“আমাদের দর্শক অত্যন্ত পিছিয়ে থাকা। এদের এত গুরুত্ব দেবার দরকার নেই। এত ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট ইত্যাদি হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শককে মাথায় রাখলে তারা নিতান্তই সেকেলে।” ১৯৮৯ সালে ফরাসি সাংবাদিক পিয়ের আদ্রেঁ বুতাঁকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় এই কথাগুলি বলেছিলেন। প্রেক্ষিত ছিল অবশ্য আরও প্রায় ৩০ বছর আগের বানানো ছবি দেবী দেখে দর্শকের প্রতিক্রিয়া। এখন কথা হল, সত্যজিতের দর্শক ছিল সারা দুনিয়া জুড়ে, তাই ভারতীয় দর্শককে গুরুত্ব না দিলেও তাঁর চলত। কিন্তু মূলধারার ছবির দর্শক তো তারাই যাদের সত্যজিৎ তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি, আর এই দর্শকই তো আসলে বাজার। বাজারকে ধর্তব্যের মধ্যে না আনলে বাণিজ্যিক ছবি হবে কীভাবে? সিনেমা ডিস্ট্রিবিউটরদের মধ্যে বহুযুগ ধরে দর্শকদের একটি বিশেষ নামে ডাকার চল আছে – পাবলিক। নায়ক ছবির শুরুতেই পাবলিক সম্মন্ধে সেই চরম বিবৃতি মনে আছে? দ্বিতীয় সপ্তাহেও ছবি তেমন চলছে না বলে নায়ক অরিন্দম মুখার্জি (উত্তমকুমার) রাগ আর বিরক্তি ভরে বলে উঠলেন, ‘শালা পাবলিক, হুইমজিকাল! শালাদের স্টিম রোলার চালিয়ে ফ্ল্যাট করে দিতে পারলে…!’ নায়কের রাগকে আর বাড়তে না দিয়ে সুহৃদ জ্যোতি সাবধানবাণী শোনায়, ‘বাঃ ভাই বাঃ… পাবলিক ছাড়া খাবেটা কী?’

তা এসব তো গত শতাব্দীর কথা। নায়ক মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৬ সালে আর এখন ২০২৪ সালের গোড়ার দিক। প্রায় ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে, সিনেমা ফিল্ম ছেড়ে ডিজিটাল হয়েছে। কিন্তু পাবলিকের মন কি একই থেকে গেছে? নায়কের রাগের কারণ হওয়া ‘খামখেয়ালি’ এই পাবলিকের অহেতুক চঞ্চলমতি হবার পিছনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে। গত দুবছরে বলিউডে যে ধারার ছবি ব্লকবাস্টার বা মেগা হিট হয়েছে, সেগুলোর দিকে তাকালে পাবলিক নিয়ে তলিয়ে ভাবার অবশ্যই সময় এসেছে। এসব জটিল ভাবনায় যাওয়ার আগে গত দুবছরে বলিউডের বাণিজ্যসফল ছবিগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। ২০২২ সালে বলিউডের বেশিরভাগ বড় বাজেটের ছবি ডাহা ফ্লপ করেছিল। ব্লকবাস্টার তকমা পেয়েছিল ভুলভুলাইয়া ২, দৃশ্যম ২ এবং দ্য কাশ্মীর ফাইলস। তিনটেই সেই অর্থে ‘আন্ডারডগ’ ছবি। কোনো খান, কাপুর বা রোশন ছিলেন না। তিনটের কোনোটাতেই দীপিকা পাড়ুকোন বা আলিয়া ভাটও ছিলেন না। শুধুমাত্র গল্প, বা এখন যাকে বলে ‘কনটেন্ট’, তার জোরে হিট হয়েছিল। গতবছর, অর্থাৎ সদ্য শেষ হওয়া ২০২৩ সালে, বলিউডে লক্ষ্মী ফিরেছেন। বেশকিছু ছবি হিট এবং সুপার হিট হয়েছে। তবে ৫০০ কোটির অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলে ব্লকবাস্টার তকমা পেয়েছে মাত্র চারটে ছবি। জওয়ান (৬০০ কোটি), পাঠান (৫০০ কোটি), অ্যানিমাল (৫০০ কোটি) এবং এই খান আর কাপুরদের মাঝখানে আন্ডারডগ – দ্য কেরালা স্টোরি – মাত্র ৫০ কোটিতে বানানো ছবিটি ২৫৩ কোটির ব্যবসা করে চিরকালীন ব্লক বাস্টারের স্থান আদায় করে নিয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আরো পড়ুন দ্য কেরালা স্টোরি: আষাঢ়ে গল্প বনাম জেহাদি বাস্তব

