‘আপ বাংলাদেশ মে নহি হো, ইউ আর ইন ইন্ডিয়া! ইন্ডিয়া মে হো না? হিন্দি নহি আতা?’

সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিওর কল্যাণে এই সংলাপ সম্পর্কে এখন অনেকেই অবগত হয়ে গিয়েছেন। খোদ কলকাতায় দাঁড়িয়ে একজন বাঙালিকে হিন্দির ব্যবহার নিয়ে রাজস্থানের তরুণী যেভাবে আক্রমণ করলেন, তাতে বাঙালি হিসাবে আমাদের ভাষিক অস্তিত্ব যে সার্বিকভাবে সংকটাপন্ন (ওই আক্রান্ত মহিলার সপাট প্রতিবাদ সত্ত্বেও), তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। কী আশ্চর্য ঔদ্ধত্যের মেজাজে ওই তরুণী একজন কলকাতাবাসীকে বলে দিলেন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইজ আ পার্ট অফ ইন্ডিয়া, ইউ মাস্ট বি লার্নিং হিন্দি! দ্য মেট্রো ইজ নট ইয়োর্স, ওয়েস্ট বেঙ্গল ইজ নট ইয়োর্স।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সাংবিধানিক ভাষা সম্পর্কে তিনি কতখানি অজ্ঞ, তা তো প্রমাণিত। কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠ একজন অচেনা সহযাত্রীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই সহবতও তো তাঁর নেই। পুরো সময় জুড়ে তিনি যে সুরে কথা বলে গেলেন, তাকে চলতি বাংলায় আমরা ‘গা-জ্বালানো’ বলে থাকি। অন্য ভাষাভাষী মানুষের প্রতি অসীম বিদ্বেষ না থাকলে এমনটা সম্ভব নয়। ভাষা সাম্রাজ্যবাদের গ্রাম্ভারি তত্ত্বের দিকে যদি আপাতত না-ও যাই, এত অল্প বয়সেই ভিনরাজ্যের শহরে মেট্রো রেলের মতো সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য জায়গায় ওই মহিলা যেভাবে এ ধরনের ঘৃণা ছড়ালেন এবং তাতে অনুতপ্ত হয়েছেন বলেও খবর নেই – এইটেই সবচেয়ে ভয়ের।

তবে এতে একটা সুবিধা হয়েছে। গাঁ-মফস্বলের পরিযায়ী শ্রমিককে কাজের সূত্রে ভিনরাজ্যের শহরে গিয়ে বাংলা বলার কারণে ‘বাংলাদেশি’ শুনতে হয়েছে, কিম্বা কলকাতায় পড়তে আসা ছেলেমেয়েকে আঞ্চলিক টানের কারণে ‘গাঁইয়া’ টিটকিরি সইতে হয়েছে – এতদিন এসব ঘটনা আমাদের গা-সওয়া ছিল, কিন্তু কলকাতার মানুষকে কলকাতাতেই হিন্দি না বলার জন্য ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে – এ আমাদের শহরকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে সেদিন অবধিও কল্পনাতীত ছিল। সেই দম্ভের বুদবুদটা দুম করে ফেটে গিয়েছে।

এমন নয় যে কলকাতায় এরকম হিন্দি আধিপত্যবাদের কথা আগে শোনা যায়নি। যে ঘটনা নিয়ে আলোচনা, সেরকম ঘটনা ইদানীং যে আকছার ঘটে, ফেসবুকে চোখ রাখলেই দিব্যি জানা যায়। খানিক পিছিয়ে গিয়ে এই শতাব্দীর প্রথম দশকে প্রাইভেট স্কুল বা টিউশনির পরিসরে বড় হওয়া কোনো বাংলা গান বা কবিতাপ্রেমী ছাত্র বা ছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেই জানা যাবে, ‘বলিউড-স্মার্ট’ বন্ধুবান্ধবদের নাক সিঁটকানো কোন পর্যায়ের ছিল। এমনকি, বাংলা মাধ্যমে পড়া ‘হতভাগ্য’ আমরা ইংরিজি কীভাবে আয়ত্ত করতে পারব — তা নিয়ে গুষ্টিসুদ্ধ আত্মীয়স্বজনের অকারণ উদ্বেগও এই নাক সিঁটকানোর পাশাপাশি চলত। আরও কিছু সময় পিছিয়ে গেলে দেখব, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ধন্যি মেয়ে (১৯৭১) ছবি। সেখানে কলকাতার ‘হিন্দি’ বোলচালে হতভম্ব হয়ে যাওয়া তোতলা পুরুত ভটচায মশাই (রবি ঘোষ) বলে ফেলছেন – এখানে তো কেউ বাংলায় কথা বলেই না। অর্থাৎ হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ বা হিন্দি আগ্রাসন, যে নামেই ডাকা হোক, জিনিসটা হালের আমদানি নয়।

