বিদ্যাভূষণ রাওয়াত
গত ১১ এপ্রিল মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল জ্যোতিবা ফুলে আর সাবিত্রী মাঈ ফুলের সংগ্রাম নিয়ে তৈরি, অনন্ত মহাদেবন নির্দেশিত ছবি ফুলে। আরেক শুক্রবার কেটে গিয়ে শনিবার এসে পড়ল, কিন্তু সে ছবি আজও মুক্তি পেল না। এখন আশা করা হচ্ছে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে মুক্তি পাবে এই ছবি। এর কারণ দুটো – ১) ব্রাহ্মণদের প্রতিবাদ, ২) সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন, চালু লব্জে সেন্সর বোর্ড, ছবির নির্মাতাদের ছবির বেশকিছু জিনিস বদল করতে বলেছে।
আমি সাধারণত সিনেমার জগতে কী হচ্ছে তার খবর রাখি না, বিশেষত যখন কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়ে কিছু করা হয়। আমি দেখেছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের ছবিগুলোর নির্মাতারা ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর কোনো তোয়াক্কা করেন না, নিজেদের মত সত্য নির্মাণ করেন। আজকের বলিউডি সিনেমা তো হিন্দুত্ববাদের মহাবয়ানের আঁতুড়ঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর সেই বয়ানের উৎস হল হোয়াটস্যাপে ছড়ানো গালগল্প।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
যে সেন্সর বোর্ড দ্য কাশ্মীর ফাইলস (২০২২), দ্য কেরালা স্টোরি (২০২৩)-র মত অসভ্য, অসত্য ছবি; ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে তৈরি প্রোপাগান্ডা ছবি এমার্জেন্সি (২০২৫) বিনা বাক্য ব্যয়ে মুক্তি পেতে দেয়, সেই সেন্সর বোর্ড এখন ফুলে ছবির নির্মাতাদের কিছু দৃশ্য বাদ দিতে বলছে। সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা এই ছবির ‘ব্রাহ্মণবিরোধী’ মেজাজে নাকি ‘আহত’ হয়েছেন।
জ্যোতিবা এমন একজন বৈপ্লবিক মানুষ ছিলেন, যাঁর কাজ স্রেফ ব্রাহ্মণ্যবাদের সমালোচনা করায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ভারতের সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত এবং বর্ণবৈষম্যমূলক এই মতবাদের একটা বিকল্পও জুগিয়েছিলেন। তাঁর সত্যশোধক সমাজ এমন এক আন্দোলন, যা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিপরীতে আধুনিক মূল্যবোধ তুলে ধরেছিল। যে জ্যোতিবা আর সাবিত্রী মাঈয়ের জীবন সম্পর্কে পড়েছে, সে-ই মানবে যে তাঁরা ভারতের সর্বকালের সবচেয়ে অসাধারণ দম্পতিদের অন্যতম। অমন দৃষ্টান্ত বিরল।
পেশোয়াই বামুনদের হাতে সাবিত্রী মাঈকে যে অবজ্ঞা এবং লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। একথাও সকলের জানা যে ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিভেদ পরাধীন ভারতের দুটো করদ রাজ্যে কঠোরভাবে কায়েম করা হয়েছিল – ১) পুনে সংলগ্ন পেশোয়াই, ২) ত্রিবাঙ্কুর। ত্রিবাঙ্কুরে দলিত মহিলাদের শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢেকে রাখার অধিকার পর্যন্ত ছিল না।
আশ্চর্যের কিছু নেই যে ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদী অভিজাতরা সিনেমার পর্দায় ফুলেকে দেখে আহত হয়েছে। এতকাল তারা নিজেদের জন্মগত বিশেষ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বয়ান নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। কিন্তু এখন আম্বেদকরপন্থীরা পরিণত হয়েছে এবং তাদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। ক্রমশ বেশি বেশি করে দলিত-বহুজন বুদ্ধিজীবী ও ফিল্ম নির্মাতারা