দার্জিলিং পাহাড়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারায় ছেদ পড়েছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে। বহু দশক পরে সেই প্রথম পাহাড়বাসী বহুমুখী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাক্ষী হয়েছিলেন। একদিকে ছিল রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থিত গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিনয় তামাংয়ের নেতৃত্বাধীন অংশ, অন্যদিকে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি এবং জিএনএলএফ সমেত কয়েকটি দলের জোট। পাশাপাশি তৃতীয় বড় শক্তি হিসাবে ছিল বিমলের নেতৃত্বাধীন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার আরেকটি অংশ। দুটি আসন জিতেছিল বিজেপি জোট, একটি আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল সমর্থিত বিনয়পন্থী মোর্চা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তারপর তিস্তা এবং মহানন্দা দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতির কুশীলবরা অনেকেই শিবির বদল করেছেন। তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে পাহাড়ে আবার ফিরেছে দ্বিপাক্ষিক লড়াইয়ের চেনা আবহ। এবার একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং অনীত থাপার গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার অঘোষিত জোট। তার বিপক্ষে বিজেপির নেতৃত্বে আট দলের মহাজোট, যাকে বলা হচ্ছে ইউনাইটেড গোর্খা মঞ্চ। এই জোটে বিজেপি ছাড়াও রয়েছে বিনয় এবং বিমলের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা, দার্জিলিং পুরসভা জিতে হইচই ফেলে দেওয়া অজয় এডওয়ার্ডসের হামরো পার্টি, সিপিএম ভেঙে তৈরি হওয়া পাহাড়ের বামপন্থী দল সিপিআরএম (ক্রামাকপা নামে পরিচিত), অখিল ভারতীয় গোর্খা লিগ, সুমেটি মুক্তি মোর্চা, গোর্খাল্যান্ড রাজ্য নির্মাণ মোর্চা।

এই তৃণমূলবিরোধী মহাজোটের প্রধান কাণ্ডারী দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা। পাহাড়ের রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, পঞ্চায়েত ভোটকে সামনে রেখে কার্যত ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিজেপি। তৃণমূলের বিরুদ্ধে পাহাড়ের সর্বসম্মত প্রার্থী হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতেই পঞ্চায়েত নির্বাচনকে হাতিয়ার করেছেন রাজু। যদিও বিমল, অজয় এডওয়ার্ডস, বিনয় বা রাজু নিজে সে কথা মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, পঞ্চায়েত নির্বাচন ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে তাঁরা ভাবছেনই না।

পাহাড়ের আবহাওয়া দ্রুত বদলায়। কখনো কুয়াশা, কখনো রোদ, তারপরেই আবার বৃষ্টি। পাহাড়ের রাজনীতিও তেমনই। রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে পাল্টে যায়। নেতারা মাঝেমধ্যেই শিবির বদল করেন। তাই একবছর আগের সমীকরণ লোকসভা নির্বাচনে কাজ করবে কিনা বলা কঠিন। যেমন বিধানসভা নির্বাচনের সময় যে বিনয় ছিলেন তৃণমূলের সঙ্গে, তিনিই এখন বিজেপি জোটের নেতা। বিমল কখনো বিজেপির হাত ধরেন, কখনো তৃণমূলের। কিন্তু তা সত্ত্বেও জিমখানা ক্লাবে একদা যুযুধান মোর্চার দুই শিবির – জিএনএলএফ, হামরো পার্টি, সিপিআরএমকে বসিয়ে মহাজোটের কথা ঘোষণা করতে পারা যে বিজেপির সাফল্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

দুই দশক পরে পাহাড়ে এবার পঞ্চায়েত নির্বাচন হচ্ছে। জিএনএলএফের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা সুভাষ ঘিসিংয়ের আমলে শেষবার পাহাড় পঞ্চায়েত নির্বাচন দেখেছিল। ২০০৫ সালের পর থেকে পাহাড়ে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নেই। ফলে গ্রামীণ উন্নয়নের সুফল থেকে বহুদিন বঞ্চিত পাহাড়ের বাসিন্দারা।

এবারেও কিন্তু পাহাড়ে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ভোট হচ্ছে না। গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির ভোট হবে, জেলা পরিষদের নির্বাচন হবে না। গোটা রাজ্যে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচন হলেও পাহাড়ে কেন দ্বিস্তরীয় ভোট – তা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বাসিন্দাদের। দার্জিলিং জেলায় ৭০টি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে, কালিম্পং জেলায় রয়েছে ৪২টি গ্রাম পঞ্চায়েত। পাশাপাশি দার্জিলিংয়ে পাঁচটি এবং কালিম্পংয়ে চারটি পঞ্চায়েত সমিতি রয়েছে। দ্বিস্তরীয় পঞ্চায়েত ভোটে দার্জিলিংয়ে ৫১৪টি এবং কালিম্পংয়ে ২৬৩টি ভোটদান কেন্দ্র থাকবে। দার্জিলিং জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৮৭,৯৫২ এবং কালিম্পংয়ের ১,৭৫,৯৩২।

