১৫ অংকের যে সংখ্যা দিয়ে পৃথিবীর প্রত্যেকটা মোবাইল ফোন বা ট্যাবলেটকে আলাদা করা যায়) চিনে ফেলা যাবে এবং অনলাইন প্রতারণার ঘটনা প্রতিরোধ করা যাবে। কিন্তু ঘটনা হল, প্রত্যেক ডিভাইসে এমন একটা অ্যাপ যদি ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যেটা ব্যবহারকারী না নিষ্ক্রিয় করতে পারবেন, না ফেলে দিতে পারবেন; উপরন্তু সেই অ্যাপ কল, এসএমএস এবং লোকেশনের তথ্য জানতে পারবে – তাহলে আর অ্যাপটা নিরাপত্তার বিষয় থাকে না, ক্ষমতার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
যে কারণে সঞ্চার সাথি নিয়ে এই সরকারি তৎপরতা আরও সন্দেহজনক, তা হল সরকার ইতিমধ্যেই উপরিলিখিত সবকটা নিরাপত্তামূলক কাজই করে কোনো অ্যাপ ছাড়াই। যে কেউ একটা ডিভাইসের IMEI জেনে নিতে পারেন ১৪৪২২ নম্বরে ‘KYM’ মেসেজ পাঠিয়ে। CEIR বা সঞ্চার সাথি পোর্টালে গিয়েও কাজটা করা যায়। এই ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চালু আছে এবং এতে কাজও দেয়। তাহলে ব্যাপারটাকে আমাদের ফোনে ঢোকানো কেন?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আনন্দের কথা, জোরালো প্রতিবাদের ফলে সরকার গত ৩ ডিসেম্বর মোবাইল নির্মাতাদের কাছে পাঠানো ওই নির্দেশিকা প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু একটা খারাপ পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে মানেই তার পিছনে যে যুক্তিটা কাজ করেছে তা উবে যাবে না। সাধারণ মানুষ ভাবছেন – আমরা তো ফেসবুকে, গুগল, ডিজি যাত্রার মত অ্যাপের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য, যেমন ছবি, বিভিন্ন নথি, ইমেল, পরিচিতদের তালিকা, ইন্টারনেট ফুটপ্রিন্ট ইত্যাদি শেয়ার করেই থাকি, তাহলে সঞ্চার সাথি অ্যাপের সঙ্গে শেয়ার করলে ক্ষতি কী? অনেকে এও বলছেন যে চালু ব্যবস্থার মধ্যে এমন অনেককিছুই তো আছে যেগুলো আমাদের ডিজিটাল প্রাইভেসি লঙ্ঘন করে, তাহলে সঞ্চার সাথি অ্যাপ ফোনে থাকলে কী আর অতিরিক্ত ক্ষতি হবে? অ্যাপটার উদ্দেশ্যও তো বলা হয়েছিল সাইবার প্রতারণা কমানো, নিরাপত্তা জোরদার করা এবং হারিয়ে যাওয়া বা চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন ব্লক করা।
কিন্তু বুঝতে হবে যে এ নিয়ে সমালোচনা তীব্র হয়ে উঠল, যখন জানা গেল যে আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। এইসব সমস্যা সামলানোর জন্যে এই মুহূর্তে যেসব ব্যবস্থা রয়েছে – ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০০০ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইন, সাইবার অপরাধ হেল্পলাইন, এমনকি ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০২৩ – সেগুলোর হয় পর্যাপ্ত ব্যবহার হয় না, নয় যথেষ্ট কার্যকরীভাবে কাজ করে না। প্রাইভেসি লঙ্ঘন করার মত একটা বাধ্যতামূলক অ্যাপ জোর করে ফোনে ঢোকানোর চেষ্টা করার চেয়ে জরুরি হল চালু আইনগুলোর আরও জোরদার প্রয়োগ এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় হওয়া।
সঞ্চার সাথি অ্যাপ দিয়ে যা করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তা হল টেলিকম ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা, প্রতারক নেটওয়ার্কগুলোকে শাস্তি দেওয়া বা আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা বাড়ানোর বদলে সাধারণ ফোন ব্যবহারকারীর ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া। আশা করা যে সে এমন একটা অ্যাপকে বিশ্বাস করবে, যা সে নিজে বেছে নেয়নি।
সরকারের বয়ান অনুযায়ী, সঞ্চার সাথি অ্যাপকে এইভাবে সমস্ত ফোনে ঢুকিয়ে দেওয়ার পিছনে উদ্দেশ্য হল ক্রমবর্ধমান সাইবার প্রতারণার বিরুদ্ধে একক সুসংবদ্ধ, প্রযুক্তিচালিত ঢাল জোগানো। ফিশিং কেলেঙ্কারি, স্পুফড ডিভাইস এবং পরিচিতি চুরি ক্রমশ সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সুতরাং সরকারের বক্তব্য হল, গভীরতর সিস্টেম পারমিশন পাওয়া একটা প্রিলোডেড অ্যাপ রাষ্ট্রকে দ্রুত ভুয়ো IMEI নম্বর চিনে ফেলতে, চুরি যাওয়া ফোন ব্লক করতে এবং প্রতারণামূলক কাজকর্ম চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে। খাতায় কলমে এরকম একটা জিনিস টেলিকম কোম্পানি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীর মধ্যে সংযোগ সুসংগঠিত করতে পারে। অর্থাৎ অত্যন্ত ঝঞ্ঝাটপূর্ণ এবং দ্রুত বেড়ে চলা সমস্যার এক জায়গায় সমাধান হয়ে উঠতে পারে সঞ্চার সাথি অ্যাপ।
