ঈশ্বরের মেজাজ গেল বিগড়ে। মহাপ্লাবনের পর নোয়ার বংশধরেরা শিনার দেশের সমভূমিতে সবে আস্তানা গেড়েছে। থিতু হয়েই তাদের আহ্লাদী মনে এক দুঃসাহসী স্বপ্ন চাগাড় দিল – এমন এক নগর পত্তন করা চাই যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে একটি স্বর্গচুম্বী মিনার। আক্ষরিক অর্থেই স্বর্গচুম্বী, কারণ তার শীর্ষ স্বর্গের ভূমি ফুঁড়ে যেন পরলোকের বুকে কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে। ঈশ্বর খাপ্পা হয়ে গেলেন। এত কিসের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কিসের এত হম্বিতম্বি? সবে তো মহাপ্লাবন থেকে খাবি খেয়ে উঠল তোমার চোদ্দ গুষ্টি। মানুষের শখও ষোলো আনা। ঈশ্বরের নুন খেয়ে কোথায় তাঁর গুণ গাইবে, তা না, তাঁর কর্তৃত্বকেই খুন করতে চায়। বেপরোয়া হয়ে টক্কর নিতে চায় সরাসরি। হিব্রু জেনেসিস বলে, মানবজাতি তখন ছিল ঐক্যবদ্ধ আর তার ভাষাও ছিল এক। ভাষার অমন আশাতীত একাকার ছিল বলেই ওই বেয়াড়া আবদারের স্পর্ধা দেখায় তারা। খড়্গহস্ত ঈশ্বর আর দেরি করেননি। খড়্গের কোপ নয়, নেমে এল এক ধুরন্ধর দৈবিক শাস্তি। মানবজাতির নিবিড় আঁতাতকে চুরমার করতে তিনি ভাষাকেই দিলেন টুকরো টুকরো করে। মানুষ তার জিহ্বার বিভ্রান্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীর আনাচে কানাচে, ভেঙে গেল গোষ্ঠীতে। পড়ে রইল মিনার, উপহাসের পাত্র হয়ে। ঈশ্বর মুচকি হেসে সেবারের মত ক্ষান্ত হলেন।

টাওয়ার অফ ব্যাবেলের উত্থানকে রুখে দেওয়ায় একটাই লাভ হল – ভাষার বল্গাহীন বিবর্তন ছুটে চলল টগবগিয়ে। ব্যাবেলের সেই গল্প নতুন করে আঁচড় কাটে নোয়ম চমস্কির ইউনিভার্সাল গ্রামারের কথা পড়লে। মানুষের কথ্য ভাষাকে চমস্কি সেভাবে তোয়াক্কাই করেন না। তাঁর ধারণা মানুষের আসল লব্জ নির্বাক বসে রয়েছে তারই মস্তিষ্কে – নিটোল, সুশৃঙ্খল ব্যাকরণের নিয়ম মেনে। একে বলা হয় ইন্টারনাল ল্যাঙ্গুয়েজ। এর আধারেই তৈরি হয় আমাদের মুখের ভাষা, জিভের উচ্চারণ। চমস্কি বিশ্বাস করেন এই মুহূর্তে ভিনগ্রহের জীবেরা উড়ে এসে জুড়ে বসলে বেহদ্দ অবাক হয়ে বলবে, আরে! মানুষের ভাষা আসলে তো একটাই। বাকিগুলো তো উপভাষা (dialect); ভূগোলের মারপ্যাঁচে খামোখাই আঞ্চলিকতার কচকচানি। চমস্কি এই ভাবনার সপক্ষে যুক্তি দেন, মানুষের মুখের বুলি, সে ল্যাটিনই হোক কি বাংলা, ইন্টারনাল ল্যাঙ্গুয়েজের অন্তর্নিহিত কাঠামো থেকে সমান বখরা পেয়েছে। দেশকাল নির্বিশেষে মানুষের জবান আসলে সেই আদিম ব্যাকরণেরই ক্রীতদাস। সে বদলেছে কেবল সামাজিক, প্রাদেশিক রীতি নীতির প্যাঁচপয়জারের ফাঁদে পড়ে। উগান্ডার শিশুকে পশ্চিমবাংলার অবৈতনিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেখুন, সে গড়গড়িয়ে বাংলা বলবে আঞ্চলিক টান সমেত। এ শুধুই শুনে শেখা নয়, পড়ে জানা নয়, এ হল ভাষাকে জিনের ক্যানভাসে এঁকে দিয়ে যাওয়া বিবর্তনের খেলা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

