প্রথম বিশ্বের শ্বেতাঙ্গ, প্রতিষ্ঠিত পরিবারের বংশানুক্রমিকভাবে সৈনিক এক পুরুষের অভিজ্ঞতা কি এক তৃতীয় বিশ্বের মানুষ কখনো অনুধাবন করতে পারে? না পারাই হয়ত স্বাভাবিক। স্থান কাল পাত্র পরিবেশ পরিস্থিতি সব কিছু মিলিয়ে দেখার চোখ বদলে বদলে যায়। তবু কখনো যদি হাজার আস্তরণের আড়ালে থাকা সত্যকে খুঁজে বার করতে চেষ্টা করে অনুসন্ধানী চোখ, তখন যেন হৃদয়ে হৃদয়ে যোগ হয়। এক নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম হয়।

ঠিক সেরকমটাই হল হ্যারি পার্কারের হাইব্রিড হিউম্যানস পড়ে। ছোট্ট শিশুর জীবনে প্রথম নিক্কো পার্কের রিভার কেভ রাইডের অভিজ্ঞতা যেমন আলোড়ন তোলে। শুরুর নিস্তরঙ্গ জলে বিন্দুমাত্র আভাস নেই যে সামনে কী কী নতুন অভিজ্ঞতা লুকিয়ে আছে। হ্যারিও তেমন ধাপে ধাপে গড়ে তুলেছেন তাঁর নিজস্ব ভুবন। প্রথম দিক পড়ে শেষের আঁচ পাওয়া যায় না। বারোটা পর্বের প্রত্যেকটাই এক নতুন দিক উন্মোচন করে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই বই শুরু হয়েছে আফগানিস্তানে। সেখানে এক বিস্ফোরণের পরে হ্যারির দুটো পা-ই কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেনাদের লব্জে হ্যারির নতুন পরিচয় ‘ডাবল-আন্ডার’। তবে এই বই প্রতিকূলতা ঠেলে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকার, আরেকটা মানুষের মত মানুষ হয়ে ওঠার কাহিনি নয়। সত্যি কথা বলতে, বিশ্বসাহিত্যের দৌলতে যেটুকু জানা, তাতে আজকের ইংল্যান্ডের জনজীবনে পুনর্বাসিত প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা অগণন। তাঁরা সবাই মানুষের মত মানুষ হয়ে ওঠার পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন অবিরত। প্রকাশ্যে বা একান্তে। সে গল্প নতুন কিছু নয়। হ্যারির জিজ্ঞাসা অন্য। তিনি আজকের প্রেক্ষিতে ওই মানুষ শব্দের অর্থ খুঁজতে বেরিয়েছেন।

নিজের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কথা হ্যারি বিশদে জানিয়েছেন। জানিয়েছেন নিরাশা থেকে আশায় ক্রমোত্তরণের কাহিনীও। সেই গল্পে মিলে মিশে রয়েছে তাঁর প্রযুক্তিনির্ভরতা – প্রযুক্তির হাত ধরে তিনি অন্তত বাহ্যত একজন সাধারণ মানুষের সমতুল্য। কিন্তু প্রযুক্তি বিহনে তিনি সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল। তিনি নিজেকে বর্ণনা করেছেন ১২% যন্ত্র হিসাবে। সেই যুক্তিতে নিজের জন্য ‘disabled’ তকমা তাঁর না-পসন্দ, সে তকমা তাঁকে যত পার্থিব সুবিধাই দিক না কেন। বরং তিনি নিজের জন্য চয়ন করেছেন ‘হাইব্রিড হিউম্যান’ শব্দবন্ধ। নিজেকে মানুষ হিসাবেই দেখতে চেয়েছেন, কিন্তু সেইসঙ্গে নিজের প্রযুক্তিনির্ভরতাকেও নিজের বদলে যাওয়া সত্তার অংশ হিসাবেই দেখতে চেয়েছেন।

হ্যারি এই বই লিখেছেন তাঁর তথাকথিত ‘পূর্ণমানব’ থেকে প্রতিবন্ধী হয়ে ওঠার দুর্ঘটনার (২০০৯) অনেক পরে। ততদিনে তাঁর প্রথম অনুভবের তীব্রতার উপর পলি পড়েছে। হয়ত বা সে দেশের তুলনায় উন্নত রাষ্ট্রীয় তথা প্রাতিষ্ঠানিক (সেনাবাহিনীর) সহায়তা তাঁর পুনর্বাসনকে সহজতরও করেছে। হয়ত সেই ব্যক্তিগত সুবিধার কারণেই তিনি অনুভবের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পাশাপাশি একটা বৌদ্ধিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দেখতে পারেন। তাঁর দেখার চোখ থেকে কখনোই আলো মোছে না। তিনি অবশ্য বইয়ের দ্বিতীয় পাতাতেই জানান যে প্রতিবন্ধতার কারণে তাঁর জীবনে “While some horizons have contracted, others have expanded”। এই আশাবাদী মনোভাব বইয়ের পাঠাভিজ্ঞতাকে আরও সুস্বাদু করেছে।

