ইগর স্টিমাচ ভারতীয় ফুটবল দলের কোচ ছিলেন। ক্রিয়াপদে অতীতকালের ছোঁয়া লাগবার পরেই অভিযোগে সরব হয়েছেন তিনি। আর তাঁর করা অভিযোগের তীরে বিদ্ধ হয়েছে দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি। বিদ্ধ হয়েছে শাসক মহলের ঘনিষ্ঠরা এবং কর্পোরেট ক্রীড়া নিয়ামকরা। ইগরের অভিযোগের কিয়দংশ প্রমাণিত হলেও বিশ্ব ফুটবল সংস্থায় ভারতের মুখ পুড়বে। সর্বোপরি, গত কয়েক বছরে ভারতীয় ফুটবলের মান যেখানে আটকে রয়েছে, তাতে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নতির প্রত্যাশার সারও শুকিয়ে যাচ্ছে।

আশ্চর্য এই যে, ইগর বরখাস্ত হওয়ার আগে অবধি ভারতীয় ফুটবল সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের সরাসরি নাম নিয়ে একটি কথাও কোনোদিন বলেননি। তিনি ২০১৯ সাল থেকে ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দল এবং ভারতীয় জাতীয় অনূর্ধ্ব-২৩ দলের প্রশিক্ষক। পাঁচবছর পরে তিনি ভারতীয় ফুটবল সংস্থার অনিয়ম ও ‘অনৈতিক’ কাজকর্মের ব্যাপারে মুখ খোলার অবসর পেলেন? যদিও ইগর জানাচ্ছেন যে, গত বছরের মাঝামাঝি তিনি পদত্যাগপত্র তৈরি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারা তাঁকে পুনর্বহাল করার প্রস্তাব দেন এবং তাঁর শর্তে রাজি হন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও প্রশ্ন জাগে, বিগত বছরগুলির অনিয়ম ও দুর্নীতি শোধরানোর ব্যাপারে তাঁর আন্তরিক উদ্যোগ কতটা ছিল? তাঁর কার্যকালের প্রথম তিন বছরেও কি ভারতীয় ফুটবলের আহামরি উন্নতি হয়েছিল? তাঁর মনমত সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন, নাকি কর্তাব্যক্তিদের বহু অনিয়ম কোনো ‘অজ্ঞাত’ কারণে তিনি মেনে নিয়েছিলেন? তিনি যখন ভারতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব নিলেন, তখন কি তিনি ভারতীয় ফুটবলের নিয়ামক প্রতিষ্ঠান এবং শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের ব্যাপারে অবহিত ছিলেন না? কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত ফুটবল লিগ নিয়ে তিনি এখন যে অভিযোগ তুলেছেন, সেই অভিযোগের কারণগুলি কি বহু বছর যাবৎ বিদ্যমান ছিল না? তাহলে এতদিন কোন রুপোর কাঠি তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তবে তথ্যভাণ্ডার বলছে, ইগর আগেও ভারতীয় ফুটবলের পরিকাঠামো এবং ফুটবল সংস্থার মনোভাব নিয়ে মুখ খুলেছেন। তাঁর অসন্তোষের কারণ এবং উন্নতির পথও বাতলেছিলেন। ২০২২ সালের এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, “Not that I didn’t say it earlier. I did say it a couple of times here and there. We were also not in a position to talk about these things since we were not getting the desired results…” কিন্তু সেই ইস্যুগুলি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে সুকৌশলে। আসলে এইসব প্রশ্ন এবং জানা-অজানা উত্তরের সন্ধান পেতে পেতে ভারতীয় ফুটবল আরও বিশ্ব ফুটবলে আরও কয়েক বছর পিছিয়ে গেল। ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীরা কমবেশি সকলেই জানেন যে, বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়া অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয় এবং এশিয় ক্রমপর্যায়েও ভারতীয় ফুটবল দল খুব বেশি এগোতে পারবে না। তবুও আশার ছলনে ভুলে থাকবেন তাঁরা। ভারতের বিশাল জনসংখ্যায় ফুটবলপ্রেমীর সংখ্যা কম নয়। ভারতকে বিশ্ব ফুটবলের ‘ঘুমন্ত দৈত্য’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন ফিফার সাবেক কর্তারা। অথচ দু-তিন দশক আগের থেকে এখন অবধি তেমন সদর্থক বদল হয়নি।