সুভাষ ঘিসিংয়ের পরে পরে পাহাড়ে শুরু হয় বিমলের দাপট। রাজ্যে পালাবদলের পর ২০১১ সালে গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) গঠনের চুক্তি সই হয়। এই চুক্তিতে পাহাড়ে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা লাগু করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখনো জিটিএ আইন সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়নি। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের যুক্তি, এর ফলে পাহাড়ে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ভোট করার চেষ্টা করলে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আপাতত দ্বিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থাতেই খুশি থাকতে হচ্ছে পাহাড়বাসীকে।

পাহাড়ের এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, জোট রাজনীতিতে বিজেপির পুনরুত্থান। এর জন্য তৃণমূলের ‘একরোখা’ মনোভাবকে দায়ী করছেন পাহাড়ের রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের একাংশ। ২০১৭ সালে বিমলের নেতৃত্বে গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে তুমুল আন্দোলন হয় পাহাড়ে। রাজ্য সরকার সেই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের পথে যায়, ক্রমশ কোণঠাসা হতে থাকেন বিমল। গ্রেফতারি এড়াতে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। মোর্চার অন্দরে উত্থান ঘটে বিনয়ের। তৃণমূল কংগ্রেসও বিনয় এবং অনীতকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ২০২০ সালের শেষদিকে অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে এসে বিমল একতরফাভাবে তৃণমূলের প্রতি সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু তৃণমূল তাঁকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। বিমল তাঁর নেতৃত্বাধীন মোর্চার পক্ষ থেকে তিন আসনেই প্রার্থী দেন বিধানসভায়। অন্যদিকে বিনয় এবং অনীত বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলের হাত ধরেন। পাহাড়ের তিনটি আসনের একটি জিতে নেন তাঁরা। বিজেপি ধাক্কা খায়।

অনেকের অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে তৃণমূল পাহাড়ের অন্য নেতাদের ছেড়ে অনীতের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। বিমলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় বিজেপি। বিনয়ও তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি শিবিরে চলে আসেন। ইতিমধ্যে উত্থান ঘটে অজয় এডওয়ার্ডসের। বিখ্যাত গ্লেনারিজ রেস্তোরাঁর মালিক অজয় ছিলেন জিএনএলএফের নেতা। বিধানসভা নির্বাচনে তিনি দার্জিলিং কেন্দ্রে প্রার্থী হতে চান, কিন্তু দলের সুপ্রিমো মন ঘিসিং প্রার্থী করেন নীরজ জিম্বাকে। অজয় শিবিরের অভিযোগ, এর পিছনে ছিল বিজেপির চাপ। নীরজ জয়ী হন। অজয় জিএনএলএফ ছেড়ে তৈরি করেন হামরো পার্টি। পৌরসভা নির্বাচনে দার্জিলিংয়ে জয়ী হয় এই নতুন দল।

ওই ভোটে জেতার পরে অজয় রাজ্য সরকারের সঙ্গে একযোগে উন্নয়নের কাজ করার বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু তৃণমূল তাঁকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং কিছুদিন পরে ঠিক সমতলের মডেলেই হামরো পার্টির কাউন্সিলর ভাঙিয়ে পৌরসভা দখল করে অনীতের গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা। এর পিছনেও তৃণমূলের ইন্ধন থাকার অভিযোগ করে অজয় শিবির।

আরো পড়ুন ২০০৮ ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা রাখে আবাস যোজনা দুর্নীতি

এই সুযোগে ঘর গুছিয়ে নিয়েছে বিজেপি। জিএনএলএফ, সিপিআরএম আগে থেকেই তাদের সঙ্গে ছিল। গত এক বছরে তিন বড় শক্তি বিমলপন্থী মোর্চা, বিনয়পন্থী মোর্চা এবং হামরো পার্টিকে নিজেদের দিকে টেনে এনেছে তারা। তবে এই মহাজোটের অন্দরেও বিস্তর টানাপোড়েন। জিমখানা ক্লাবের ঐক্যের ছবিটা অনেকটাই অন্যরকম বুথ স্তরে। জোটের শরিকরা একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়েছেন বহু জায়গায়। মন ঘিসিং এবং নীরজের সঙ্গে এডওয়ার্ডসের চাপান-উতোরও প্রকাশ্যেই ঘটছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেকটাই নিশ্চিন্ত রাজু বিস্তা। নাগরিককে তিনি বললেন, “আঞ্চলিক নির্বাচনে আমরা খুব বেশি হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমরা চেয়েছি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করার বার্তা দিতে৷ তা অনেকটাই সফল।” তবে রাজুর ঘনিষ্ঠ শিলিগুড়ির এক বিজেপি নেতার কথায়, “এতগুলি পরস্পরবিরোধী শক্তিকে পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক মঞ্চে আনা গিয়েছে, লোকসভা নির্বাচনের আগে এটাই বিরাট সাফল্য।”

তৃণমূলের পাহাড়ের নেত্রী শান্তা ছেত্রী অবশ্য বলছেন, “মুখ্যমন্ত্রী বিপুল উন্নয়ন করেছেন। পাহাড়ের মানুষ তাঁর সঙ্গেই থাকবেন।” আর অনীতের কথায়, “বিমলরা অতীতের ব্যাপার। যতই বিজেপির হাত ধরুন, পাহাড়ে ওঁরা আর জমি ফিরে পাবেন না।”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.