দিয়েগো মারাদোনাকে চোখের সামনে দেখেও নিস্পৃহ থাকতে পারতেন, এমন মানুষ সম্ভবত বিরল; তা তিনি ফুটবল নামক খেলাটি সম্বন্ধে যতই উদাসীন হোন না কেন। খেলা ছেড়ে দেবার বহুদিন পরেও মারাদোনা তাঁর চলনে বলনে, কথায় বার্তায়, কখনো মুচকি, কখনো বা উচ্চকিত হাসিতে, নিজেকে ঘিরে এমন একটি বাতাবরণ তৈরি করে ফেলেছিলেন, যা তাঁকে সর্বদাই করে তুলত যাবতীয় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ফুটবলার হিসাবে প্রাক্তন হয়ে যাবার বহুবছর বাদেও, যখন মারাদোনা মানেই অনন্ত কেচ্ছার মুখরোচক গল্প মাত্র, তখনও যে কোনো আসরে এই আর্জেন্টিনীয় তারকার উপস্থিতি অবধারিত নিয়ে আসত এক বাড়তি ঔজ্জ্বল্য, তাঁর প্রবেশমাত্র শতপুষ্পে বিকশিত হত যে কোনো অনুষ্ঠান। অনেকেই বলাবলি করতেন, হয়ত সঠিক কারণেই করতেন — ফুটবল পরবর্তী জীবনে তাঁর যাবতীয় আচার আচরণ আদতে ছিল এক সযত্নে লালিত ভান মাত্র, দেশে বিদেশে নিজের বাণিজ্যিক মূল্য তরতাজা রাখতে সর্বদাই এক মোটা দাগের নাটকীয়তার মোড়কে নিজেকে আবদ্ধ রাখতেন এই বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার।

তাঁর অগণিত ভক্ত তেড়েফুঁড়ে বলবেন দিয়েগো মারাদোনার কোনো ভানের প্রয়োজন হয়নি কোনোদিন, তাঁর বাঁ পায়ের সামান্য মোচড়ে ভূলুণ্ঠিত হত সমগ্র পৃথিবী; তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতার বলে তিনি আজও, মাত্র ষাট বছর বয়সে অকালপ্রয়াণের পরেও, বিশ্বের সবচাইতে আলোচিত ফুটবলার।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

হয়ত তাই। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগে বেশ কয়েকবার তাঁকে কাছাকাছি দেখবার সুবাদে প্রায়শই মনে হয়েছে ফুটবলার মারাদোনা ও প্রাক্তন খেলোয়াড় মারাদোনার মধ্যে তফাৎ অনেকটাই; মাঠের মধ্যের মারাদোনা এক সীমাহীন স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ, এক চিরকালীন ভালোবাসা। সেই মানুষটাই খেলা ছেড়ে দেবার পর যেন হয়ে দাঁড়ালেন এক সতর্ক শোম্যান, যাঁর নিয়মিত অসংলগ্ন আচরণ, বিতর্কিত কথার ফুলঝুরি আসলে শেয়ার বাজারে ব্যক্তি মারাদোনার দর যাতে কিছুতেই না পড়ে যায়, তার আপ্রাণ প্রয়াস মাত্র।

মারাদোনা প্রথমবার কলকাতা আসেন ২০০৮ সালে, ডিসেম্বরের কুসুম কুসুম শীতে, দিন তিনেকের জন্য। মহেশতলায় এসেছেন মারাদোনা, পৌঁছে দেখলাম তিনি ততক্ষণে কয়েক হাজার দর্শককে মাতিয়ে দিয়েছেন। তাঁকে উদ্দেশ্য করে যে বাংলা গানটি রচিত হয়েছিল, তার গীতিকার-গায়ককে মারাদোনা বুকে টেনে নিলেন, আবেগে স্পষ্টতই তাঁর চোখে জল চলে এল। এরপর কে যেন তাঁর দিকে একটা বল ছুঁড়ে দিল, তিনি অত ভিড়ের মধ্যেও সাপের ছোবলের মত বিদ্যুৎ গতিতে বাঁ পা বাড়িয়ে দিয়ে অব্যর্থ টেনে নিলেন সেই বল, মাঠভর্তি দর্শক জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল। মারাদোনার মুখে হাল্কা হাসি, সংগঠকদের দিকে তিনি তাকালেন — মাথা ঘুরিয়ে দেবার মত বিশাল টাকার কড়ারে তিনি কলকাতায় এসেছেন, ভাবখানা, দেখো আমি কিন্তু কড়ায় গণ্ডায় শোধ দিয়ে যাচ্ছি।

