ভারত চারশো রানে টেস্ট হেরেছে, ঘরের মাঠে এই নিয়ে পরপর পাঁচটা টেস্টে হেরে ভূত হয়েছে বলে মন খারাপ? কেন? আগামী বছর অগাস্টের আগে তো আর টেস্ট খেলতে হচ্ছে না। তখন খেলা হবে শ্রীলঙ্কায়, তারপর বছরের শেষদিকে নিউজিল্যান্ডে। আবার দেশের মাঠে টেস্ট সেই ২০২৭ সালের গোড়ায় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। আসছে রবিবারই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একদিনের ম্যাচের সিরিজ শুরু হবে, আজ হাতে ছুরি কাঁচি নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে বসা প্রাক্তন ক্রিকেটার আর সাংবাদিকরা দুই বুড়োকে নিয়ে আদিখ্যেতা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। সম্প্রচারকারী সংস্থা তো ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ হেরে যাওয়ার পরের নিয়মরক্ষার ম্যাচে তাঁরা যে ব্যাটিং করেছিলেন তা দেখিয়ে আসন্ন সিরিজের এমন প্রচার শুরু করেছে, যেন ওই দুজনে অস্ট্রেলিয়াকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়ে এসেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকাকে রো-কো মাঠে নেমে ধন্য করে দেওয়ার পরে হবে কুড়ি বিশের সিরিজ। সেটা মিটতে মিটতেই এসে যাবে নতুন বছর। তখন এসে পড়বে নিউজিল্যান্ড – তিনটে একদিনের ম্যাচ আর পাঁচটা কুড়ি বিশের ম্যাচ খেলতে। সেটা মিটলে ঘরের মাঠে কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ। মার্চের গোড়ায় বিশ্বকাপ মিটবে, হপ্তাখানেক পরেই শুরু হয়ে যাবে ভারতীয় ক্রিকেটের দুর্গাপুজো, অর্থাৎ কিনা আইপিএল – যার জন্যে সারাবছর হাপিত্যেশ করে বসে থাকেন বিজ্ঞাপনদাতা, ক্রিকেট বোর্ড, ক্রিকেটাররা; এমনকি আপনিও। সুতরাং তেম্বা বাভুমার দলের কাছে নাকানি চোবানি খেয়েও গৌতম গম্ভীর যে রেলায় সাংবাদিক সম্মেলনে নিজের ছাড়া সকলের দোষ ধরেছেন – তা ভেবেচিন্তেই করা। দিল্লির প্রাক্তন সাংসদ গম্ভীর জানেন, যে দেশের মানুষ নোটবন্দির লাঞ্ছনা ভুলে যেতে পারে, চার ঘন্টা সময় দিয়ে অমানবিক লকডাউনের অত্যাচার গা করে না, যথেষ্ট লেখাপড়া শিখেও থালা বাজালে অতিমারীর জীবাণু পালিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করে – খেলার মাঠের এই ব্যর্থতা, অভূতপূর্ব হলেও, ভুলতে তাদের দিন তিনেকের বেশি লাগবে না।
অবশ্য এরকম ভেবে নেওয়ায় সামান্য ঝুঁকি আছে। আপনি, আমি এই ব্যর্থতা ভুলে যাব তখনই, যখন সাদা বলের সিরিজগুলো ভারত জিতবে; বিশেষ করে ঘরের মাঠে কুড়ি বিশের বিশ্বকাপটা জিতবে। তবে সত্যি কথা বলতে, এটুকু ঝুঁকি নেওয়া কোনো ব্যাপার নয়। কারণ এতগুলো ট্রফির সবকটা না জিতলেও চলবে। বিজেপির মত বিসিসিআইয়েরও গোদি মিডিয়া আছে। যেগুলো জেতা হবে না, সেগুলো হারার পিছনে নানা অজুহাত তারা ঠিক জোগাড় করে দেবে। সুনীল গাভস্করের মত প্রাক্তন ক্রিকেটার আছেন, যিনি তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়ায় ঋষভ পন্থের জঘন্য শট খেলে আউট হওয়া দেখে ধারাভাষ্যে বলে দেন ‘স্টুপিড স্টুপিড স্টুপিড’। তারপর চাট্টি টাকার জন্যে এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সে তাঁর ওই মন্তব্যকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে তৈরি বিজ্ঞাপনে ঋষভের সঙ্গে অভিনয়ও করেন। এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেটের এই ভীষ্ম পিতামহ বিস্তর তড়পাচ্ছেন অন্যদের মতই, কিন্তু গত আইপিএলের সময়ে ইনিই সাই সুদর্শনকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। একে ভারতীয় দলে ঢোকানো আশু প্রয়োজন বলছিলেন। শুধু কি তাই? এই সিরিজের প্রথম টেস্টে ইডেনের পিচ নিয়ে যখন ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা