ক্যামেরার সামনে হাউ হাউ করে কাঁদছেন উত্তরপ্রদেশের সর্বেশ সিং। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যত ফর্ম পূরণ করে আপলোড করতে বলা হয়েছিল, সর্বেশ কিছুতেই পেরে উঠছিলেন না। সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন, ‘আমি বাঁচতে চাই, কিন্তু খুবই দুশ্চিন্তা ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। আতঙ্ক হচ্ছে। রাতদিন কাজ করেও এসআইআরের লক্ষ্য পূরণ করতে পারিনি।’ তথ্য বলছে, হাজারেরও বেশি ইনিউমারেশন ফর্ম পূরণ করার কাজ দেওয়া হয়েছিল সর্বেশকে। রাত জেগে কাজ করেও সামলাতে পারছিলেন না। চার মেয়ের বাবা, ৪৫ বছরের সর্বেশ আত্মহত্যা করেছেন ৩০ নভেম্বর।

নদীয়ার রিঙ্কু তরফদার সুইসাইড নোটে লিখেছেন, অফলাইনের কাজ তিনি অনেকটাই করে ফেলেছিলেন। কিন্তু অনলাইনে এসব করতে তিনি জানেন না। সংশ্লিষ্ট বিডিও অফিসে সুপারভাইজারকে জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি। রাজস্থানের মুকেশ চাঁদ জাহাঙ্গীরের পকেটে পাওয়া সুইসাইড নোটে লেখা ‘এত চাপ আর নিতে পারছিলাম না। অনলাইনে নাম তুলতে পারছিলাম না, ফলে কাজ এগোচ্ছিল না। তার মধ্যে চাকরি যাওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন সুপারভাইজার…।’ উত্তরবঙ্গের মালবাজারের অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী শান্তিমণি এক্কা ভালো বাংলা জানতেন না। তাঁকে দেওয়া হয়েছিল বাংলা ফর্ম পূরণের কাজ। শান্তিমণি আত্মহত্যা করেছেন ১৯ নভেম্বর।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শারীরিক পরিশ্রম যতই কষ্টের হোক, একজন মানুষ তা অনেকটা সয়ে নিতে পারেন মানসিক শান্তি থাকলে, পাশে ভরসা দেওয়ার কেউ থাকলে। ভোটার লিস্টের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর কাজে নামিয়ে দেওয়া বিএলওদের এইসব ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সাহায্য বা ভরসার বদলে উপরতলা থেকে এসেছে হুমকি, চাপ, শাস্তির ভয়। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, যে নির্বাচন নাকি ‘গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসব’, সেই নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক কাজে নেমে চাপে, আতঙ্কে, অসহযোগিতায় দিশেহারা হয়ে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, যাদের ভোটে জিতে আজ ক্ষমতায় বসে আছেন দেশের, রাজ্যের নেতা মন্ত্রীরা। পশ্চিমবঙ্গে চারজন সহ দেশে অন্তত ২৮ জন বিএলও-র মৃত্যু হয়েছে। তার পরেও নির্বাচন কমিশন বা বিজেপি নেতারা নিজেদের ত্রুটি স্বীকার দূরে থাক, দুঃখপ্রকাশ বা মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সৌজন্যটুকুও দেখাচ্ছেন না। উলটে কে কত তাড়াতাড়ি ফর্ম ভরছেন, সময়ের আগেই লক্ষ্যপূরণ করে ফেলছেন – সেইসব উদাহরণ তুলে এনে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে, সব ঠিক আছে। দোষ সব ওই অদক্ষ, অসহায় মানুষগুলোর।

