অর্ক মুখার্জি
ডুরান্ড কাপের বড় ম্যাচ বাতিল করে দিল পুলিস। শুধু তাই নয়, ম্যাচ না হওয়া সত্ত্বেও ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের সমর্থকরা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সামনে জমায়েত করে যে প্রতিবাদ করবেন ভেবেছিলেন, তা বানচাল করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করল পুলিস। র্যাফ নামল, লাঠি চলল নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে। প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও হল। যদিও সমর্থকদের লড়াকু মেজাজে শেষপর্যন্ত সেই প্রিজন ভ্যান স্থান ত্যাগ করতে পারল না, ধৃত ফুটবলপ্রেমীদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হল পুলিস। কিছু ফুটবলপ্রেমীকে অবশ্য তুলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিস। পরে লালবাজার থেকে তাদের ছাড়িয়ে আনেন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবে। এমন কাণ্ড নজিরবিহীন। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে আর জি কর হাসপাতালের ভিতর কর্তব্যরত অবস্থায় এক ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে আন্দোলন চলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই নির্মমতা সমাজের সব স্তরের মানুষকে নাড়া দিয়েছে এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত করতে সামাজিক বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে মহিলাদের সামনে আসতে দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ১৪ অগাস্ট মধ্যরাতে মেয়েদের রাতদখল কর্মসূচি আয়োজিত হয়েছে এবং সেখানে বিপুলসংখ্যক মহিলা অংশ নিয়েছেন। এই কর্মসূচি কলকাতার করুণাময়ীর সেক্টর ফাইভে কাজ করা মহিলাদের আন্দোলন আর প্রান্তিক পুরুলিয়ার গ্রাম্য জীবনে অভ্যস্ত মহিলাদের সামাজিক সম্মান রক্ষার তাগিদে, নারী হিসাবে নারীর পাশে দাঁড়ানোর অকৃত্রিম প্রয়োজনীয়তায় এক সুতোয় গেঁথেছে।

বহু জায়গায় ছাত্রছাত্রীরা অবস্থান বিক্ষোভ করছেন। সঙ্গত কারণে চিকিৎসকরা ন্যায়বিচারের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন। সাধারণ মানুষ অবশ্যই সমস্যায় পড়ছেন, কিন্তু যখন সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন চলে তখন সেই আঁচ আমাদের সবার গায়ে লাগে। নাগরিক সমাজ দূরে সরে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে পারে না। অনেক বেসরকারি মেডিকাল কলেজে ছাত্রছাত্রীরা ন্যায়বিচারের দাবিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্যে কলেজ কর্তৃপক্ষের চক্ষুশূল হচ্ছেন। এমনকি সোশাল মিডিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা তবুও নাছোড়বান্দা। সমস্ত রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁরা নিজেদের মত করে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন, অবস্থান নিচ্ছেন এবং প্রতিবাদ করছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বর্তমান শাসক দল, অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেসের জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগান হল ‘খেলা হবে’। ছোট থেকে বড়, বিভিন্ন তৃণমূল নেতা মাঝেমধ্যেই তাঁদের প্রত্যাশিত পথে ঘটনাপ্রবাহ এগোলেই সগর্বে বলে থাকেন ‘খেলা হচ্ছে’। বড় ম্যাচ বাতিলের সিদ্ধান্তের পর সোশাল মিডিয়া জুড়ে ছেয়ে গেল ‘খেলা হল না’। কেন তৃণমূল সরকারকে বড় ম্যাচ বাতিলের মত চরম সিদ্ধান্ত নিতে হল? রাজনৈতিকভাবে অবশ্যই এই নারকীয় ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড, নাগরিক সমাজের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ আর ১৪ অগাস্ট রাতে আর জি করে দুষ্কৃতী তাণ্ডব – এই ঘটনার ঘনঘটায় তৃণমূল কংগ্রেস চাপে আছে। বড় ম্যাচ হলে মাঠে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সম্ভাবনা ছিল। সোশাল মিডিয়ায় ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগান – দুই দলের সমর্থকদের উদ্দেশেই ডাক দেওয়া হচ্ছিল এমন কিছু টিফো নিয়ে হাজির হতে, যেগুলো প্রতিবাদী বক্তব্য তুলে ধরবে। জনমানসে এই ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড ও আর জি করে দুষ্কৃতী হামলা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং সরকারবিরোধী ক্ষোভ তৈরি করেছে।
সরকার যখন সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে ন্যায্য দাবিকে ভয় পেতে শুরু করে এবং সেই সম্ভাবনা থেকে ন্যায়বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ নির্মূল করতে খেলা বাতিল করে, তখন বুঝতে হবে জনতার দ্বারা নির্বাচিত সরকারের গণভিত্তি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার ভাবছে খেলার মাঠের আবেগ মানুষকে বিভেদ ভুলিয়ে এই ধরনের কর্মসূচি সামাজিক স্তরে সরকারবিরোধী ধিকধিকে আঁচকে আগুনে পরিণত করবে এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসন হাতে থাকলেও জনতার উপর নিয়ন্ত্রণ আলগা হবে। ভোট রাজনীতিতে যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে যা মারাত্মক হয়ে উঠতে বেশি সময় নেয় না।
