মনে আছে কেমন আগে বহুবার শোনা কেকের ‘আলবিদা’ গানটা ওঁর মৃত্যুর পর একটা নতুন অর্থ পেয়েছিল? চেস্টার বেনিংটনের চলে যাওয়ার পর ‘ইন দি এন্ড’? রবিন উইলিয়ামসের আত্মহত্যার পর ‘ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট ড্যাড’-এর নিঃসঙ্গতা নিয়ে ওঁর সংলাপটা? আবার ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে মেফিস্টো নাটকের কথাও বলা যায় উদাহরণ হিসাবে। অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য বলেছিলেন ভোটের আগে এবং পরে মঞ্চের ফ্যাসিবাদের প্রতি কীভাবে দর্শকের প্রতিক্রিয়া পালটে গিয়েছিল। শিল্প মাঝে মাঝে সময়ের গুণেই অনন্য হয়ে ওঠে, কারণ সেই বিশেষ সময় দর্শকের প্রতিক্রিয়াকে কয়েকগুণ জোরালো করে দেয়। আদিউ গোদার ছবিটাও সেই দলে পড়ে। অমর্ত্য ভট্টাচার্যের এই ছবি নিজগুণেই যথেষ্ট প্রশংসার যোগ্য হলেও, জঁ লুক গোদারের চলে যাওয়ার সপ্তাহে মুক্তি পাওয়ায় গোদারপ্রেমীদের কাছে অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়।

ছবির প্রধান চরিত্র ওড়িশার গণ্ডগ্রামের পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত মধ্যবয়সী আনন্দ (চৌধুরী বিকাশ দাস)। সে এবং তার সমগোত্রীয় বন্ধুবান্ধব তার বাড়িতেই পর্ন-মোচ্ছবে বিপুল উৎসাহে অংশ নেয়। বাড়িতে থাকা আনন্দের অসুস্থ স্ত্রী ও মেয়ে প্রচণ্ড অস্বস্তির মধ্যে পড়লেও এসব মেনে নিতে বাধ্য হয়। একদিন ডিভিডির দোকান থেকে পর্নোগ্রাফির বদলে আনন্দের হাতে আসে গোদারের ব্রেথলেস ছবির একটা পাইরেটেড কপি। সেটা চালিয়ে পর্নোগ্রাফিক যৌনতার অভাবে বাকিরা হতাশ হলেও আনন্দ প্রচণ্ড আকর্ষিত হয় সেই ইংরেজি সাবটাইটেলওয়ালা ফরাসি সিনেমার প্রতি। তার মনের এতটাই পরিবর্তন হয়, যে সে ঠিক করে তার ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরেই একটা ফরাসি ফিল্মোৎসব করবে। এখান থেকেই শুরু হয় মূল গল্প।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বলিউড ভক্তদের কাছে ওম শান্তি ওম ছবির ‘দিওয়ানগি দিওয়ানগি’ গানটা যা অথবা মার্ভেল ভক্তদের কাছে এন্ডগেম, গোদার ভক্তদের জন্য আদিউ গোদার ঠিক তাই। প্রায় প্রত্যেকটা দৃশ্য, কাট, ক্যামেরা অ্যাঙ্গল, সাদা-কালোর ব্যবহার (এবং অব্যবহার), আবহসঙ্গীত এবং বিশেষ কয়েকটা চরিত্রের পরিণতি গোদারের একের পর এক ছবির কথা মনে করাবে। হঠাৎ একেকটা শট দেখে মনে হবে, আরে! এটা তো ব্রেথলেসকে ট্রিবিউট; ওটা তো কনটেম্পট-এর রেফারেন্স। গল্পের ডার্ক কমেডির পাশাপাশি এই মুহূর্তগুলোও যে কোনো গোদারপ্রেমীর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যথেষ্ট। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ছবির তিনটে গল্প – অর্থাৎ আনন্দের গোদার-লাভ, আনন্দের মেয়ে শিল্পার (সুধাশ্রী মধুস্মিতা) গ্রামের প্রেম এবং পরবর্তীতে শিল্পা এবং পাবলোর (অভিষেক গিরি) প্রেম, যা হঠাৎ ন্যারেটিভকে ভেঙে নিজেকে ন্যারেটার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে – একেবারে ধ্রুপদী গোদারিয় স্টাইল। সমুদ্রের তীরে পাবলো ও শিল্পার কথোপকথন কনটেম্পট মনে করাতে বাধ্য।