উগ্র জাতীয়তাবাদ ছাড়াও এক অদ্ভুত উপাদান এই হিট ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে – তা হল দক্ষিণী ছবির উগ্রতা। বাণিজ্যে খরা কাটাতে দক্ষিণী সিনেমার আদলে বলিউডের এই ভোলবদল যে বিপুল সাফল্য এনে দিয়েছে তা তো পাটিগণিতই বলে দিচ্ছে।

এই কয়েকবছর আগেও ভারতবর্ষে রামচন্দ্রের চেয়ে শাহরুখ খান বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। শাহরুখ তো ঠিক রাবণ দমন করতে আসা পুরুষোত্তম রামের উত্তরসূরি নন, বরং গোকুলে বেড়ে ওঠা চিরপ্রেমিক কৃষ্ণের বংশধর। মাঝেসাঝে কালীয় দমন বা কংস নিধন করে থাকে বটে, কিন্তু তাঁর কিংবদন্তি হয়ে ওঠার ঘটনা ঘটেছে যমুনার তীরে – ত্রিভঙ্গমুরারী, হাতে বাঁশি, মাথায় ময়ূরপুচ্ছ আর কাঁধে মাথা এলিয়ে রাখা রাধা। শাহরুখ যখন দু বাহু বাড়ায়ে কুছ কুছ হোতা হ্যায় (১৯৯৮) করে উঠতেন তখন তো ভারতীয় মানসপটে কৃষ্ণের ডাকাতিয়া বাঁশিই বেজে উঠত। কিন্তু বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয় প্রেমিক শাহরুখ একলা হয়ে পড়েছেন। তাঁর একসময়ের রাধা ও অন্যান্য গোপিনীরা মা, কাকিমা হতে শুরু করেছেন। জুহি চাওলা, কাজল, রানী মুখার্জিরা আর শাহরুখের কাঁধে মাথা রাখতে পারেন না। একটা বয়সের পরে তো কৃষ্ণকেও বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরা যেতে হয়েছিল, বাঁশি ফেলে সুদর্শন চক্র হাতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নামতে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের সপক্ষে একটা গোটা সন্দর্ভ নির্মাণ করতে হয়েছিল, যাকে গীতা বলা হয়ে থাকে। শাহরুখকেও তেমনি রাহুল আর রাজের রূপ ছেড়ে ঈস (২০১৭) হয়ে উঠতে হল। তারপর যতবার প্রেম করতে গেছেন, বেচারা ব্যর্থ হয়েছেন। তাই আবার পাঠান আর জওয়ানের মত অতি-পুরুষ নায়ক হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।

আরো পড়ুন দুঃসময়ে নিজের সবটুকু নিংড়ে দিলেন জওয়ান শাহরুখ

বলিউডের চলন বলতে গিয়ে শাহরুখের গাজন গাওয়ার একটাই কারণ। গত ৩০ বছর ধরে কিছু ব্যতিক্রমী অ্যাকশনধর্মী ছবি হলেও হিন্দি ছবির মূল সুরে কখনো প্রকট বা কখনো প্রচ্ছন্নভাবে প্রেমের ধারা বইত। সে ধারা শুরু হয়েছিল সেই নয়ের দশকের গোড়ায় তিন খানের হাত ধরেই। কয়ামত সে কয়ামত তক (১৯৮৮), ম্যায়নে প্যার কিয়া (১৯৮৯), দিওয়ানা (১৯৯২)…। সেই সব চকোলেট, গোলাপফুল আর আর্চি’স গ্যালারির প্রেমিকরা আস্তে আস্তে কীভাবে যেন কবীর সিং হয়ে গেল! আমাদের কিশোরকালে প্রেমের বাংলা নাম যদি বেণীমাধব হয়, তবে তার সর্বভারতীয় সংস্করণ অবশ্যই ছিল শাহরুখ খান। আজকের প্রজন্ম সেই ‘নাম তো সুনা হি হোগা!’ কিন্তু সেই শাহরুখ কালের প্রভাবে পাঠান আর জওয়ান হয়ে উঠলেন। শুধু মাই নেম ইজ খান (২০১০) বললে তাঁর দর পড়ে যাচ্ছিল। কেন এমন হল? পাবলিক চেয়েছে বলে? এই বিষয় নিয়ে বাংলার বিখ্যাত ছবি (দোস্তজি) ও সিরিজের (ছোটলোক) সহপ্রযোজক সৌম্য মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। উনি বললেন ‘হিন্দি বড় বাজেটের বাণিজ্যিক ছবিতে গত দু-এক বছরে মূলত তিনটে প্রবণতা দেখা গেছে – জাতীয়তাবাদ, বীরগাথা, হিংসা। এই তিনটে উপাদান সিনেমায় চিরকালই ছিল এবং ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার। যে জিনিসটা উল্লেখযোগ্য সেটা হল রোম্যান্টিক ছবির অভাব। রকি ঔর রানি কি প্রেম কাহানি (২০২৩) একমাত্র সফল উদাহরণ। এছাড়া এই ধরনের ছবিগুলো এখন ওটিটিতে হচ্ছে। আমার মনে হয় এই ধারাটা ২০২৪ সালেও চলবে এবং আরও কিছু বছর চলতে থাকবে… যতদিন না বলিউড আবার কোনও রোম্যান্টিক হিরোর সন্ধান পায়।”

