শুনুন ধর্মাবতার, আমি অতশত বুঝি না। আমি জানি না চারদিকে যা কিছু চলে তাতে আমার কতটা লাভ হতে চলেছে। আমি টিভি দেখি, সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে হাত-পা ধুয়ে বসে পড়ি। আমার বাবা কিনেছিলেন টিভিটা, রংটা পড়ে এসেছে, কিন্তু এখনও চাবুক। রোজনামচার জমা খরচ হিসাব নিকাশ করতে করতেই টিভি দেখি। আমার বউ কোণা ভাঙা কাপে চা দিয়ে যায়। আজকাল শরীরের জন্য চিনি খাই না। বলি বটে শরীর, তবে আসলে কাটছাঁট করার চেষ্টা করছি। ধর্মাবতার, আমি কিচ্ছু বুঝি না। শুধু সেদিন দেখলাম ওই টিভিতেই, আমাদের ছেলেগুলো মার খাচ্ছে। আমায় বলতে দিন, এই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যখন গীতায় হাত রেখেছি, তখন মিথ্যে বলব না। আপনারা তো অনেক অভিযোগ অনু্যোগের আঙুল তুললেন। তা যখন তুললেনই, আমিও ভাবলাম কিছু বলি। না আমি কোনও কাজে আসিনি। গত চব্বিশ বছরে একটা সোনার হারও গড়িয়ে দিতে পারিনি বউকে। এমনধারা লোক কোনও কাজে আসেও না। কিন্তু আমি লড়েছি ধর্মাবতার, ছাড়িনি। কেন জানেন? ওই রংটার জন্য, জার্সিটার জন্য। আমার জীবনে কী আছে যদি জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে ওই একটা ছবিই ভেসে আসবে। জানলা দিয়ে ভেসে আসা চাঁদের আলোয় বউটাকে জড়িয়ে ধরা নেই। ক্ষয়ে যাওয়া শরীরে আজ দুজনেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ছোটন জন্মানোর পর থেকে ও আর কাছেও আসে না। কাজ করি সিকিউরিটি গার্ডের, আমার কাজ সেলাম ঠোকা। আমি কিচ্ছু করে উঠতে পারিনি ধর্মাবতার, কিন্তু লড়েছি। আর যতবার পড়ে গেছি, আমার হাত ধরেছে ওই একজনই।