কয়েক শতাব্দী ধরে চলা ইউরোপিয় সাম্রাজ্যবাদী অনুশীলনের অন্যতম স্তম্ভই ছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ। কত যে পরাধীন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ধারাবাহিক ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হয়েছে, নষ্ট হয়ে গিয়েছে কত ভাষা! রাজ্যপাট জারি রাখার জন্য সে শূন্যস্থানের সুযোগে দিব্যি নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দিতে পেরেছে বিপুল ক্ষমতাধর, বহিরাগত শক্তি। ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হওয়ার পরেও যে আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলির সরকারি ভাষার তালিকায় ইংরাজি, স্প্যানিশ পর্তুগিজ বা ফরাসির নামই চোখে পড়ে, তার অবশ্যম্ভাবী শিকড় ওই অন্ধকার অতীতেই। রবার্ট ফিলিপসনের মত ভাষাবিদরা একেই ‘লিঙ্গুইস্টিক ইম্পিরিয়ালিজম’ বলেছেন। ব্যতিক্রম মধ্য আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন। সেখানকার দুই সরকারি ভাষা, ইংরাজি ও ফরাসির পাশাপাশি একাধিক দেশিয় ভাষাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে গত ৩০ বছর ধরে। সেসব ভাষায় প্রশাসনিক কাজ হচ্ছে, স্কুলে স্কুলে পড়াশোনা হচ্ছে, সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। তিন কোটি মানুষের ছোট্ট দেশটির ভাষার সংখ্যা নেহাত কম নয় – ২৭৩। অসামান্য বৈচিত্র্যের জন্য ক্যামেরুনকে বলা হয় ‘মিনি আফ্রিকা’।

ভারতীয় উপমহাদেশের পরিস্থিতি আফ্রিকার মত হয়নি। এখানে অন্তত নাগরিক পরিসরে ভাষা বা ভাষাগোষ্ঠীর অমন বিস্তৃত ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেনি বটে, উলটে কাজের সুবিধার্থে বাংলা বা হিন্দির মতো দেশিয় ভাষা শেখার উৎসাহ দেখা যেত নবাগত ব্রিটিশদের মধ্যে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ‘ওয়ার্কিং ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসাবে যে ইংরিজিই প্রাধান্য পেল, সাহিত্যভারে কুলীন বাংলা, মারাঠি বা তামিলের ভাগ্যে সে শিকে ছিঁড়ল না – তা নিয়ে আম ভারতবাসী যে খুব অখুশি ছিল, তাও নয়। পাশ্চাত্যের ভাষা শিক্ষিত ভারতীয়কে শেক্সপিয়র চিনিয়েছিল, মিলটন পড়িয়েছিল। বিশ্ব রাজনীতির দুনিয়া উন্মুক্ত হয়েছিল মুক্তিকামী যুবসমাজের কাছে। এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম উচ্চবর্ণের সীমাহীন অত্যাচারে অতিষ্ঠ নিম্নবর্ণের মানুষকে ভরসাও দিয়েছিল ইংরিজি শিক্ষাই। একথা তো কোনোভাবেই আজ অনস্বীকার্য নয়, যে ইংরিজি ছিল বলেই ভীমরাও আম্বেদকরের মত দলিত সমাজের উজ্জ্বল উদ্ধারকে রাজনীতির জগতে পেয়েছিল আধুনিক ভারত। উত্তরপ্রদেশের বাঙ্কা গ্রামে ইংরিজি দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার মত অভিনব ঘটনা তো আর অকারণে ঘটেনি।