কিন্তু লক্ষণীয়, এই পদক্ষেপের মধ্যে আরও বেশি তথ্যের নাগাল পাওয়ার সঙ্গে আরও ভালো শাসনকে এক করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ সুবিধাযুক্ত একটা অ্যাপ সরাসরি স্মার্টফোনে ঢুকিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র তার নজরদারি এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে পারে এমন একটা ব্যবস্থার জন্য অবিরাম তথ্যের পাইপলাইন তৈরি করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপারটাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে চালানোর চেষ্টা হলেও এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটা ভয়ংকর ধারণা গ্রথিত। সেটা হল, রাষ্ট্রের নাগরিকের ডিভাইসে উঁকি মারা প্রয়োজনীয় এবং যৌক্তিক।
আরো পড়ুন আধার ও ভোটার কার্ড লিঙ্ক: ভয়াবহ বিপদ
এই মানসিকতা বিপজ্জনক। আর সাংবাদিক, অ্যাকটিভিস্ট, উকিল, ছাত্রছাত্রী এবং জনজীবনে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের পক্ষে এই মানসিকতা বিশেষভাবে ভীতিপ্রদ। তাঁদের কল লগ, পরিচিতদের তালিকা, মেসেজ, ছবি এবং লোকেশনের তালিকা তুচ্ছ তথ্য নয়। সেগুলো বিশ্বস্ত ও বিপন্ন খবরের ‘সোর্স’-এর নেটওয়ার্ক। রাষ্ট্র তাদের উপর নজর রাখতে পারলে একদিকে যেমন তাদের বিপদ হতে পারে, তেমন তাদের ব্যবহার করে যা ইচ্ছে তাই করিয়েও নিতে পারে। এইসব তথ্য নজরদারির আওতায় এসে গেলে বহু ব্যক্তিকে দিয়ে যা খুশি করানো যাবে, তাদের ভয় দেখানো যাবে অথবা সুনির্দিষ্ট হয়রানির চালানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে যদি ধরে নেওয়া হয় রাষ্ট্র এইসব তথ্য যথেষ্ট দায়িত্ব নিয়েই ব্যবহার করবে, তাহলেও একটা অ্যাপকে বিশেষ সুবিধাযুক্ত নাগাল দিলে নিরাপত্তার বিরাট ফাঁক তৈরি হয়। বিন্দুমাত্র ত্রুটি দেখা দিলেই হ্যাকাররা ওই অ্যাপ যেসব তথ্য সুরক্ষিত রাখে বলে দাবি করে, সেগুলোরই নাগাল পেয়ে যায়, চুরি করতে পারে এবং সেগুলোকে নানা কুকর্মে কাজে লাগাতে পারে। ফলে ওই অ্যাপ যা করবে বলে ঘোষণা করেছিল, তার ঠিক উলটোটা ঘটে যায়।
ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাস সঞ্চার সাথি সম্পর্কে আশঙ্কাকে কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ রাখে না। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রের পোর্টাল থেকেই লক্ষ লক্ষ লোকের আধার কার্ডের তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে; CoWIN ভ্যাক্সিনেশনের তথ্য এক টেলিগ্রাম চ্যানেলে খোলাখুলি পাওয়া যাচ্ছিল। এমনকি ভারতে তো সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পের ভোক্তাদের তালিকাতেও নাগরিকদের ফোন নম্বর আর পরিচয়পত্রের তথ্য প্রকাশ্যে দিয়ে দেওয়া হয়। সুতরাং দুর্ভাবনার কারণটা সহজ। যদি অত্যন্ত স্পর্শকাতর তথ্য চালু ব্যবস্থাতেই এত সহজে ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে একটা সরকারচালিত অ্যাপকে প্রত্যেকটা স্মার্টফোনের বিশেষ সুবিধাযুক্ত নাগাল দিয়ে দেওয়া আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে তুলবে, আক্রমণের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়ে যাবে। নাগরিকরা এমন কোনো ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করতে পারেন না, যা বারবার তার কাছে থাকা তথ্য সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
সরকার পিছু হটে নির্দেশিকা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু এতেই ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেল মনে করা উচিত নয়, বরং এ থেকে ডিজিটাল শাসন সম্পর্কে ভারতে বৃহত্তর কথোপকথন শুরু করা উচিত। কোনো নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করার আগে সাইবার অপরাধের আরও জোরদার পুলিশি, চালু ব্যবস্থাগুলোর স্বচ্ছ অডিট, স্বাধীন তদারক সংস্থা প্রতিষ্ঠা এবং গণপরিসরে আলোচনা দরকার। আমাদের ফোনে গোলমেলে অ্যাপ ঢুকিয়ে দেওয়ার বদলে সরকারের উচিত কাঠামোগত ব্যর্থতার সুরাহা করা।
নিবন্ধকার স্বাধীন সাংবাদিক। প্রধানত শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে লেখালিখি করেন। অতীতে ডেকান হেরাল্ড ও দ্য হিন্দু কাগজে কাজ করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