অনুষ্ঠান থেকে মারাদোনার নির্গমনও অতি নাটকীয়; তাঁর নামে সৃষ্ট গান তারস্বরে বাজছে, তারই মধ্যে হুডখোলা গাড়িতে দুহাত তুলে নাচতে নাচতে চলে গেলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান খেলোয়াড়টি। মনে হল যেন প্রবল বাজনার মধ্যে একটি যাত্রাপালার অবসান হল।

এই একবার নয়, বহুবার মারাদোনাকে দেখে সন্দেহ জেগেছে, তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ডের অনেকটাই আসলে এক বাণিজ্যসুলভ মানসিকতার ফসল, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে তিনি বিপণন করছেন তাঁর জন্মগত প্রতিভা, কৃত্রিম হাসি ও হাত-পা ছোঁড়ার মাধ্যমে তিনি নিজেকে নামিয়ে এনেছেন এক সার্কাসের ট্র্যাপিজ আর্টিস্টের স্তরে।

মার্সেই বিমানবন্দরে ঢুকে যাবার আগে মারাদোনা একটু দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে মাছির মত ছেঁকে ধরেছে সংবাদমাধ্যম। হঠাৎ মারাদোনা একটি বল চেয়ে নিয়ে খেলা দেখাতে শুরু করলেন, বিস্ময়কর তৎপরতায় বলটা দাঁড় করিয়ে দিলেন একটি খালি ঠান্ডা পানীয়ের বোতলের উপর। টেলিভিশন ক্যামেরা ক্রু আহ্লাদে আটখানা। কেপটাউনে বিশ্বকাপের ম্যাচ চলছে আর্জেন্টিনার, মারাদোনা কোচ; হঠাৎ একটা বল ধেয়ে এল তাঁর দিকে, মারাদোনার চকিত ব্যাকহিলে বলটা চতুর্থ রেফারির সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। উচ্ছাসে ফেটে পড়ল গ্যালারি।

মাঠের মধ্যে মারাদোনা শুধু অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়েই নিজের কর্তব্য শেষ করে দেননি; তিনি ছিলেন একজন সফল নেতাও। প্রতি ম্যাচে জয় তুলে আনবার জন্য তাঁর অফুরন্ত লড়াই, তাঁর নিরবচ্ছিন্ন আবেগ সহজেই জারিত হত তাঁর সহখেলোয়াড়দের মধ্যে, তা সে নাপোলিতেই হোক, অথবা জাতীয় দলে, সাফল্য আসত বড় আসরে। মাঠের ভিতরে এক বিশুদ্ধ অনুভূতির নাম দিয়েগো মারাদোনা, কিন্তু অফ দ্য ফিল্ড সম্ভবত সেকথা বলা যায় না। সেখানে তিনি কিউবার বিচে পায়ে বল নিয়ে চুরুট ধরিয়ে ছবি তোলেন, কলকাতার হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলনে আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে মাথায় বল নিয়ে দেখিয়ে দেন অবিশ্বাস্য জাগলিং। সবটাই কি স্বতঃস্ফূর্ত? বিশ্বাস করা শক্ত।

সহজ সরল অঙ্ক কষলে অনেক সময় মনে হয়, তাঁর ফুটবল জীবনে দাঁড়ি পড়ে যাবার পর একটা কথা পরিষ্কার উপলব্ধি করেছিলেন মারাদোনা। তাঁর বিতর্কিত কথাবার্তা, অপ্রত্যাশিত আচরণ এবং অসামান্য প্রতিভা — এই তিনের সংমিশ্রণে এমন একটি চরিত্র তিনি নিজের জন্য তৈরি করতে পারেন, যার ব্র্যান্ড ভ্যালু হবে সবার উপরে, এই বাজারি অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রতিদিন টাকার বিনিময়ে বিক্রি করবার এর চাইতে চমৎকার উপায় আর নেই।

হয়ত তাই। আর যদি তেমনটাই হয়, তাহলে তার ভিতরে অন্যায় কিছু নেই। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এটাই দস্তুর, এই অবিরত ঘূর্ণায়মান শাণিত সুদর্শন চক্রের তীক্ষ্ণ আক্রমণের সামনে তাবৎ দুনিয়া এক অসহায় শিশুপাল।

কিন্তু এর বাইরেও একটা দিক আছে, যা অনেকটাই অনালোচিত। ফুটবলের ক্ষেত্রে যে বিপুল মেধা নিয়ে জন্মেছিলেন দিয়েগো মারাদোনা, তার ঠিক কতটুকু কাজে লেগেছে তাঁর নিজের, আর কতটা খরচ হয়েছে তাঁর চারপাশে ঘিরে থাকা স্বার্থান্বেষী মানুষদের মুনাফার খাতিরে, তা নিয়ে কিন্তু বেশ কিছু প্রশ্ন তোলাই যায়।