পর্যন্ত তিতিবিরক্ত, গাভস্কর পার্থের অপটাস স্টেডিয়ামের পিচের দিকে আঙুল তুলে বললেন – ওটা যদি ভালো পিচ হয়, এটা কেন খারাপ পিচ হবে? পার্থে দ্বিতীয় দিন যে ট্রেভিস হেড বোলারদের বেধড়ক ঠেঙিয়ে শতরান করতে পারলেন এবং পিচটা দ্রুত গতির হলেও ইডেনের মত ভেঙে যে ধুলো ওড়েনি – সেসবের তোয়াক্কাই করলেন না। তা এরকম বিশেষজ্ঞ থাকতে ভাবনা কী? নিন্দেমন্দ বেশি হয়ে যাচ্ছে মনে হলেই গৌতম বোর্ডকর্তাদের কাছে নালিশ করে দেবেন, গাভস্কর প্রমুখ এক ধমকেই সুর বদলে ফেলবেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রূপকথা নয়
কী ভাবছেন? এসব নেহাত কল্পনা? আজ্ঞে না, এমনটা ঘটেছে ভারতীয় ক্রিকেটে। অমিতাভ বচ্চনের মনে হয়েছে – ভারতীয় ধারাভাষ্যকারের ভারতীয় ক্রিকেটারদের সমালোচনা করা ভালো নয়, তিনি সেকথা টুইট করে দিয়েছেন। মহামতি মহেন্দ্র সিং ধোনি তাতে সহমত পোষণ করে টুইট করেছেন। তারপরেই ঘ্যাচাং করে হর্ষ ভোগলেকে ধারাভাষ্যকারদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে বোর্ড। রবীন্দ্র জাদেজাকে ‘বিটস অ্যান্ড পিসেজ ক্রিকেটার’ বলেও মহাপাপ করেছেন সঞ্জয় মঞ্জরেকর। সেই পাপে তাঁকেও বাদ পড়তে হয়েছে। এ তো কিছুই নয়। ২০১১-১২ মরশুমে পরপর আটটা টেস্ট হারার পর (যদিও বিদেশে) ধোনিকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা নির্বাচন সমিতির সভায় বলার পর নির্বাচক মোহিন্দর অমরনাথেরই চাকরি চলে যায়। অর্থাৎ ভারতীয় ক্রিকেট সেই এন শ্রীনিবাসন আর তাঁর আদরের ধোনির আমল থেকেই হয়ে উঠেছে এমন এক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে স্রেফ স্তাবকতা চলে। ভুল ধরা চলে না। এভাবে যে দেশের ক্রিকেট চলে, সে দেশের আজকের হাল হওয়া সময়ের অপেক্ষা। ধোনি, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মাদের ভক্তরা শুনলেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। কিন্তু ঘটনা হল, গম্ভীর ভারতীয় ক্রিকেটের যে কবরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আজ ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরায় রৌদ্রস্নানের ভান করছেন – সে কবর খুঁড়েছেন ওই মহাতারকারাই।
এখন প্রশ্ন উঠবে – তাহলে ওদের আমলে দল অত জিতছিল কী করে? এখন এত হারছে কেন? এর উত্তরগুলো আরও তেতো।
অর্ধসত্য ও প্রোপাগান্ডা
প্রথমত, কত জিতছিল? টেস্ট ক্রিকেটে সব দলই দেশের মাঠে বাঘ, ভারতও। গতবছর নিউজিল্যান্ডের কাছে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাওয়ার আগে ভারত দেশের মাঠে হেরেছিল সেই ২০১২-১৩ মরশুমে অ্যালাস্টেয়ার কুকের ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। এই শতাব্দীতে প্রথম সিরিজ হারে ২০০৪-০৫ মরশুমে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। তার আগের সিরিজ হার ছিল গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে ১৯৯৯-২০০০ মরশুমে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া গিলক্রিস্টদের জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। কুকের দলের আগে ইংল্যান্ডের শেষ সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ডও আগে কখনো জেতেনি। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া ইত্যাদি সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে। সুতরাং এই যে বিরাটের ভক্তরা সুযোগ পেয়েই বলতে শুরু করেছেন – বিরাট নাকি দেশের মাটিতে অপরাজেয় দল গড়ে তুলেছিলেন, সেটাকে গম্ভীর নষ্ট করে দিয়েছেন – সেটা বোকা ঔদ্ধত্যে পূর্ণ অর্ধসত্য। এরকম ঔদ্ধত্যই ভবিষ্যতের কবর খোঁড়ে। আসলে বিরাট দায়িত্ব নেওয়ার আগেও ভারতীয় দল দেশে অপরাজেয়ই ছিল।
আর বিদেশের কথা?