প্রযুক্তি এই বইয়ের কেন্দ্রে। প্রযুক্তিকে তিনি তত্ত্বের আলোয় দেখেননি, দেখেছেন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। দুর্ঘটনার পরে লেখকের প্রাণে বেঁচে যাওয়াও সেনাবাহিনীর তৎপরতায় এবং উন্নত প্রযুক্তিরই দাক্ষিণ্যে। তারপর দুটো কৃত্রিম পা এবং একটা কৃত্রিম হাঁটুর সৌজন্যে তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা। নিজের শরীরের অংশ হয়ে ওঠা নকল অঙ্গই তাঁর দৃষ্টি ফেরায় কৃত্রিম অঙ্গের বিবর্তনের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে। একের পর এক মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে এনেছেন। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মাত্রার ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা তাঁদের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা-প্রযুক্তির সাহায্য নিতে বাধ্য করেছে। সেইসব কাহিনি পড়তে পড়তে হতবাক হয়ে যেতে হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দুনিয়ায় রক্তমাংসের মানবদেহ আর প্রযুক্তির যান্ত্রিকতার পরিষ্কার সীমারেখাও অস্পষ্ট হয়ে যায়। আজকের দিনে পেসমেকার, স্টেন্ট, ক্যাথিটার, কৃত্রিম হাঁটু প্রভৃতির সাহায্যে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা রোজ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। নিদেনপক্ষে রুদ্ধগতির জীবনকে আবার আগের বেগে ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসা-প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে আকছার, এমনকি আমাদের দেশেও। সেইসব ব্যবস্থা থেকে স্টিফেন হকিংয়ের বহুপরিচিত হুইল চেয়ারের আজকের উত্তরসূরীরা – সবই প্রযুক্তির কাজ। সেইসব নিয়েই বিশদে আলোচনা করেছেন হ্যারি। সেইসঙ্গে বারবার চেতাবনী দিয়েছেন – জীবনও নিউটনের সূত্র মেনে চলে। আমাদের প্রতিটি ক্রিয়ার যে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে সেটাও জীবনের শিক্ষা। প্রযুক্তির ব্যবহার করে জীবনের মান বাড়ানোর ক্রিয়াকে প্রতিক্রিয়াহীন ভাবার ধৃষ্টতা যেন কেউ না করেন। এমনকি প্রযুক্তির নাগাল পাওয়া, না পাওয়া যে প্রতিবন্ধীদের মধ্যেও স্তরভেদ প্রকট করে তাও তাঁর নজর এড়ায় না। হ্যারির সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রায়-নিরপেক্ষ সুবিধা-অসুবিধার বিশ্লেষণ একটা বাস্তব মানবিক ছবি সামনে তুলে ধরে।

তবে শুধুই প্রযুক্তির কথা নয়, আলোচ্য বইটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে আমাদের মনে সক্ষমতা-অক্ষমতার গভীরে প্রোথিত ধারণাও। বস্তুত নতুন পরিচিতিতে হ্যারির ক্রমাগত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সঙ্গে এই ভাবনার একটা প্রত্যক্ষ সংযোগও আছে। ব্যক্তির জীবনদর্শন এখানে প্রযুক্তির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে। আমাদের সম্মিলিত সামাজিক চিন্তাপদ্ধতির যে রূপ পুনর্জন্মের পরে তাঁর চোখে ধরা পড়েছে, তার প্রেক্ষিতে তাঁকে পাশ্চাত্য সমাজের ইতিহাস খুঁড়ে উত্তর খুঁজে আনতে অনুপ্রাণিত করেছে, সেইসব ঘটনা ও বিশ্লেষণ তিনি খুবই নৈর্ব্যক্তিকভাবে, বিনা তিক্ততায় লিখে গেছেন। ‘মনস্টার’ শীর্ষক পর্বটা যেমন গভীরভাবে নাড়া দেয়। শব্দের গা থেকে মন খারাপের দাগ মুছে ফেলার ক্ষমতা খুব সাধারণ নয় মোটেই। নিজের বিশেষ সুবিধা একটুও গোপন না করে অত্যন্ত সৎভাবে নিজের চিন্তাকে কাটাছেঁড়া করতেও সবাই পারে না। সেসব কাজ এই বই সেরেছে নিতান্তই গণসংস্কৃতির পরিধিতে বসে; অত্যন্ত সহজভাবে, অন্তরঙ্গ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার রসে জারিত কথোপকথনের মাধ্যমে। সেই দুনিয়ায় সবকিছুর উপরে জেগে থাকে জীবনের অনন্ত সম্ভাবনার কথা।