বড় বেশি প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন মারাদোনা। দশে পা দেবার আগেই তাঁর বল স্কিল দেখে স্রেফ তাক লেগে গিয়েছিল আশেপাশের লোকজনের। নিতান্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে, দিন আনতে পান্তা ফুরোয় তাঁদের; সুতরাং বালক দিয়েগো হলেন অর্থাগমের নতুন যন্ত্র। বুয়েনস এয়ার্সের মাঠে কোনো বড় খেলা হলেই তার আগে কিংবা বিরতির সময় বল নিয়ে নামিয়ে দেওয়া হতে লাগল ছোট্ট ছেলেটিকে। মাথায়, বুকে, পিঠে বল নাচিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করে দশে পা দেবার আগেই সে হয়ে দাঁড়াল সংসারের অন্যতম রোজগেরে পুরুষ।

একটু বড় হয়ে মারাদোনা যখন আত্মপ্রকাশ করলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসাবে, তখনো কিন্তু তাঁর ছাড় নেই। এই দুরন্ত প্রতিভাবান সদ্য যুবকটিকে তখন বোকা জুনিয়রস কিনেছে সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন ডলারে, সুতরাং তাঁকে নিংড়ে নিতে হবে। উপায় একটাই, সারা বিশ্ব জুড়ে যত বেশি সম্ভব প্রীতি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা করা হোক। বিশাল টাকা দিতে প্রস্তুত বহু লোক, শর্ত শুধু একটাই — মাঠে নামাতে হবে ফুটবলের এই নবাগত রাজপুত্রকে।

১৯৮১-র মাঝামাঝি সময় থেকে সার্কাস পার্টির মত বিশ্বভ্রমণ শুরু করলো বোকা। আমেরিকা, জাপান, হংকং, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, গুয়াতেমালা…। ১৯৮২-র জানুয়ারি মাসে এমন একটা সময় এল যখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ২১ দিনে আটটি ম্যাচ খেললো বোকা; প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নামলেন মারাদোনা। উপায় নেই, তাঁকে দেখিয়ে এই আটটি ম্যাচের জন্য ক্লাব পেয়েছে সাড়ে সাত লক্ষ ডলার।

হাতে তুরুপের তাস মারাদোনা — টাকার নেশায় তখন পাগল হয়ে উঠেছেন বোকার কর্তারা। এক রবিবার সকালে টোকিওতে নামল বোকা। সেদিনই ম্যাচ খেলে উড়ে গেল আমেরিকা। সেখান থেকে মেক্সিকো। মঙ্গলবার সেখানে খেলেই অপেক্ষমান বিমানে উঠে গুয়াতেমালা — খেলা সেদিনই। মারাদোনা পরে বলেছিলেন, এটা সম্ভবত বিশ্ব রেকর্ড।

“আমি আর সত্যি পেরে উঠছি না”, এই সময় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন মারাদোনা। “আমার শরীর, মন, কোনোকিছুই আর টানতে পারছে না, কিন্তু হায় ঈশ্বর, এরা আমাকে ছাড়বে না। যে ফুটবল আমার সবকিছু, যে ফুটবল আমি খেলি প্রাণের আনন্দে, সেই ফুটবল আমার বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”

না, রেহাই পাননি তিনি। কোনোদিন নয়। টাকা, আরও টাকা নামক পেশাদার ফুটবলের যে নিষ্ঠুর রীতিপ্রকৃতি তাঁকে টেনে নিয়েছিল সেই কৈশোরকালেই, তারই জাঁতাকলে তিনি কাটিয়ে দিলেন সারাটা কাল, জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে তিনি ঈশ্বরের বরপুত্র, ভালবাসার মহানায়ক। কিন্তু অন্তিমে মারাদোনা সেই সিস্টেমের দাস, অর্থ উপায়ের যন্ত্র মাত্র। সুতরাং নমো যন্ত্র!

অতএব, দোষ কারো নয় গো মা! বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠ মঞ্চ একদিন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তাঁর আলোকিত প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে, তাঁর উদ্ভাসিত দীপ্তিতে, তাঁর প্রদীপ্ত অনন্যতায়। কিন্তু ফুটবলের বাজারি মুৎসুদ্দিদের কাছে তিনি তো সেই বাল্যকাল থেকে এক স্বর্ণপ্রসূ হংস মাত্র, তার বেশি কিছু নয়।

তাই বুঝি আজ তাঁর অবর্তমানে তাঁর ৬১তম জন্মদিন পালন করতে বসে হঠাৎ মনে হয় দিয়েগো মারাদোনা কি সবটাই করতেন তাঁর চোখের জল গোপন করে? তিনি কি জানতেন, কার চোখে কত জল, কে বা তা মাপে?

ছবি: @ElDiegoPics টুইটার হ্যান্ডেল থেকে

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.