বাইনারি ভাঙা সহজ কাজ নয়, বিশেষত যেখানে জাতি-পরিচয় গড়েই উঠেছে বাইনারিকে অবলম্বন করে। যে দেশে বাঙালি মুসলমানের সংখ্যা বিপুল, সেখানে ভাষাগত ও ধর্মীয় সংঘাত তৈরি হতে বাধ্য, যার অনিবার্য পরিণতি সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ।

গতবছর ৩ অগাস্ট, অর্থাৎ সরকারবিরোধী জনসমুদ্রের মুখে পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মোটামুটি ৪৮ ঘণ্টা আগে, গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা মাহফুজ আলম (আবদুল্লাহ) ফেসবুক পোস্টে নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। সেইসঙ্গে অতদিন ধরে যে সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় বাইনারি বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে, এবার যে সেই বাইনারি ভাঙার সময় এসেছে, সেকথাও জানিয়ে দেন আলম।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বামপন্থী ও ইসলামপন্থী, দুই শক্তিরই সক্রিয় যোগদান ছিল। ৩ অগাস্টের পোস্টে আলম, যিনি কিছুদিন পরেই (২৮ অগাস্ট) অন্তর্বর্তী সরকারে প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের বিশেষ সহকারীর পদ পাবেন – এই সক্রিয়তার প্রশংসাও করেন। তবে, সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হয় ছোট্ট সতর্কবার্তা – শাহবাগ-শাপলা ফেরত আনার কোনোরকম চেষ্টা হলে তা বরদাস্ত করা হবে না।

২০১৩ সালে বাংলাদেশে, একদিকে ধর্মনিরপেক্ষ-উদারবাদী-নাস্তিক শিবির (যে শিবিরের গর্বের ভিত্তি তাদের বাঙালি পরিচয়), অন্যদিকে ইসলামপন্থী শক্তির যে মুখোমুখি সংঘর্ষ লেগেছিল, সেটাকেই চলতি কথায় ‘শাহবাগ-শাপলা’ বলা হয়।

উদারবাদী শিবির জড়ো হয়েছিল ঢাকার শাহবাগ স্কোয়্যারে। তাদের সোচ্চার দাবি ছিল, যারা একসময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যাও ঘটিয়েছে, সেইসব জামাত নেতাদের অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। কেবল ইসলামপন্থী রাজনীতিই নয়, এই শিবিরের আক্রমণের তির ছিল ইসলামিয় আচার অনুষ্ঠানের দিকেও।

শাহবাগ আন্দোলনের তিন মাস পরে, ঢাকার শাপলা স্কোয়্যারে পাল্টা মিছিল ডাকে হেফাজত-এ-ইসলাম। ইসলামিয় জীবনধারণের পক্ষে জোর সওয়াল করতে থাকে তারা। পরিণতি খুব সুখের হয়নি। নানা জায়গায় ভাংচুরের অভিযোগ ওঠে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনির গুলিতে প্রাণও হারান বহু মানুষ। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, ইসলামপন্থী রাজনীতির পরিসরে হেফাজত ও জামাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের রেষারেষি।

জুলাই-অগাস্টের হাসিনাবিরোধী সংগ্রামে যাঁরা একদম সামনের সারিতে ছিলেন, সেই ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস ফ্রন্টের (ডিএসএফ) আলম ও তাঁর সঙ্গীরা গত কয়েক বছর ধরেই এই ধর্মনিরপেক্ষ বনাম ধর্মীয়র মেরুকরণ এবং সামরিক দমনপীড়নের বিরোধিতা করে আসছেন।

তাঁদের বক্তব্য, দুই পক্ষেই চরমপন্থীরা যথেষ্ট শক্তিশালী। তারা একে অন্যের দিকে কাদা ছুড়বে, একে অন্যের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাবে, প্রয়োজনে হত্যার পক্ষে সাফাইও গাইবে। আলমরা নিজেদের পরিচয় দেন মধ্যপন্থী বা নরমপন্থী এবং গণতন্ত্রবাদী হিসাবে। তাঁদের মতে, সহজাত গণ ঐক্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে দীর্ঘদিনের এই মেরুকরণের রাজনীতি। এই প্রবণতা রোখার একমাত্র উপায় অন্তর্ভুক্তিকরণ। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটাকে এক্ষেত্রে ইচ্ছা করেই দূরে রাখছেন তাঁরা।