সৌম্য বাংলা ছবির হালহকিকত যেহেতু বেশ কয়েকবছর ধরে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাই ওঁকে আরেকটি প্রশ্নও করেছিলাম। জিগ্যেস করেছিলাম অতি-পুরুষ নায়ক নিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী বা হিংসাত্মক ছবি তৈরির প্রবণতা কি বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতেও দেখা যাচ্ছে? উনি প্রযোজক হিসাবে এই প্রবণতাকে কীভাবে পাঠ করছেন? উনি জানালেন ‘বাংলা ছবির মূল সমস্যা হল বাজেট। খুব বড় পরিসরে ভাবা ও দেখানো সম্ভব নয়। তাই এ ধরনের ছবি খুব একটা হয় না। যদিও বাঘাযতীন (২০২৩), রক্তবীজ (২০২৩)-এর মত ছবি বানানো হলে লোকে দেখছে বইকি। দ্বিতীয়ত, বাংলা ছবিতে মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক, এলিট বাঙালির একটা নিজস্ব পরিসর আছে। সেখানে গোয়েন্দা, গুপ্তধন, বাঙালি ভদ্রলোক আইকন, মধ্যবিত্ত পরিবার ইত্যাদি কিছু স্মৃতিমেদুর ভাবনাচিন্তা নিয়ে ছবি হচ্ছে বহুদিন। আরও বেশ কিছুদিন হবে। এসব ছবি লোকে বিশেষ দেখে না, হুজুগে না পড়লে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম নন্দিতা-শিবপ্রসাদ এবং রাজ চক্রবর্তী। এঁরা অন্যরকম ভাবেন। আমার নিজের মনে হয়, এঁরা নিজেদের মত করে বলিউডের মূলধারার ওই তিনটে প্রবণতা নিজেদের ছবিতে আনার চেষ্টা করছেন।’

আরো পড়ুন বাংলা সিনেমায় উত্তরসত্য, মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে হাজির রক্তবীজ

তাহলে হয়ত বাজেট পেলেই বাংলাও বলিউডের জাতীয়তাবাদ আর বীরগাথায় সিনেমাকে ডুবিয়ে বাঙালির হজম করার মত হিংসা উদযাপন করতে পারে। আশঙ্কা হল একঘেয়ে বস্তাপচা হলেও এই গোয়েন্দা, গুপ্তধন আর মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে পরকীয়া দেখিয়ে বাংলা ছবি একপ্রকার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বটে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ আর অতি-পৌরুষের জ্বালা যদি ছবিতে আনতে হয়, তবে তা কেমন হবে? বাঙালির নিজস্ব হিংসা বলতে দাঙ্গা আর ছুটকো চোরাগোপ্তা খুনের বাইরে কি আর কিছু কল্পনায় আসছে? চোখ বন্ধ করতেই যে ছবিটা ভেসে এল তা হল গৃহযুদ্ধ (১৯৮২) ছবিতে খুন হয়ে যাওয়া সাংবাদিক সন্দীপনের (গৌতম ঘোষ) রাস্তায় পড়ে থাকা দেহ।

