~ যমুনা দাস ~

আমি যমুনা দাস, ইস্টবেঙ্গলের মেয়ে
যমুনা দাস, ইস্টবেঙ্গলের লজেন্স মাসি

আমি খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারি না৷ পড়াশোনা শিখিনি৷ লজেন্স বিক্রি করে খাই৷ কিন্তু ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্মদিনে তোমরা যখন আমার জীবনের কথা জানতে চাইছ, তখন আমায় বলতেই হবে৷ আসলে, ইস্টবেঙ্গল ছাড়া আমার জীবনে তো আর কিছু নেই। এই ক্লাব, এই গ্যালারি, এই লাল-হলুদ রং-  এই সব কিছু আমার সারা জীবনের সম্বল। এর বাইরে আর কিছু নেই আমার। যতদিন বাঁচব, এই ইস্টবেঙ্গলকে নিয়েই বাঁচব।

আমার নাম যমুনা দাস। লোকে আমায় ভালবেসে লজেন্স দিদি বলে ডাকে। বয়স হল ৫৭ বছর। থাকি আগরপাড়ায়। আজ প্রায় ৩০ বছর ধরে আমি গ্যালারিতে লজেন্স বিক্রি করছি৷ ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে আমি লাল-হলুদ শাড়ি পরে যাই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমাবেশেও আমি লজেন্স বিক্রি করি বটে, কিন্তু লোকে আমাকে চেনে ইস্টবেঙ্গলের লজেন্স দিদি বলেই।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কথাটা ভুলও নয়। আমরা পারিবারিক ভাবেই ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। খুব দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে আমার ছোটবেলাটা কেটেছে। বাবা ওপার বাংলা থেকে চলে এসে সংসার পেতেছিলেন। গরীব পরিবার। রিফিউজিদের জীবন যেমন হয়। মোহিনী মিলে কাজ করতেন। কোনওরকমে সংসার চলত। চরম অভাবের সেই দিনগুলিতে আমার বাবার আনন্দ বলতে ছিল ইস্টবেঙ্গলের জয়ের খবর। তবে এই সবই আমার শোনা কথা। আমার যখন ৫ বছর বয়স, তখনই বাবা মারা যান। তারপর থেকে আমি অন্যের বাড়িতে মানুষ।

ফরিদপুরের মেয়ে আমি, ঢাকার বউ। ইস্টবেঙ্গল না হয়ে আমার উপায় কী! বাবা মারা যাওয়ার পর যাঁদের বাড়িতে বড় হলাম, সেখানেই আমার স্বামীর সঙ্গে আলাপ। আমার স্বামী গোপাল দাসের পিসতুতো দিদির বাড়িতে আমি বড় হয়েছি। আলাপ-পরিচয় তো বহুদিন ধরেই ছিল। অবশেষে ১৯৯৯ সালে আমরা বিয়ে করলাম। ততদিনে আমি ময়দানে নিয়মিত যাতায়াত করছি। বেশ পরিচিতও হয়ে গিয়েছে।
 
আমার স্বামীর ছিল নার্ভের অসুখ। মাঝেমধ্যেই অজ্ঞান হয়ে যেত। সে বড্ড কষ্ট! চোখে দেখা যায় না। বিয়ের পর আমি ওঁকে বললাম, “তুমি আমার গা ছুঁয়ে থাকো। আমার চোখের সামনে থাকো। তাহলেই হবে৷ কোনও কাজ করতে হবে না তোমায়। সংসারের ভার আমার।”

আচ্ছা, তোমরা বলো তো, মেয়েরা কি সংসারের হাল ধরতে পারে না? এই তো আমি পেরেছি। তাহলে একজন অসুস্থ মানুষ কেন কাজ করবে?

আমি আরও বললাম, “তোমার চিন্তার কোনও কারণ নেই। আমি যেমন ইস্টবেঙ্গলের মেয়ে, তেমন এই হাজার হাজার ইস্টবেঙ্গল সমর্থকও তো আমার ছেলেমেয়ে। কেউ আমার ভাই, কেউ দাদা, কেউ বোন। আমি কোনও বিপদে পড়লো তারা আসবে না? আলবাত আসবে। তাহলে আর চিন্তা কী!”

