২০১৪ সালে অজিত দোভালকে কেমন দেখতে ছিল? মোটের উপর এখনকার মতই, বয়সটা দশ বছর কম ছিল, ফলে আজকের তুলনায় কম বুড়ো দেখাত। শিরদাঁড়ার জোরও খানিক বেশি ছিল বোধহয়। তদুপরি তখনো কংগ্রেসের রাজনৈতিক ক্ষমতা আজকের মত অত ফিকে হয়ে যায়নি। আজকের মত ফ্যাসিবাদের থাবা তখনো ভারতের গলায় চেপে বসেনি। ফলে অজিতকে তখন আজকের তুলনায় অনেক বেশি সপ্রতিভ লাগতে পারে দর্শকের চোখে। অবশ্য সেবছরই তিনি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। নিশ্চয়ই সকলের মনে আছে যে সেবছরই নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। মসনদে এসেই তিনি শিবশঙ্কর মেননের জায়গায় অজিতকে নিয়োগ করেন। আর ওই ২০১৪ সালেই অস্ট্রেলিয়া ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের এক আলোচনাসভায় অজিত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ইত্যাদি নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তরের সময়ে একজনের প্রশ্নের জবাবে ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে নিজের অভিমত সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন, যার এক ছোট্ট অংশ সম্প্রতি রাজনৈতিক তরজার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেখানে অজিত বলছেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আজ পর্যন্ত ভারত থেকে যতজনকে নিয়োগ করেছে – ১৯৪৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যে চার হাজারের মত এমন ঘটনা পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে মুসলমানের চেয়ে হিন্দু বেশি। অজিত নির্দিষ্টভাবেই বলেছেন যে ওই আইএসআই চরদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি নয়, অর্থাৎ প্রায় ৮০% হিন্দু। অজিত এসব কথা বলেন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনাসভায়। তখনো দেশের ক্ষমতায় কিন্তু কংগ্রেস, বিজেপি ছিল বিরোধী আসনে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
লালকেল্লা চত্বরে গত ১০ নভেম্বর বিস্ফোরণ হওয়ার পর থেকেই যখন আবার দেশজুড়ে সংবাদমাধ্যমে মুসলমানদের কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে, মুসলমানবিরোধী লেখাপত্তর উপচে পড়ছে গণমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়ায়, জনমানসে মুসলমানবিদ্বেষের বিষ ছড়াচ্ছে হু হু করে, ঠিক তখনই অজিতের ওই কথার ভিডিও ভেসে ওঠে এবং মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়।
তারপর মজার মজার ঘটনা ঘটতে শুরু করে। সর্বভারতীয় মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে একথা প্রমাণ করতে যে ওটা ভুয়ো ভিডিও। এদের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি, অজিত স্বয়ং বলেছেন যে ওটা অধুনা জনপ্রিয় ডিপ ফেক প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। বলে থাকলে আশ্চর্যের কিছু নেই। হতেই পারে তিনি ভোল পালটেছেন। বর্তমানে তিনি এমন একজন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করেন, যাঁর নিজের দলের রাজনীতি খোলাখুলি মুসলমানবিদ্বেষী। তাদের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির ভরকেন্দ্রই হল মুসলমানদের দেশের শত্রু বলে প্রচার করে সমাজে তীব্র মেরুকরণ ঘটানো।
কিন্তু ইন্টারনেট বড় কঠিন ঠাঁই। অবিলম্বেই তথ্য যাচাইকারী সংস্থা অল্টনিউজ জানায়, ওই ভিডিও মোটেই ডিপ ফেক নয় এবং অজিত ওই কথাগুলো সত্যিই বলেছিলেন। অল্টনিউজকে বিশ্বাস করেন না? তাতেও ক্ষতি নেই। ইউটিউবে অস্ট্রেলিয়া ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের নিজেদের আপলোড করা ভিডিওটা দেখুন।
