কথাটা আমার কাছের লোকেরা আগেই বলতেন, ইদানীং কয়েকজন বন্ধুও দেখছি একই মতের শরিক হয়ে উঠেছে। এদের ধারণা, যেখানে আমার যত ছবি ওঠে তাতে নাকি আমাকে ভীষণ রাগী রাগী দেখায়। যে কোনো লোক আমার ছবি দেখে নাকি আমায় ভয়ঙ্কর রাগী বলে ঠাওরাবে। আমি জানি না মুখমণ্ডলের কোন অদৃশ্য বিকিরণ, লেন্সের সামনে আমার অবয়বকে অধিক রাগী করে তোলে, তবে নিঃসন্দেহে এটা বেশ চাপের ব্যাপার। কারণ যারা রাগী পুরুষ বলে চিহ্নিত এবং কার্যত হাসতে যাদের মানা, আমি মোটেও তাদের দলে পড়ি না । কিন্তু গণপিটুনি না খেলে যেহেতু মুখের গড়ন-গঠন বদলে ফেলা যায় না, তাই ছবি-টবি তোলার ব্যাপারে এখন আমি কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে যাই। কী জানি! এতে হয়ত ক্যামেরার চোখ আমাকে আরও রাগী চেহারায় ফ্রেমবন্দি করে! সব মিলিয়ে বিষয়টা দাঁড়ায় এক দুষ্টচক্রের ছলনা। এই চক্রব্যূহ থেকে বেরোবার দরজাটাই তো আমি চিনি না।
হীনমন্যতার এই বোধের উলটো দিকে দাঁড়িয়ে কখনো কখনো আমার আজকাল মনে হয় – ওই দরজাটা খুঁজে বার করার দরকারটাই বা কী? রাগী ব্যক্তিত্বকে মানুষ সবসময় এড়িয়ে চলতে চায়, হয়ত এটা কিছুটা ঠিক। কিন্তু প্রচণ্ড রাগে নায়িকা সুচিত্রা সেন যখন নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জামা ছিঁড়ে ফালাফালা করে দেন – সাত পাকে বাঁধা ছবির দর্শক কি সেই দৃশ্যটা ভুলে যেতে চান, নাকি স্মৃতিতে স্থায়ী জায়গা করে দিতে চান? পাঁচ-ছয়ের দশকের বাংলা সিনেমার যে স্বর্ণযুগের কথা আমরা ঘুরে ফিরে বলে থাকি, উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন জুটির সেইসব জনপ্রিয় ছবিগুলোয় প্রথম ৩০-৪০ মিনিট নায়িকা সুচিত্রা ভীষণ রাগী একটা পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতেন। সেই রাগ অনুরাগে পরিবর্তিত হত পরের দিকে। সাতের দশকের হিন্দি ছবির ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’ অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে সে যুগের যুবসমাজ নিজেদের একাত্ম করে ফেলেছিল। অর্থাৎ রাগী যুবক কারও বীতরাগের কারণ হননি। মনে পড়ে যাবে, বাংলা সিনেমার ওই পর্বে নায়ক বা নায়িকার বাবাদের চরিত্রগুলো চরম স্বৈরাচারী। বদরাগী বাবার ক্রোধ থেকে ছেলে বা মেয়েকে বাঁচাতে মায়েরা কিছুটা নরম ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করতেন, যদিও সেজন্যে তাঁদেরও অপমানিত হতে হত।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আসলে এতে একটা সামাজিক সত্যের প্রতিফলন ছিল। গত শতকের প্রায় সাত দশক আমাদের চেনা বাঙালি সমাজে ও পরিবারে এইরকম ঘোর পিতৃতান্ত্রিক রাশভারী গৃহকর্তাদের অনায়াসে দেখতে পাওয়া যেত, যাঁদের সামান্য দিবানিদ্রার ব্যাঘাতও যাতে না ঘটে, পরিবার তা নিয়ে তটস্থ থাকতেন, তটস্থ থাকতেন তাঁর ভোজনের পরিপাটি আয়োজন যাতে অবিন্যস্ত না হয়। তরকারিতে সামান্য স্বাদের এদিক ওদিক হলে ভাতের থালা ছুড়ে ফেলে দেওয়া ছিল ওইসব পুরুষসিংহের অভিজ্ঞান। সেখান থেকেই একটা কথা চালু হয়েছিল – যে পুরুষের শরীরে রাগ নেই সে আবার কেমন পুরুষমানুষ! সিনেমায় এমন ধারণাকেও পুষ্ট করা হয়েছে যে, স্বামী যদি স্ত্রীর উপর একটু রাগ না দেখায়, তাহলে সেই স্বামী ‘মেয়েলি’ অথবা ‘স্ত্রীর আঁচল-ধরা’।
