প্রথমে ৩-০, তারপর ৪-০। পশ্চিমবঙ্গের সাতটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে কার্যত জয়জয়কার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের৷ ভোটপ্রাপ্তির হারও নজরকাড়া। কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি৷ কার্যত অস্তিত্বহীন বিরোধী শক্তি। বস্তুত, বিরোধীদের সাংগঠনিক শক্তি এতটাই তলানিতে যে, “ভোট লুঠ হয়েছে” — এই চেনা অভিযোগও নির্বাচনের দিন তেমন শোনা যায়নি। ফল প্রকাশের পর তৃণমূলের পক্ষে এই বিপুল রায় দেখে ইতিউতি বিরোধী নেতারা সন্ত্রাসের কথা বলছেন বটে, কিন্তু জনমনে তার আদৌ কোনো প্রভাব পড়ছে বলে মনে হয় না।

বস্তুত, এই বিপুল জয় কেবলমাত্র ছাপ্পা ভোট বলে মেনে নেওয়া কঠিন। বিপুল জনসমর্থন ছাড়া এই জয় হাসিল করা অসম্ভব। এ কথা মেনে নিতে কোনো অসুবিধা নেই, রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে একমেবাদ্বিতীয়ম রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিরোধীদের দূরবীন দিয়েও দেখা যাচ্ছে না। বিকল্পহীন নির্বাচনী পরিসরে একতরফা জয় ছিনিয়ে নিচ্ছে তৃণমূল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একদিকে ছন্নছাড়া, কার্যত অস্তিত্বহীন বিরোধী শিবির। অন্যদিকে তৃণমূলের নিবিড় সংগঠন। সর্বোপরি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা এবং দুয়ারে সরকার, কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ বিভিন্ন প্রকল্পের সাময়িক সুফল। চুম্বকে তৃণমূলের সাফল্যের ম্যাজিক সমীকরণ এখানেই।

উপনির্বাচনে শাসক দল সবসময়েই এগিয়ে থাকে। ভোটারদের সামনে বিকল্পও থাকে না তেমন। কারণ এই ভোটে সরকার বদলায় না। নবান্নে যে দলের সরকার, এলাকায় যদি তাদের বিধায়কই থাকেন, তাহলে উন্নয়নমূলক কাজকর্মের সুবিধা — এমন ভাবনাও কাজ করে। এই সব ফ্যাক্টর বহুচর্চিত। তার সঙ্গে নিঃসন্দেহে বিরোধীরা যে রিগিংয়ের অভিযোগ তুলেছেন, তারও খানিক সারবত্তা আছে। বিশেষ করে দিনহাটা, গোসাবা এবং খড়দহের গ্রামীণ এলাকায়। কিন্তু দিনের শেষে এ কথা স্পষ্ট যে, বিরোধীদের সাংগঠনিক অস্তিত্ব না থাকায়, তাঁরা ছাপ্পা কোথায় হচ্ছে, তা ঠিক করে বুঝে উঠতেও পারেননি। পারলে, নির্বাচনের দিন খানিক প্রতিরোধ হত৷ তা যখন হয়নি, ফলপ্রকাশের পর কান্নাকাটি কেবল অক্ষমের আর্তনাদ বলেই প্রতিভাত হবে।

তৃণমূলের ভোট শতাংশ কতটা বাড়ল দেখা যাক। গত বিধানসভা নির্বাচনে দিনহাটা আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। মাত্র ৫৭ ভোটে তৃণমূলের উদয়ন গুহকে হারিয়ে জিতেছিলেন বিজেপির নিশীথ প্রামানিক। পরে কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ তাঁর বিধায়ক পদ ছেড়ে দেন, ফলে উপনির্বাচন হয়। এবার তৃণমূল পেয়েছে ৮৪.১৫ শতাংশ ভোট! মে মাসের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। এই কেন্দ্রে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল ৪৭.৬ শতাংশ ভোট, উপনির্বাচনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১.৩১ শতাংশ। অর্থাৎ ৩৬ শতাংশ কম। নিশীথের বুথেও বিজেপির তিন গুণ ভোট পেয়েছেন উদয়ন। স্পষ্টতই, বিজেপির দিকে যাওয়া হিন্দু, বিশেষত দলিত ভোটের বিরাট অংশ তৃণমূলের কাছে ফিরে এসেছে। বিধানসভা নির্বাচনেও যাঁরা বিজেপিকে ভরসা করেছিলেন, তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ৫৭ ভোটে হারা আসন তৃণমূল জিতেছে ১ লক্ষ ৬৩ হাজারের বেশি ভোটে।

তুলনামূলকভাবে লো-প্রোফাইল কেন্দ্র গোসাবা। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৫৩.৯৯ শতাংশ ভোট, উপনির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ৮৭.১৯ শতাংশ। বিজেপির ভোট ৪১.৮৮ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৯.৯৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মনে রাখা জরুরি, গোসাবা হল সেই কেন্দ্রগুলির অন্যতম, যেগুলিতে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সাম্প্রদায়িক তাস খেলেছিল। রিগিং তত্ত্ব থাকলেও দেখা যাচ্ছে, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী প্রচারের আবেদন কার্যত উধাও।

