আবার একটা বড় ম্যাচ। বাঙালির আড়াআড়ি দু ভাগ হয়ে যাওয়ার দিন। তবে নবকলেবরে এটিকে-মোহনবাগান কিংবা এস সি ইস্টবেঙ্গল কি আদৌ সেই আবেগের উত্তরাধিকারী হতে পারল? ফ্র‍্যাঞ্চাইজ ফুটবলের খোলসে আনতে ভারতীয় ফুটবলের দুই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে দড়ি টানাটানি তো কম হয়নি। আবেগের পণ্যায়নের চাহিদায় এটিকের সঙ্গে সংযুক্তিকরণে বাধ্য হল মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গলের মালিকানা গেল বাঙুর গোষ্ঠীর শ্রী সিমেন্টের হাতে। ময়দানের ধুলো, ঘাস  থেকে কোনো অনামী ভাইরাস খেলাটাকে সরিয়ে নিয়ে গেল। এই অবস্থায় ফুটবলের চরিত্র হয়ে গেল নাগরিক, ময়দানের প্রত্যেকটা কাঁকর যার সাক্ষী।

ফুটবল বাংলার আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে হাত মিলিয়ে চলেছে চিরকাল। উচ্চবিত্তের রাজবাড়ি থেকে মধ্যবিত্তের আঙিনায় সে এসেছে কালের নিয়মে। আবার আশির ইডেনে সেই মৃত্যুমিছিলের পর মধ্যবিত্ত বাঙালি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অভিমানে, নিম্নমধ্যবিত্ত আরও বেশি করে হয়েছে মাঠমুখী। কিন্তু অভিমান জমলেও ফুটবলের আত্মার সাথে বাঙালির অদৃশ্য সংযোগ কখনো ছিন্ন হয়নি। অন্য কোনো খেলার সাথেই বাঙালির একাত্মতা ফুটবলের মতো ছিল না কোনদিন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৭৬ সালের ১০ই আগস্টের কথাই ধরা যাক। ইস্টবেঙ্গলের সোনার অধ্যায় শেষ করে সেবার মোহনবাগানে এলেন পি কে ব্যানার্জি। বড় ম্যাচ জিতল সবুজ মেরুন। আকবরের ঐতিহাসিক ১৫ সেকেন্ডের গোলে। সেই বড় ম্যাচে জয় লিগ খেতাব প্রায় নিশ্চিত করে দিল গোষ্ঠ পাল সরণীর তাঁবুতে। ১০ই আগস্ট এরিয়ানের সাথে শেষ ম্যাচ খেলে লিগ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে উড়ে আসা পাথরের আঘাতে বরানগর নিবাসী মোহনবাগান সমর্থক বিমান মুখোপাধ্যায়ের একটা চোখ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। এই ঘটনার ঠিক ৪১ বছর পর ২০১৭ সালে শিলিগুড়িতে আই লিগ ডার্বি দেখে ফেরার পথে ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বিমান বাবুরই ছেলে সৌম্য মুখোপাধ্যায়। একটা খেলা, একটা বড় ম্যাচ কেড়ে নিল একটা পরিবারের সবকিছু। এমন উদাহরণ ডার্বির ইতিহাসে কম নেই।

১৯৮০-র সেই কলঙ্কিত ম্যাচের আগে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায় আকাশবাণীর সামনে। রেফারি সুধীন চ্যাটার্জির ব্যর্থতায় সেদিন যে উত্তেজনার আগুন জ্বলেছিল ইডেনের গালিচায়, তা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে। অকালে ঝরে যায় অনেকগুলো প্রাণ। ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে পৃথিবীর  যেখানেই খেলাটা জনপ্রিয় হয়েছে, সে মিশে গেছে সেই সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে। তাই সে যতখানি সুন্দর, ঠিক ততটাই ভয়াবহ। সে শুধুমাত্র সাইড লাইনে সীমাবদ্ধ থাকেনি কোনদিন।

বড় ম্যাচের দিন সকালে গোষ্ঠপাল আর লেসলির মুখ থেকে বিক্রি হত বড় বড় ব্যাটারির খোল আর কার্ডবোর্ডের তৈরি পেরিস্কোপ। অজয় বসু, পুষ্পেন সরকারের গলায় জীবন্ত হয়ে উঠত মাঠের খেলা। কলকাতা থেকে শহরতলি, ঘরে ঘরে রেডিওতে বড় ম্যাচ, কাতারে কাতারে লোক মাঠমুখী।  যারা টিকিট পেত না তাদের সম্বল হত পেরিস্কোপ আর ব্যাটারির খোল। এ জিনিস পাওয়া যেত ভাড়াতেও। দুটো মিলে দু ঘন্টার ভাড়া আট আনা । এক দিক খোলা অঞ্চলের দখলের জন্য রীতিমতো মারামারি দেখা দিত বড় ম্যাচের দুপুর থেকে। দুই প্রধানের মাঠে খেলা থাকলে একটা বড় অঞ্চল জুড়ে থাকত সার সার সাইকেল। তার ওপর উঠে লোক দাঁড়িয়ে যেত গোলের চিৎকার শুনে। অজস্র মাথার ভিড়ে ম্যাচে চোখ রাখা বাইরে থেকে অসম্ভব। ইস্টবেঙ্গল মাঠে বড় ম্যাচ থাকলে গাছের মাথায় জায়গা নিতে হত দুপুর থেকেই।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো বড় ম্যাচও চিরকাল এসেছে এমনই সাজ সাজ রবে। ক্রিকেটের প্রবল উন্মাদনার ভিতরেও যে সে কত বর্ণময় তা প্রমাণ করে দিয়েছিল ১৯৯৭-এর ডায়মন্ড ডার্বি। কিন্তু এই যে শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বাঙালির বড় ম্যাচ, তা কি আদৌ সেই আবেগের কলসকে বয়ে চলেছে আজও? এর ভবিষ্যৎই বা কী? উত্তর দেবে সময়। কিন্তু এটিকে-মোহনবাগান কিংবা এস সি ইস্টবেঙ্গলের কর্পোরেট কর্তাদের ওপর দায় বর্তায় বড় ম্যাচের এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এ যে আসলে অগণিত মানুষের পাওয়া না পাওয়ার হিসাবের খাতা। কর্পোরেট বিনিয়োগ আসুক, কিন্তু বজায় থাক ঐতিহ্য। বড় ম্যাচের পাণ্ডুলিপিতে যোগ হোক আরো নতুন নতুন অধ্যায়। আমরা যেন সেদিন ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে পারি, চিকচিক করে ওঠে চোখ।

ছবি ঋণ : Wikimedia

Leave a Reply