উলটো বয়ান দিয়ে কাজ করছেন এবং তথ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্র তৈরি করছেন, নিষেধ বজায় রাখা যাচ্ছে না। তার ফলেই সমস্যা হচ্ছে। ফুলে, বাবাসাহেব, আম্বেদকর, পেরিয়ারের লেখাপত্র যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন যে ওঁরা ব্রাহ্মণ্যবাদের সমালোচক হলেও কখনোই কোনো ব্রাহ্মণ ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা পোষণ করেননি। এই তফাত বোঝা জরুরি। ফুলে প্রথম যে স্কুল খুলেছিলেন সেটা ছিল বিশেষত ব্রাহ্মণ বিধবাদের জন্য। কারণ তিনি জানতেন যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশু বিধবা রয়েছে ব্রাহ্মণদের মধ্যে।
ফুলে দম্পতি এমন দুই অসামান্য ব্যক্তি যাঁরা যে পথে যে লক্ষ্যে বিশ্বাস করতেন, সেই পথ সেই লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জীবন কাটিয়েছেন। তাঁরা এমন এক ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন যে বিধবার সন্তান। সেই মহিলাকে সামাজিক হয়রানি বা আরও বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে ফুলে সেই শিশুকে নিজের পরিচিতি দেন। সেই ছেলে, যশবন্ত রাও, আজীবন বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার বহন করেছেন এবং মানুষের জন্য কাজ করেছেন। ফুলের কাজকর্ম ব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণ সকলের পক্ষেই অনুকরণীয়। তাঁর দেখানো সত্যশোধকের পথ আমাদের সকলেরই অনুসরণ করা উচিত। তিনি ছিলেন, যাকে বলে ‘অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল’। তাঁর কাজ ভারতের নিম্নবর্গীয় মানুষের জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলেছে। জ্যোতিবা আর সাবিত্রী মাঈ সম্পর্কে একটা ভাল ছবি হলে সেটা ভারতের যুবসমাজকে প্রেরিত করতে পারে, যদি তারা নিজেদের জাতি আর ভ্রান্ত গর্বের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে।
সেন্সর বোর্ড নিজের কথা মত সকলকে ওঠবোস করতে বলতে পারে না। বোর্ডের ব্রাহ্মণ্যবাদী ঔদ্ধত্যের প্রতিবাদ করা দরকার। এই ছবির নির্মাতাদের রাজনৈতিক প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলা উচিত, প্রয়োজনে আদালতে যাওয়া উচিত। তাঁরা জয়যুক্ত হলে তা হবে এক যুগান্তকারী ঘটনা। সেন্সর বোর্ডকে মাথায় চড়ে বসতে দেওয়া চলে না। তাদের একচোখামির জন্যে ফুলে ছবির মুক্তি পিছিয়ে যাওয়া লজ্জাজনক। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপও প্রার্থনীয়।
আরো পড়ুন অথৈ: যত্নে নির্মিত ভারতের ট্র্যাজেডি
ব্রাহ্মণ্যবাদের সমালোচনা করা ভারতের ঐতিহাসিক যাত্রাপথের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বরাবরই ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে মানবতাবাদের দিকে আমাদের যাত্রা চলেছে। মানবতাবাদ আমাদের সংবিধানের ভিত্তি। ফুলে, আম্বেদকর আর পেরিয়ারের মূল্যবোধ আধুনিকতা, যুক্তিবাদ আর মানবতাবাদের নিদর্শন। ওঁদের জীবন আমাদের যতরকমভাবে সম্ভব উদযাপন করা উচিত, যাতে তরুণ প্রজন্ম তাঁদের সংগ্রাম এবং তাঁদের ভাবনার উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।
ইনিউজরুমে প্রকাশিত মূল প্রবন্ধ থেকে অনূদিত। নিবন্ধকার একজন সমাজকর্মী। এই মুহূর্তে হিমালয় ও ভারতের সমভূমির উপর গঙ্গা ও তার শাখানদীগুলোর প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন।মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








