১৯৬১ সালের কোনো এক শীত-বিকেলে রবার্ট জিমারম্যান সুদূর হিবিং (মিনেসোটা) থেকে হাজার মাইল উজিয়ে নিউইয়র্ক শহরে হাজির হলেন তাঁর স্বপ্নের নায়ক, গুরু উডি গাথরিকে চাক্ষুষ করতে। উডি তখন নিউ জার্সির এক হাসপাতালে হান্টিংটন নামে এক ভয়ংকর অসুখের সঙ্গে লড়াই করছেন। আ কমপ্লিট আননোন ছবিটা শুরু হচ্ছে সেখান থেকে।

জিমারম্যান, ওরফে বব ডিলানের সঙ্গে, উডির দেখা হয়, সঙ্গে থাকেন পিট সিগার। ডিলান তাঁকে ‘সং ফর উডি’ গেয়ে শোনান। ছবিতে এর পরের পাঁচ থেকে সাত মিনিট ধরে ওই সময়ের নিউইয়র্ক শহরটার সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। কেমন ছিল সেই নিউইয়র্ক? বহুকাল আগে প্লেবয় পত্রিকাকে দেওয়া ডিলানের এক সাক্ষাৎকারের দিকে যদি তাকাই, দেখব সেখানে ডিলান বলছেন ‘নিউ ইয়র্কের ধরন তো তুমি জানোই। যেন একই রান্নাঘরে কুড়িটা আলাদা খাবার তৈরি হচ্ছে বা একই চত্বরে ঘটে যাচ্ছে হাজারো অনুষ্ঠান। প্রায় ২০০ বা তারও বেশি বিভিন্ন ধরনের ব্যান্ড হাজির হত ওই পার্কে। তাদের মধ্যে কেউ জাগ ব্যান্ড, কেউ ব্লু গ্রাস, কেউ বা হালকা স্ট্রিং। আরও ছিল – আইরিশ বা দক্ষিণের পার্বত্য ব্যান্ড। কেউ গাইছে ‘জন হেনরি’, কেউ অন্য কিছু।’ ছবির পরিচালক চমৎকার মুনশিয়ানায় এই বিশ্বজনীনতা ধরেছেন ছবিতে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আ কমপ্লিট আননোন ডিলানের বায়োপিক নয়। তবে ১৯৬১-৬৫ সময়কাল যে সঙ্গীত রচয়িতা হিসাবে ডিলানের জীবনের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল পর্ব – তা নিয়ে অনেকেই একমত। আর ছবিতে এই পর্বটার পুঙ্খানুপুঙ্খ অত্যন্ত দক্ষভাবে দেখিয়েছেন পরিচালক। কে নেই এই ছবিতে! অ্যালান লোমাক্স থেকে অ্যালবার্ট গ্রসম্যান, সশরীরে। অ্যালান কুপার, জনি ক্যাশ, জোন বায়েজ তো বটেই। পিট সিগারের স্ত্রী তশি সিগারকেও দেখা যাবে। মোটের উপর, পাঁচ বছরের ওই সময়কালকে ঘিরে এক সুন্দর গল্প তৈরি করেছেন পরিচালক, যেখানে ইতিহাসের সব চরিত্র উপস্থিত। আর আছে গান, গানের প্রয়োগ আর তাদের হয়ে ওঠার মুহূর্ত। ডিলানের সব প্রবাদপ্রতিম গান পরিচালক অবলীলায় ব্যবহার করেছেন এই ছবিতে। ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’, ‘গার্ল ফ্রম দ্য নর্থ কান্ট্রি’, ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেঞ্জিং’, ‘ডোন্ট থিঙ্ক টোয়াইস, ইট’স অলরাইট’, ‘মাই ব্লু আইড সন’ ইত্যাদি। সেইসঙ্গে রয়েছে ঈর্ষা আর ভালবাসা।

ঘটনা আবর্তিত হয়েছে তিনজনকে ঘিরে – পিট সিগার, জোন বায়েজ আর সিলভি রুসো (যিনি আসলে সুজ রোটোলো)। এঁদের মধ্যমণি ডিলান। বায়েজ-ডিলানের প্রেম চল অথচ মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে সুজ, যাঁকে ডিলান অক্লেশে ঠকিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তাঁর ডিলানের প্রতি ভালবাসা একেবারে নিখাদ। বায়েজের সঙ্গে ডিলানের সম্পর্ক পারস্পরিক প্রেমের হলেও তাঁরা একে অপরের প্রতি ঈর্ষান্বিত।

ছবির শেষ পর্ব শুরু ১৯৬৫ সালের নিউ পোর্ট ফেস্টিভাল দিয়ে। সেখানে উৎসবের শেষ শিল্পী হিসাবে ডিলান হাজির তাঁর ইলেকট্রিক ব্যান্ড নিয়ে, কিন্তু সিগার আপ্রাণ লড়ে যাচ্ছেন, যাতে শেষপর্যন্ত ডিলান মত বদলান আর অ্যাকিউস্টিক গিটার নিয়ে তাঁর ‘ফোক’ গানগুলো গেয়ে যান। ডিলান হেলায় পিতৃসম পিটের অনুরোধ অস্বীকার করেন। ডিলান ও তাঁর ব্যান্ডকে মানুষ ভাল চোখে নেয় না। শেষে জনি ক্যাশের অনুরোধে শেষবারের মত নিউ পোর্টে অ্যাকিউস্টিক গিটার নিয়ে গান ধরেন ডিলান,

You must leave, now take what you need
You think will last
But whatever you wish to keep
You better grab it fast.

উইংসের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা জোন বায়েজের দিকে তাকিয়ে ডিলানকে শেষ পংক্তি গাইতে দেখা যায়

Well, strike another match
Yeah, go start new, go start new
’Cause it’s all over now, baby blue…

ছবির একেবারে শেষ লগ্নে আমরা দেখব সিগারকে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে পড়ে থাকা চেয়ারগুলোকে এক এক করে গাড়ির উপর সাজিয়ে রাখতে, আর ডিলানকে দেখা যায় সিগারকে দেখেও না দেখার ভান করে তাঁর হার্লি ডেভিডসন বাইকে চড়ে দিগন্তের দিকে ধাবিত হতে।

আবার সেই প্লেবয়ের সাক্ষাৎকারে ফিরে যাই। যেখানে ডিলান বলেছিলেন ‘জীবনের নিয়মই হল, সময় হলে সবকিছুকেই ছেড়ে চলে যেতে হয়।’

আরো পড়ুন বিদ্রোহ আর প্রেমের দিব্যি

বহুদিন পর একখানা উপভোগ্য ছবি দেখলাম, যার কৃতিত্ব অবশ্যই ছবির পরিচালক জেমস ম্যানগোল্ডের। এ ছবির অভিনেতাদের সকলেই উঁচু দরের কাজ করেছেন। যেমন সিগারের ভূমিকায় এডওয়ার্ড নর্টন, বায়েজের চরিত্রে মনিকা বারবারো এবং ডিলানের ভূমিকায় টিমথি শ্যালামেট। আ কমপ্লিট আননোন একইসঙ্গে এক সফল পিরিয়ড ছবিও বটে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেইসময়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্মাণ করা হয়েছে পর্দায়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.