শ্রমিকরা একসময় লড়াই করে আট ঘন্টার বেশি কাজ না করার দাবি আদায় করেছিলেন। এখন কেউ অবস্থার চাপে ১০-১২ ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য হন বা কাজ উতরে দিতে পারেন বলে, আট ঘন্টা কাজের ন্যায্য দাবিকে উড়িয়ে দেওয়া যেমন অযৌক্তিক, এও তাই। সবাই যদি সব কাজে দক্ষ হত, তাহলে মোটর মিস্ত্রি কলের লাইন সারাতে পারতেন এবং তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী নাইনের ভূগোল ক্লাসে গিয়ে পড়াতে পারতেন। সহজ বুদ্ধি বলে – এমনটা হয় না বলেই একজন মানুষকে তার নির্দিষ্ট, অভ্যস্ত কাজের সম্পূর্ণ বাইরের কাজ দিলে সময় দিতে হয়, ভালো করে শিখিয়ে দিতে হয় এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও মাথায় রাখতে হয়। বিএলওদের একটা প্রশিক্ষণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতাই বলে দিচ্ছে যে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। অথচ ভুল হলে, পেরে না উঠলে চাপ এবং দায় এসে পড়ছে তাঁদের ঘাড়ে। রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ নাগরিকের সম্পর্ক এখন দাঁড়িয়েছে সুরক্ষা ও নিরাপত্তার পরিবর্তে শাসন ও চোখরাঙানির।

পুলিশের খাতায় বা খবরে সর্বেশ, রিঙ্কু বা মুকেশের পরিচয় লেখা হচ্ছে এবং হবে ‘আত্মঘাতী বিএলও’ হিসাবে। ওঁরা যে আসলে ছিলেন শিক্ষক, যাঁদের মূল কাজ বা দায়িত্ব ছিল স্কুলে গিয়ে পড়ানো – এ কথাটা ভুলে যেতে বোধহয় আমাদের খুব বেশি সময় লাগবে না। কাগজে পড়েছি, পড়াতে ভালোবাসতেন বলে রিঙ্কু পার্শ্বশিক্ষিকা হয়েছিলেন। যাঁরা পড়াতে ভালোবাসেন এবং স্কুলে গিয়ে সত্যিই মন দিয়ে পড়াতে চান, পশ্চিমবঙ্গের (পড়ুন সারা দেশের) সরকারি স্কুলের সেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবস্থা আজ এমনিতেই করুণ। ক্লাসরুমে বসে থাকা কচি কিশোর মুখগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে একটা বিষয় মন দিয়ে পড়াব, যতটা সম্ভব গভীরে ঢুকে নানা দিক থেকে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করব, চার দেওয়ালের মাঝে বসেই সবুজ মনগুলো ছুঁতে চাইবে দুনিয়াজোড়া জ্ঞানের আকাশ – এসব আজ প্রায় দিবাস্বপ্ন। সরাসরি এসব কথা না বললেও সকলেই মনে মনে জানেন, ছুটি যতই বাড়ুক, পরীক্ষা যতই এগিয়ে আসুক, ক্লাসের সময়ে স্কুলের এবং সরকারের নানাবিধ কর্মকাণ্ডে যতই নিযুক্ত থাকতে হোক, শিক্ষককে কোনো এক অদ্ভুত জাদুমন্ত্র বলে সিলেবাস শেষ করে ফেলতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের স্কুলমুখী না করার, প্রাইভেট স্কুল এবং প্রাইভেট টিউশনের বাজার বাড়ানোর যেসব আয়োজন চারদিকে ছড়ানো, শিক্ষককে তার সাথে মানিয়ে নিতে হবে, যদি টিকে থাকতে চান। সিলেবাস শেষ করার, ভালোভাবে পড়ানোর সময়-সুযোগ তাঁকে দেওয়া হবে না, কিন্তু সিলেবাস শেষ না হলে তিনি জবাবদিহি করতে বাধ্য স্কুল কর্তৃপক্ষ; সেইসব অভিভাবকের কাছেও, যাঁরা দিনের পর দিন সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে কোচিংয়ের নোট মুখস্থ করতে উৎসাহ দিয়েছেন। শিক্ষকদের নামের পাশে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ কথাটা লেখা হত একসময়। এখন তাঁদের মানুষ ভাবার পরিসরও কমে আসছে ক্রমশ।