আসলে এইসব ভাবনার প্রধান প্রবণতা হল রাগকে ক্ষমতার সঙ্গে একাকার করে দেখতে চাওয়া। ক্ষমতার উৎস যেহেতু গৃহকর্তা এবং তিনি রোজগেরেও বটে, তাই তিনি স্ত্রী বা ছেলেমেয়ের উপর মেজাজ দেখাবার স্বাভাবিক ‘অধিকার’ অর্জন করেন। একইভাবে, মাস্টারমশাই মানেই রাগী। তাঁকে দেখে ছাত্রছাত্রীরা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, কারণ তাঁর হাতে একটা লম্বা ছিপছিপে বেত, নিদেনপক্ষে ডাস্টার। যে দারোগার নামে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়, তাঁর কাছে ঘেঁষতে সকলের সাহসে কুলোয় না, কারণ তিনি এক মস্ত রাগী পুরুষ। তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা এই রাগকে অনুমোদন করে। থানা স্তরের পুলিশ যে আসামীদের উদ্দেশে অনর্গল খিস্তি খেউড় করে নিজেদের রাগের প্রতিমা নির্মাণ করে, তার নিউক্লিয়াসেও সেই রাগের ফিউশন।
আবার প্রচলিত ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যারা কথা বলে, তাদের স্পর্ধাকেও ধারণ করতে পারে একরকমের রাগ। ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সামাজিক অসাম্য আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে সিনেমার পর্দায় অমিতাভ বচ্চন, পরে শাহরুখ খান, যেসব মারামারি ভাংচুর চালিয়ে হাততালি পান, তার চালিকাশক্তি তো আসলে প্রচণ্ড এক রাগ। মৃণাল সেনের ইন্টারভিউ ছবিতে আমরা দেখি সাতের দশকের চাকরিপ্রার্থী এক বেকার যুবক পাথর ছুড়ে ভেঙে ফেলতে চাইছে একটা দোকানের সুসজ্জিত কাচের শোকেস আর ম্যানেকুইন। বাস্তবে আমরা দেখেছি, সমাজবদলের স্বপ্ন দেখা বিপ্লবী যুবকরা তাদের রাগ প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে বেছে নিচ্ছেন নেহাত পাথুরে বিদ্যাসাগরকে। সেই উত্তেজিত ব্যক্তিহত্যার হিংসা কি এই রাগেরই অন্যরকম এক বিকৃতি নয়? কবি অরুণ কুমার সরকার লিখেছিলেন
শুধু প্রেম নয়, কিছু ঘৃণা রেখো মনে,
যেমন অনেক বৃক্ষ কোমলাঙ্গ কাঁটা দিয়ে ঢাকে
এই ঘৃণা থেকেও জন্ম নেয় রাগ। শুনেছি, ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রার্থী হিসাবে অশোক মিত্র মশাই এই কবিতার লাইন উদ্ধার করে ভোট দেওয়ার আবেদন করতেন। রাগকে প্রতিবাদী ব্যালটে বদলে দেওয়ার আহ্বান। সদ্য নেপালে ঘটে যাওয়া জেন জি-র যে তুমুল বিক্ষোভ, সেও তো রাগেরই এক সুতীব্র অগ্ন্যুৎপাত।