ধোনির আমল থেকে বিরাটের আমল পর্যন্ত ভারতীয় দলের টিম ডিরেক্টর এবং/অথবা কোচের দায়িত্ব পালন করা রবি শাস্ত্রী তথ্যের ধার কোনোদিনই ধারেন না। ধারাভাষ্যকার হিসাবে অনর্গল ভুল বকতে তাঁর জুড়ি নেই, ভারতীয় দলের দায়িত্ব পালনের সময়েও ছিল না। সর্বদাই তিনি যে তত্ত্বে বিশ্বাসী, সেটা হল – যা বলবে জোর গলায় বলো, সেটাই সত্যে পরিণত হবে। বেশ গোয়েবেলসীয় ব্যাপার। তা এই শাস্ত্রী দলের দায়িত্বে থাকার সময়ে একবার বলে বসেছিলেন, তাঁর আর বিরাটের দলটাই নাকি ভারতের সেরা সফরকারী দল। বিসিসিআইয়ের গোদি মিডিয়াও বিনা বিচারে এই প্রোপাগান্ডা চালিয়ে দিয়েছিল। অথচ তথ্য মোটেই তা বলে না। বিরাটের আমলে ভারত নিউজিল্যান্ডকে নিউজিল্যান্ডে হারাতে পারেনি, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসের দুঃসময়েও দুবারের চেষ্টায় একবারও সিরিজ জিততে পারেনি। ইংল্যান্ডেও শোচনীয় হার আর ড্রয়ের ইতিহাস। রোহিতের আমলেও ফলাফল বদলায়নি। গত এক যুগে বিদেশে সাফল্য বলতে পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। তার মধ্যে ২০২০-২১ মরশুমে কিন্তু প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে লজ্জাজনকভাবে ৩৬ রানে অল আউট হয়ে যাওয়া আছে। দ্বিতীয় টেস্ট থেকে বিরাট ছিলেনই না। মেলবোর্নে লড়াকু শতরান করেন অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানে, ভারত জেতে। তারপর সিডনির তৃতীয় টেস্টে হনুমা বিহারী আর অশ্বিন শেষদিনে অত্যাশ্চর্য ব্যাটিং করে ম্যাচ বাঁচিয়ে দেন। ব্রিসবেনে চতুর্থ টেস্ট জিতে ভারত সিরিজ পকেটস্থ করে। ধোনির আমলে বিদেশ সফরের ইতিহাস তো আরও কম উল্লেখযোগ্য। দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে সিরিজ জয় আর সেই ২০০৮-০৯ মরশুমে নিউজিল্যান্ডে সিরিজ জেতা ছাড়া।
দ্বিতীয়ত, আজ গম্ভীর আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকরের অতি সূক্ষ্ম বুদ্ধির প্রভাবে টেস্ট দলের যে হাস্যকর চেহারাটা হয়েছে, তারও সূচনা ধোনি-শাস্ত্রী, বিরাট-শাস্ত্রী আমলেই। বিরাট অধিনায়ক হিসাবে নিজের প্রথম ১৪-১৫ খানা টেস্টের একটাতেও একই একাদশ খেলাননি। কেবলই বদলাতে থাকতেন। ধোনির আমল থেকেই দেখা গেছে, সম্ভাবনাময় টেস্ট ক্রিকেটারদের লালন করে না দল। উলটে তাদের ক্ষতি করে। যেমন ভুবনেশ্বর কুমারের অযোগ্যতা হয়ে দাঁড়াল বল সুইং করানোর দক্ষতা! তিনি একটা টেস্টে পাঁচ উইকেট নিয়ে পরের টেস্টে বাদ পড়ে যাচ্ছেন – এ দৃশ্য দেখা গেছে। অলরাউন্ডারের জন্যে কান্নাকাটি সে আমল থেকেই চলছে, অথচ ভুবনেশ্বরের ব্যাটের হাত যথেষ্ট ভালো থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সার জল দিয়ে বড় করা হল না। তারপর