চোখে চোখে রেখেছিলাম ওঁকে। গরীব মানুষ আমরা, তা-ও যতটুকু পারি যত্ন করেছি। কিন্তু পারলাম না৷ এই ২০১৯ সালে মানুষটা চলে গেল। আমি একদম একা হয়ে গেলাম। তারপর থেকে দিন কাটে না। সকালে, দুপুরে, রাতে- সব সময়, সব কিছুতে মনে পড়ে ওঁর কথা। চেষ্টা করেছিলাম,  কিন্তু পারলাম না রাখতে৷ ভগবানের যা ইচ্ছা…

তবে একটা কথা আমি বলব। স্বামী হারানোর ওই তীব্র শোকের সময়ও আমি বুঝতে পেরেছিলাম ইস্টবেঙ্গল কী জিনিস। একটা শুধু ফোন করেছিলাম একজনকে৷ সঙ্গে সঙ্গে কত ছেলেমেয়ে এসে হাজির হল! কত ফ্যান ক্লাব থেকে সমর্থকরা এল, নীতুদা নিজে লোক পাঠালেন, কত ফুল, মালা, লাল-হলুদ পতাকায় সাজিয়ে তুললাম আমার স্বামীকে! বিশ্বাস করো, কাঁদতে কাঁদতেই সেদিন খুব গর্ব হয়েছিল। এমন করে বিদায় দিতে পারব, তা তো ভাবিনি।

এখন একা থাকলে একটা কথা খুব মনে হয়। আমি যেন শেষ দিন অবধি লাল-হলুদ পতাকাটা পাই। জানি না ঈশ্বরের কী ইচ্ছে…

যাক এ সব কথা। আমার জীবনের গল্প বলি। কী করে ময়দানে এলাম, শোনো। আমি তো পেট চালাতে নার্সিংহোমে কাজ করতাম। কলকাতার অনেকগুলো বড় নার্সিংহোমেই কাজ করেছি। কিন্তু তাতে ঠিক চলত না৷ কোনওদিন কাজ থাকত, কোনওদিন থাকত না৷ তারপর কিছুদিন বড়বাজারে কাজ করেছি৷ সেটাও ঠিকঠাক হল না। তারপর অনেক ভেবে ঠিক করলাম, কলকাতা ময়দানে লজেন্স বিক্রি করব। আর আমি যেহেতু ইস্টবেঙ্গল সমর্থক, তাই ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিই হবে আমার প্রধান কর্মক্ষেত্র।

একদিন খেতে বসে বাড়িতে বললাম, আমি ময়দানে যাব। শুনেই সবাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল যেন! ‘ময়দানে ভদ্রঘরের মেয়েরা যায়! পরিবারের মানসম্মান থাকবে না।!’ এই রকম অনেক কথাই শুনতে হয়েছিল। সেদিন ভাতের থালা সামনে নিয়ে চুপটি করে বসেছিলাম। খেতে পারিনি। রাতে ঘুম আসেনি৷ শুয়ে শুয়ে অনেক কথা ভেবেছিলাম। আমি তো অসৎ পথে কিছু করছি না, ভুল কিছু করছি না, কাউকে ঠকাচ্ছি না৷ সৎ পথে কাজ করে খেতে চাইছি। সেই সঙ্গে চাইছি যে ক্লাবকে আমি ভালবাসি, সেখানে যেতে। এতে আমার জাত যাবে? কেন আমি যেতে পারব না? কেন আমি ভরা গ্যালারিতে লজেন্স বেচতে পারব না? মেয়ে বলে? আমি যদি ছেলে হতাম, তাহলে তো এত কথা উঠত না।

সারারাত ধরে ভেবে মনস্থির করে ফেললাম। আমি যাবই। আমার কেমন একটা বিশ্বাস হল, ইস্টবেঙ্গল জনতা আমাকে ফেরাবে না৷ এখন ভাবলে মনে হয়, ভাগ্যিস আমি সেই সময় মনস্থির করতে পেরেছিলাম! নাহলে কী হত? এত মানুষের ভালবাসা, আত্মীয়তা কিছুই তো পেতাম না।

জানো, আমার বিয়েটা বরের বাড়িতে মেনে নেয়নি। চালচুলোহীন মেয়েকে বাড়ির বউ ভাবতে পারেনি ওরা৷ তাতে আমার কোনও দুঃখ নেই। আমার বর তো আমায় ভালবেসেছে। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের ভালবাসা তো পেয়েছি। আর কী চাই! আরও একটা কথা বলব। বাপ-মা মরা মেয়ে আমি, চালচুলো নেই৷ তাতে কোনও লজ্জাও নেই। এই ক্লাবটাও তো রিফিউজিদের ক্লাব। আমরা বাস্তুহারা, কিন্তু আমরা হার মানিনি৷ এই আমাদের গৌরব।

আসলে সেই সময় ময়দানটা অন্য রকম ছিল। মেয়েরা কম আসত। আর ফিরিওয়ালাদের মধ্যে তো কোনও মেয়ে ছিলই না। এখনও তেমন নেই৷ ময়দানটা ছিল পুরোটাই ছেলেদের বিষয়। কিন্তু আমি ভাবলাম, চেষ্টা করে দেখিই না কী হয়!

