ভুতুড়ে ভোটার বা ভুয়ো ভোটারের অভিযোগ নিয়ে এখন দারুণ আক্রমণাত্মক তৃণমূল কংগ্রেস। তারা নির্বাচন কমিশনকে দাঁড় করিয়েছে কাঠগড়ায়। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই দুবার ইপিআইসি (ভোটারদের ফটো আইডেন্টিটি কার্ড বা সচিত্র পরিচয়পত্র – সংক্ষেপে এপিক) নম্বর নিয়ে ব্যাখ্যা দেয় কমিশন। ২ মার্চের এক বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন জানায় যে কিছু সোশাল মিডিয়ার পোস্টে দুটো আলাদা রাজ্যের ভোটারদের একই এপিক নম্বর নিয়ে লেখা হয়েছে, যা তাদের নজরে এসেছে। কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয় যে ওই এপিক নম্বরগুলো এক হলেও অন্যান্য বিবরণ, যেমন বিধানসভা কেন্দ্র, বা ভোটকেন্দ্রের বিবরণ আলাদা। অর্থাৎ এপিক নম্বর এক হলেই যে অন্য রাজ্যের ভোটার পশ্চিমবঙ্গে এসে ভোট দিয়ে দিতে পারে – এমন দাবি করা যায় না।
তার পাঁচ দিন পরেই কমিশন আরেকটা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবার তাদের দাবির ন্যায্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করে। এবার বলা হয়, এপিক সংখ্যা নির্বিশেষে কোনো নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে ভোটার তালিকার তালিকায় নথিভুক্ত একজন ভোটার কেবল সেই ভোটকেন্দ্রেই তাঁর ভোট দিতে পারেন, অন্য কোথাও নয়। কথাটা ঠিক, কিন্তু দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তির শেষ অনুচ্ছেদে বলা হয়, বিষয়টা নাকি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে এবং এবার কমিশন ‘আগামী তিন মাসের মধ্যে’ এর সমাধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তাহলে কি কমিশন সাফাই দিতে গিয়ে বলেই দিল যে ভুলত্রুটি ছিল এবং তা তাদের জানা ছিল? এবার সেই ত্রুটি শোধরানো হবে? একথা বলেই কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস তাদের জয় হয়েছে বলে দাবি করছে। আরেকটা ব্যাপার হল, কমিশন ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ তারিখে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকদের জন্য নন-স্ট্যান্ডার্ড এপিক নম্বরকে স্ট্যান্ডার্ড এপিক নম্বরে পরিবর্তন করার জন্য প্রোটোকল জারি করেছিল। এই এপিক আবার কমিশনের বিশেষ সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে। তাতে নাম, ঠিকানা, বয়স, বিধানসভা কেন্দ্র ইত্যাদি বিশদ বিবরণ দেওয়া থাকে, সঙ্গে থাকে ভোটারের ছবিও। সেখানে এপিক সংখ্যা এক হলেও অন্যান্য বিবরণ আলাদা হবে ঠিকই, কিন্তু একই একাধিক ভোটারের না হওয়াই বাঞ্ছনীয় নয় কি?
এখানে বলে রাখা উচিত, রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টরস রুলস, ১৯৬০ অনুযায়ী ভুয়ো ভোট রোধে সমস্ত ভোটারকে একখানা সচিত্র পরিচয়পত্র দেওয়ার বিধান রয়েছে। রাজ্য সরকারগুলো ১৯৯৩ সাল থেকে নথিভুক্ত ভোটারদের এপিক জারি করতে শুরু করে। এপিকে ভোটারের নাম, বয়স, বাসস্থান এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক দেওয়া নির্দিষ্ট বিবরণ থাকে। এছাড়া থাকে ভোটারের ছবি এবং কার্ডটা যে জাল নয় তার প্রমাণ হিসাবে রেজিস্ট্রেশন অফিসারের স্বাক্ষর। এ সবেরই কপি বা অনুলিপি তোলা থাকে কমিশনের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে।
এবার দেখা যাক, নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে আর কী বলেছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ম্যানুয়ালের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৫ এর অনুচ্ছেদ ১৪.৪.১-এ বলা আছে, প্রত্যেকটা এপিক একটা অনন্য সিরিয়াল নম্বরের অধীনে জারি করা হয়। এই এপিক সংখ্যা আলফা-নিউমেরিক, অর্থাৎ কিছু বর্ণ এবং সংখ্যা দিয়ে তৈরি। প্রথম তিনটে বর্ণ প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য আলাদা (এফইউএসএন বা কার্যকরী অনন্য ক্রমিক সংখ্যা)। তারপর থাকে একটা ছয় অঙ্কের ক্রমিক সংখ্যা, আর তার পর এক অঙ্কের ‘চেকসাম’। অর্থাৎ তিনটে বর্ণ ও সাতটা সংখ্যা নিয়ে মোট ১০ খানা অক্ষর দিয়ে তৈরি হয় এই এপিক সংখ্যা। আবার এই ম্যানুয়ালের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৭-এর অনুচ্ছেদ ১৪.৮.১-এ লেখা আছে, এই এপিক নম্বর একবারই বরাদ্দ করা হয় গোটা জীবনের জন্য। কাজেই কমিশনের আত্মপক্ষ সমর্থনে মার্চে দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে চিঁড়ে ভেজার নয়।