বাঙালি সেইসময় নিজেকে ব্রিটিশের সমকক্ষ ভাবতে শুরু করেছিল জাতি হিসাবে চোস্ত ইংরিজি বলায় তারাই প্রথম সারিতে থাকতে পেরেছিল বলে। কংগ্রেসের প্রথম কয়েক দশকের ইতিহাসে ইংরিজি বাদ দিয়ে অন্য কোনো ভাষায় বক্তৃতা করার কথা ভাবতেই পারেননি উমেশচন্দ্র ব্যানার্জি বা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির মত নেতারা। দেশের মানুষের কাছে পৌঁছতে হলে দেশের মানুষের ভাষায় কথা বলতে হবে – এই দাবি তুলে এ নিয়মের প্রতিবাদ এসেছিল যাঁর তরফে, তিনি কোনো রাজনৈতিক হোমরা-চোমরা ছিলেন না, তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নাটোরে প্রাদেশিক কমিটির সভায় বাংলায় বক্তৃতা দেওয়া নিয়ে প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে তরুণ কর্মীদের কীরকম সংঘাত বেধেছিল, ঘরোয়া বইতে সে কাহিনি রানী চন্দকে বলে গিয়েছেন অবন ঠাকুর।

ভাষার প্রাধান্যের এই চিত্রটা খুব স্বাভাবিকভাবেই বদলাতে শুরু করেছিল ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্যায়ে এসে। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে সর্বভারতীয় ঐক্যের সেতু হিসাবে হিন্দি ভাষাকে ব্যবহার করার একটা উদ্যোগ কংগ্রেসি নেতাদের তরফ থেকেই ছিল। বিশেষত দক্ষিণ ভারতের হিন্দি-অপ্রতুল অঞ্চলে হিন্দির প্রচারকে পাখির চোখ করেছিল কংগ্রেস। স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী ১৯১৮ সালে তৈরি করেছিলেন দক্ষিণ ভারত হিন্দি প্রচার সভা। তারপর ১৯২৫ সালেই ডব্লিউ সি বোনার্জি-সুরেন বাঁড়ুজ্জের হাতে গড়া ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সরকারি ভাষা ইংরিজি থেকে হিন্দি হয়ে গেল। ১৯৪২ সালে যখন হিন্দু-মুসলমান অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে, প্রবল হয়ে উঠছে পৃথক পাকিস্তানের দাবি, ধর্মনিরপেক্ষতায় বাঁধতে হিন্দি-উর্দু দুই উত্তর ভারতীয় ভাষাকে পাশাপাশি রেখে গান্ধীজী তৈরি করলেন হিন্দুস্তানী প্রচার সভা।

 

স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী ১৯১৮ সালে তৈরি করেছিলেন দক্ষিণ ভারত হিন্দি প্রচার সভা। তারপর ১৯২৫ সালেই ডব্লিউ সি বোনার্জি-সুরেন বাঁড়ুজ্জের হাতে গড়া ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সরকারি ভাষা ইংরিজি থেকে হিন্দি হয়ে গেল।

 

তারও চারবছর পর, নখদন্তহীন ব্রিটিশ সিংহের মানে মানে ঘরে ফেরা আর ভারত ভাগ যখন একপ্রকার নিশ্চিত, সংবিধান পরিষদের উল্লেখযোগ্য সদস্য পণ্ডিত রঘুনাথ বিনায়ক ধুলেকর ১০ ডিসেম্বর সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন ‘যাঁরা হিন্দুস্তানী জানেন না, তাঁদের ভারতে থাকার কোনও অধিকার নেই। যাঁরা এখানে সংবিধান তৈরি করতে এসেছেন অথচ হিন্দুস্তানী জানেন না, তাঁরাও এই পরিষদে থাকার যোগ্য নন।’

আজ প্রায় ৮০ বছর পরে হিন্দি না জানা নাগরিককে যখন হরবখত পরদেশি বলে কোণঠাসা করা চলছে, আর তাতে মদত দিয়ে চলেছে রাষ্ট্র, তখন এই প্রতিধ্বনির ইতিহাস ফিরে দেখার প্রয়োজন পড়ে বৈকি।