গৃহযুদ্ধ
গৃহযুদ্ধ ছবিতে গৌতম ঘোষ। সূত্র: ইউটিউব

কিন্তু এইটুকুতে তো হবে না। সবকিছুতেই এগিয়ে থাকা দক্ষিণ ভারতের কাছ থেকে আরও অনেককিছুর মতো হিংসা দেখানোও বাঙালিকে শিখতে হবে। সে যা-ই হোক, মুম্বাইয়ের ফিল্ম জগতে কর্মরত দুজনের সঙ্গেও কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। দুজনেই ফিল্ম সম্পাদনা করেন। প্রথম জন হলেন জবিন মারচেন্ট। প্রচুর তথ্যচিত্র ও ফিকশন ছবি সম্পাদনা করেছেন জবিন, যার মধ্যে খুব পরিচিত নাম এনএইচটেন (২০১৫), আনারকলি অফ আরা (২০১৭) কিংবা কড়ভি হাওয়া (২০১৭)। ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হিন্দি ছবির জগতের ঘনিষ্ঠ হবার সুবাদে উনি কীভাবে এই প্রবণতাকে দেখছেন? আমরা সেই মুন্নাভাই (২০০৩, ২০০৬), চলতে চলতে (২০০৩) বা দিল চাহতা হ্যায় (২০০১) জাতীয় ছবি কি আর দেখব না? জবিন বললেন ‘বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তো চিরকাল বাণিজ্যমুখী। ফলে যা পাবলিক নিচ্ছে তার থেকে চট করে সরে দাঁড়ানোর তো কোনো কারণ নেই। দুর্ভাগ্যবশত হাইপার ভায়োলেন্স আর হাইপার জাতীয়তাবাদ কম্বো বর্তমানে অসম্ভব জনপ্রিয়।’ আমার পরের প্রশ্ন ছিল, এই জনপ্রিয়তা কি শুধু জনতাই নির্ধারণ করে, নাকি আরও বড় কোনো শক্তি এই জনমানসকে প্রভাবিত করার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে যাতে জনগণ জাতীয়তাবাদের নেশায় ডুবে থাকে? জবিন স্পষ্ট বললেন ‘দেখো, রাজনৈতিক এজেন্ডা তো পরিষ্কার। এদের তো কোন রাখঢাক নেই। প্রাচীন ভারতের এক অভিনব পন্থা বেশ সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছে এরা। সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ – মিথ্যে বলে, পয়সা দিয়ে, ভয় দেখিয়ে এবং তাতেও না হলে কূটনৈতিকভাবে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ তৈরি করে নিজের কাজ হাসিল করা। ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের কাছে মূলধারার সিনেমা তো একটা বড় অস্ত্র। একদিকে যেমন কিছু ছবিকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে হল থেকে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, একান্ত প্রোপাগান্ডামূলক ছবির পিছনে কোটি কোটি টাকাও ঢালা হচ্ছে। আর শুধু বলিউডকে দোষ দিয়ে তো লাভ নেই, সমাজের সর্বত্র এই ছবি।”

একই প্রশ্ন করেছিলাম আরেক ফিল্ম সম্পাদক আইরিন ধর মালিককে। আইরিন বস এক পল (২০০৬) সহ বহু বিখ্যাত ছবির সম্পাদনা করেছেন, জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন সেলুলয়েড ম্যান (২০১২) তথ্যচিত্রের জন্যে। উনিও বললেন, এই প্রবণতা এখন কিছুদিন হইহই করে চলবে। তবে আইরিনও সৌম্যর সুরেই বললেন, এই অতি-পুরুষকার এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ বলিউড ছবিতে চিরকালই ছিল। গদর এক প্রেম কথা (২০০১)-র পদাঙ্ক অনুসরণ করে গতবছর গদর ২ (২০২৩)-ও তো বেজায় হিট হয়েছে। কিছু ছবি যেমন আদ্যন্ত এক বিশেষ রাজনৈতিক মতের লোকেদের টাকায় তৈরি হচ্ছে বলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তেমনি কিছু ছবিকে শুধুমাত্র নায়িকার বিকিনির রঙের জন্য হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। ফলে গোটা বলিউড কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের অঙ্গুলিহেলনে চলছে এমনটা নয়। বলিউডের সোজা হিসাব – যা সহজে বিকোয়, তাই বানানো হয়।