আগে যেমন বলা হল, ২০১৭ সাল থেকে এপিক তৈরি হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ইরোনেট পোর্টাল (কমিশনের কর্মকর্তাদের জন্য এক ওয়েবভিত্তিক সিস্টেম) ব্যবহার করেই। ম্যানুয়ালে আরও বলা হয়েছে, এই এপিকগুলো কেবল অনলাইনেই তৈরি করা যায়। যাতে নম্বর জাল করা প্রায় অসম্ভব হয়। আবার ম্যানুয়ালে একথাও বলা হয়েছে যে যখনই প্রথমবার কোনো ভোটারকে এপিক দেওয়া হয়, তখন প্রত্যেক ভোটারের জন্য একটা অনন্য নম্বরই বরাদ্দ করা হয়। এপিক রিপ্লেস বা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা একই থাকার কথা।
কাজেই গলদ যে কোথাও একটা আছে তা বলাই বাহুল্য। নির্বাচন কমিশনের ৭ মার্চ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে এটাও পরিষ্কার যে আগেও এই ধরনের অভিযোগ তাদের কাছে জমা পড়েছে, কিন্তু সংশোধন করার কাজ তেমনভাবে হয়নি। আবার আগামী তিন মাসের মধ্যে সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় এটাও বোঝা যায় যে উপায় থাকলেও এতদিন প্রতিকার করা হয়নি। এবার অপেক্ষা জুলাই মাসের। সমাধান হবে?
আরো পড়ুন গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়
সে যা-ই হোক, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই ধরনের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের গোলমেলে উত্তর তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে তুলে দিয়েছে এক রাজনৈতিক অস্ত্র। পার্শ্ববর্তী রাজ্য আর পশ্চিমবঙ্গের বহু ভোটারের এপিক নম্বর এক, তাই অন্য রাজ্যের ভোটার আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এসে ছাপ্পা ভোট দিয়ে যেতে পারেন – এই দাবি তুলে তৃণমূল নির্বাচন কমিশনকে তো বটেই, বিজেপিকেও চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। কদিন আগে মমতা ব্যানার্জি কলকাতায় দলীয় কর্মীদের নিজ নিজ এলাকার ভোটার তালিকা যাচাই করার নির্দেশই দিয়ে ফেলেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি আর নির্বাচন কমিশন অন্য রাজ্যের ভোটারদের নাম তালিকায় জুড়ে দিয়েছে। এবার নাকি মহারাষ্ট্র ও দিল্লির নির্বাচনের পর তাঁর রাজ্যে তারা আসবে ভুয়ো ভোট দিতে।
বলা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের শনাক্তকরণ করতে গিয়ে দেখা গেছে, তাঁদের কয়েকজনের এপিক নম্বর রাজ্যের কিছু ভোটারের সঙ্গে মিলে গেছে। যদিও ওই শ্রমিকদের ভোটার কার্ডে নথিভুক্ত নাম, বাসস্থান, বিধানসভা ইত্যাদি আলাদা। মমতা তাঁর বক্তব্যে এর মধ্যে কিছু শ্রমিকের নাম, ঠিকানা, রাজ্য এবং পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় একই এপিক নম্বরের কথা তুলেছেন উদাহরণস্বরূপ। এরপরেই দলীয় কর্মীরা ভোটার তালিকা যাচাই করতে শুরু করেন, নেতারা অভিযোগ করেন প্রথমে রাজ্যের নির্বাচন কমিশনের দফতরে। আগামীকাল (১১ মার্চ) দিল্লির নির্বাচন সদনেও তাঁদের অভিযোগ জানাতে যাওয়ার কথা। এদিকে সংসদে অধিবেশনও শুরু হতে চলেছে। সেখানেও এ নিয়ে শোরগোল হবে।
প্রশ্ন হল, এপিক নম্বর এক হলেই কি দলে দলে অন্য রাজ্যের লোক পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে জাল ভোট দিতে পারে? সেখানে কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সাফাই ঠিক। কারণ ভোটার কার্ডের নাম, ঠিকানা, ছবি, ইত্যাদি মিলতেই হবে। এসব মিলিয়েই তো দেওয়া হয় ভোটার স্লিপ। এক্ষেত্রে জালিয়াতি করতে হলে শুধু ভোটার কার্ডে বিবরণ বদল নয়, ভোটার তালিকাতেও প্রচুর অদলবদল করতে হবে। সেটা কি সম্ভব? তৃণমূল কংগ্রেস আপাতত তাই বলছে – এটা হয়েছে, আসছে বছর আবার হবে। এবার দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।
তবে জানা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন এবার এপিক নম্বরগুলো খতিয়ে দেখছে। যেখানেই দেখা যাবে একই নম্বরে দুটো এপিক, সেখানে দেওয়া হবে নতুন এপিক নম্বর।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