একসময় তিনি চোটের জন্য মাঠের বাইরে চলে গেলেন। যখন ফিরলেন, তখনো কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাঁকে সাদা বলের জন্য ভাবা হল, টেস্টের জন্য নয়। গোদি মিডিয়াকে দিয়ে প্রচার করা হল, উনি নিজেই নাকি টেস্ট খেলতে চান না, কারণ পাঁচদিন খেলার মত ফিটনেস আছে কিনা বুঝতে পারছেন না। বিরক্ত ভুবনেশ্বর ২০২১ সালে একবার সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জানান – এই প্রচার সর্বৈব মিথ্যা।
এখানেই শেষ নয়। হার্দিক পান্ডিয়া একবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একটা টেস্টে প্রায় শতরান করে ফেলেছিলেন আর চারটে উইকেট নিয়েছিলেন। তাতেই তাঁকে পুরো বাস্তুতন্ত্র পরবর্তী কপিলদেব বলে ফেলল। কিন্তু কয়েকটা টেস্ট যেতে না যেতেই দেখা গেল – না তিনি ব্যাটে সুবিধা করতে পারছেন, না বলে অপরিহার্য। কিছুদিন পরে জানা গেল তিনিই বরং টেস্ট খেলতে আগ্রহী নন। শরীরে দেবে না বলেও আশঙ্কা। তবুও বিরাটদের অলরাউন্ডারের মায়া রহিয়া গেল। হার্দিককে পাওয়া যাচ্ছে না? শার্দূল ঠাকুরই সই। কী করে যেন একবার ব্রিসবেনে আর একবার ওভালে অর্ধশতরান করে ফেলেছিলেন। তাতেই বোলার হিসাবে সেরা সময় পেরিয়ে যাওয়া শার্দূলকে অলরাউন্ডার বানানোর চেষ্টা সেই ২০১৮ থেকে এবছরের জুলাই মাস পর্যন্ত চলল। তবু তাঁর ব্যাটিং গড় বিশে পৌঁছল না, বোলিং গড়ও তিরিশের নিচে নামল না। অর্থাৎ মাঝে রাহুল দ্রাবিড়-বিরাট, দ্রাবিড়-রোহিত জুটিও একই ধারায় দল চালিয়ে গেছেন।
তিন নম্বর, চার নম্বরের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একজন ভালো ব্যাট করা অফস্পিনার আর একজন উইকেটরক্ষককে খেলানোর ছ্যাবলামি তো একদিন করতেই হত। কারণ দেশের তরুণ ব্যাটাররা সেই ধোনি-শাস্ত্রী আমল থেকে দেখছেন – ‘ইনটেন্ট’ না থাকলে দলে চেতেশ্বর পূজারার জায়গাও পাকা নয়। ‘ট্যালেন্ট’ না থাকলে অজিঙ্ক রাহানেকেও বাইরে বসতে হয়। তা এই ইনটেন্ট আর ট্যালেন্ট মাপা হয় কী দিয়ে? আইপিএলের রান দিয়ে। স্বভাবতই সুদর্শনরা চার-ছয় মারার দিকে মন দেবেন, স্পিনের বিরুদ্ধে ফুটওয়ার্ক শেখায় নয়। তাঁরা আরও দেখেছেন যে করুণ নায়ারের রঞ্জি ট্রফির রানকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, সরফরাজ খানের রানের চেয়ে ওজন নিয়ে ভাবা হয় বেশি। অভিমন্যু ঈশ্বরনের জল বওয়া দেখেই সিদ্ধান্ত করে নেওয়া হয় – একে দিয়ে হবে না। তার উপর স্রেফ ব্র্যান্ড মূল্যের কারণে বহু আগেই ক্রিকেটীয় মূল্য শেষ হয়ে যাওয়া রোহিত আর বিরাটকে বয়ে চলা হল এই সেদিন পর্যন্ত, ওদিকে সিডনির সেই অমানুষিক ইনিংসের পরেও বিহারী বিস্মৃত। তাহলে ওয়াশিংটন সুন্দর আর ধ্রুব জুড়েল ছাড়া পড়ে থাকবে কে?