তবে আমার আশা, কিছুদিন পরে এই হিংসার উদযাপন বন্ধ হবে। কারণ ব্যবসার রীতি অনুযায়ীই বলিউড মূলত একটা ধর্মনিরপেক্ষ জায়গা। অধ্যাপক ও কলামনিস্ট (উত্তমকুমার – আ লাইফ ইন সিনেমা বইয়ের লেখক) সায়নদেব চৌধুরী একটা বিষয়ে আলোকপাত করলেন। বললেন ‘ভুলে গেলে চলবে না, কোভিড তথা লকডাউন পরবর্তী সময়ে আমাদের দর্শকের মানসিকতার অনেক পরিবর্তন এসেছে। এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি যখন বলিউড ইন্ডাস্ট্রির তাবড় পরিচালকেরাও দর্শকের পছন্দ অপছন্দ নিয়ে তেমন নিশ্চিত নন। অতিমারীর সময়ে যে ওটিটিতে বুঁদ হয়ে থাকার স্বভাব গড়ে উঠেছিল তা তো হলের সিনেমার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। ওটিটি আগে ছিল পুরনো সিনেমার একটি নির্ভরযোগ্য আর্কাইভ। কিন্তু এখন তারাই নতুন সিনেমা ও সিরিজ নিয়ে আসছে। বলা যেতে পারে যে সিনেমাকে কনটেন্ট নামক একটি বিষয়ে সংকুচিত করে এনেছে ওটিটি। সুতরাং স্পেকট্যাকল না হলে দর্শককে হলে নিয়ে আসা যাবে না। তাই দক্ষিণী ছবির লার্জার দ্যান লাইফ গল্প, সেইরকম স্তব্ধ করে দেওয়ার মত ভায়োলেন্স আর কিঞ্চিৎ স্টারডম যা ছিঁটেফোঁটা পড়ে আছে, বলিউড তাই দিয়েই পাবলিককে টানবে। যাকে বলে সিনেমাটিক ইমপ্যাক্ট তৈরি করা, এখন পুরনো বলিউড ফর্মুলা তা করতে ব্যর্থ। দক্ষিণ এই মুহূর্তে তাদের রাস্তা দেখিয়েছে।’

এই ধারা শুধু ’২৪ কেন, সায়নদেবের মতে ২০২৫ সালেও চলবে। বলিউড সিনেমার ইতিহাস বলছে, কোনো বিশেষ প্রবণতা একবার ব্যবসার রাস্তা দেখালে চট করে তা যাওয়ার নয়। যতদিন না দর্শকের অরুচি হচ্ছে এবং তারা মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে, ততদিন এই প্রবণতা চলবে। সৌম্য ও আইরিনের কথার রেশ ধরে সায়নদেব স্বীকার করলেন ‘ভায়োলেন্স হিন্দি ছবিতে আগেও ছিল। শোলে (১৯৭৫), শান (১৯৮০) বা খোটে সিক্কে (১৯৯৮)-র মত ছবি ভুলে গেলে তো চলবে না। কিন্তু এই ভায়োলেন্সকে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া মানে নিঃশব্দে মানুষের আপাতনিষ্ক্রিয় মনের গহনে ভায়োলেন্সের পক্ষে সমর্থন তৈরি করা। তবে ছবির পর্দায় দেখা ভায়োলেন্স কীভাবে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে বা আদৌ সরাসরি প্রভাবিত করে কিনা এটা একটা জটিল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর আমিও খুঁজছি।’

সায়নদেবের এই প্রশ্ন আমাকেও কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি পাঠের স্মৃতি উসকে দিল। সত্যিই কি যুরগেন হেবারমাস যাকে ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বলেছেন, তেমন কিছু আর আছে এখন? যেখানে ভোগবাদের হাত ধরে রাষ্ট্র আমাদের যা-ই গেলাতে চাক না কেন, আমরা সহজে ভুলব না, বরং আমরা আমাদের সুচিন্তিত ভাবনা দিয়ে পরমহংসের মত ভালটুকু বেছে নেব? নাকি এখন ঠিক উল্টোটাই হতে থাকবে? স্বাধীন হওয়ার ভয় আমাদের তাড়া করে মারবে? ধনতন্ত্র তার জাঁকজমকে ভুলিয়ে চরম ডানদিকে নিয়ে গিয়ে তার গেরুয়া কাচ বসানো জানলা দিয়ে আমাদের যা দেখাবে আমরা তাই বিশ্বাস করব? দেখা যাক।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.