এই কয়েক মাসে আলম হয়ত উপলব্ধি করেছেন, ওকথা বলা যত সহজ কাজে করে দেখানো ততটাই কঠিন। ইউনুস সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নানা ইসলামপন্থী শিবির শক্তিবৃদ্ধি করেছে, ধর্মান্ধ জনতা মাথাচাড়া দিয়েছে। সুফি মাজারে আক্রমণ থেকে শুরু করে মূর্তি-ভাস্কর্য ভাংচুর, মহিলা ফুটবল থেকে বাউল-ফকির অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, বিরোধী কণ্ঠস্বরকে চাপা দেওয়া চেষ্টা, এই কয়েক মাসে অগণতান্ত্রিক ঘটনা কম ঘটেনি। আক্রমণ নেমে এসেছে বসন্তোৎসব, নাট্যোৎসব, ঘুড়ি ওড়ানো, ভ্যালেন্টাইনস ডে পালন, জনসমক্ষে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রির উপরেও। এমনকি, বইমেলায় বিরুদ্ধ মতের বই বিক্রির কারণেও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে।

আর যতবার এমন ঘটনা ঘটেছে ততবারই এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে ধর্মনিরপেক্ষ মহল বা শাহবাগ মহল, যাদের শক্তির ভিত্তিই হল বাংলা ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ। ইসলামপন্থীদের এমন বাড়বাড়ন্ত তাদের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের। এরই মধ্যে আগুনে ঘি ঢেলেছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতার সপক্ষে জামাতের সাফাই আর মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাংচুর করার ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই আবার শুরু হয়েছে মেরুকরণ।

 

সেই পুরনো দ্বন্দ্ব

বাঙালির জাতি-ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে উনবিংশ শতকের শেষদিকে, যার অনিবার্য ফলশ্রুতি বিংশ শতকের প্রথম দশকেই হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থান। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন শুরু হল, বাঙালি জাতীয়তাবাদ তখন প্রবল জনপ্রিয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হল বটে, কিন্তু ততদিনে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বিভাজনরেখা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।

১৯৪৭ সালের বাংলায় ধর্মীয় পরিচয় আরও প্রকট হল, দেশভাগের অংশ হিসাবে দ্বিখণ্ডিত হল বাংলা। মুসলমান অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ গেল পাকিস্তানে, হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গে থেকে গেল ভারতেই। খুব বেশিদিন পার হয়নি, পূর্ববঙ্গে, বা বলা ভাল পূর্ব পাকিস্তানে, নতুন করে শুরু হল ভাষাগত ও ধর্মীয় সংঘাত। ১৯৫২ সালে ঘটে গেল ঐতিহাসিক বাংলা ভাষা আন্দোলন। ১৯৭১ সালে আবার যখন পাকিস্তান ভাগ হল, তার নেপথ্য কারণ হিসাবে উঠে এল পূর্বের উপর পশ্চিমের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য।

যে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা, তা অনেকাংশেই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক। ইসলামপন্থী দলগুলো পাকিস্তানের মত ইসলামিয় প্রজাতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়নি। তাই তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে, দুপক্ষের সংঘাত হয়। প্রসঙ্গত, বামপন্থীদের মধ্যে যাঁরা আওয়ামী লীগের বিরোধী ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁদেরও যে সমর্থন ছিল তার, কারণই হল সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ।

আরো পড়ুন বাংলাদেশ: পশ্চিমবঙ্গের আওয়ামীপ্রেমীদের প্রতি কিছু কথা

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কিছুদিনের জন্য ইসলামপন্থীরা চুপচাপ ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধপন্থীদের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদও দুর্বল হয়ে পড়ে। মুজিব-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রায় দেড় দশক যে সামরিক শাসন চলেছিল, তার মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময়ে ইসলামকে গুরুত্ব দিয়েই অন্য এক ধরনের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটিকে সরিয়ে লেখা হয় ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহের উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি।’ জেনারেল হুসেন মহম্মদ এরশাদের আমলে ইসলাম রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা পেয়েছিল।