কালের নিয়মে যেমন আকবর বাদশার দিন গিয়েছে, তেমনি বাঙালির সমাজ বা পরিবার থেকে মুছে গিয়েছেন রাগী গৃহকর্তারা। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর রোজগেরে কর্তা-গিন্নীরা যে সময়বিশেষে উভয় উভয়ের উপর রাগারাগি করেন না একথা বলা যাবে না । তবে কর্তার জিনের মধ্যে বহমান রাগের একচেটিয়া আধিপত্য, ভাঙা সোভিয়েতের মতই চুরমার। এর জন্য কেউ কেউ গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন না তা নয়, তবে কালের যাত্রার পথ আটকানোর সাধ্য গড়পড়তা মানুষের হাতের বাইরে। পরের দিকের বাংলা সিনেমায় বরং এইসব রাগী পরিবার-প্রধানরা নিয়ে আসেন কিছুটা ‘কমিক রিলিফ’। আমরা দেখেছি এইসব চরিত্রে উৎপল দত্তের অনবদ্য অভিনয়। সেই সুযোগকে বিস্তৃত করে দিয়েছে তরুণ মজুমদারের দাদার কীর্তি বা শ্রীমান পৃথ্বীরাজ ছবির নায়িকার রাগী বাবারা। সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজা তারই এক সূক্ষ্মতর নির্মাণ বলে ধরা যেতে পারে। উৎপল সেখানে পর্দায় চোখ গোল গোল করা প্রচণ্ড রাগী, কিন্তু দর্শকের হাসির পাত্রই।
ধূসর হয়ে যাওয়া রাগী মানুষগুলো স্মৃতির মধ্যে কোঠাবাড়ি তৈরি করলেও রাগ আমাদের ছেড়ে গেছে এমন নয়। বরং আমাদের প্রতিদিনের রাগারাগিগুলো কেমন যেন তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আজকাল। ধনী পরিবারের নায়িকা গরিব নায়কের প্রেমে পড়লে তার বাবা তো রেগে অগ্নিশর্মা হবেনই। এর মধ্যে আর যা-ই হোক একটা সহজ যুক্তি ছিল। কিন্তু এখন মিনিবাস বা মেট্রোর ভিড়ে পা মাড়িয়ে দিলে সহযাত্রী যেমন চিড়বিড় করে উঠে অপভাষা ব্যবহার করেন বা ক্লাসের এক ছাত্র কি ছাত্রীর সঙ্গত জিজ্ঞাসা শুনে দিদিমণি যেমন তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন, নবীন প্রেমিকাটি তার কথা না শোনায় যেভাবে তার উপর আধিপত্যকামী রাগ ফলায় তার প্রেমিক, এমনকি হত্যা বা ধর্ষণ করে শোধ তোলে – তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে রাগের কেমন একটা চরিত্র বদল ঘটে গেছে আজকের দিনে। আবার প্রেমিকার রাগ ও ষড়যন্ত্রে প্রেমিকের হেনস্থা বা হত্যাও খুব বিরল নয় আজ। এই মাত্রা বদলের পিছনেও কিন্তু রাগ, ক্ষমতা আর হিংসা দিয়ে তৈরি এক ত্রিভুজের উঁকিঝুঁকি, যে ত্রিভুজের তিনটি কোণের যোগফল দুই সমকোণ নয়।
২
রাগ ব্যাপারটাকে যদি সত্যি সত্যি কেউ বুঝে থাকেন, তিনি সুকুমার রায়। হেড অফিসের বড়বাবুর মত শান্ত লোকের দুম করে রেগে যাওয়ার জন্য যে দায়ী আসলে তাঁর মাথার ব্যারাম – এটা সুকুমার প্রথম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখান। আধুনিক যুগের মনোচিকিৎসকরা একে বলবেন মানসিক বিশৃঙ্খলা বা ডিসঅর্ডার। সুকুমার-কথিত ফুটোস্কোপ দিয়ে যদি আমাদের মগজটা দেখা যেত, তাহলে হয়ত বার করা যেত, কেন আমরা এত রেগে যাই। রেগে গিয়ে যা-নয়-তাই কাণ্ড করে ফেলি, অথচ তার থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তাটা কী, সেটা বোধহয় আমরা খুব ভালো করে বুঝতে বা বলতে পারি না। বলা বোধহয় সম্ভব নয়। সমস্যাটা এইখানে আরও যে, রেগে যাওয়া বিষয়টা ঠিক না বেঠিক সেই সিদ্ধান্তটাই আমরা এখনো নিয়ে উঠতে পারিনি। রাগ, ক্ষমতা ও হিংসার সামাজিক অনুমোদনের একটা চেহারা বদলের ছবি চোখে পড়লেও, ব্যক্তিমনের কাছে তার আদল খুব বদলে গেছে ভাবলে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি কোথাও কোথাও রাগ বিষয়টাকে যেভাবে মহৎ করে তোলার প্রয়াস করে, তার থেকে বেরিয়ে আসা মোটেও সহজ নয়।