আরো পড়ুন ফিফা থেকে নির্বাসন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা মাত্র

স্টিমাচের প্রথম অভিযোগ, তিনি অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) এবং অন্যান্য সংস্থা থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি। তাদের বলা একের পর মিথ্যে দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন। ভারতীয় ফুটবলের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা শুধু নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করে গেছেন। সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব কারা? কল্যাণ চৌবে। ভারতীয় জনতা পার্টির ঘোষিত সদস্য; লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটে হেরে যাওয়া বিজেপি প্রার্থী। ভারতের প্রায় প্রত্যেকটি ক্রীড়া সংস্থার শীর্ষপদে আরএসএস এবং বিজেপির অতি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বসে আছেন। ক্রিকেট, ফুটবল, দাবা, কুস্তি – কোনোটাই ব্যতিক্রম নয়। আর এই ক্রীড়াগুলির প্রত্যেকটিতে বিতর্ক এবং অনৈতিকতার অভিযোগ উঠেছে অনেকবার। এবছর মার্চের শুরুতে সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার প্রধান আইনি পরামর্শদাতা নীলাঞ্জন ভট্টাচার্য সংস্থার সভাপতি কল্যাণের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লেখেন। আই লিগ, মহিলা লিগ, সন্তোষ ট্রফি সহ আরও কিছু সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতা সম্প্রচারের স্বত্ব বিষয়ক দরপত্র আহ্বান এবং দরপত্র অনুমোদনের পদ্ধতিতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ করেন তিনি। এশিয়ান ফুটবল সংস্থার শৃঙ্খলা বিষয়ক কমিটি এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। বছরের শুরুতে অন্ধ্রপ্রদেশ ফুটবল সংস্থার প্রাক্তন সভাপতি গোপালকৃষ্ণ কোসারাজু কল্যাণ এবং কোষাধ্যক্ষ অজয় কিপার বিরুদ্ধে তহবিল তছরূপের মারাত্মক অভিযোগ করেছিলেন। ফুটবল সংস্থার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে সভাপতি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র কিনেছেন এবং অজয় ক্রেডিট কার্ড ব্যক্তিগত আমোদ প্রমোদে ব্যবহার করেছেন – এমনটাই ছিল অভিযোগ। “Mr Kalyan, Mr Ajay & Mr Shaji (Prabhakaran, AIFF general secretary) availed the privilege of holding the AIFF Credit Cards on their own for the purpose of any emergency spending when on AIFF official travelling, which was the first of its kind in the history of AIFF.” সেই ব্যক্তিগত ব্যবহারের তালিকায় জুতো, স্পা, গাড়ির তেল, ব্যক্তিগত ভ্রমণের হোটেল ভাড়া – সবই ছিল। কোসারাজু তাঁর পোস্টে আই লিগে টাকা নয়ছয়ের দিকেও আঙুল তুলেছিলেন এবং উপর্যুক্ত শীর্ষকর্তাদের দায়ী করেছিলেন।