অথচ ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কেবল সম্ভাবনা কল্পনা করে নিয়েই এতখানি ভয় পেল সরকার। বোঝাই যাচ্ছে, ন্যায়বিচার দেওয়ার ব্যাপারে বর্তমান সরকারের উপর জনতার বড় অংশই ভরসা রাখতে পারছেন না। তাঁরা মনে করছেন, সরকার দায়সারাভাবে গোটা ব্যাপারটাকে দেখছে এবং সম্ভাব্য সংগঠিত অপরাধের দায় একজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাকে গোদা বাংলায় বলে বলির পাঁঠা। জনমানসে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, যে ধৃত সঞ্জয় রায় অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হোন আর না-ই হোন, তিনি একা নন। এই ধারণাও যুক্ত হয়েছে যে এই ঘটনা কেবল দৈহিক লালসা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ধর্ষণ নয়। এই ধর্ষণ এবং খুনের পিছনে আরও অনেক অন্ধকার সত্য লুকিয়ে আছে। বিশেষত আর জি কর মেডিকাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ, যাঁর বিরুদ্ধে বহুবার বহু অভিযোগ উঠেছে, তাঁকে পদত্যাগ করতে না দিয়ে সরকার যেভাবে তাঁকে ন্যাশনাল মেডিকাল কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে বহাল করেছিল, তাও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ভালভাবে নিতে পারেননি। মানুষের মনে যে ক্ষোভ জমেছে তাতে সন্দেহ নেই। কেউ কেউ বিক্ষোভ প্রদর্শনের মাধ্যমে সেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, কেউ কেউ নানা বাধ্যবাধকতায় ক্ষোভ উগরে দিতে না পেরে ছটফট করছেন, হয়ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তে অবস্থান স্পষ্ট করছেন।
আরো পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান
সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি হীরক রাজার দেশে মনে আছে? হীরক রাজা এই সম্ভাবনাকে ভয় পেয়েই বন্ধ করিয়েছিলেন উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। যুক্তি ছিল সেই সংলাপ – ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ ছবিতে হীরক রাজার পতন হয়েছিল এবং মগজ ধোলাই যন্ত্রে নিজেরই মগজ ধোলাই হয়ে যাওয়ার হীরক রাজা নিজের মূর্তি ভাঙার কাজে হাত লাগিয়ে বলেছিলেন ‘দড়ি ধরে মারো টান রাজা হবে খানখান’। সিনেমার গল্প আর বাস্তব রাজনীতির পার্থক্য বিস্তর। বিশেষ করে সোশাল মিডিয়ার যুগে রাজনীতিতে দৃশ্যের প্রভাব মারাত্মক সংক্রামক। মমতা ব্যানার্জির সরকার ভেবেছিল, বড় ম্যাচ বাতিল করে বিক্ষোভের দৃশ্যের জন্ম আটকে দেওয়া যাবে । সেই কারণে প্রথমে পর্যাপ্ত পুলিস দেওয়া যাবে না – এই যুক্তি দেখিয়ে ম্যাচ বাতিল করা হল। পরে সাংবাদিক সম্মেলন করে একখানা অডিও ক্লিপ শুনিয়ে দাবি করা হল, গোয়েন্দা সূত্রে নাকি খবর ছিল, ম্যাচ হলে কিছু লোক মাঠে অস্ত্র নিয়ে হিংসা ছড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল।
মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ মানেই উত্তেজনা, সোশাল মিডিয়ায় বাকযুদ্ধ, ইদানীং সমর্থকদের মধ্যে উত্তাল খিস্তি খেউড়। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় সত্যিই কিছু লোক হিংসা ছড়ানোর চেষ্টা করত, তাহলেও প্রশ্ন ওঠে, পুলিস প্রশাসন কি এতই দুর্বল যে তা আটকাতে বড় ম্যাচ বাতিল করার মত সিদ্ধান্ত নিতে হল? নাকি আসলে সম্ভাব্য দৃশ্যগুলোর ভয়েই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিল?
ম্যাচ বাতিল করেও কিন্তু সরকার দৃশ্যের জন্ম আটকাতে পারল না। বরং খেলা হলে যা হত, তার চেয়ে অনেক বড় এবং ঐতিহাসিক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল রাজ্য এবং গোটা দেশ। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে বিরাট পুলিসবাহিনী ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান এবং মহমেডান স্পোর্টিং সমর্থকদের আটকে দিতেই সম্মিলিত প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ল। বৃষ্টিতে ভিজে, পুলিশের লাঠি অগ্রাহ্য করে যুবক-যুবতী, মধ্যবয়স্ক, বৃদ্ধ ফুটবলপ্রেমীরা আওয়াজ তুললেন ‘সব গ্যালারি একই স্বর/জাস্টিস ফর আ র জি কর’। কখনো ‘এক হয়েছে বাঙাল ঘটি/ভয় পেয়েছে হাওয়াই চটি’। অর্থাৎ বড় ম্যাচ বাতিলের বিক্ষোভ সরাসরি সরকারবিরোধিতায় পরিণত হল। ন্যায়বিচারের পক্ষ নিয়ে বাইপাসের জনপ্লাবনে শামিল হলে মোহনবাগান অধিনায়ক শুভাশিস বোস। ইস্টবেঙ্গলের সৌভিক চক্রবর্তী ফেসবুকে সরব হয়েছেন।
বাংলার ময়দানের ইতিহাসে লেখা থাকবে কিভাবে এক না হওয়া খেলা এক করে দিয়েছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের। লাঠির বাড়ি খেয়েও রাস্তা ছাড়েননি সমর্থকরা, ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব হয়েছিলেন। ১৮ অগাস্ট ২০২৪ বাংলার খেলাধুলোর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সন্দেহ নেই। ফুটবলে আত্মঘাতী গোল বলে একটা ব্যাপার আছে। বাংলার সরকার তেমন কিছু করে ফেলল না তো?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








