“ফুটবলারের আত্মসম্মানবোধ আছে বিশুবাবু”। মতি নন্দীর লেখা আখ্যানে কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রতিটি খেলোয়াড়ের আত্মসম্মানবোধ প্রবল। আর এদের প্রত্যেকের একজন করে এমন প্রশিক্ষক ছিলেন যাঁরা জীবনযুদ্ধের পাঠও দিতেন। কমল গুহর ছিল পল্টুদা; প্রসূনের ছিল হর্ষদা, দাসুদা। অনুপমকে খাদের কিনারা থেকে খেলায় ফিরিয়েছিল রবিদা। শিবার হেরে যাওয়ার মুহূর্তগুলি ভুলিয়ে তাকে জিততে শিখিয়েছিলেন গোমস্ স্যার। সেসব অবশ্য বহুযুগ আগের আখ্যান। সাত-আটের দশকের কলকাতা ময়দানের গল্প। প্রসূন, কমল, অনুপমরা এখন আরও বেশি ‘কাল্পনিক’ হয়ে গেছে। মূল্যবোধ এবং মানসিকতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে বদলেছে। আখ্যানের কাল্পনিকতার সঙ্গে বাস্তবের রক্তমাংসের খেলোয়াড় বা প্রশিক্ষকদের তুলনা চলে না। তবু মার্সেলো বিয়েলসার মত কেউ কেউ থাকেন। ফুটবল প্রশিক্ষক হিসাবে ছাত্রদের জন্য জান লড়িয়ে দেন। প্রয়োজনে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রবল প্রতাপশালী সংস্থার বিরুদ্ধে গলা তোলেন।
সম্প্রতি বিয়েলসা দক্ষিণ আমেরিকার শীর্ষ ফুটবল সংস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অন্যান্য দলের প্রশিক্ষকরা পরিস্থিতি মেনে নিয়েছেন বা আড়ালে যেকথা বলেছেন বিয়েলসা সেই কথা প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন। যে মাঠে কোপা আমেরিকা প্রতিযোগিতার খেলাগুলি হয়েছে এবং যে অবস্থায় খেলাগুলি হয়েছে, তা ফুটবলের অযোগ্য। চূড়ান্ত অব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফুটবলারদের খেলতে হয়েছে। এহেন মারাত্মক অভিযোগ করেছেন বিয়েলসা। ‘এই কথাগুলো বলার অনেক বিপদ – ভেবেছিলাম মুখ খুলব না। কিন্তু সাহস করে বলতে আমাকে হতই,’ বিয়েলসা বলেছেন উরুগুয়ে বনাম কলম্বিয়া সেমিফাইনাল ম্যাচের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কলম্বিয়া বনাম উরুগুয়ে সেমিফাইনাল ম্যাচের পরে গ্যালারিতে দুই দলের ক্ষুব্ধ দর্শকদের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। জড়িয়ে পড়েন উরুগুয়ের ফুটবলাররাও। ডারউইন নুনেজ, রোনাল্ডো আরাউজোরা দর্শকদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ছেন – এমন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়। কনমেবলের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ এবং আয়োজক দেশের ফুটবল সংস্থা নুনেজদের কাঠগড়ায় তুলে কড়া শাস্তি দিতে চান। উরুগুয়ের ফুটবলাররা অভিযোগ করেন, কলম্বিয়ার দর্শকরা তাঁদের পরিবার এবং সন্তানদের সম্পর্কে ক্রমাগত অশ্রাব্য ভাষায় মন্তব্য করছিলেন। তাই তাঁরা যথোপযুক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বিয়েলসা বলেন, ‘আপনারা শুধু ফুটবলারদের প্রতিক্রিয়াটুকু দেখেছেন, কিন্তু কেন তাঁরা অমন আচরণ করলেন, তা দেখেননি। যে কোনো সুস্থ মানুষ ওই প্রতিক্রিয়াই দেখাতেন।’ ফুটবলারদের ন্যূনতম আত্মসম্মান আছে বলেই তাঁরা কটু মন্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। বিয়েলসা তাঁর ফুটবলারদের পাশে দাঁড়িয়ে একের পর এক যৌক্তিক অভিযোগ তোলেন আয়োজকদের বিরুদ্ধে। বস্তুত, তাঁর অভিযোগগুলি শুধু উরুগুয়ে-কলম্বিয়া ম্যাচ নয়, সার্বিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকা ফুটবলের নীতিহীনতা তুলে ধরে।