আমরা ছোটবেলা থেকে যে দুর্বাসা মুনির গল্প শুনি, তিনি তো এক ভয়ঙ্কর রাগী পুরুষ, যিনি পান থেকে চুন খসলে এমন সব অভিশাপ দেন, যাকে ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ বলা অসম্ভব। আমাদের পরমারাধ্য নটরাজ রেগে গেলে যে প্রলয় ঘটে যেতে পারে, তার ভয় আমরা শিশুকাল থেকে বহন করে আসছি, গানে শুনেছি প্রলয় নাচনের কথা। ক্রুদ্ধ মহাদেব সতীকে ঘাড়ে নিয়ে যেভাবে ‘ভারত ভ্রমণে’ বেরিয়েছিলেন, তাঁকে নিরস্ত করার জন্য বিষ্ণুকে সুদর্শন চক্র ছুড়ে সতীর দেহকে ৫২ খণ্ড করে সামাল দিতে হয়েছিল। একটা মৃতদেহকে কেটে টুকরো টুকরো করা খুব সংবেদনশীল ব্যাপার কি? পুরাণ আরও বলে, নাগরাজ বাসুকী রেগে গিয়ে ফণা দোলালে ভূমিকম্প হয়। তিনি খামোকা রেগে যান কেন? ভূমিকম্পে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যান, ঘরছাড়া হন – তাঁদের কী দোষ? এছাড়া ছোটখাটো রাগের খুচরো বিষয় প্রায় সমস্ত দেবদেবীর অস্তিত্বের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। সরস্বতীপুজোর আগে কুল খেলে সরস্বতী ঠাকুর রেগে গিয়ে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেন, দুর্গাপুজোয় নতুন জামাকাপড় পরে না বেরোলে দেবী কুপিত হন।
এই রাজ্যের দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা প্রায় দেড় কোটি মানুষ এসব করতে পারেন না বলেই তো তাঁদের উন্নতি হওয়ার কোনো ‘সিনই নেই’। মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীদের রাগ আর হিংসার কাহিনি তো আরও নিষ্ঠুর ও হৃদয়হীন। আমাদের শাস্ত্র অনুসারে, রাগ বা ক্রোধ মানুষের ছয় রিপুর, অর্থাৎ শত্রুর, অন্যতম। যেসব দেবদেবী বা মুনি ঋষি মানুষের থেকে মহত্তর ও উন্নততর বলে প্রচারিত, তাঁরা কেন এই একটা রিপুকে জয় করতে পারলেন না?
এইসব কূট প্রশ্ন পেরিয়ে রাগের সংস্কৃতিগ্রাহ্য প্রবণতা যখন হুড়মুড় করে বেশি বেশি মগজে ঢুকে যায়, তখনই আমরা রাগকে অলংকার বলে ভাবতে থাকি। এইসব ভাবনা থেকেই দুর্যোগের মেঘ জমে আমাদের স্বভাব আর মনের আকাশে, মগজে নেমে আসে কারফিউ। দোকানে কোনো একটা মাউথ ফ্রেশনার ক্যান্ডি কিনতে গিয়ে ক্রেতা এক বিশেষ ব্র্যান্ডের নাম শোনেনি বলে রাগে অন্ধ হয়ে একজন দোকানি ক্রেতাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে জলের বালতিতে তার মাথা চুবিয়ে দেয় – বিজ্ঞাপনের এই বিপজ্জনক দৃশ্য দেখে আমরা ভয় বা লজ্জা পাই কি? রাগকেন্দ্রিক এই কদর্যতা পণ্যের বিপণন কৌশল হিসাবে যে যুগে বেছে নেওয়া হয়, তা বড় সুখের সময় নয়।