আরো পড়ুন নোলানের ওপেনহাইমার: সৃষ্টির আনন্দ ও অনুশোচনার ছবি

বইটি তুমুল কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে ওঠে মধ্যভাগে এসে, যখন হ্যারি (যিনি বর্তমানে একজন চিত্রকর) নিজ কৌতূহলে একটি assistive and wearable robotics-এর সিম্পোজিয়ামে যোগ দিতে যান। এ কি শুধুই ব্যক্তির নিজের জানার ইচ্ছাকে ধাওয়া করা? কোন ধরনের সামাজিক পরিকাঠামো এই ধরণের অনুসন্ধিৎসাকে লালন করে? জানতে ইচ্ছে করে। যাই হোক, সেই সূত্র ধরে লেখকের পরিচয় হয় আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে। অজস্র জটিল, বহুমূল্য সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি থ্রি ডি প্রিন্টার দিয়ে তৈরি করা সম্ভব এমন একটা স্বল্প মূল্যের মেকানিকাল ব্যাটারিবিহীন কৃত্রিম হাতের কথাও উঠে আসে।

এ দেশের সাধারণ অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই বইকে মেলানো শক্ত। তবু এই বই বিভিন্ন প্রশ্ন উস্কে দিতে পারে। যেমন ধরা যাক এই গল্পটা।

সংক্ষিপ্ত আকারে বললে, একজন মানুষ বিভিন্ন তথ্য নিজের মাথায় পুরে রাখেন আর প্রয়োজন মত ব্যবহার করেন। অন্য দিকে একজন অ্যালঝাইমার্স রোগাক্রান্ত মানুষ একটা নোটবুকে সব তথ্য লিখে রাখতে বাধ্য হন। অর্থাৎ দুটো ক্ষেত্রে তথ্য সংরক্ষণ ও প্রয়োজনে পুনরুদ্ধার করার পদ্ধতি আলাদা। তবু সেই তথ্য ব্যবহার করে তাঁরা দুজনেই হয়ত শেষ অবধি একই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন। তাহলে আদতে কি ওই দুই ভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে কোনো মূলগত তফাৎ হল? হল না। সেক্ষেত্রে ওই নোটবুক চুরি করা আর প্রথমজনের মস্তিষ্কে আঘাত করা – দুটোই কি একই স্তরের অপরাধ? আমাদের আজকের নৈতিকতার বোধ কি অন্যরকমভাবে ভাবতে শেখায় না? আমাদের জীবনে ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তির ব্যবহার যে আরও কত রকমের নতুন নৈতিক বা আইনগত সমস্যা তৈরি করতে পারে সেইসব দিকের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় পাঠক হিসাবে প্রশ্ন জাগে, এই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সাবালকত্ব কি আমরা আদৌ অর্জন করেছি? নাকি আমাদের চোখে এক স্মৃতি-বিচ্ছিন্ন মানুষ মনুষ্যেতর প্রাণী? তাহলে অজস্র ফোন নম্বর স্মার্ট ফোন আর গুগল ব্যাকআপের ভরসায় রেখে নিশ্চিন্তে জীবন কাটানো আমিও কি গোটা মানুষ? মানুষ বলতে কী বুঝি? ব্যক্তিগতভাবে? সমষ্টিগতভাবে?

একদম শেষ পর্বে হ্যারি বলেছেন সাইবর্গদের কথা। সাইবর্গ, অর্থাৎ যারা সাইবারনেটিক্স ও অর্গানিজমের সংমিশ্রণ। মানব শরীরে যন্ত্র প্রতিস্থাপন করে বা প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষের স্বীকৃত সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়ার বাস্তব। আমাদের চেনা ভাষায় বললে এ যেন কন্ট্যাক্ট লেন্স পরে আরও ভাল দেখার বদলে সোজা লেন্স প্রতিস্থাপন করে এমন কিছু বসানো যাতে চোখের পাওয়ার তো ঠিক হলই, সেইসঙ্গে সাধারণ চোখে দেখতে না পাওয়া অতিবেগুনি বা অবলোহিত আলোকতরঙ্গও খালি চোখে দেখার ক্ষমতা জন্মাল।

এমন হলে কেমন হত? সাইবর্গ শব্দটা বিজ্ঞানের দরবার থেকে গণসংস্কৃতির সীমানায় এসে ধাক্কা দিয়েছে। এ দেশে দূর অস্ত হলেও অন্তত বিদেশে। বোঝা যায় যে হ্যারি নিজেই যন্ত্রের সাহায্যে মানুষকে উন্নততর করার প্রশ্নে ততটা দ্বিধামুক্ত নন। ট্রান্সহিউম্যানিস্টদের অমরত্বের কামনার প্রসঙ্গে তিনি নিজের দ্বিধা জানান। “an immortal life is like a story without an ending, no part of the story will hold any meaning without the context of a conclusion.” মনের মধ্যে ঝঙ্কার তোলে “আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়ো এই শেষ কথা বলে/যাব আমি চলে।” মানুষের অমরত্বকে শরীরের গন্ডিতে বেঁধে রাখতে হবে কেন? হয়ত দুই ভিন্ন ভাবনার পথ সসীমে মিলে যাওয়ার কারণ লুকিয়ে আছে আমাদের ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারে। তবু কথাগুলো ভাল লাগে।