ইতিহাসচক্রের অদ্ভুত পরিহাসে, একসময় যে ইংরিজি ছিল পাশ্চাত্য উপনিবেশবাদের ভরসার খুঁটি, পরবর্তীকালে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে অহিন্দিভাষীদের কার্যকরী অস্ত্র হয়ে উঠল সেই বিদেশি ভাষাই। হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিবাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার উত্তরাধিকার বলতে গেলে একটি রাজ্যেরই – মাদ্রাজ বা তামিলনাড়ু। ১৯৩৮ সালে রাজাগোপালাচারীর প্রাদেশিক সরকারের সময়েই হোক, বা স্বাধীনতার পরপরই ১৯৪৮ সালে কংগ্রেসি প্রিমিয়ার ওমানদুর রামস্বামী রেড্ডিয়ারের আমলে, হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সরকারি নির্দেশনামার বিরুদ্ধে সর্বদাই বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তামিল ভাষাভাষী মানুষ, পুলিশি দমনপীড়নে প্রাণও দিয়েছেন। ভাষাসত্তা রক্ষার সেইসব আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন এরোডে ভেঙ্কটাপ্পা রামস্বামী (পেরিয়ার নামেই যিনি বেশি পরিচিত), আরোগ্যস্বামী পনীরসেলভম, কোঞ্জিভরম নটরাজন আন্নাদুরাই, মুভালুর রামামিরথম, স্বামীনাথন ধরমমবালের মত ব্যক্তিত্ব। এমনকি কংগ্রেসের এইসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দলের অভ্যন্তরেই প্রতিবাদ উঠেছে সুন্দরশাস্ত্রী সত্যমূর্তি বা সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের তরফে।

সংবিধান পরিষদে রঘুনাথ ধুলেকর তো বটেই, বালকৃষ্ণ শর্মা, পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন, বাবুনাথ গুপ্তা, রবিশঙ্কর শুক্লা, শেঠ গোবিন্দ দাস, সম্পূর্ণানন্দ, কানহাইয়ালাল মানেকলাল মুন্সির মতো হিন্দিবাদীদের আগ্রাসী উপস্থিতি সত্ত্বেও হিন্দি যে জাতীয় ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি তার পিছনেও মাদ্রাজের সদস্যদের অনড় অবস্থানের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তিরুভেলোর থাট্টাই কৃষ্ণমাচারি, জি দুর্গাবাঈ, তিরুপ্পুর আঙ্গাপ্পা রামলিঙ্গম চেত্তিয়ার, আচার্য এন জি রাঙ্গা, এন গোপালস্বামী আয়েঙ্গার ও মাইসোরের এস ভি কৃষ্ণমূর্তি রাও ছিলেন এই বিরোধী জোটের প্রধান মুখ। হিন্দির পরিবর্তে ইংরিজিকেই কর্মক্ষেত্রের ভাষা হিসাবে ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন তাঁরা। প্রায় তিনবছর তর্কাতর্কি চলার পর অবশেষে যে সমঝোতার সিদ্ধান্ত হয়, যা মুন্সি-আয়েঙ্গার সমঝোতা নামে পরিচিত, সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সংবিধানের ১৭ নম্বর ভাগে ইংরিজির সঙ্গে দেবনাগরী লিপির হিন্দিকে কেবল ‘আরেকটি সরকারি ভাষা’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, একক জাতীয় ভাষা হিসাবে নয়।

পরে ১৯৫৫ সালে, ১৭ নম্বর ভাগের ৩৪৪ অনুচ্ছেদের নির্দেশমাফিক, বালাসাহেব গঙ্গাধর খেরের কমিশন যখন ইংরিজি সরিয়ে হিন্দিকে একক সরকারি ভাষা করার পরামর্শ দিচ্ছে, তখনো যে দুজন কমিশন সদস্য বিরোধিতা করেন তাঁদের একজন যদি হন পশ্চিমবঙ্গের ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, আরেকজন তামিলনাড়ুর পরমশিবন সুব্বারায়ান। ১৯৫৭ সালের ১৩ অক্টোবর হিন্দি-বিরোধী দিবস পালন করে আন্নাদুরাই প্রতিষ্ঠিত দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাঝঘম। ১৯৬৩ সালের অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যাক্টের বিরুদ্ধে আবার নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয় দক্ষিণ ভারতে। ১৯৬৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় আসার পর সে আইন সংশোধনও করা হয়। এরপর থেকে, ১৯৬৮ সালে হিন্দির বিশেষ মর্যাদা তুলে নেওয়ার নেপথ্যের আন্দোলনই হোক বা ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধী সরকারের জহর নবোদয় বিদ্যালয় প্রোগ্রামে হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে আন্দোলন, অথবা হালের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান সূত্রে গাঁথা ফ্যাসিবাদী নিয়মনীতির বিরুদ্ধে পথে নামা – কার্যকরী প্রতিরোধ এসেছে প্রায় একা কুম্ভের মত লড়ে যাওয়া তামিল ভূমি থেকেই।