তাঁর প্রাথমিক অভিযোগ ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের মত নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনি ঘেরা দেশে ফুটবলারদের জন্য এত কম নিরাপত্তা আশ্চর্যজনক। কোপা আমেরিকার মত শীর্ষ স্তরের প্রতিযোগিতায় ফুটবলার বনাম দর্শক খণ্ডযুদ্ধ চলছে এবং নিরাপত্তারক্ষীরা তা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছেন – এ দৃশ্য অভূতপূর্ব। বিয়েলসার পরবর্তী অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমে একপাক্ষিকভাবে বিবাদের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে উরুগুয়ের ফুটবলাররা দোষী প্রতিপন্ন হয়েছেন। আয়োজক এবং বিপক্ষ দলের দর্শকদের ভূমিকা লঘু করে দেখানো হয়েছে। উরুগুয়ে ফুটবল সংস্থা দাবি করে, ফুটবলারদের আচরণ অনভিপ্রেত কিন্তু স্বাভাবিক এবং তা এড়ানো অসম্ভব ছিল। অভিযোগের পরে নড়েচড়ে বসে কনমেবল। অথচ তারা আগে সতর্ক হলে এবং নিরাপত্তা খতিয়ে দেখলে এমনটা ঘটত না।
#
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা আয়োজন করেছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। সেই প্রতিযোগিতায় ১৬টি দল অংশগ্রহণ করে। উরুগুয়ে ছিল এবারের সম্ভাব্য বিজয়ী। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন ডারউইন নুনেজ, রোনাল্ডো আরাউজো, হোসে মারিয়া হিমেনেজ, ভালভার্দেদের মত তরুণ ফুটবলাররা বিয়েলসার মতো প্রাজ্ঞ বহুদর্শী প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বিজয়ী হবে। উরুগুয়ে শুরু থেকে চমৎকার খেলছিল। ৩-২-৪-১ বা ৪-২-৩-১ ছক। জমাট রক্ষণভাগ সেমিফাইনাল অবধি পাঁচ ম্যাচে মাত্র তিন গোল হজম করেছিল। ব্রাজিলের আক্রমণভাগ অসহায় হয়ে পড়েছে তাদের প্রতিরক্ষার সামনে। বিয়েলসা অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক। দুই দশক আগে পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব সামলেছেন। কোপা আমেরিকায় দ্বিতীয় স্থান, অলিম্পিকে সোনা এবং ২০০২ বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জন পর্বে প্রথম স্থান অর্জিত হয়েছে তাঁর প্রশিক্ষণ পর্বে। জয়ের রেকর্ড ৬৫%। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, আরিয়েল ওর্তেগা, জেভিয়ার জানেত্তি, হার্নান্দো ক্রেসপো, রবার্তো আয়ালার মত ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। চিলে জাতীয় ফুটবল দলের প্রশিক্ষক হিসাবেও শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছিলেন বিয়েলসা। শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে প্রথমবার আন্তর্জাতিক ম্যাচে হারানো, ২০১০ বিশ্বকাপে চিলের যোগ্যতা অর্জন এবং শেষ ষোলোয় যাওয়া – বিয়েলসার সাফল্যের ঝুলি ভর্তি। ফুটবলারদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, তাদের আগলে রাখা এবং সুসময়-দুঃসময়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস তাঁর বরাবরের।
সাম্প্রতিক বিতর্কে তাঁর মূল অভিযোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে। খেলার জন্য মাঠগুলি ঠিকমত প্রস্তুত করা হয়নি। খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি ও অনুশীলনের জন্য যে মাঠের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তা অনুশীলনের অনুপযুক্ত ছিল। বলিভিয়াসহ একাধিক দেশ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেনি। মাঠের ঘাস এবং সার্বিক অবস্থা নিয়ে বিয়েলসার অভিযোগ এই যে, মাঠগুলি ভাল ফুটবল খেলার অযোগ্য। আর্জেন্টিনা প্রশিক্ষক লায়োনেল স্ক্যালোনিও একই অভিযোগ করেছিলেন। ‘মাত্র দুদিন আগে আয়োজকরা হঠাৎ মাঠ বদলে দিল। এই মাঠ একেবারেই খেলার যোগ্য না।’ যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল কাঠামোয় নকল টার্ফ ব্যবহার হয়। কিন্তু ফিফা বরাবর স্বাভাবিক ঘাসের মাঠের পক্ষে সওয়াল করে এসেছে। আর্জেন্তিনার গোলরক্ষক এমি মার্তিনেজও নকল টার্ফের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। নকল টার্ফে লাফানো বল ধরা মুশকিল এবং খেলোয়াড়দের চোট পাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। স্ক্যালোনি বা বিয়েলসার অভিযোগের কোনো সদুত্তর এখন অবধি দিতে পারেনি কনমেবল।