১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে দুটো ঘটনার ফলে ভাষাগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের বাইনারি আবার ফিরে আসে। প্রথমটা ঘটে ১৯৯১ সালে। জামাতের ‘আমীর’ নির্বাচিত হন গুলাম আজম। এই মানুষটার নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে জামাতের কর্মীরা পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর সীমাহীন বর্বরতা চালিয়েছিল। ছাড় পাননি তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও। এমনকি আজমকে যখন ‘আমীর’ ঘোষণা করা হয়, তখনো তিনি পাকিস্তানের নাগরিক। দেশের রাজনীতিতে এহেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিত্বের (যিনি আবার পাকিস্তানিও বটে) ফিরে আসার প্রতিক্রিয়ায় ঘটে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৯২ সালে কয়েক জন মুক্তিযুদ্ধপন্থীর উদ্যোগে তৈরি হল ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনির সঙ্গে যারা সহযোগিতা করেছিল, তাদের শাস্তির দাবি তোলে এই সংগঠন। সেই দাবিদাওয়া থেকেই পরবর্তীকালে শাহবাগ আন্দোলনের সূত্রপাত। ইসলামপন্থী শক্তিকে দমন করার জন্য হাসিনারও প্রধান অস্ত্র হয়েছিল এই শাহবাগ। কিন্তু সেইসঙ্গে তিনি সমস্ত বিরোধী শক্তিরই ইসলামপন্থীদের সঙ্গে যোগ আছে বলে দাগিয়ে দেন।

 

নতুন স্রোত

এই দ্বন্দ্বকে বাঙালি আর মুসলমানের দ্বন্দ্ব হিসাবে দেখানো হয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সুশীল সমাজের বহু সদস্যই দেখিয়েছেন। সেই বাইনারি আসলে বিরাট ভুল। কারণ বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমানই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বিশিষ্টদের মতে, ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে ইসলামপন্থী রাজনীতিকে এক করে দেখা কিংবা ধার্মিক মানুষকে ইসলামপন্থী হিসাবে মিছিমিছি সন্দেহ করা – দুটোই অপ্রয়োজনীয় মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে।

গণহত্যা বিষয়ে যিনি লেখালিখি করেন, ঢাকার সেই গবেষক-লেখক সোহুল আহমেদের মতে, নাগরিক সমাজের সদস্যরা যতই জামাতের ইসলামপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলে থাকুন, ইসলামের প্রতি তাঁদের অবজ্ঞা এতটাই, সেটাকে ইসলামবিদ্বেষ থেকে আলাদা করা কঠিন। আহমেদ বলেছেন, ‘অনেকেই আছেন যাঁরা ধর্মপ্রাণ মুসলমান। কিন্তু ইসলামপন্থী রাজনীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে যে সুরে তাঁরা কথা বলেন, তাতে তাঁদের ইসলামোফোবিক মনে হতে পারে।”

জুলাই-অগাস্ট অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিল মধ্যপন্থী-নরমপন্থী শক্তি। ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকার যে ব্যাপক দমনপীড়ন নামিয়ে এনেছিল, তাঁরা তার তীব্র নিন্দা করেছিলেন। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আওয়ামী লীগের কবল থেকে মুক্ত করা। আন্দোলনে বামপন্থী ও ইসলামপন্থী শক্তির সক্রিয় যোগদানকেও তাঁরা সাদরে গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু এটাও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ওই দুই পক্ষের হাতে নেতৃত্বের রাশ কোনোভাবেই তুলে দেওয়া যাবে না।

কিন্তু হাসিনার দেশত্যাগের পর ইসলামপন্থী শক্তিগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। অগাস্ট আন্দোলনের সাফল্যকে তারা দেখছে শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলার জয় হিসাবে। এমনকি শাহবাগের নেপথ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বিচার শুরু করার দাবিও জানাচ্ছে। তাদের নেতা থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকটিভিস্ট – সকলেই এখন দেশব্যাপী ইসলামিয় জীবনধারা আরোপ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। ধর্মোন্মাদ জনতার শর্ত আরোপের দৃশ্য দেখে ভয় পেতে শুরু করেছে নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশ।