বোলিংয়ের শূন্য ভাঁড়ার
শুধু কি ব্যাটিংয়ের এই অবস্থা? বোলিংয়েরও তো কঙ্কালসার চেহারা। বিরাট অধিনায়ক থাকার সময়ে দিনরাত বলাবলি এবং লেখালিখি হত – তিনি নাকি পেস বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। ভারতের ঘরে ঘরে নাকি জোরে বোলার আবির্ভূত হয়েছে সেকালের ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত। এদিকে ওই পেস ব্যাটারি বিদেশে সিরিজ জেতাতে পারত না, দেশের ধুলো ওড়া পিচে দারুণ। উমেশ যাদব দেশে বাঘ, বিদেশে বেড়াল। ইশান্ত শর্মা ঠিক কী কারণে যে একশো টেস্ট খেলার সুযোগ পেলেন তা সম্ভবত ঘুম চোখে জিজ্ঞেস করলে উনিও বলতে পারবেন না। মনে রাখবেন, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন বোলারের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যাঁদের বোলিং গড় শতাধিক ম্যাচ খেলে তিনশোর বেশি উইকেট নেওয়ার পরেও তিরিশের নিচে নামেনি। অধিনায়ক বিরাটের বিদেশে স্মরণীয় জয়গুলোর স্থপতি আসলে যশপ্রীত বুমরা আর মহম্মদ শামি। শামির বয়স বেড়েছে, চোট-আঘাত বেড়েছে। গম্ভীর-আগরকর জুটি কোনো অজ্ঞাত কারণে ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছেন যে তাঁকে আর দলে নেবেন না। কিন্তু বুমরা তো আছেন। তাঁর বয়স মোটে ৩১। অথচ দেখা যাচ্ছে তিনিও টানা তিনটে টেস্ট খেলার অবস্থায় নেই। কোন সিরিজে খেলবেন, কোনটায় খেলবেন না, খেললে কটা ম্যাচ খেলবেন – তা নিয়েই একখানা রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ করা যেতে পারে।
এদিকে দানবের সাথে সংগ্রামের তরে যে জোরে বোলাররা প্রস্তুত হতেছিল ঘরে ঘরে, তাদের খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, আকাশ দীপ, হর্ষিত রানা – কারও উপরেই গোটা দুয়েক টেস্টের বেশি ভরসা করা যাচ্ছে না। একমাত্র ব্যতিক্রম মহম্মদ সিরাজ। ফলে রোহিত অস্ট্রেলিয়ায় বুমরাকে দিয়ে এত বল করিয়ে ফেলেছিলেন যে তাঁকে শেষে মুখ ফুটে বলতে হয়েছিল – আর পারছি না। গত এক যুগে আমাদের দেশের রাজনীতির মত ক্রিকেটেও স্তাবকতাই নিয়ম হয়ে যাওয়ায়, এত বছর ধরে সকলে বুমরার পিঠ চাপড়ে গেল। তিনিই যে সর্বকালের সেরা ভারতীয় পেসার, কপিলদেব নন – তাও উচ্চগ্রামে বলা শুরু হয়ে গেল। অথচ একজনও বলল না যে ওই বোলিং অ্যাকশন নিয়ে কপিলের মত বিশ বছর টেস্ট খেলা যায় না, সত্যিকারের ‘গ্রেট’ হওয়াও যায় না। এখন মাত্র ৫২ টেস্ট খেলার পরেই ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, বুমরার টেস্ট জীবন শেষ হয়ে আসছে। তিনি শেষমেশ ৩০০ উইকেটেও পৌঁছতে পারবেন কিনা সন্দেহ। অথচ বোলিং অ্যাকশনের কারণে চোট পাওয়ার পর অ্যাকশন বদলে ফেলে আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠার দৃষ্টান্ত আছে – স্বয়ং ওয়াকার ইউনিস। ভারতীয় উদাহরণ চান? জাভাগাল শ্রীনাথ। যদি বোলারদের এসবই বোঝানো না যায়, তাহলে কিসের বোলিং কোচ? কিসের জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি? কিসের ফিজিও? কিসের জিম করা? কিসের ফিটনেস ট্রেনার? বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বোর্ড টাকাগুলো দিয়ে করে কী?