২০২৪ কোপা আমেরিকায় নিয়ন্ত্রণহীন এবং ভুল রেফারিংয়ের জন্য কনমেবল প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কোনো ম্যাচে মাত্রাতিরিক্ত কার্ড দেখিয়ে খেলার গতি নষ্ট করা, কোনো ম্যাচে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কোনো ম্যাচে ন্যায্য ফাউলের সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়ায় কোপা আমেরিকা প্রতিযোগিতার সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উরুগুয়ে বনাম যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে খেলা চলাকালীন হলুদ কার্ড দেখানোয় বিতর্ক বাধে। চিলে বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচে নিকো গঞ্জালেজ দৃষ্টিকটুভাবে বক্সের ভিতরে চিলের এক ফুটবলারের পা টেনে ফেলে দিলে ফাউল দিলেও কার্ড দেখানো হয়নি। রেফারি ব্রেজিলের ভিনিসিয়াসকে ন্যায্য পেনাল্টি থেকে বঞ্চিত করার পরে কনমেবলকে প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করতে হয়েছে।
আরো পড়ুন কাতারে বিশ্বকাপ: নিরোর অতিথি আমরা সবাই
লাতিন আমেরিকার বহু দেশের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। তা সত্ত্বেও সেইসব দেশের ফুটবলপ্রেমীরা জাতীয় দলের খেলা দেখতে বিদেশে পাড়ি দেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত কোপা আমেরিকায় টিকিটের দাম অত্যধিক থাকার কারণে অনেক ফুটবলপ্রেমী মাঠে উপস্থিত থাকতে পারেননি। টিকিট না পাওয়ায় দর্শকদের ক্ষোভে স্টেডিয়ামের গেটে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে দর্শকদের ধস্তাধস্তি হয়েছে। কানাডার প্রশিক্ষক জেসি মার্চ আয়োজক সংস্থার কর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় বিষয়ে তাঁরা প্রায়শই বিভ্রান্তিমূলক কথা বলেছেন। এমনকি আয়োজকদের পেশাদারিত্ব নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
বিয়েলসা যে অভিযোগগুলি করেছেন, তার সারবত্তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। নিজের দলের ফুটবলারদের উপরে যখন শাস্তির খাঁড়া ঝুলছে, তখন তিনি নির্দ্বিধায় তাদের আচরণকে সমর্থন করেছেন এবং কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ামক সংস্থাকে বিদ্ধ করেছেন। এজন্য অবশ্যই তাঁর প্রশংসা প্রাপ্য। স্ক্যালোনি, মার্চের মতো কতিপয় প্রশিক্ষক কয়েকটি বিষয়ে মুখ খুলেছেন। শীর্ষ সংস্থার বিরুদ্ধে মুখ না খুলে চুপ থাকাটাই যখন রীতি, তখন তাঁদের ভূমিকা দৃষ্টান্তস্বরূপ। মতি নন্দীর আখ্যানের দাসুদা, পল্টুদার মত মূল্যবোধ এবং সত্যি বলার সাহস রয়েছে তাঁদের। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় ফুটবল বিশ্বকাপের আসর বসবে। কোপা আমেরিকা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যেসব মাঠে, তাদের অনেকগুলিতেই বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে বিয়েলসাদের অভিযোগকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ফিফা ব্যবস্থা গ্রহণ করে কিনা এখন তার অপেক্ষা।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