কোভিডের সময়ে দুবছর ধরে বন্ধ থাকল স্কুল, যে সিদ্ধান্তে শিক্ষকদের কোনো ভূমিকা ছিল না। অনেকে নিজের উদ্যোগে অনলাইনে পড়িয়েছেন, বহু স্কুলে অনলাইন ক্লাস হয়েছে, কোনো কোনো শিক্ষক সংগঠন বিকল্প ব্যবস্থার দাবিতে একাধিকবার বিক্ষোভ দেখিয়েছে সরকারি শিক্ষা দফতরে। অথচ শিক্ষকদের নামের পাশে বসে বসে মাইনে নেওয়ার যুক্তিহীন অপবাদ বসে গেল সেই থেকে, সরকারের পক্ষে আরও সহজ হয়ে গেল স্কুল এবং শিক্ষকের গুরুত্ব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। শিক্ষকদের আজ অনেক দুর্নাম। ক্লাসে গিয়ে না পড়ানো, স্কুলে ফাঁকি দিয়ে গৃহশিক্ষকতায় সময় দেওয়া, আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতই নিজেদের অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার বাইরে বৃহত্তর সমাজের সমস্যা নিয়ে মাথা না ঘামানোর মানসিকতা। এর কোনোটাই অসত্য নয়, আবার একমাত্র সত্যও নয়। নিজের ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অন্তত পেশাগত ক্ষেত্রে শিক্ষকদের যা ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা, সেগুলো কাটিয়ে তোলা বা যাচাই করার উদ্যোগ অথবা সদিচ্ছা সরকার কি শিক্ষা দফতরের নেই। শিক্ষক-শিক্ষিকারা শিক্ষাশ্রী, ঐক্যশ্রী, কন্যাশ্রী করবেন, নির্মল বিদ্যালয় পালন করবেন, এক-একজন পড়ুয়ার জন্য কয়েক পাতা জোড়া হোলিস্টিক রিপোর্ট লিখবেন, সারা বছরের সব পরীক্ষার নম্বর বাংলা শিক্ষা পোর্টালে তুলবেন (নেটওয়ার্কের সমস্যায় যে পোর্টাল প্রায়শই কাজ করবে না), মিড ডে মিলের হিসাব লিখবেন। শুধু পড়াতে পারবেন না। ছাত্রজীবনের শেখায় যা ফাঁকফোকর থাকে, তা অনেকটা পূরণ করে নেওয়া যায় পড়াতে গিয়ে। পড়াতে পড়াতেই পড়ানোর দক্ষতা বাড়ে। অথচ এই পড়ানো ব্যাপারটাই আজ ক্রমশ গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে।

একের পর এক সরকারি স্কুল উঠে যাচ্ছে, এই রাজ্যেই কয়েক হাজার স্কুল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যোগ্য-অযোগ্য, টেট মামলা সহ হাজার দুর্নীতি আর অভিযোগের স্রোতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে শিক্ষক নিয়োগ। জাতীয় শিক্ষানীতির সুপারিশ মেনে ‘স্কুল ক্লাস্টার’ বা ‘স্কুল মারজার’-এর নামে আরও কত স্কুল উঠে যাবে তার হিসাব নেই। এই পরিস্থিতিতে ধুঁকতে থাকা সরকারি শিক্ষার পরিকাঠামো থেকে তুলে নেওয়া হল হাজার হাজার শিক্ষককে, কেননা তাঁদের বুথ লেভেল অফিসার হয়ে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের কাজে নামতে হবে। নির্বাচন কমিশনের ২০২২ সালের নির্দেশিকায় আছে – খুব প্রয়োজন ছাড়া শিক্ষকদের বিএলও করা যাবে না, করলেও এমনভাবে করতে হবে যাতে পড়াশোনার ক্ষতি না হয়। শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের একটা অংশ একজোট হয়ে গড়ে তুলেছেন বিএলও ডিউটি প্রতিরোধ মঞ্চ। কাজের সমস্যা, দাবিদাওয়া নিয়ে নিয়মিত আদানপ্রদান হচ্ছে সেখানে, একে অন্যের সমস্যায় পাশে থাকার চেষ্টা করছেন, কমিশনের অফিসে নিজেদের অসুবিধার কথা জানাচ্ছেন। সেই মঞ্চের আহ্বায়ক শিক্ষক অনিমেষ হালদার বলছেন ‘শিক্ষার অধিকার আইনে বলা হয়েছে, পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো কাজ শিক্ষকদের দিয়ে করানো যাবে না। ডিসেম্বর মাসে যেখানে স্কুলগুলিতে শিরে সংক্রান্তি অবস্থা হয়, সেখানে শিক্ষকরা না থাকলে কীভাবে পড়ুয়াদের পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে?’