উৎফুল্ল মানুষ কোমর বেঁধে নেমেছিল ভাষার মধ্যেকার এই আদিম খোলনলচের সুলুকসন্ধানে। সে দেখল ভাষা যদি একই কাণ্ডের গজিয়ে ওঠা ডালপালা হয়, তাহলে অনুবাদের একটা সার্বজনীন সূত্র তার মূলের গভীরে নিশ্চয় কোথাও লুকনো থাকবে। সেই কষ্টকল্পিত ভাবনার একটা উদ্ভাবনী দোআঁশলা ফসল হল মেশিন ট্রান্সলেটর। তবে মানুষ তো, ভাষা নিয়ে তার কপাল বরাবর খারাপ। যন্ত্র খাড়া হয়েছে একটা, তবে তাতে অনুবাদের দেবমন্ত্র এখনো ফোঁকা যায়নি। যন্ত্রকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেবে যারা, তারাই তো ভাষা নিয়ে হরদম গোলমাল করে। এই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুবাদ করতে গিয়ে উইলিয়াম রাদিচে বনমালী চরিত্রটার লিঙ্গ পাল্টে ফেলে কেলেঙ্কারি বাধালেন। তাঁর সাফাই হল, উপমহাদেশের বেশিরভাগ মহিলার নাম ‘ঈ’ স্বরধ্বনি দিয়ে শেষ হয়। এখানেও বনমাল +ঈ। সুতরাং তিনি নার+ঈ।

তবে এতে আটকায়নি কিছু। মেশিন ট্রান্সলেশন আসায় বরং জবাবদিহি ছাড়াই অনুবাদের হরদম আড়ংধোলাই চলছে। চাহিদার সঙ্গে জোগানের পুরনো আত্মীয়তা বজায় রেখে ফোঁপরা অনুবাদকদেরও তেমন ঠাসাঠাসি ভিড়। যোগ্যতা অবশ্য আজকাল কোনো মাপকাঠিই নয়, বুকভরা আত্মবিশ্বাসটাই আসল রাজা। সাহস করে নামতে পারলে বাকিটা গুগল ট্রান্সলেটর দেখে নেয়। দুর্বোধ্য অনুবাদে ন্যূনতম দায়বদ্ধতা কারোর নেই। বইবাজারের ভরা বসন্তে প্রকাশক দিব্য ঘুমন্ত, অনুবাদক তো চিরক্লান্তই, চাঙ্গা কেবল অনুবাদ যন্ত্র। দিতে যা দেরি, মুহূর্তে বঙ্গানুবাদ। হ্যাঁ, বাংলা অক্ষরমালা থাকবে এটুকুই নিশ্চিন্তে বলা যায়, বাকিটা কপালজোরের হিসাবনিকাশ। বললাম “life is full of problems that are, quite simply, hard”। গুগল ট্রান্সলেটরে খাবি খেয়ে দাঁড়াল “জীবন এমন সমস্যায় পূর্ণ যেগুলো, বেশ সহজ, কঠিন।” চমৎকার! কাজেই সাড়ে তিন পাতার আড়মোড়া ভেঙে অনুবাদ উপন্যাস চলল শেলফের সব চেয়ে দুরূহ কোনায় একটু গা গড়াতে। তারপর … তারপর মরণঘুম! ক্রেতা-কাম-পাঠক গেল ভুলে ওই শিরোনামের কোনো বইকে গাঁটের কড়ি দিয়ে বড় সাধ করে আপ্যায়ন করেছিল সে।

পাঠকদের অবশ্য অনুবাদে আসক্তির পিছনে একটা ব্যাখ্যা রয়েছে, আর অশেষ ধৈর্যের সমর্থনে আরেকটা দীর্ঘ ইতিহাসও আছে। সে ছেলেবেলা থেকেই একটা আনুমানিক তত্ত্ব শুনছে, যা সহজপাচ্য তা কক্ষনো সাহিত্য বা শিল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয় না। কাজেই সে তার মত করে বুঝেছে, আঁতেল হতে গেলে সর্বদাই জনপ্রিয় জিনিসের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতে হয়। লোকের খুব মনে ধরা, বাজারে দ্রুত কাটতে থাকা, নয়ত বক্স অফিসে বাজিমাত করা সব মালপত্রই আদপে যে নিম্নমেধার দ্বারা এবং নিম্নমেধার জন্যই – এই উপপাদ্যকে সে বেদবাক্য জ্ঞান করে মুখস্থ রাখে। তাই মনের ভুলে ছয় মাত্রার ডবল দাদরায় পা নেচে উঠলে ভিতরে ভিতরে ইজ্জত খোয়ানোর শঙ্কা হয়, বিলায়েত খাঁয় মাথা দোলানো যেতে পারে। তার মাথা-কোটা বিশ্বাস, সমস্ত গভীর বিষয়ই প্রথমটায় মাথা ছুঁয়ে ট্যানজেন্ট হয়ে বেরিয়ে যায়। ব্যাপারটা গুলে খাওয়াতে কিছু সাংস্কৃতিক পেশাদার কাগজ-কলম-বক্তৃতা মজুত রাখেন, যাঁদের নিবন্ধ-কাম-ছাত্রবন্ধু পড়লে তবেই আবিষ্কার করা যায় অমুকের তমুক লেখাটার ওই অধ্যায়ে এতদিন তবে এই গোপন বার্তাটিই ঘাপটি মেরে ছিল। দ্যাখো কাণ্ড! কিংবা ওই সিনেমার সেই দৃশ্যটার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটা তবে এই দাঁড়াল। কাজেই আক্ষরিক অনুবাদে হোঁচট খেতে খেতে ক্ষতবিক্ষত হওয়াটাকে গুরুপাক আহারের বদহজমজনিত স্বাভাবিক লক্ষণ ভেবে সে গায়ে পুলক মাখে। যন্ত্রের অপারগতাকে, অনুবাদকের অজ্ঞানতাকে সে সাহিত্যের অগাধ সৃজনশীলতা বলেই নাগাড়ে গোলায়। ভাষান্তরের সীমাবদ্ধতাকে তার সন্দেহ হয় শিল্পের চোরা সংকেত বলে।