ময়দানে ঢোকাটা আমার জন্য সহজ হয়নি, ভাই। আমাকে ঢুকতে দিতে চায়নি অনেকে। একটা মেয়ে লজেন্স নিয়ে গ্যালারিতে ঘুরবে, বিক্রি করবে- এসব মানতে পারেনি অনেকে। একজন কর্তা সেই সময় খুব বাধা দিতেন। আমি কিন্তু হাল ছাড়লাম না। লেগে রইলাম৷ রোজ আমায় মুখ শুকনো করে ঘুরতে দেখে ঘোড়সওয়ার পুলিশের এক কর্তার বোধহয় দয়া হল। উনি সেই কর্তাকে বললেন, ‘আরে মেয়েটিকে ঢুকতে দিন। ও তো পেট চালাতে ঢুকছে গ্যালারিতে। কেন দেবেন না!’ কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর আমায় ঢুকতে দিল।

ভিতরে ঢুকে যে কী অনুভূতি হয়েছিল কী বলব! স্বর্গের মতো! মাঠে আমার ইস্টবেঙ্গল খেলছে, আমি গ্যালারিতে লজেন্স বেচছি, নিজের পরিশ্রমের টাকায় খাচ্ছি- এই সবটা মিলিয়ে কী আনন্দ, বলে বোঝাতে পারব না। এই শুরু৷ তারপর পল্টবাবু, জীবনবাবুকে পেলাম৷ বড় দাদার মতো স্নেহ করতেন ওঁরা৷ তারপর স্বপন বল, নীতু সরকার- সবার ভালবাসা পেয়েছি। আর সবচেয়ে বেশি করে বলব সমর্থকদের কথা। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ সমর্থক আমায় উজাড় করে দিয়েছে ভালবাসা। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি খুব দামি একটা গাড়ি পাশে এসে থামল। স্যুট-বুট পরা একজন নেমে এসে বলল, ‘দিদি, জয় ইস্টবেঙ্গল!’ আমিও বললাম, ‘জয় ইস্টবেঙ্গল!’ আবার ধরো খুব গরীব কোনও কমবয়সী ছেলে। সে-ও আমাকে দেখে ডাকে, ‘দিদি, জয় ইস্টবেঙ্গল’! এই ভালবাসা পেয়ে মনে হয়, এ জীবনে আর কিছু চাই না।

কত খেলোয়াড়কে দেখলাম, সান্নিধ্য পেলাম। বাইচুং, সুনীল, মুসা- কার কথা বলব আর কার কথা বলব না, জানি না। তবে আজ খুব কৃশানুদার কথা মনে পড়ছে৷ মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আইএফএ শিল্ডের ডার্বি ছিল। আমার পাশে বসেছিল, জানো! আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন। খুব মিষ্টি করে হেসে বলল, “তোমার আর্শীবাদে ভাল আছি”।

ওই শেষ দেখা। তার ক’দিন পরেই মারা গেল। সেদিন গ্যালারিতে যেন খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল কৃশানুদাকে। একটা অফ হোয়াইট শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে এসেছিল। মারা যাওয়ার আগে কোনও কোনও মানুষ খুব সুন্দর হয়ে যায় বলে শুনেছি৷ কৃশানুদাকে ওই রকম লাগছিল সে দিন।

আর কী বলব? সবই বলে ফেললাম এলোমেলো করে। আমি ইস্টবেঙ্গলের মেয়ে৷ এই আমার পরিচয়। আমার অন্য কোনও পরিচয় নেই।
Jamuna-Das-East-Bengal
যমুনা দাস, ইস্টবেঙ্গলের লজেন্স মাসি

~অনুলিখন অর্ক

যমুনা দাস – ইস্টবেঙ্গল আলট্রাস -এর সৌজ্যনে।ইস্টবেঙ্গল গ্যালারি – ছবি উইকিপেডিয়া থেকে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.