শান্তিপুরে উপনির্বাচনের প্রচারে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে এনেছিলেন। ওই কেন্দ্রে দলিত ভোটার প্রচুর। দেখা যাচ্ছে, সেখানেও চূড়ান্ত ফ্লপ বিজেপির রণনীতি। বিজেপির জেতা কেন্দ্রে ৪৯.৯৪ শতাংশ থেকে কমে পদ্মের ভোট দাঁড়িয়েছে ২৩.২২ শতাংশে। একমাত্র এই আসনেই বিজেপির জামানত বেঁচেছে। শান্তিপুরে তৃণমূল ৪২.৭২ শতাংশ থেকে ভোট বাড়িয়ে পৌঁছেছে ৫৪.৮৯ শতাংশে।

খড়দহে হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বিধানসভা নির্বাচনে পাওয়া ৪৯ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে তিনি পেয়েছেন ৭৩.৫৯ শতাংশ ভোট। এখানেও বিজেপির ভোট কমেছে। ৩৩.৬৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৩.০৭ শতাংশ।

মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বাংলায় এখন মাত্র দুটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক পক্ষ — তৃণমূল এবং বিজেপি। বামপন্থী জোট এবং কংগ্রেসের অস্তিত্ব কাগজের ভিতরের পাতার বাইরে খুঁজে পাওয়া ভার। তবে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি যেমন চারটি কেন্দ্রেই বিপুল ভোট খুইয়েছে, হীনবল বামফ্রন্টের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয়নি। দুটি কেন্দ্রে বাম ভোট কমেছে। একটি কেন্দ্রে ভোট সামান্য বেড়েছে। শান্তিপুরে বিধানসভা নির্বাচনে জোটের প্রাপ্ত ভোটের তুলনায় নজরকাড়া ভোট বাড়িয়েছেন সিপিএম প্রার্থী।

দিনহাটায় বিধানসভা নির্বাচনে ফরোয়ার্ড ব্লক পেয়েছিল ২.৪৯ শতাংশ ভোট। এবার তা সামান্য বেড়েছে — ২.৭৯ শতাংশ। খড়দহে সিপিএম প্রার্থী এক সময় বিজেপির থেকে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ অবধি তিনি পেয়েছেন ১০.৩৯ শতাংশ ভোট। বিধানসভার চেয়ে মোটামুটি তিন শতাংশের কম। গোসাবায় আরএসপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ১.৬৬ শতাংশ। বিধানসভায় ছিল ২.৪৯ শতাংশ।

বাম-কংগ্রেস জোটের নিরিখে শান্তিপুরের নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ নির্বাচনে ওই আসনে বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী জয়ী হন। পরে তিনি তৃণমূল ঘুরে বিজেপিতে যান। ২০২১ সালেও জোটের পক্ষে কংগ্রেস লড়ে শান্তিপুরে। ঋজু ঘোষাল পান ৪.৪৮ শতাংশ ভোট। এবার ওই আসনে জোট হয়নি। আলাদা লড়ে সিপিএম ২০ শতাংশ এবং কংগ্রেস ১.৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

উপনির্বাচনে বামেদের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। কিন্তু শান্তিপুরের ফল বাম কর্মী সমর্থকদের মধ্যে চলতে থাকা পুরনো বিতর্কটিকে নতুন করে উস্কে দিতেই পারে। কংগ্রেসের সঙ্গে কি আদৌ জোট করা জরুরি? যে ২০ শতাংশ মানুষ শান্তিপুরে কাস্তে হাতুড়ি তারায় বোতাম টিপলেন, তাঁদের অধিকাংশ বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থীকে ভোট দেননি। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাম এবং কংগ্রেসের মধ্যে এই রাজ্যে বহু দশকের যে তিক্ততা, কেবল নির্বাচনে জেতার শর্টকাট খুঁজতে গিয়ে তাকে পেরনো অসম্ভব। তেলে জলে যেমন মেশে না, তেমনই কংগ্রেসের ভোট বামে এবং বামের ভোট কংগ্রেসে যায় না। বরং দু পক্ষেরই ভোটক্ষয় হয়। এই বিষয়ে মতাদর্শগত প্রশ্ন না হয় উহ্যই থাকল।

উপনির্বাচনের ফল স্পষ্ট দেখাল, বাংলায় বিজেপি ডুবন্ত জাহাজ। দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে তাদের জনভিত্তি। আপাতভাবে তৃণমূল অপ্রতিরোধ্য শক্তি। কিন্তু বিরোধী পরিসর ফাঁকা থাকবে না। শর্টকাট না খুঁজলে, কষ্টসাধ্য পথে হাঁটলে তার দখল নিতে পারেন বামেরাই। তৃণমূলের পপুলিজমের রাজনীতি আর দুর্নীতি দুষ্টচক্রকে প্রশ্ন করেই সম্ভব বিরোধী হিসাবে বামপন্থীদের উত্থান। বিধান ভবনে বসে জোটের আলোচনা অথবা সোশ্যাল মিডিয়াসর্বস্ব প্রতিবাদে কাজের কাজ হওয়া মুশকিল।

Leave a Reply