প্রসঙ্গত, হিন্দিকে জাতীয় ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সোচ্চার সওয়াল যাঁরা করেছেন, সেই তালিকায় একজন উল্লেখযোগ্য বাঙালি রাজনীতিবিদও ছিলেন। প্রত্যাশিতভাবেই তাঁর নাম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

বাংলায় হিন্দি প্রভাবের পরিস্থিতি অবশ্য অনেকটা আলাদা। এখানে প্রতিবাদের ইতিহাসও তামিলনাড়ুর তুলনায় নবীন। আটের দশকে আনন্দমার্গী প্রভাতরঞ্জন সরকারের মতাদর্শ অনুসারী আমরা বাঙালি দলের কিছু কাজ নজর কেড়েছিল। এই দল বেশকিছু পঞ্চায়েতে আসনও জিতেছিল। আমরা বাঙালির পরে এ ধরনের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ধারায় দ্বিতীয় নাম বলতে এই শতাব্দীর বাংলা পক্ষ।

 

হিন্দিকে জাতীয় ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সোচ্চার সওয়াল যাঁরা করেছেন, সেই তালিকায় একজন উল্লেখযোগ্য বাঙালি রাজনীতিবিদও ছিলেন। প্রত্যাশিতভাবেই তাঁর নাম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

 

তামিলনাড়ুতে শুধু চেন্নাই কেন, মহাবলীপুরম বা কাঞ্চীপুরমের মতো ছোট শহরেও ছোট ব্যবসায়ী বা গাড়িচালকরা তামিল বাদ দিয়ে কেবল ইংরিজিই বলে থাকেন। হিন্দি জানলেও না বলার জেদ তাঁদের অধিকাংশের মজ্জাগত। গ্রামীণ তামিলনাড়ুতে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতিজাত মানুষের পক্ষে কথাবার্তা চালানো আরও দুষ্কর হয়ে ওঠে (অবশ্যই মৌখিক ভাষার কারণে। ইশারা দিয়েও যে মানুষের মন জয় করা সম্ভব, সেকথা বছর কয়েক আগে পাঝাভারাকাড়ু বা পুলিকটের এক নৌকাচালক আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন)। অন্য দিকে এরাজ্যে, কলকাতা তো বটেই, দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় নানা ধরনের কাজে লিপ্ত রয়েছেন বিপুল সংখ্যক হিন্দি ভাষাভাষী মানুষ। তাঁদের এখানে চলে আসার ইতিহাসও বিচিত্র। একসময় যখন রেকর্ড হারে শিল্প কারখানা তৈরি হয়েছিল এখানে, তখন বিহার ও উত্তরপ্রদেশের খেটে খাওয়া মানুষ এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। দক্ষিণবঙ্গীয় চশমাটা সরিয়ে উত্তরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আমাদের শিলিগুড়িতে বিপুলসংখ্যক অবাঙালি ব্যবসায়ীর ভিড়। রামনবমীর সময়ে সেখানে যা জাঁকজমক হয়, দুর্বল হৃদযন্ত্রের কেউ উপস্থিত থাকলে তাঁর জীবনের গ্যারান্টি দেওয়া মুশকিল।

সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে – এ সমস্যা যখন ঐতিহাসিক, এ রাজ্যে হিন্দিভাষীদের বাসও যখন শতাব্দীপ্রাচীন এবং মেট্রোর ঘটনাও বিচ্ছিন্ন দৃষ্টান্ত নয়, তাহলে ভাষা সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে পুরনো আপত্তি আউড়ে কী হবে? কারণ এক নয়, একাধিক।