পরীক্ষা-পড়াশোনা কীভাবে হবে – এ নিয়ে ভাবিত নয় কেন্দ্র, রাজ্য কেউই। শিক্ষা যৌথ তালিকাভুক্ত, ফলে শিক্ষকদের বিএলও করার ক্ষেত্রে জোরালো আপত্তি জানাতে পারত রাজ্য প্রশাসন। তেমনটাও চোখে পড়েনি। ডেটা এন্ট্রির জন্যে সহায়ক নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজ্য ঢিলেঢালা ভাব দেখিয়েছে। রাজ্যের অসংখ্য স্কুলে পঠনপাঠন যখন শিক্ষকের অভাবে ইতিমধ্যেই ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন সরকারেরই তৈরি করা নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দলে দলে শিক্ষকদের বিএলও-র কাজে নামতে বাধ্য করেছে কমিশন। শিক্ষকদের প্রথমে বলা হয়েছিল, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম দিয়ে আসতে হবে, আবার গিয়ে ফেরত আনতে হবে, ভোটার তথ্য যাচাই করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এর সঙ্গে জুড়ে গেল অনলাইনে তথ্য আপলোড করার কাজ। এখানেই বিপাকে পড়েছেন বহু শিক্ষক। ডিজিটাল ভারত শুনতে যতই সুন্দর লাগুক, এদেশে তার চেয়ে অনেক বড় সত্য হল ‘ডিজিটাল ডিভাইড’। ফলে পেনশনের টাকা তোলা বা পাসবই আপডেট করার মত কাজগুলো করতে গিয়ে ব্যাংকের লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষার পর নেট ব্যাংকিংয়ের উপদেশ শুনলে অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধারা যেমন অথৈ জলে পড়েন, অনেক শিক্ষকের অবস্থাও হয়েছে সেরকম। শিক্ষকদের আইসিটি (Information and Communication Technology) প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঝেমাঝেই অনেক কথা হয়, যার বেশিটাই কথার কথা। বিএলও-র দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষকদের একটা বড় অংশ অনলাইনের কাজে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞতার ফলে বিরাট সংকটে পড়েছেন।

তিনশো ফর্ম এন্ট্রি করতে বসে একটা করতেই সময় লাগছে ১৫-২০ মিনিট। তার উপর সার্ভার মাঝেমাঝেই কাজ না করায় ফর্ম জমা পড়ছে না এবং তথ্য উড়ে যাচ্ছে। সারাদিনে অজস্রবার অসংখ্য ফোন আসছে ভোটারদের কাছ থেকে। ফোনে ফর্ম পূরণের কাজ করতে করতে সেই ফোন ধরতে গেলেই তথ্য উড়ে যাচ্ছে, যে কারণে আলাদা ট্যাব দেওয়ার দাবি করেছিলেন বিএলওরা। প্রশ্ন উঠেছে, মহিলা বিএলওদের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর সাইটে দেওয়া নিয়েও। আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এবং কর্মক্ষেত্রে এই ধরনের কাজ করতে গিয়ে লিংকের সমস্যা, নেটওয়ার্কের সমস্যায় ভুগি। সেই একই সমস্যায় যখন একটা মানুষকে তার সারাদিনের সমস্ত রুটিন কাজের পরে ঘন্টার পর ঘন্টা ভুগতে হয় এবং তার সঙ্গে সামান্য ভুলচুক হলেই এলাকার নানা রাজনৈতিক দলের চাপ এবং বিডিও অফিসের হুমকি সহ্য করতে হয়, তার মানসিক অবস্থা কী দাঁড়ায় বোঝা খুব কঠিন নয়। যাঁদের ডায়বেটিস, হাইপারটেনশন, হার্টের অসুখের মত অসুস্থতা আছে – তাঁদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও মারাত্মক হচ্ছে। প্রথমে স্কুল করে ছুটির দিনে বা বাড়তি সময়ে বিএলও-র কাজ করার নির্দেশ ছিল। পরে সেটা একেবারে অসম্ভব বুঝে শিক্ষকদের পুরোপুরি কাজে নামিয়ে ‘অন ডিউটি’ দিতে বাধ্য হয়েছে কমিশন। এই অন ডিউটি, ১,২০০-র বেশি ফর্ম হলে একজন সহায়ক পাওয়া, ফর্ম পূরণের সময়সীমা বাড়ানো – এমন আরও অনেক ন্যায্য দাবি কিছুটা হলেও আদায় করতে নিয়মিত বিক্ষোভ-আন্দোলনে নামতে হয়েছে। যে কাজ সরকারের, প্রশাসনের, দেশের নির্বাচন কমিশনের – সেই কাজের বাস্তব রূপায়ণে পরিকল্পনা ও বাস্তবজ্ঞানের এতখানি অভাব এবং প্রথম থেকেই প্রশাসনের যুদ্ধং দেহি মনোভাব প্রশ্ন তুলে দেয় – এসআইআর যদি দেশের ভালোর জন্যই হবে, দেশের মানুষকে এত ভুগতে হচ্ছে কেন?