ব্যক্তিগতভাবে আমার আনন্দের চরিত্রকে একদিক থেকে সেই বিখ্যাত “I want to become immortal and then die” উক্তির প্রকাশ মনে হয়েছে। এছাড়া গ্রামবাসীদের ব্রেথলেস দেখার সময়ে সিনেমা ছেড়ে ক্যামেরার আশেপাশের প্রকৃতি দেখানো, পুরোপুরি সাদা-কালো দৃশ্যের মধ্যে হঠাৎ রঙের ব্যবহার বারবার দেখিয়ে দেবে পরিচালক কেন একে “a humble tribute to Godard” বলেছেন। আর মুহুর্মুহু রেফারেন্স, শ্রদ্ধাঞ্জলি আর ইস্টার এগ বর্ষণের মধ্যে অবচেতনে মনে পড়বে, গোদার আর নেই। সিনেমা নিয়ে এই খেলা আর দেখতে পাব না। তাই আইসক্রিমের শেষ চামচের মতো এর স্বাদও যে বেড়ে যাবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এ ছবি স্টাইলসর্বস্ব নয়, যথেষ্ট সারবত্তা আছে। “ভেবে কী হবে?” প্রশ্নের উত্তরে “ভেবে ভাবনার সুখ মিলবে” মনে থেকে যায়। “সিনেমায় কি সব সময়ে হিরো, ভিলেন থাকতেই হবে? সব সিনেমাকেই কি রোম্যান্স অথবা থ্রিলার এরকম বাক্সের মধ্যে বন্দি থাকতে হবে?” – এসব প্রশ্ন আনন্দের মুখ দিয়ে করানো হলেও বেশ বোঝা যায় আসলে ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের এই মৌলিক প্রশ্নগুলো পরিচালক রাখছেন মূলধারার ভারতীয় সিনেমার সামনে। আবার পাবলোর চরিত্রের মাধ্যমে দুনিয়াজোড়া আঁতেল সিনেমাবোদ্ধাদের অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত দর্শকের প্রতি হেলাফেলার কথা সামনে এনেছেন পরিচালক। শিল্প যে কথ্য ভাষা, এমনকি সিনেমার চেনা নান্দনিক ভাষার ব্যারিকেডও অনায়াসে টপকে গিয়ে মানবিকতার একটা বুনিয়াদি স্তরে সব ধরণের মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে, এই বিশ্বাসটাই এই ছবির প্রাণ।

গোদারের প্রত্যেকটা প্রথাভাঙা পাগলামির একটা উদ্দেশ্য ছিল। হুইলচেয়ারে বসে তোলা হ্যান্ডহেল্ড শটগুলো চরিত্রের ভিতরের অস্বস্তির প্রক্সি হয়ে উঠতো, জাম্প কাটগুলো দেখাত অমনোযোগ অথবা অস্থিরতা। অমর্ত্য সে কাজ বেশ ভালভাবেই করেছেন। তাই এই ছবির সমালোচনা করার মত তেমন কিছু নেই। তবে একটা জায়গায় খচখচ করছে বলে একে নিখুঁত শ্রদ্ধাঞ্জলি বলতে পারছি না। গোদার বলেছিলেন “Cinema is not a series of abstract ideas, but rather the phrasing of moments”। তিনি ছিলেন আদ্যোপান্ত রাজনীতির সৃষ্টি। তাঁর ছবিতে তৎকালীন রাজনীতির অনন্য দ্বন্দ্ব আর অসঙ্গতিগুলো ফুটে উঠত। বিশ্বযুদ্ধ ও মার্শাল প্ল্যান পরবর্তী ফরাসি যুবসমাজে হামফ্রে বোগার্টকে নিয়ে মাদকতা বা উত্তরাধুনিকতাবাদ, ভোগবাদ ও কমিউনিজমের জগাখিচুড়িতে কড়াইশুঁটি হয়ে থাকা ১৯৬৭ সালের প্যারিসের ছাত্রসমাজকে “মার্ক্স ও কোকাকোলার সন্তান” বলা – এগুলোর জন্যই গোদার অনন্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অমর্ত্যর ছবিতে সেরকম কিছু পেলাম না।

আরো পড়ুন অলৌকিক মেগা সিরিয়াল দেখা সমাজের সত্যজিতের ছবি দেখার কোন কারণ নেই, তিনি উপলক্ষ মাত্র

অমর্ত্য কিন্তু শুরুতে বাংলাতেই ছবি করতেন। কিন্তু বাংলার সিনেমাজগৎ তাঁকে আমল দেয়নি। তাই ওড়িয়া ভাষায় ছবি করে দেশবিদেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এমন পরিচালকের হাত ধরে যে সপ্তাহে গোদার আমাদের আদিউ বলে পালিয়ে গেলেন, সেই সপ্তাহেই এক গোদারিয় প্যাস্টিশের মাধ্যমে তাঁকে পালটা আদিউ বলতে মন্দ লাগল না।

~মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.