প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য
প্রথমেই যেটা বলতে চাই, আমি রাজনীতির লোক নই, অ্যাক্টিভিস্ট নই। আমি যা বলেছি, যা বলছি, যা করেছি এবং করছি – সবটাই একজন চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সমাজসচেতন মানুষ হিসাবে। আমি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির তীব্র বিরোধী। তবে আমার এই প্রতিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বন করে নয়।
টিভি নাইন বাংলা চ্যানেলের তরফে কিছুদিন আগে একটি পুরস্কারের মনোনয়নের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ওঁরা বাংলা বিনোদন জগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ওঁদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম। আমার পরিচালিত বিরহী ২ সিরিজটি বিভিন্ন বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল। এছাড়া আমাদেরই প্রযোজনার উলটপুরাণ ছবিটিও মনোনয়ন পেয়েছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রাথমিকভাবে দেখে আমার ভালই লেগেছিল। কারণ ওঁরা যেভাবে বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থার ছবিকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল বিষয়টা বেশ স্বচ্ছ। কারণ কোনও বিশেষ হাউজের প্রাধান্য নেই। উরিবাবা ইউটিউব চ্যানেলের ছবিরও মনোনয়ন ছিল। এটাও আমার বেশ চমৎকার লেগেছিল, কারণ আগে সাধারণত ইউটিউব সিরিজ পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেত না।
শনিবার সেই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান ছিল শহরের এক বিলাসবহুল হোটেলে। আমার কিন্তু ওঁদের আতিথেয়তা নিয়ে কোনও অভিযোগ নেই। ওঁরা আমাদের খুব ভালভাবেই স্বাগত জানান। উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছি। ঢুকে দেখলাম, বিরাট হলঘর। আমাদের পৌঁছতে একটু দেরি হওয়ায় একদম পিছনে বসি। ফলে সামনে কারা আছেন ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমন্ত্রিত অতিথিরা মঞ্চে না উঠলে অতদূর থেকে তাঁদের চেনা মুশকিল।
অনেকক্ষণের অনুষ্ঠান – প্রায় ঘন্টা চারেকের। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সহকর্মী, দুর্দান্ত অভিনেতা অমিত সাহা পুরস্কার পেল। আমিও পুরস্কৃত হলাম। সেরা নির্দেশক (জুরি) সম্মান পেলাম বিরহী ২ সিরিজের জন্য।
মঞ্চে উঠলাম, পুরস্কার নিলাম। ওঁরা আমায় কিছু বলতে অনুরোধ করলেন, তাও বললাম। আরও কিছু পুরস্কারের বিভাগ বাকি ছিল আমাদের, সেগুলোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
তারপর দেখলাম বিজেপির নেতা অনুরাগ ঠাকুর মঞ্চে উঠলেন, বক্তব্য রাখলেন। তাঁর গলায় শুনতে হল “জিমি জিমি আ যা আ যা”। খুব বিরক্ত লাগল। খেয়াল করে দেখলাম, প্রচুর রাজনৈতিক নেতা উপস্থিত হয়েছেন। বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস – সব দলেরই। তবে মধ্যমণি অবশ্যই অনুরাগ ঠাকুর। ক্রমশ বিরক্তি বাড়ছিল। সিনেমার পুরস্কার দেওয়ার অনুষ্ঠানে এত রাজনৈতিক নেতা কী করছেন। আমার নিজেকে ওখানে বেমানান মনে হচ্ছিল।
এরপর বিষয়টা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেল। দেখলাম মঞ্চ জুড়ে শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস (এসভিএফ) সংস্থার গুণকীর্তন চলছে। একদম খোলাখুলি, নগ্নভাবে। এসভিএফ কীভাবে তৈরি হয়েছে তার ভিডিও চালিয়ে দেওয়া হল। বসে বসে দেখলাম ওই সংস্থার লোকজন মঞ্চে উঠছেন, মঞ্চ আলো করে থাকছেন। পুরস্কার পাচ্ছেন এবং দিচ্ছেন। বুঝলাম, অনুষ্ঠানটা আসলে ওঁদেরই নিয়ন্ত্রণে। আমাদের গুটিকয়েককে ডাকা হয়েছে বিরোধী পক্ষ হিসাবে, যাতে সবটাই একপাক্ষিক বলে মনে না হয়।
বাইরে পানভোজনের ব্যবস্থা ছিল, দেখলাম প্রচুর রাজনৈতিক নেতারা ঘুরছেন। মধ্যমণি বিজেপির লোকজন। আমার অসম্ভব খারাপ লাগছিল নিজেকে এই গোটা বিষয়টার অংশ ভাবতে। আক্ষেপ হচ্ছিল কেন আগে পুরোটা বুঝতে পারিনি। পারলে পুরস্কারটাই নিতাম না। কিন্তু নিয়ে ফেলেছি যখন, কী আর করব? আমার অসম্ভব লজ্জা করছিল, বিশ্রী লাগছিল। বাড়ি ফেরার পথে ফেসবুকেই লিখে সকলকে জানালাম যে আমি ওই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করছি। জানালাম আমি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে, অনুরাগদের বিরুদ্ধে। তাতে অনেকে পাশে থাকলেন যেমন, তেমন গালমন্দও করলেন অনেকে। আমার কোনোটাতেই আপত্তি নেই।
একজন সিনেমা পরিচালক হিসাবে বলতে পারি, গত কয়েক দশকে এই দেশের সিনেমা মানচিত্র একদম বদলে গিয়েছে। আদিপুরুষ মার্কা সিনেমা হচ্ছে রামায়ণকে বিকৃত করে, যেখানে মার্কেটিং গিমিকের জন্য দর্শককে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে হনুমানের পাশের আসনে বসতে। কেরালা স্টোরি-র মত কুৎসিত ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। আমার মনে পড়ছে, গত শতকের তিনের দশকে জার্মানিতে হিটলারের পক্ষে লেনি রিফেনস্টালের তৈরি ট্রায়াম্ফ অফ দ্য উইল ছবির কথা। টেকনিকের বিচারে একটা মাস্টারপিস, অথচ ছবি জুড়ে কেবল নাজি প্রচার। এমন দিন হয়ত আমার দেশেও আসতে চলেছে।
আরো পড়ুন ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ শিল্প তো নয়ই, প্রচারও নয়
এলে আসুক। আমি আর কিছু না পারি, ভারতীয় নাজিদের সঙ্গে এক মঞ্চে দাঁড়াব না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