স্বীয় দ্বিধার কারণে সাইবর্গ সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোকে তিনি এড়িয়ে যাননি, আলোচনা করেছেন। আর সেই প্রসঙ্গেই এসেছে সেই চিরকালীন নৈতিক দ্বন্দ্বের প্রশ্ন। ধরা যাক একটি নিউরাল লেস মাথায় বসালে আমার সন্তান আরও বুদ্ধিমান হবে, তার পরীক্ষার ফল আরও ভাল হবে, তার জন্য ভবিষ্যতের সুযোগের দরজা বেশি করে খুলে যাবে, এবং আমার বন্ধু তা ইতিমধ্যেই তার সন্তানের জন্য কিনে নিয়েছে। তখনো কি আমি আমার সন্তানের জন্য সেটা কিনব না? জিনিসটার মূল্যমান যদি পথরোধ না করে, তাহলে কি আমার সিদ্ধান্ত ভিন্নতর হবে? আর দশটা প্রযুক্তি ঠিক যেমনভাবে ধনতন্ত্রের হাতে পড়ে বাঁদর নাচ নেচে সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়েছে এই প্রযুক্তি কি তার থেকে আলাদা কিছু হবে? সেক্ষেত্রে সমস্যা কি প্রযুক্তি জিনিসটারই, নাকি আদতে আমাদের ব্যবস্থার? কেউ কেউ এই প্রশ্নের সহজ সমাধান করবেন প্রযুক্তির গতিরোধ করে। কিন্তু ভাবতে বসতে হয়, তাতে কি মানুষের অন্তর্নিহিত অসাম্যের আকাঙ্ক্ষার কোনো বদল হবে? তাহলে কি সেই প্রতিরোধ নিতান্ত বালির বাঁধ নয়? দীর্ঘমেয়াদি কোনো উপায় বেরোবে না?

হ্যারির প্রথম বই অ্যানাটমি অফ এ সোলজার পড়েছি কিছুদিন আগে। ঋজু গদ্য, অনুপম কথকতার ভঙ্গি ভাল লেগেছিল। প্রকরণ নিয়ে তাঁর পরীক্ষা কৌতূহল জাগিয়েছিল। এই বই গদ্যভঙ্গিতে প্রথম বইয়ের উত্তরাধিকার বহন করলেও বক্তব্যের দিক দিয়ে আমার মতে আগের বইটাকেও ছাপিয়ে গেছে। প্রযুক্তিতে আস্থা রেখেও মানবিক সীমায় ভরসা রাখেন বলেই কি? তাঁর জীবনদর্শন আমাকেও ভাবতে শিখিয়েছে বলে? কোনো শেষ কথা না বলে প্রশ্নগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বলে? সেগুলো কারণ তো বটেই। তবে তার চেয়েও বেশি ভাল লাগে তাঁর ভবিষ্যৎমুখী আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, সেইসঙ্গে প্রযুক্তির অযুত শুভ সম্ভাবনার কথা বলা। বিজ্ঞানকে গণপরিসরে এনে ফেলাই প্রযুক্তির একমাত্র কাজ। অথচ এ দেশের কোনো কোনো স্তরের আলোচনা থেকে মনে হয় প্রযুক্তি ব্যাপারটার মানববিরোধী রূপটাই একমাত্র আলোচ্য। হয়ত জানার অভাব থেকেই এই ভয়ের জন্ম। হ্যারি পার্কারের বইয়ের মত বই অনেক বেশি মানুষ পড়লে হয়ত আমাদের প্রযুক্তি দেখার চোখটা একটু বদলাবে। আর কে জানে, তাহলে হয়ত আধুনিক প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ আয়ত্তে এনে তাকে শুভ বোধে বেঁধে দেশজ গণহিতৈষণার পরিসরে এনে ফেলার পথও প্রশস্ততর হবে। তেমন দিনের কথা ভাবতে লোভ হয় বৈকি।

হাইব্রিড হিউম্যানস: ডিসপ্যাচেস ফ্রম দ্য ফ্রন্টিয়ার্স অফ ম্যান এন্ড মেশিন
লেখক: হ্যারি পার্কার
প্রকাশক: ওয়েলকাম কালেকশন
মূল্য: ১৪৩.০৬ টাকা (পেপারব্যাক), ১২৮১ টাকা (হার্ড কভার)

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.