আমি বাঙাল ভাষা বলতে পারি না ধর্মাবতার। আমার দাদু যখন দাঙ্গায় এপারে চলে এসেছিল রাতের অন্ধকারে, তখন আমার দিদিমার নাম পালটাতে হয়। সত্যি বলি আমার কোনও ধর্ম নেই, আমার শুধু একটা রং রয়েছে। আমার গায়ে কাঁটাতারের কোনও দাগ নেই। কিন্তু আমার বিবেক, মনন সেগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া আর ভাগের যন্ত্রণা। আমি কিচ্ছু পারিনি ধর্মাবতার, আপনাকে বললাম না একটু আগেই। এই দেখুন কীসব বলছি! হ্যাঁ, তা দেখলাম আমাদের ছেলেগুলো মার খাচ্ছে। কোন ছেলেমেয়েগুলো বলুন তো? এরা কারা? কোথা থেকে আসে? যেখানে ওই রংটা যায়, তার টানে তারাও ছোটে। কোনও গেজেটে তাদের নাম পাবেন না। কোনও কর্তাব্যক্তি তাদের কথা বলবেন না। তবুও তারা ছোটে। কেন বলুন তো? পাগল? উন্মাদ? দেশে বেকারত্বের সংখ্যা বেশি, তাই? এই যে আপনারা একটা চুক্তি-চুক্তি সার্কাস খেলছেন; ঠিক যেমন গত বছর ফুটবল-ফুটবল সার্কাস খেললেন, এটাই তো আমাদের পাওনা, তাই না?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ধর্মাবতার, আমার কোনও জাতি নেই, বর্ণ নেই, গন্ধ নেই, আমার শুধু একটা রং আছে — সেই রংটা লাল হলুদ। আমি ওই মিছিলে যাইনি ধর্মাবতার। বিদ্যা ছুঁয়ে মিথ্যে অনেক বলেছি ধর্মাবতার। কিন্তু আজ সত্যি বলি — মন চেয়েছে কিন্তু যাইনি। ভয়ে, যদি পুলিশ এসে মারে! যদি আমায় জেলে থাকতে হয়! যদি আমার চাকরিটা চলে যায়! আমি জানি আপনারা মুখ টিপে হাসবেন। আমি যখন সারাদিন না খেয়ে লাইন দিয়ে টিকিট কেটে পাগলের মতো নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরতাম, সবাই মুখ টিপে হাসত। কিন্তু মুক্তির খবর তারা কী-ই বা জানে। তারা জানে না, যখন লাল হলুদ রঙের এগারোটা বাঘ মাঠে থাবা মারে তখন খিদে থাকে না, যন্ত্রণা থাকে না, ভাগ, ক্লান্তি কিচ্ছু থাকে না — শুধু মুক্তি! আমার মাইনে বছরে সাতশো টাকা বাড়ুক না ছাই, আমার স্বাধীনতা দিবস ওই প্রতিটা খেলার দিন। এই দেখুন আবারও কী যে বলছি! হ্যাঁ তা আপনারা বলছেন যে না পড়ে চুক্তি সই করে দিয়েছেন। বেশ করেছেন; কেউ না পড়ে দেশ বেচে দিচ্ছে, কেউ ক্লাব বেচে দিচ্ছে, ঠিকই আছে। কিন্তু আপনারা মারলেন কেন ওদের? ক্লাবের মাঠের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা কেড়ে নিতে চাইছেন, কারা এসে ক্লাবে ঠেক বসিয়ে দিচ্ছে কাদের মদতে, কিছুই জানার অধিকার নেই আমাদের? আমার দাদু যখন পালিয়ে এসেছিলেন, মাটি কামড়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। প্রতিটা রন্ধ্র জুড়ে তাঁকে সাহস জোগাল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। পন্ডিতপাড়ার নাম শুনেছেন? ময়মনসিংয়ের মহারাজা খেলার মাঠ তৈরি করে দিয়েছিলেন — নাম হয়েছিল পন্ডিতপাড়া ক্লাব। ইস্টবেঙ্গলের প্রথম ভাগের প্রায় সকলেই পন্ডিতপাড়ার রত্ন। আপনাদের প্রতিটা মার তাদের গায়ে গিয়ে পড়েছে। এই যে গোষ্ঠ পাল বলে এত লাফালাফি করেন সকলে, চীনের প্রাচীর আরও কত কী। তাঁর কোনও স্মৃতি কেউ রাখতে পারেননি। তিনিও তো বাঙাল, মাঠের মধ্যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ করেছিলেন। আপনারা রঙিন যুগের মানুষ। ক্যামেরার সামনে বিবৃতি দিয়ে বুঝিয়ে দেন ক্লাব আপনাদের কাছে মন্দির। আপনারা একমাত্র পূজারী, যারা মন্দিরে বসে মদ্যপান করতে পারে।

ধর্মাবতার, আমি জানি না ক্লাবে কীভাবে নির্বাচন হয়। এই ব্যাপারটা ভারি মজার, বুঝলেন তো? দেশের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটা আমি বুঝি না। আমি তো টিভি দেখি, তা সেখানেই সবকিছু জানতে পেরে যাই। সমর্থকদের নাকি অনুপ্রবেশকারী বলা হয়েছে চুক্তিতে। বাপরে বাপ! এত দরদ যখন, তা সমর্থক পিটিয়ে দিলেন? বেশ কয়েকদিন আগে দেখলাম আমাদের ক্লাবের এক ব্যক্তিত্বকেই পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল। ভাবা যায়? সগৌরবে তিনি ফিরে এসে ক্লাব চালাচ্ছেন। আমাদের কী আছে বলুন তো? গতবছর যখন খেলার সুযোগ পেলাম, বিশ্বাস করুন একবারের জন্যও ভাবিনি কি হতে চলেছে। আমরা চিরকাল বলে এসেছি ইস্টবেঙ্গল ক্লাব জেতার জন্য খেলে। গত সতেরো বছর এসবই বলে এসেছি, যাতে জাতীয় পর্যায়ে সেরা না হওয়ার দুঃখ ভুলে থাকতে পারি। আমরা ভুলতে দারুণ পারি ধর্মাবতার, দেশের ক্ষেত্রেও, ক্লাবের ক্ষেত্রেও। গতবার প্রথম টের পেলাম, আমরা জেতার জন্য খেলি না। অংশগ্রহণ করার জন্য খেলি। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ছয় গোল খেয়ে হারছে এমন ঘটনা তো দেখিনি, তাই আর কি।

তা এ আর এমন কী ব্যাপার? বাজার করতে গিয়ে মাসের মাইনে বাজারেই শেষ করে আসছি, এই বা কবে দেখেছি? কিন্তু জানেন, যত এগুলো দেখি, তত বেশি স্মৃতি এসে আঁকড়ে ধরে। আমার এখনও মনে আছে, মাধ্যমিকের তিনদিন আগে যুবভারতীতে খেলা। মাকে বললাম, যদি জিতি, এমন ভালো পরীক্ষা দেব ভাবতেও পারবে না। সেই শুনে মা তো ঠাকুর ঘরে সকাল থেকে! তার আগে নটা কি দশটা ম্যাচ জিতিনি যুবভারতীতে। জাতীয় লিগেও ইস্টবেঙ্গলের হাল সেবার ভাল নয়। কিন্তু মাঠে সেবার বাঘ যেন রক্তের স্বাদ পেল! ৩-০! ভাবতে পারেন! নবি দুটো, সুনীল ছেত্রী একটা।