এ তো গেল বিএলওদের হয়রানির কথা। স্কুলগুলোর অবস্থা কী দাঁড়িয়েছে?

কথা হচ্ছিল হাড়োয়ার সোনাপুকুর বিদ্যাপীঠের একজন শিক্ষিকার সাথে। বললেন, স্কুলের ২৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার তিনজন আগেই চলে গেছেন (একজন অযোগ্য তালিকায় ছিলেন, দুজন ফিরেছেন পুরনো চাকরিতে) ২০১৬ নিয়োগ মামলার জেরে। এখন আরও তিনজনকে বিএলও হিসাবে তুলে নিয়েছে কমিশন। ফলে ছজন শিক্ষককে বাদ দিয়ে স্কুল চালাতে হচ্ছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রশ্ন তৈরি, খাতা দেখা, রেজাল্ট তৈরি করার মত জরুরি এবং সময়সাপেক্ষ কাজগুলো করতে হচ্ছে অন্য সহকর্মীদের। তাতে কাজ চলে গেলেও, হিমশিম অবস্থা সকলেরই। বাঙুরের নারায়ণ দাস মেমোরিয়াল মাল্টিপারপাস স্কুলের প্রধান শিক্ষক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্কুলের একমাত্র গ্রুপ সি কর্মী এবং ১৩ জন শিক্ষক চলে গেছেন বিএলও-র কাজে। প্রাথমিক বিভাগের আটজন শিক্ষকের পাঁচজনই নেই। স্কুলের পড়াশোনা, কাজকর্ম, নতুন ভর্তি – সবই সামলাতে হচ্ছে এর মধ্যেই। শ্যামবাজার পার্ক ইনস্টিটিউশনের দুজন রসায়ন শিক্ষকের একজনের চাকরি গিয়েছিল যোগ্য-অযোগ্য মামলায়, আরেকজনকে তুলে নেওয়া হয়েছে বিএলও-র কাজে। কম্পিউটার সাইন্সের দুজন শিক্ষকের একজন নেই। ফলে কার্যত ক্লাস নেওয়া যাচ্ছে না, অথচ পরীক্ষা সামনে। টাকী বয়েজ স্কুলের ৩৮ জন শিক্ষকের ২০ জন, অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি চলে গেছেন বিএলও-র কাজে। স্কুলের সমস্ত কাজের চাপ সামলাতে হচ্ছে বাকিদের।

উদাহরণ আর বাড়ানোর দরকার নেই। কলকাতার স্কুলের এই অবস্থা হলে গ্রামবাংলার দশা কেমন? বর্ধমানের হালারা প্রাথমিক স্কুলের চারজন শিক্ষকের সকলেই চলে গেছেন বিএলও-র কাজে, স্কুলের ১১২ জন ছাত্রছাত্রী আর তাদের অভিভাবকরা জানেন না, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কী হবে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার মৌসুনি দ্বীপের কুসুমতলা পশ্চিম অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের যা হোক পড়িয়ে দিচ্ছেন মিড ডে মিলের রাঁধুনি মাসি অনুমতি মন্ডল, কারণ তিনজন শিক্ষকই বিএলও হয়ে ঘুরছেন সকাল থেকে। বাচ্চাদের স্কুলে এনে না পড়িয়ে বসিয়ে রাখা চলে না – এটা তিনি বুঝলেও আমাদের সরকার বোঝেনি। যে দেশে জিডিপির ছয় শতাংশও শিক্ষার পিছনে খরচ হয় না, যে দেশে মিড ডে মিলের মাথাপিছু বরাদ্দে সবার পাতে একটা করে ডিমও দেওয়া যায় না, সে দেশে পায়ে হেঁটে বা মাইলের পর মাইল সাইকেল চালিয়ে মাঠ-নদী পেরিয়ে ইস্কুলে আসা মলিন মুখগুলোর পড়াশুনা নিয়ে ভাবার সময় কার আছে? ফলে কাগজপত্র ও সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে যেটুকু ছবি উঠে আসছে, তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র।