প্রথমত, হিন্দি বলয়ের যাঁরা এরাজ্যের বাসিন্দা হয়ে গিয়েছেন, যাঁদের দেওয়া ভোট বিজেপি-তৃণমূল দ্বৈরথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় – শহরাঞ্চলের অভিজাত ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দা থেকে শুরু করে ছোটবড় ব্যবসায়ী কি কারখানার শ্রমিক বা দিনমজুর – শ্রেণি নির্বিশেষে প্রত্যেকেই এ বিষয়ে অবগত যে রাজ্যটার নামে বঙ্গ থাকলেও এখানকার ভূমিসন্তানদের সঙ্গে হিন্দিতে বাক্যালাপ চালানোই যায়। তার জন্য কোনোরকম তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ভয় নেই। হিন্দি বলয়ে গিয়ে বাঙালি শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ শুনতে হচ্ছে বলে এখানেও হিন্দিভাষী শ্রমিককে আচ্ছা করে ‘সবক শেখানো’ হোক, এমন কোনো প্রতিশোধ স্পৃহা প্রচারের আমিও ঘোর বিরোধী। ঠিক যেমন হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে তুলসীদাস থেকে মুন্সি প্রেমচাঁদ কি মহম্মদ রফি থেকে আল্লারাখা রহমানকে বয়কট করতে হবে – এমন অর্থহীন ধুয়ো উঠলে তারও বিরোধিতা করা কর্তব্য বলেই মনে করি। এমনকি ‘বিহারি’ বা ‘খোট্টা’ সম্বোধনের মধ্যে যে ঘৃণ্য প্রাদেশিকতা ধরা পড়ে, সে আচরণেরও নিন্দা করি। আমার বলার কথা এই যে, যিনি হিন্দিভাষী, তিনি ভাষা-রাজনীতি না জানলেও, সংবিধান না পড়লেও, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় এটুকু বুঝে নিয়েছেন যে ভূভারতে ভাষার দিক দিয়ে তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সে ভাষার সাংবিধানিক ক্ষমতাও অন্যান্য ভাষার চেয়ে বেশি। ফলে দক্ষিণ ভারতের কিছু জায়গা আর উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অংশ বাদ দিলে মোটামুটি গোটা ভারতেই তাঁর হিন্দি বলাকে কেউ প্রশ্ন করার সাহস করবে না। খাতায় কলমে অষ্টম তফসিলে ২২ খানা ভাষাকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তা যে আদৌ হয়নি, অন্য ভাষা সম্পর্কে হিন্দিভাষীদের উদাসীনতাই তার প্রমাণ।

দ্বিতীয় কারণ প্রশাসনিক। বিশেষত, সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি তরফে যে ধরনের হিন্দিভাষী তোষণ শুরু হয়েছে, সেটা ছটপুজোয় দুদিন সরকারি ছুটি দেওয়াই হোক বা হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন, তাতে কলকাতা মেট্রোর মত আক্রমণাত্মক ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলেও আর অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যেসব রাজ্যে এখনো বহু বাঙালি কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করছেন, সেই বিহার, ঝাড়খণ্ড বা আন্দামানে দুর্গাপুজোয় পাঁচদিন ছুটি অকল্পনীয়। আসাম বা ত্রিপুরায় তিনদিন ছুটি যে এখনো দেওয়া হয় তার কারণ এই দুই রাজ্যের ভূমিসন্তানদেরও একটা বড় অংশ বাঙালি।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসের বড় বড় পদে হিন্দিভাষী কর্মীর সংখ্যা দিনকে দিন কীভাবে বাড়ছে, তার সঠিক তথ্যভাণ্ডার এখনো তৈরি হয়নি বটে, কিন্তু চোখকান খোলা রাখলেই টের পাওয়া যায়। নিশ্চিতভাবে এর পিছনে সংঘ পরিবারের বৃহৎ পরিকল্পনা কাজ করছে। সংঘ পরিবার যে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারে – গত ১০০ বছরের ইতিহাসে এই গুণের প্রমাণ তারা বারবার দিয়েছে। কিন্তু ঘোষিত বিজেপিবিরোধী তৃণমূল সরকারের এই হিন্দি তোষণ যে সংঘ পরিবারের অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণকে আরও সহজ করে দিচ্ছে এবং দুই দলেরই ঘোষিত বিরোধী বাম বৃত্ত থেকে এর বিরুদ্ধে কোনো জোরালো রাজনৈতিক প্রতিবাদ উঠে আসছে না (সচেতনভাবেই বাংলা পক্ষের প্রতিবাদ এখানে বিবেচনায় রাখছি না), তাতেই বোঝা যায় তামিলনাড়ু কেন পারে আর আমরা কেন পারি না।

 

আমরা, কলকাত্তাইয়া বাবুসমাজ, ‘খাব না’-র জায়গায় ‘খাবুনি’ শুনেই আঁতকে উঠেছি, আর সেই ছিদ্র দিয়ে মারকুটে ভঙ্গিতে দিব্যি ঢুকে পড়েছে ‘নহি খাউঙ্গা’।

 