অজিতের এই দীর্ঘ ভাষণ এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব শুনলে খেয়াল না করে পারবেন না যে তিনি সেদিন ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্কে একটা কথা নয়, অনেক কথাই বলেছিলেন। কিছু শ্রোতা যখন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়কে নিয়ে কিছু সংশয় প্রকাশ করেন, তখন স্পষ্টতই অজিতের মুখচোখ থমথমে। তিনি প্রথমেই স্পষ্ট করে বলে দেন যে, যখন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন আসে, তখন দেশের হিন্দু ও মুসলমান জনতার মধ্যে কোনো পার্থক্য করা চলে না। মুসলমানরাও দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এরপর তাঁর এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অজিত ইতিহাসে চলে যান। পলাশীর যুদ্ধের কথা তোলেন। তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পলাশীর প্রান্তরে মুসলমানরাই লড়াই করেছিলেন। অবশ্যই কিছু বিশ্বাসঘাতক ইংরেজকে সাহায্য করেছিল, কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে যাঁরা লড়াই করেছিলেন তাঁরাও তো মুসলমানই। এরপর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতার সাধারণীকরণ করে অজিত স্পষ্ট মত দেন – ভারতের স্বাধীনতার লড়াইতে মুসলমানরা কারও থেকে কম লড়াই করেননি, তাঁদের বলিদান কম নয়। বরং অনেকের থেকে বেশিই। সুতরাং আমাদের সাম্প্রদায়িক লাইনে ভাবা বন্ধ করতে হবে।
তারপর অজিত সরাসরি কিছু সাম্প্রতিক ঘটনায় চলে আসেন। তিনি বলেন যে, কিছুদিন আগে দিল্লির রামলীলা ময়দানে ৫০,০০০ মৌলানা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এক প্রস্তাব পাশ করেছেন। তাঁরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা চেয়েছিলেন, হিন্দু সংগঠনগুলোও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এক মঞ্চে আসুক। কিন্তু কেউ যায়নি। এরপরই তিনি প্রশ্নকর্তার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন ‘আপনি বলুন তো, কোন হিন্দু সংগঠন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এরকম সমবেত প্রস্তাব নিয়েছে?’ অজিত এখানে স্পষ্টত ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে দিল্লির রামলীলা ময়দানে জামাত-এ-উলেমা-এ-হিন্দ সংগঠন আয়োজিত বৃহৎ আন্তর্জাতিক সমাবেশের উল্লেখ করেছেন। ওই সমাবেশে জড়ো হওয়া ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ সেদিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শপথ নিয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে জামাত-এ-উলেমার বিভিন্ন দেশের শাখার কর্তারা সভা করে ঘোষণা করেছিলেন যে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। সুতরাং শান্তির প্রচার ছাড়া ইসলামপন্থীরা অন্য কিছু করতে পারে না। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে তাঁরা প্রচার চালাবেন ইত্যাদি। অজিত সেকথাই সেদিন উল্লেখ করেছিলেন।
সেখানেই থামেননি। ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় নিয়ে আরও অনেক কথাই বলেছিলেন। সেসব বলতে গিয়েই তিনি পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের প্রসঙ্গে আসেন এবং বলেন, তাদের ভারতে নিযুক্ত গুপ্তচরদের মাত্র ২০% মুসলমান। তিনি যেভাবে সংখ্যা উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাতে বোঝা যায় যে নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই যা বলার বলেছেন।
আজ গোদি মিডিয়া এবং বিজেপির আই টি সেল প্রাণপণে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে উনি ওসব বলেননি। বিজেপি-আরএসএসও ফাঁপরে পড়েছে। ফলে অজিতকে বলতেই হত যে ওটা ডিপ ফেক। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে গেছে। উনি যে সেদিন ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের হয়ে ব্যাটিং করেছিলেন তা নিয়ে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ নেই। শুধুমাত্র কিছু তথ্যপ্রমাণ দিয়ে নয়, রীতিমত বিদ্যায়তনিক ব্যক্তির মত ইসলামের তত্ত্ব দিয়েও অজিত সেদিন প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় হিংসায় বিশ্বাসী নয়। শুধু কি তাই? অজিত পাকিস্তানের মুসলমানদেরও একই সার্টিফিকেট দিয়েছেন, আর কাঠগড়ায় তুলেছেন সৌদি আরব পোষিত সালাফি ইসলামিক বয়ানকে। বস্তুত, সেদিন তাঁর আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকার বন্ধু সৌদি আরব এবং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আরো পড়ুন জনসংখ্যা নিয়ে অভিসন্ধিমূলক প্রচার করলেন রাজার পারিষদরা