সূক্ষ্মতা বা গভীরতার সঙ্গে জনপ্রিয়তা ও সহজবোধ্যতার চিরকালীন কোন্দল একেবারে গালগল্প নয়, তবে ‘দুর্বোধ্যতার আড়ালে কোনো নিশ্চিত শৈল্পিক ব্যঞ্জনা আছে’ – এই একগুঁয়ে সংজ্ঞায় মস্ত গোঁজামিল রয়েছে। কাজেই যান্ত্রিক অনুবাদের ছত্রে ছত্রে নিষ্প্রাণ ভাষান্তর যতই ঘুমের অব্যর্থ ওষুধ হোক, জিভ ফসকিয়ে আজ অবধি পাঠক রা কাড়েনি, পাছে লোকজন ঠারেঠোরে তাকেই আকাট ঠাউরে বসে। পাঠক সত্যিই ন্যাড়া হলে, বেলতলাকেই সান্ধ্যভ্রমণের স্থায়ী জায়গা বানাত। কারণ পরেরবার বইমেলায় আবার গুচ্ছের অনুবাদ কিনে ঘরে তোলাটা তার একপ্রকার ভবিতব্য। দুর্বোধ্যকে কালো পতাকা দেখাতে গিয়ে তার এই নিত্য হাত কচলানি যে শুধুমাত্র অনুবাদের ক্ষেত্রেই বরাদ্দ, তার আরও একটা কারণ হল অনুবাদে দেশি নামের সঙ্গে একটা বিদেশি নাম জড়িয়ে থাকায় ঔপনিবেশিক মানসিকতা প্রথম প্রেমের মতই একটু টনটনিয়ে ওঠে। যা দুর্বোধ্য গুরুপাক তা সৃজনশীল ও নান্দনিক – এই নাক উঁচু মনোভাবের নোয়াপাতি ডিভিডেন্ড কামায় ডামাডোলের বাজারে পঙ্গপালের মত উড়তে থাকা অনুবাদক, যে নামমাত্র পারদর্শিতা এবং একটা ভাসা ভাসা সংকল্প না রেখেও অনুবাদের দোকান দিয়ে ফেলে। আর তাই ডজনখানেক বিদেশি ডিম দেশি খোলায় পেড়ে ফেলার পরেও অনুবাদকের এই ন্যূনতম উপলব্ধি আসে না, যে শব্দের শুষ্ক রূপান্তর আর যাই হোক কোনোভাবেই অনুবাদ সাহিত্য নয়। সময় ও একাগ্রতার পুরোটাই গুগল পাদদেশে নিঃশর্ত সমর্পণ করলে, বিদ্যেবুদ্ধিও তারই চরণতলে একচেটিয়া সঁপে দিতে এতটুকুও কার্পণ্য না দেখালে, অনুবাদের দীনতা যে আমাদের অযাচিত নিত্যসঙ্গী হবে তাতে আর আশ্চর্য কী?