আর স্পিনের কথা? রবিচন্দ্রন অশ্বিন পাঁচশোর বেশি উইকেট নিয়েছেন, জাদেজা প্রায় সাড়ে তিনশো। ফলে বিষাণ সিং বেদি, ভাগবত চন্দ্রশেখর, এরাপল্লি প্রসন্ন তো বটেই; অনিল কুম্বলেকেও আজকাল ভারতের সর্বকালের সেরা বলতে নারাজ অনেকে। কারণ পরিসংখ্যানই নাকি শেষ কথা। জাদেজার আবার সঙ্গে হাজার চারেক রান আছে, ফলে তাঁকে গ্যারি সোবার্সের পাশে বসানোর তোড়জোড় চলছে। এদিকে দুজনেই দেশের সেইসব পিচে রাজা, যেগুলো বিরাট-রোহিতের ভক্তদের বয়ান অনুযায়ীই ব্যাটিংয়ের পক্ষে এত অনুপযুক্ত যে ওঁরা রান করে উঠতে পারেননি। আর বিদেশে অশ্বিনকে খুব বেশি ম্যাচ খেলানোর সাহসই করে উঠতে পারলেন না তাঁর টেস্ট জীবনের তিন অধিনায়ক। খেলে গেলেন জাদেজা, কারণ তাঁর ব্যাটের হাতটা নাকি বেশি ভালো, মানে ব্যাটারদের ব্যর্থতা ঢাকা দিতে কাজে লাগে। কাজে লেগেছেও, কিন্তু বিদেশের স্পিন সহায়ক নয় এমন পিচে একটা ম্যাচেও তাঁকে বিশ্বমানের বোলার মনে হয়নি। দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ড সিরিজ আর এই সদ্যসমাপ্ত সিরিজে প্রচণ্ড স্পিন সহায়ক আর সাধারণ ভারতীয় – দুরকম পিচেই যেভাবে মিচেল স্যান্টনার, সাইমন হার্মাররা তাঁকে টেক্কা মেরে বেরিয়ে গেলেন, তাতে ওই সাড়ে তিনশো উইকেটের বেশিরভাগটাই যে পিচের দাক্ষিণ্যে – এমন সন্দেহ দৃঢ় হয়।
ক্যাচ কট কট
ইডেনের পিচ দেখে ভারতীয় সমর্থকরা বেজায় চটেছিলেন। বলেছিলেন, অমন পিচে খেলার দরকার নেই। ওতে মুড়ি মিছরি এক দর হয়ে যায়। তাই বিদেশের স্পিনাররা আমাদের স্পিনারদের থেকে বেশি উইকেট নিয়ে ফেলে। আমাদের ক্রিকেটারদের যা প্রতিভা, তাতে ভালো পিচেই আমরা দিব্যি জিততে পারি। গৌহাটির বর্ষাপাড়া স্টেডিয়ামের পিচ দেখিয়ে দিল – সমর্থকরা দিবাস্বপ্ন দেখেন, গম্ভীর বরং নিজের দলের মুরোদ জানেন। তিনি জানেন যে জাদেজা, অক্ষর প্যাটেলরা, ওয়াশিংটন সুন্দররাই মুড়ি; অন্য দেশের স্পিনারদের মধ্যে বরং মিছরি থাকতে পারে। আর সে মিছরির ছুরিতে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে আমাদের ব্যাটিং। কথাটা গম্ভীরের পূর্বসুরিরাও বিলক্ষণ জানতেন। তাই নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের উদ্বোধনী টেস্টের পিচ থেকে শুরু করে বহু পিচই আগের অধিনায়ক-কোচদের আমলে অমন করে বানানো হয়েছিল। তখন ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার প্রেস এবং বিশেষজ্ঞরা নিন্দে করলে আমরা কান দিইনি। কারণ ১) আমরা জাতীয়তাবাদী, ২) সবাই নিজের দেশে নিজের সুবিধা মত পিচ বানায়, ৩) আমরা জিতেছি এবং যে জেতে সে-ই ঠিক।
না, কুলদীপ যাদবের কথা ভুলিনি। কিন্তু উনিও সম্ভবত কেরিয়ারের সেরা সময়টা কাটিয়ে ফেলেছেন মাঠের বাইরেই। কী কুক্ষণে কুম্বলে কোচ থাকার সময়ে ২০১৭ সালে আহত বিরাটকে বসিয়ে কুলদীপকে ধরমশালায় খেলিয়ে দিয়েছিলেন! কুলদীপ সে ম্যাচে উইকেট-টুইকেট না নিলেই পারতেন। তা না, অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে চারজনকে আউট করে ফেলেন। ব্যাস! বিরাট, রোহিতের আমলে দেশে অশ্বিন-জাদেজার পাশেও তাঁর জায়গা পাওয়া শক্ত হয়ে গেল। ব্যাট করতে পারেন না – এই অজুহাতে তৃতীয় জায়গাটাও দেওয়া হতে লাগল অক্ষর, ওয়াশিংটনদের। ফলে এতদিনে যাঁর সিনিয়র স্পিনার হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তিনি এখনো দলে জায়গা পাকা করতে লড়ছেন।