ইগর জানিয়েছেন, গতবছর তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বলে মনস্থির করার পরে তৎকালীন সম্পাদক শাজি প্রভাকরণের সঙ্গে তাঁর ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। তাতে সন্তুষ্ট হয়েই তিনি থেকে যেতে সম্মত হন। অথচ এই শাজিকেই সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে। শাজি ফিফার দক্ষিণ-মধ্য এশিয়া শাখার উন্নয়ন আধিকারিক ছিলেন এবং কল্যাণ জমানার আগে মামলা মোকদ্দমার ঝক্কি কাটিয়ে ভারতীয় ফুটবলের উন্নয়নের স্বার্থে সংস্থায় নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কল্যাণ সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পরে শাজিকে সেই পদের দাবি ছেড়ে দিয়ে সম্পাদক হতে হয়। কিন্তু ২০২৩ সালের নভেম্বরে তাঁকে বরখাস্ত করার পরে একাধিক সংবাদমাধ্যম দাবি করে, সভাপতি এবং সম্পাদকের প্রচুর মতানৈক্য ছিল। সভাপতির সঙ্গে সহমত না হওয়াতেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইগর সভাপতি কল্যাণকে মিথ্যাবাদী বলে দাগিয়ে দিয়ে অভিযোগ করেছেন, তাঁকে কোনো স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি, ফুটবল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অনধিকার হস্তক্ষেপ করা হয়েছে এবং সোশাল মিডিয়ায় মনোরঞ্জন করতেই কল্যাণ ব্যস্ত ছিলেন।

এআইএফএফ স্টিমাচের অভিযোগ খণ্ডন করার জন্য যুক্তি সাজিয়েছে। বিবৃতিতে বলেছে যে, সভাপতি গত ১৮ মাসে পাঁচবার স্টিমাচের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। তখন নাকি তিনি সভাপতির বিরুদ্ধে সাহায্য না করার কোনো অভিযোগ করেননি। বরং প্রশিক্ষণে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া থেকে সবরকম সহায়তা তাঁকে করেছে এআইএফএফ। ইগর বারবার প্রয়োজনের তুলনায় কম সহায়ক কর্মী দেওয়ার অভিযোগ করলেও ভারতীয় ফুটবল সংস্থার বক্তব্য, তারা সর্বদা ১৩-১৬ জন সহায়ক কর্মীকে সর্বদা কোচের পাশে রেখেছিল। সভাপতি সহ বর্তমান শীর্ষকর্তারা ভারতীয় ফুটবলের অগ্রগতির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। স্টিমাচের অভিযোগ এবং অভিযোগ খণ্ডনে ফুটবল সংস্থার বিবৃতি অস্বাভাবিক নয়, যেহেতু তিক্ত মনোমালিন্যে তাদের সম্পর্কের ইতি হয়েছে। আদৌ ইগর নিজের অভাব-অভিযোগ সভাপতিকে জানিয়েছিলেন কিনা কিংবা সেইসময় সভাপতির প্রতিক্রিয়া কী ছিল, তা জানা সম্ভব নয়। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে দুবছর আগে থেকেই ইগর অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। বারবার জানিয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি, একথাও বলছিলেন, “Yes, when I came here, I knew there were problems. I was expecting things to be sorted out by the stakeholders. But it didn’t happen.” তিনি যেভাবে সমস্যার সমাধান ও পরিকাঠামোর বদল চেয়েছিলেন, তাতে কি শাসক দল থেকে শুরু করে কর্পোরেট মালিকদের আধিপত্যকারী অংশ পর্যন্ত অনেকেই চটে যেত? তাই কি বর্তমান বা তৎকালীন সভাপতি কানে তুলো আর পিঠে কুলো নীতি নিয়েছিলেন? প্রধান আইনি পরামর্শদাতা নীলাঞ্জন অভিযোগ তুলে সরব হতেই তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শাজির ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটে। স্টিমাচের ক্ষেত্রেও কি সেরকমই কোনো গোপন কারণ রয়েছে? ইগর যে অভাব-অভিযোগের কথা বলেছেন, সেগুলোর সমাধানের ব্যাপারে সদিচ্ছার অভাব ছিল বলেই কি শেষপর্যন্ত স্টিমাচের প্রস্থান হল? এআইএফএফ নিশ্চয়ই এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু সংস্থার সভাপতির নামে একের পর এক অভিযোগ ওঠা নিশ্চয়ই ভাল বিজ্ঞাপন নয়। আর ভারতীয় ফুটবলের অগ্রগতির লক্ষণও এতে চোখে পড়ে না।

পরবর্তী অংশ আগামীকাল

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.