প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অজিত সেদিন ইসলামের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও বয়ান নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বলেছিলেন, সালাফি মতাদর্শের উৎপত্তি দ্বাদশ শতাব্দীতে তুরস্কে। সেই সময়ে মোঙ্গলরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং মুসলমানদেরই একটা বড় অংশের উপর হত্যালীলা চালায়। সেইসময় ইসলামের ‘সঠিক বয়ান’ পুনরুদ্ধার করতে তুরস্কে পন্ডিত ইবন তাইমিয়া (Ibn Taymiyya), যিনি নিজেও মোঙ্গল আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন, সালাফি আন্দোলনের সূচনা করেন। অজিতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দ্বাদশ শতাব্দীতে সালাফি আন্দোলনের যে অর্থ ছিল আজ তা নেই, কিন্তু সেদিনও সালাফি আন্দোলন মুসলমান বিশ্বে সংখ্যালঘু ছিল। আজও সংখ্যালঘু। পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলমানই এই সালাফি ইসলামের সঙ্গে একমত নন। একথা আরও বেশি খাটে ভারত, পাকিস্তান সহ গোটা উপমহাদেশের মুসলমানদের সম্পর্কে। ভারতের ৯৪% মুসলমান সংগঠন এই উগ্র সালাফি মতধারার বিরোধী। ভারতে এর পালটা ইসলামিক মতাদর্শ, সংস্কৃতি ও অনুশীলন প্রচণ্ড প্রভাবশালী। কিন্তু সালাফি গোষ্ঠীর পিছনে সৌদিরা আছে। অজিত ইঙ্গিত করেন যে আরও অনেক শক্তিশালী লোকে তাদের বিপুল পুঁজি নিয়ে রয়েছে। তিনি হয়ত নাম না করে আমেরিকার কথাই বলেছিলেন। তাঁর ভাষায় “big man with big money”। অজিত যোগ করেন, এই বিপুল শক্তিধর সালাফিরা ভারতের যে ৯৪% সংগঠন তাদের বিরোধী, তাদের উপর ভয়ানক চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে দ্বন্দ্ব পেকে উঠছে। দুঁদে গোয়েন্দা অজিত এই আক্ষেপও প্রকাশ করেন যে, রাষ্ট্র এই দ্বন্দ্বটাকে কাজে লাগাতে পারছে না।
এরপরেই তিনি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার ভারতীয় চর নিয়োগ করার প্রসঙ্গে আসেন। তবে তার ঠিক আগে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। পরিষ্কার বলেন, আফগানিস্তানে সোভিয়েত শাসনের অবসানের লক্ষ্যে আমেরিকা যখন উগ্র ইসলামকে মদত দেওয়া শুরু করে, কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে জেহাদ করার জন্য তালিবানদের মদত দেয় এবং জেহাদি দল গঠন করে, তখন সারা পৃথিবী থেকে কিছু কিছু মুসলমান সেই জেহাদে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ভারত থেকে একজনও যায়নি – ‘not a single person’!
আপনি যদি ধৈর্য ধরে এতটা পড়ে থাকেন, তাহলে বুঝবেন, কেন আজ শত চেষ্টা করেও এটা প্রমাণ করা যাবে না যে, অজিত সেদিন একথা বলেননি। আবার অজিতের পক্ষেও ওসব স্বীকার করা মুশকিল। আরএসএস-বিজেপি, সর্বোপরি মোদী-শাহ চক্র যে অস্বস্তিতে পড়েছে তার থেকে বেরিয়ে আসাও কঠিন। বস্তুত, রাষ্ট্রের ভৃত্য হিসাবে সেদিন অজিত একজন গবেষকের ভূমিকাই পালন করেছিলেন। ফলে তাঁকে বস্তুগত ব্যাখ্যাই করতে হয়েছিল রাষ্ট্রের হিতের জন্য। তিনি পরিষ্কার বুঝেছিলেন এবং ওই বক্তৃতায় বারংবার বলেছেনও যে, মুসলমানদের অযথা আক্রমণের লক্ষ্য বানানো ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক। বরং তাঁদের সঙ্গে নিয়ে চলতে পারলেই রাষ্ট্রের লাভ।
আজ সময় বদলেছে। এখন বিজেপি শুধু দেশের ক্ষমতায় নেই, সংঘ পরিবারের সামাজিক প্রভাবও বিপুল। আজ মুসলমানদের গণশত্রু বানিয়ে হিন্দু ভোট একত্রিত করার তথাকথিত রণনীতিই হল ভারতের রাষ্ট্রনীতি। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, অজিতের সতর্কবাণীই সত্যি হতে যাচ্ছে। ফ্যাসিবাদী ভারত রাষ্ট্রের পাতাল প্রবেশ রোখা দুরূহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