কার্ল মার্কস ১৮৬৯ সালের এক বক্তৃতায় বলেছিলেন ‘On the one hand a change of social circumstances was required to establish a proper system of education, on the other hand a proper system of education was required to bring about a change of social circumstances; we must therefore commence where we were.’

আমরা আজও দাঁড়িয়ে আছি ঠিক এই জায়গায়। সরকারি শিক্ষার বেহাল পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ না করা, শিক্ষকদের অন্য কাজে ব্যস্ত রাখা, পরিণতিতে স্কুলে ছাত্র আরও কমে যাওয়া, তারপর ছাত্র নেই দেখিয়ে আরও স্কুল তুলে দেওয়া – বছরের পর বছর এসব চলছে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায়। শাসক তার স্বার্থবোধ থেকে জানে – অন্যায় শাসন টিকিয়ে রাখতে হলে শিক্ষাকে ধ্বংস করা সবার আগে দরকার। সেটাই সে করছে মন দিয়ে। আমাদের যা করা দরকার, আমরা করছি কি?

দুটো কথা বলে শেষ করব। মানুষের অসহায় মৃত্যু দেখে সবার আগে দুঃখ পাওয়ার কথা। অথচ কাজের চাপে বিএলওদের অসুস্থতা বা মৃত্যুর খবর বহু ক্ষেত্রেই ভেসে গেল ট্রোলের বন্যায়। কর্পোরেট জগৎ সহ নানা ক্ষেত্রে যাঁরা অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন, তাঁদের অনেকেই হাসি মস্করা করলেন শিক্ষক-বিএলওদের অপারগতা, চাপ নিতে না পারা, অসুস্থতা-আত্মহত্যা নিয়েও। এই একই জিনিস দেখা গেছে যোগ্য-অযোগ্য মামলা, টেট মামলা সহ সব ক্ষেত্রেই। এই সময় এবং সমাজ, সহনাগরিকের সংকটের প্রতি আমাদের এতটা অসংবেদনশীল করে তুলেছে – এ শুধু লজ্জার নয়, চিন্তারও। কারণ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যায় বঞ্চনার স্বীকার মানুষগুলো যত পরস্পরের দিকে কাদা ছুড়বে, সমস্যার মূলে না গিয়ে একে অন্যকে দোষারোপ করে শান্তি খুঁজবে, তত সুবিধা করে দেওয়া হবে অন্যায়ের কারবারিদের।

রিঙ্কু সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন, ‘আমি দুই সন্তানের মঙ্গল ছাড়া কোনোদিন কিছু বুঝিনি। …এরা আমায় বাঁচতে দিল না।’ সর্বেশ কাঁদতে কাঁদতে বলে গেছেন ‘আমার মেয়েদের দেখো।’ এই চোখের জল, অসহায়তা দুঃখ দেয়, ভাবায়। রিঙ্কু, সর্বেশরা সেই শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ, যাঁরা সাতে পাঁচে থাকতে চান না, রাজনীতির কথা বুঝতে চান না, নিজের কাজ নিজের পরিবার পরিজন নিয়ে শান্তিতে থাকতে চান। বাজার এঁদের শিখিয়ে দেয় – মিটিং-মিছিল-প্রতিবাদ-ইউনিয়ন খুব খারাপ জিনিস। নিজের কাজটুকু সবাই মন দিয়ে করলেই কোনো ঝামেলা থাকে না। অথচ, নিজের কাজে কোনো ফাঁকি না দিয়ে, কোনো অপরাধ না করে, শেষপর্যন্ত চেষ্টা করেও রিঙ্কুরা কি বাঁচতে পারলেন এই নির্মম সমাজে? কেন পারলেন না? এখান থেকেই আমাদের ভাবনা শুরু হোক।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.