সাংস্কৃতিক সংঘাত আবার ফিরে এসেছে। অগাস্ট-পরবর্তী পর্বে বৃহত্তম দল যে বিএনপি, তারা এখন নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য রক্ষা করার প্রধান শক্তি হিসাবে তুলে ধরতে চাইছে। পাশাপাশি ইসলামপন্থী রাজনীতির কড়া সমালোচনাও শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে ১৯৮০ সালে তৈরি হওয়া বিএনপি ১৯৯১ সাল থেকে দীর্ঘ সময় জামাতের জোটসঙ্গী ছিল। যদিও এই মুহূর্তে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। অন্যদিকে ধর্মীয় শক্তির এমন পেশি প্রদর্শন দেখে কপালে ভাঁজ পড়ছে বামপন্থী ও নাগরিক সমাজের।

এই প্রসঙ্গে ঢাকার সমাজ-রাজনীতি গবেষক ও তাত্ত্বিক আলতাফ পারভেজ বলেছেন, বাংলাদেশ আসলে এমন একটা দেশ, যেখানে শ্রেণিবিভাজন আর অর্থনৈতিক অসাম্য প্রকট। কিন্তু খুব পরিকল্পিতভাবে এই বিভাজনটাকে সবসময় আড়ালে রাখা হয়। আড়ালে রাখার জন্যই শাহবাগ-শাপলার মত কৃত্রিম বাইনারির খেলা চলে। কি হাসিনার আওয়ামী লীগ, কি ইসলামপন্থীরা – সকলেই এই বাইনারির সুযোগ নিয়েছে। এমনকি হাসিনা যে দেড় দশক কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়াই দেশ চালিয়ে গেলেন, তার পিছনেও এই বাইনারির ভূমিকাই বেশি।

পারভেজের মতে, জুলাই-অগাস্ট অভ্যুত্থানের নেতারা ক্ষমতায় এসে বৈষম্য দূরীকরণের কথা বললেও প্রথম ছয় মাসে অর্থনৈতিক অসাম্য কিছুই কমেনি। শ্রমিক, কৃষক বা অন্যান্য নিপীড়িতদের কথা আদৌ ভাবা হয়নি। তিনি বরং বলছেন, জুলাই-অগাস্টের আন্দোলন সম্ভব হয়েছিল কারণ, মানুষ সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কোনও শাপলা-শাহবাগ বাইনারির কথা ভেবে তাঁরা অংশ নেননি। তারপর হাসিনা সরকারকে ফেলে দিয়ে যাঁরা ক্ষমতায় এলেন, তাঁরা প্রথমে বাইনারি ভাঙার কথা বললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে গেল।

স্পষ্ট ভাষায় পারভেজ জানিয়েছেন, ‘আন্দোলনকে যারা সফল করল, তারাই এখন দ্বিধাবিভক্ত। ক্ষমতায় যাঁরা আছেন, তাঁরা যা-ই বলে থাকুন, এটা মানতেই হবে যে তাঁদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড কিন্তু ওই পুরনো বাইনারিকেই নানা মাত্রায় উস্কে দিচ্ছে, আর তাঁরা শেষপর্যন্ত একচোখা অবস্থান নিচ্ছেন। ছোট করে বললে, এই মুহূর্তে শাহবাগের চেয়ে শাপলাই বেশি শক্তিশালী। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন শাপলা-প্রভাবিত।’ তাঁর মতে, লড়াইটা অমীমাংসিতই রয়েছে। কয়েক মাস পরে বাংলাদেশে যে নির্বাচন হওয়ার কথা, তার ফলাফলই বলে দেবে বাইনারির প্রভাব কতটা।

খবর অনুযায়ী, ছাত্র শক্তির নতুন রাজনৈতিক দলেও এখন শুরু হয়েছে ক্ষমতা দখলের তীব্র লড়াই। একদিকে আলম সহ অগাস্ট অভ্যুত্থানের অন্যান্য স্বঘোষিত মধ্যপন্থী ছাত্র শক্তি। অন্যদিকে ইসলামপন্থী শক্তি।

আউটলুক পত্রিকায় প্রকাশিত মূল নিবন্ধ থেকে অনুদিত। মতামত ব্যক্তিগত

ভাষান্তর: সোহম দাস

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.