ভাবের ঘরে চুরি না করে সত্যি কথাটা এবার স্বীকার করে নেওয়া দরকার। সেটা এই যে, এতদিন আমরা জিতছিলাম ভালো খেলছিলাম বলে নয়, প্রতিপক্ষ আমাদের চেয়েও খারাপ খেলছিল বলে। গত এক যুগে ভারতীয় টেস্ট দলের দেশ ও বিদেশের পারফরম্যান্স পরপর সাজালে এবং উগ্র জাতীয়তাবাদে অন্ধ না হলে বুঝতে বাকি থাকে না যে, দলটা বরাবরই নড়বড়ে ছিল। ব্যাটাররা বারবার ব্যর্থ হয়েছে, বোলাররা মান ইজ্জত বাঁচিয়ে দিয়েছে। যখন পারেনি, তখনই আমরা বিশ্রীভাবে হেরেছি। আবার বোলাররাও বারবার ব্রাহ্ম মুহূর্তে মুখ থুবড়ে পড়েছে – সেটা কখনো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল, কখনো দক্ষিণ আফ্রিকা সফর, কখনো ইংল্যান্ড সফর।
আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই, তার দুই স্যাঙাত ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড আর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটকে এমন এক কুয়োয় পরিণত করে ফেলেছে, যে আমরা ঘুরে ফিরে এই তিনটে দলকেই খেলতে দেখি এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য প্রচারযন্ত্রের প্রভাবে মনে করি এই কুয়োটাই সাগর। তিনটে দলের মধ্যেই সামগ্রিক মাঝারিয়ানা প্রবল, তাই নিজেদের মধ্যে খেলা প্রায়শই প্রবল উত্তেজক হয়ে ওঠে। নিউজিল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ড খানিকটা ঠ্যাকায় পড়ে, খানিকটা সদিচ্ছায়, আইপিএল বা দ্য হান্ড্রেডের মত চটজলদি ক্রিকেটের উপর সর্বস্ব পণ করেনি বলে সেদেশের ক্রিকেটাররা এখনো টেস্ট খেলতে ভুলে যাননি। অস্ট্রেলিয়ারও সঙ্গদোষ একটু কম ঘটেছে, তাই তাদের টেস্ট দলের অবস্থা তুলনায় ভালো। তবে ভারতের মতই চল্লিশের দিকে পা বাড়ানো ক্রিকেটারদের ধরে রাখতে গিয়ে পাইপলাইন খালি করে ফেলার রোগ তাদেরও ধরেছে। তার ফল হয়ত অদূর ভবিষ্যতেই দেখা যাবে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হার, সম্প্রতি পার্থে প্রথম ইনিংসে মুখ থুবড়ে পড়া তার ঝলক বলা যেতে পারে।
তাহলে ভারতীয় ক্রিকেটের কী হবে?
দেখুন, কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য দলে জায়গা সংরক্ষণ করা এবং সে কারণে শ্বেতাঙ্গ ক্রিকেটারদের দেশত্যাগ, তার উপর ‘বিগ থ্রি’ (ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড) চালিত আইসিসির আর্থিক কার্পণ্য – এসব মিলিয়ে অন্য অনেক দেশের মতই দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটও মাঝে কয়েকবছর রক্তশূন্য হয়ে পড়েছিল, এখন সামলে নিয়েছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরা রাজনৈতিক কারণে খেলি না সেই ২০০৭-০৮ থেকে। শ্রীলঙ্কা প্রথমে একগাদা কিংবদন্তির অবসর, তারপর রাজনৈতিক অস্থিরতায় টালমাটাল হয়ে গিয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো বহুকাল হল হিসাবের বাইরে চলে গেছে। ইংল্যান্ড ব্রেন্ডন ম্যাককালাম আর বেন স্টোকস জুটি বাঁধার আগে স্বখাতসলিলে ডুবছিল, ‘ব্যাজবল’ অন্তত মাঝারি অবস্থায় আনতে পেরেছে। কিন্তু তারাও কাউন্টি ক্রিকেটকে গুরুত্ব না দেওয়া, অজ্ঞাত কারণে বারবার ব্যর্থ ক্রিকেটারকে খেলিয়ে যাওয়া (জ্যাক ক্রলিকে দেখুন), ম্যাচের পরিস্থিতির কথা না ভেবে যেমন খুশি ব্যাট চালাও নীতি অবলম্বন করে প্রচুর ম্যাচ খোয়ায়। এইসব ফাঁকতালে আমরা গত ১২-১৩ বছর টেস্ট ক্রিকেটে খানিকটা ছড়ি ঘুরিয়ে নিয়েছি। এখন বাকিরা উন্নতি করা শুরু করতেই আমাদের ফাঁকি ধরা পড়ে গেছে।
আরো পড়ুন টেস্ট পরীক্ষায় আবার ফেল: একটি পূর্ণাঙ্গ প্রহসন