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ সাংস্কৃতিক। দীর্ঘ সময় ধরে কেবল কলকাত্তাইয়া বাংলাকেই ‘মান্য বাংলা’ হিসাবে তুলে ধরার অসুস্থ অনুশীলন বাংলা ভাষার আঞ্চলিক শক্তিকে নষ্ট করেছে, যা আসলে গোটা ভাষা পরিকাঠামোকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। খুব নির্মম ভাষায় বলতে গেলে, চ্যাটার্জি-ব্যানার্জির বাংলার পাশে সোরেন-মাহাতোর বাংলা জায়গা পায়নি। পুরুল্যা-বাঁকুড়া তো তাও খানিক দূরের জেলা, গ্রামীণ হাওড়ার বাংলার সঙ্গেই শহুরে হাওড়ার বাংলার আলংকারিক পার্থক্য কানে বাজে। ভাষার বিবর্তনগত বা ব্যুৎপত্তিগত অনেক বৈশিষ্ট্যই আসলে ধরা থাকে উপভাষার আধারে। মাথামুণ্ডুহীন মেগা সিরিয়ালে অনেক সময়ে উপভাষার নামে যেটা চালানো হয়, সেই আধসেদ্ধ খিচুড়ি ভাষা একটা বাণিজ্যিক ধ্যাষ্টামো ছাড়া কিছু নয়। আমরা, কলকাত্তাইয়া বাবুসমাজ, ‘খাব না’-র জায়গায় ‘খাবুনি’ শুনেই আঁতকে উঠেছি, আর সেই ছিদ্র দিয়ে মারকুটে ভঙ্গিতে দিব্যি ঢুকে পড়েছে ‘নহি খাউঙ্গা’।

এসবের সঙ্গে ফুটনোট হিসাবে আসতেই পারে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ব্যবসায়িক ভাষা হিসাবে বাংলার গুরুত্ব না থাকা – এমন বেশকিছু তর্ক বিতর্ক।

শেষ করি বছর তিনেক আগের এক অভিজ্ঞতা দিয়ে। কালীপুজোর, থুড়ি দিওয়ালির, আগে দিল্লি গিয়েছি। গান্ধীকে নিয়ে এক তথ্যচিত্রের কাজের সূত্রে দেখা করতে গেলাম এক অধ্যাপকের সঙ্গে। বিশেষ কারণে তাঁর নামটা উহ্য রাখছি। বিজেপি-আরএসএস বিরোধিতায় তিনি বেশ পরিচিত মুখ, নিয়মিত পত্রপত্রিকায় লিখে থাকেন। ২০২০ সালে দিল্লি গণহত্যায় তাঁকেও ফাঁসিয়েছিল দিল্লি পুলিস। আমাদের সঙ্গে যখন দেখা হল, তখনো তিনি আত্মগোপন করে আছেন। বাঙালি শুনে মুখে ভরাট হাসি, সঙ্গে আমাদের চমকে দিয়ে নিজস্ব বাংলায় সাদর অভ্যর্থনা ‘আসুন। আপনারা কলকাতা থেকে আসছেন?’ তারপর, আমাদের জিজ্ঞাসু মুখ দেখে বললেন ‘বাংলা অল্প অল্প জানি।’ কীভাবে জানা হল? লাজুক উত্তর এল, ছোটবেলা কেটেছিল দেওঘরে। দেওঘরে প্রচুর বাঙালি প্রতিবেশী ছিলেন, ফলে বাংলা শিখে নিতে অসুবিধা হয়নি।

আরো পড়ুন বাংলা শব্দগুলো যথাসময়ে আমার মনের বাগানে ফুটে উঠেছে

এরপর যতক্ষণ ছিলাম, গান্ধীকে নিয়েই বেশি কথা হল, কিছুটা কলকাতা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। কলকাতায় হিন্দি সংস্কৃতি কতখানি সমৃদ্ধ ছিল সে প্রসঙ্গও এল। আমাদের বাক্যালাপের বেশিরভাগটাই হল ইংরিজি ও বাংলায়। অনেকদিন পরে বাংলা বলতে পেরে চোখেমুখে তাঁর শিশুর মত আনন্দ। আশ্চর্যের কথা, দিল্লি শহরে বসে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক, সেই হিন্দি ভাষায় কথা আদৌ হয়েছিল বলে মনে পড়ে না।

আরও আশ্চর্যের কথা, ভদ্রলোক স্বয়ং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি সাহিত্যের অধ্যাপক।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.