ধর্মাবতার, আমার চিংড়ি বা ইলিশ কোনও কিছু কেনার সাধ্যি নেই। কিন্তু বাঁচতে যদি চাই, ইস্টবেঙ্গলকে ছেড়ে বাঁচতে পারব না। আমি জানি না আপনাদের চুক্তির কী বেড়াজাল। আমি জানি না, কোথায় আপনাদের বিরোধিতা, কারণ আপনারা একেক জায়গায় একেকটা কথা বলছেন। কেউ বলছে মুনাফা থাকবে না, কাটমানি বন্ধ হবে। কেউ বলছে ইনভেস্টর রক্তচোষার রূপ ধারণ করছে। আমি তো আগেই বললাম, অতশত বুঝি না। মাঠে শুধু বলটা গড়ান, একটা দল দিন আমাদের। ভিড় বাসে মেয়েটা যখন গোঁত্তা মেরে ওঠে ছেলেগুলোর সঙ্গে, আমি জ্বলন্ত মশালটা দেখতে পাই। না না, বিশ্বাস করুন কাব্যি টাব্যি করছি না। এই আবেগটুকুই তো পড়ে আছে ধর্মাবতার। আমাদের পাড়ার বিশুর একটা পা নেই। রেললাইন পেরোতে গিয়ে খুইয়েছিল। ঠিকই ধরেছেন, খেলা দেখতেই যাচ্ছিল। লকডাউনে পেটে দানাপানিও পড়ে না কত লোকের। তাদের কেউ ধনেখালি, কেউ শ্যাওড়াফুলি, কেউ নোয়াপাড়া, কেউ বা নেপালগঞ্জে লড়ছে। হাল ছাড়ছে না ধর্মাবতার। এই লড়াইটুকুই তো ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু, একবার মাঠে দলটাকে নামতে দিন, আমাদের অনেক না পাওয়া, কান্না চাপা পড়ে যায় অতলে। যেখানে যা কিছু পাইনি আমরা, তার সবটুকুর হিসাব মেটাতে নব্বই মিনিট এগারোজন খেলে জীবন বাজি রেখে। আসলে সেটা তো এগারোশো, এগারো হাজার, এগারো লক্ষ আরও কত…! আমরা চুক্তি দেখে কী বুঝব? নিজেদের বাড়ির দলিল কোনওদিন পড়ে দেখিনি আমরা। মোবাইলে নতুন অ্যাপ নামাতে গিয়ে চুক্তিপত্রটা না পড়েই তো সই করে দিই। কীভাবে বুঝব যে আমাদের শিখণ্ডী খাড়া করে কর্তারাও তাই করবেন?

দাদু মাটি কামড়ে থেকে গড়েছিল সবটুকু। সঙ্গী ছিল আমাদের রেডিও, যেখানে কণ্ঠের মাদকতায় আমেদ খানের দৌড় বদলে গেছে সুরজিত সেনগুপ্তে। সে রেডিও আর নেই, কিন্তু দৌড় তো ছিল। আমরা কোন অপরাধ করেছি ধর্মাবতার? ভালোবাসায় কী অপরাধ থাকতে পারে? আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন, তারপর ক্যামেরা চালিয়ে অ্যাকশন বলে দিয়েছেন। জানি না কখন কাট বলে চেঁচিয়ে উঠবেন। তাই একটা কথা বলে যাই, ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা শুধু কাঁটাতারের উত্তরাধিকার বয়ে বেড়ায় না, প্রতিরোধের উত্তরাধিকারও মিশে থাকে তাতে।

আপনারা খেলুন আপনাদের খেলা, ঝাঁপ ফেলে দিন ক্লাবের। পরিত্যক্ত মাঠে ঘাস গজাক, অন্ধকার নেমে আসুক। জং পড়ে যাক গেটে, আমাদের মনেও তো পড়তে শুরু করেছে। জংলা, আগাছায় ভরে উঠুক সবটুকু।

তবুও, বহু যুগ পরে যদি লেসলি ক্লডিয়াস সরণিতে পথচলতি শিশু যদি তার বৃদ্ধ দাদুকে জিজ্ঞাসা করে, “এখানে কী ছিল গো?” দাদু হয়তো খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে, ধরা গলায় বলে উঠবেন “মুক্তি!”

Leave a Reply