অস্ট্রেলিয়া আমাদের চেয়ে কিছু কম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে না, অথচ তাদের কোনো শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটার শেফিল্ড শিল্ড এড়িয়ে যান না। আর আমরা? একটা তথ্যই যথেষ্ট। ধোনি ভারতীয় দলে অভিষেকের পর আর কখনো রঞ্জি ট্রফিতে ঝাড়খণ্ডের হয়ে খেলেননি। রোহিত আর বিরাটকে এবছরের গোড়ার দিকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে প্রায় বাধ্য করল বোর্ড এবং তখনই বোঝা গিয়েছিল – হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের পিচগুলোর সঙ্গে আবার আন্তর্জাতিক ম্যাচের পিচগুলোর আকাশপাতাল ফারাক করে দেওয়া হয়েছে, যা বিশ বছর আগে হত না। ফলে রঞ্জি মাতানো জোরে বোলাররা টেস্ট খেলতে এসে পাড়ার বোলারে পরিণত হচ্ছেন, স্পিনের দেশে জন্মানো ব্যাটাররা বল ঘুরলেই চোখে অন্ধকার দেখছেন। অবশ্য গত পাঁচ বছরে আমাদের ব্যাটাররা স্পিন, সুইং, সিম, বাউন্স – কোনোটাই কোনোরকম পিচেই সামলাতে পারেননি। অশ্বিন, জাদেজারা রান করে দিতেন বলে গায়ে লাগত না।
তা এতসব গণ্ডগোল স্রেফ অকারণ গম্ভীর আর অবোধ আগরকরকে সরালেই মিটে যাবে কি? এই দুজনকে সরানো মানে অখাদ্য রান্নার রাঁধুনিদের সরানো। সেটা প্রয়োজন অন্তত দুমুঠো খেয়ে বাঁচা যায়, সেরকম রান্নার জন্য। কিন্তু যে রান্নাঘরে জোগান বলতে কেবল সজনে ডাঁটা, সেখানে পৃথিবীর সেরা রাঁধুনি এসেও বিরিয়ানি রাঁধতে পারবে না। তাছাড়া ক্রিকেটে কোচের ভূমিকা ফুটবলের মত নয়। বব উলমারের মত দু-একজন কৌশলগতভাবে বৈপ্লবিক কিছু করতে পারেন, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম। ভালো দল তৈরি হয় জবরদস্ত অধিনায়ক আর দক্ষ ক্রিকেটারদের নিয়ে। সেসব রাতারাতি হয় না। বর্তমানে ভারতীয় ক্রিকেট যেভাবে চলছে, তাতে তো সহস্র এক রজনীতেও হবে না। গৌহাটিতে হারের পর দর্শকরা গম্ভীরকে ‘হায় হায়’ ধ্বনি শোনানোয় তাঁদের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়েছেন ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটক।
ইনি আবার টেস্ট শুরুর আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়ে গম্ভীরের পক্ষ নিয়ে ইডেনে হারের দায় পুরোপুরি ক্রিকেটারদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। গোদি ক্রিকেট সাংবাদিকরাও ‘আহা উহু’ করছেন। গোহারান হারের পরেও কোচের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারবেন না ক্রিকেটভক্তরা – এই তাঁদের বক্তব্য। এই দমবন্ধ করা পরিবেশ সফল ক্রিকেট দল তৈরি করতে পারে না। দেশের লাগাম যাদের হাতে, তারা প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে ব্যর্থতা চাপা দিতে পারে, মানুষের মুখ বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু খেলার মাঠে প্রোপাগান্ডার জোরে স্কোরবোর্ডটা বদলে দেওয়া যায় না। সবচেয়ে ধনী বোর্ড হওয়ার জোরে যতটা অতিরিক্ত সুবিধা ভারতীয় দলকে পাইয়ে দেওয়া যায়, তা বিসিসিআই দেয়। কিন্তু ওতেও আর কুলোচ্ছে না।
সুতরাং আগামী বছর শ্রীলঙ্কা সফরেও চুনকাম হলে অবাক হবেন না, কোচের আসনে গম্ভীর থাকুন আর না-ই থাকুন। দেশটার মত ভারতীয় ক্রিকেটও মাঝদরিয়ায় ডুবছে, ত্রিসীমানায় কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ দেখা যাচ্ছে না আপাতত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত স্রেফ কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে অদূর ভবিষ্যতে। আইপিএল দেখুন, টেস্ট ক্রিকেট ভুলে যান। কারণ টেস্টে কী হল তা নিয়ে বিসিসিআই ভাবে না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