কিন্তু একথা বলতে চাই না যে রাগকে আমরা সমস্ত অর্থেই বর্জন বা অস্বীকার করে থাকতে পারব। বড় বড় মুনি ঋষিই যেখানে গাড্ডু মেরে যান, সেখানে হেঁজিপেঁজি আমরা কি আর পারি? তাছাড়া শাস্ত্রে যাকে রিপু বলা হয়েছে, সেই প্রবণতাগুলো আনুপাতিক হারে মানানসইভাবে আমাদের মধ্যে থাকলে অসুবিধার কিছু নেই। কিন্তু আনুপাতিক হারের বেশি হয়ে গেলে সমূহ গোলযোগের সম্ভাবনা। ধরা যাক, একজন কিশোর বা কিশোরী যদি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে ট্রেন বা রাস্তায় অবরোধের মুখে পড়ে নাকাল হয়, তার রাগ হবে না? হাসপাতালে গিয়ে রোগী যদি ঠিকমত চিকিৎসা না পান, তাঁর পরিবারের মানুষজন রেগে যাবেন না? মেট্রো শহরে যদি নাগরিকরা দিনের পর দিন জলবন্দি, বিজলিহীন হয়ে আটকে থাকেন, তাঁরা কি আনন্দে গলা সাধবেন? কঠিন প্রস্তুতি নিয়ে চাকরির পরীক্ষা দিয়ে প্রার্থীরা যদি দেখেন অনেকেই আঁকাবাঁকা পথে সেখানে আগেই সেঁধিয়ে গেছে, তাঁরা কি হাততালি দেবেন? প্রতিদিনের বেঁচে থাকায় এই ধরনের রাগের উৎসকে ভ্যানিশ করে দেওয়ার কোনো আশ্চর্য প্রদীপ আমাদের হাতে নেই। তুচ্ছতর রাগের স্ফুলিঙ্গ যেমন সর্বগ্রাসী, তাতে যৌক্তিক অবস্থান নেওয়া জরুরি কাজ। তবে সেই কঠিন পরীক্ষায় নিজেরা উত্তীর্ণ হওয়া আর সহনাগরিকদের উত্তীর্ণ করাটাই আজ মস্ত চ্যালেঞ্জ।
আরো পড়ুন ভারতীয় সমাজের মন্থন আজও শেষ হয়নি
কথাটা জ্ঞান দেওয়ার মত শোনাচ্ছে বুঝতে পারছি। কথাগুলো বলা সহজ কিন্তু করা কঠিন, আর কঠিন বলেই কাজটা একা করার নয়। আমাদের দেশের থেকে ইউরোপ আমেরিকায় লোকে যে আরও বেশি রেগে আছে, তা একটু খবর নিলেই জানা যায়। রাগের প্রকোপে সেখানে দাম্পত্য, বন্ধুত্ব – সবই খানখান হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে এই সমস্যার মোকাবিলায় তৈরি হয়েছে নানা রকম রাগ নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা, নানান ক্লিনিক, নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক প্রকৌশল – মানুষ বেশি রেগে গিয়ে যাতে বাড়াবাড়ি কিছু না করে ফেলে। ইন্টারনেটের সামনে বসলে রাগ না করার নানা পরামর্শ বিনি পয়সায় পাওয়া যায়, এদেশেও রাগারাগি ভুলে থাকার জন্য এই ধরনের কাজকর্ম শুরু হলে রাগ করা সমুচিত হবে বলে আমার মনে হয় না।
কিন্তু রাগ বিষয়ক যে দু-চারটে কথা আমি জানি, তার একটা হল, রাগ ব্যাপারটার মধ্যে সব সময় বজ্রগর্ভ মেঘের বাজখাঁই আওয়াজই থাকে না, থাকে আড় বাঁশির মিষ্টি একটা সুরও। সে সুর চেনা খুব সহজ নয়, তবে চেষ্টা করলে যে পারা যাবে না তাও নয়। একবার নিয়মটা বুঝে নিতে পারলে সে এক মজাদার খেলা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে সেই গানটার কথা মনে পড়ে – ‘রাগ যে তোমার মিষ্টি আরও/অনুরাগের চেয়ে/ সাধ করে তাই তোমায় রাগাই/ওগো সোনার মেয়ে’। যদি বিশুদ্ধ রাগ থেকে অনুরাগের এই খেলাটা আমরা সবাই শিখে নিতে পারতাম! তাই রাগ যদি করতেই হয়, তাহলে বেশি রাগ করবেন না। ছোটখাটো রাগ করুন। এই অণুমাত্র রাগ থেকেই অনুরাগ জন্ম নিতে পারে। ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখবেন স্যার।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