বর্ণমালা যদি হাতেগোনা কিছু চিহ্ন হয় তবে ভাষা সেই সীমিত চিহ্নের উপর বয়ে চলা এক উচ্ছ্বসিত প্রবল স্রোতধারা। মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন মানুষকে খুঁটি জুগিয়েছে অভিব্যক্তির এই বিস্ময়ধারাকে তিলে তিলে গড়ে পিটে নিতে। নিজের তাগিদে অবোধ শিশুও তার ছেঁড়াখোঁড়া নগণ্য শব্দভাণ্ডারকে যে চাতুর্যের সঙ্গে কাজে লাগায় তার ন্যূনতম ধারণাও কোনো সুপার কম্পিউটারকে চিরতরে বিমূঢ় করে দিতে পারে। সদ্য অঙ্কুরিত শৈশব যতই আধো আধো বোলে হোঁচট খাক, তার বয়স কিন্তু লক্ষ বছরের মানব বিবর্তনের সমান। সুতরাং তার কগনিটিভ স্কিল সুপার কম্পিউটারকে পদে পদে তাচ্ছিল্য করে ঘোল খাওয়াবে, এটাই বরং প্রত্যাশিত। মেশিনের মূল প্রতিকূলতা হল, তার বোধ বা বিচারশক্তির কোনো জন্ম বা জৈবিক বিবর্তন নেই। অথচ মানুষ সততই বিবর্তনশীল, তার ভাষাও। ভাষা নির্দ্বিধায় তার উপকরণ সংগ্রহ করে তারই ভৌগোলিক পরিমণ্ডল থেকে। সামাজিক বাতাবরণের উত্থান পতনের ফাঁকফোকরে কখন কায়দা করে আদায় করে নেয় তার নিজস্ব চলনের রীতি রেওয়াজ। লোকগাথা, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতার জোরালো প্রতিফলন ঘটবে তার ছত্রে ছত্রে। সংস্কৃতিও তার নিজস্ব সব ঐতিহ্য, যাবতীয় পরম্পরাকে উজাড় করে দেবে ভাষার নির্বন্ধে। আবেগ ,অনুভূতির কত শত নতুন নাম হুড়মুড়িয়ে নেমে আসবে শব্দের আনাচে কানাচে। আর তাই অনুবাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকও হল ভাষার সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা।

তর্জমাকে যতই নিখুঁত করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চলুক, ভাষার সাংস্কৃতিক উপাদানগুলিকে অচ্ছুৎ করে রাখলে তা ভস্মে ঘি ঢালারই নামান্তর। সেক্ষেত্রে অনুবাদ গল্প-কবিতাতে মনোনিবেশ করা দূরস্থান, বরং তা থেকে শতহস্ত দূরেই আমরা স্বস্তির শ্বাস নেব। সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা কেমন বেসুরো আচরণ করতে পারে তার একটা প্রাঞ্জল নমুনা: জাপানিদের চোখে পশ্চিমীরা বড্ড রূঢ় স্বভাবের, সবজান্তা, বদমেজাজি, বেশ অহঙ্কারী। এদিকে স্বভাববিনয়ী জাপানিরা আবার পশ্চিমীদের ভাবনায় অতিরিক্ত মুখচোরা, নড়বড়ে প্রকৃতির, একদম স্মার্ট নয়, একটু ক্যাবলা গোছের। এ জাতীয় প্রতিবন্ধকতার ঘেরাটোপকে ধূলিসাৎ করতে অনুবাদককে কী অক্লান্ত পরিশ্রমটাই না করতে হয়! ভাষার সংস্কৃতি এবং তার ব্যাকরণের মারপ্যাঁচকেই শুধু গুলে খেলে চলে না, বুঝতে হয় ওই ভাষার বাচনভঙ্গির ওঠাপড়া এবং মেজাজ, স্থানীয় কথকদের অভ্যাস-বদভ্যাস, এমনকি মুদ্রাদোষও। অনুবাদককে সর্বক্ষণের নির্ভেজাল শ্রোতা হতে হয়, আজীবন ব্রত থাকে চূড়ান্ত মনোযোগী পাঠক হওয়ার। পৃথিবীর যে কোনো ভাষার সাংস্কৃতিক পটভূমি বন্ধক থাকে তারই বাগধারার কাছে। পেশাদার অনুবাদককে বাগধারাগত খুঁটিনাটি নিয়েও সারাক্ষণ সজাগ থাকতে হয়। তাছাড়া লক্ষ্যভাষায় উপযুক্ত শব্দের অভাব তো রয়েছেই। কিছু শব্দ হারিয়ে যাবেই অনুবাদের জাবদা খাতায়। যেখানে আক্ষরিক অনুবাদ সম্ভব নয়, সেখানে উপযুক্ত বিকল্প খুঁজতে হয় সাম্যের শর্ত মেনেই, প্রয়োজন হতে পারে সৃজনশীল কল্পনার নিক্তি মাপা আঁচড়। তবেই তো অনুবাদে উৎকর্ষ আসবে। এককালে রুশ অনুবাদ সাহিত্যকে ঠিক এই কারণেই অগাধ ভালবাসা দিয়েছিল বাঙালি। সকল বৈপরীত্য উপেক্ষা করেও তাদের মনে হয়েছিল বিভূতিভূষণ আর দস্তয়েভস্কির দূরত্ব কেবল এপাড়া ওপাড়া। রাশিয়া বোধহয় নতুন কোনো বৃহত্তর বাংলা।

আরো পড়ুন কবিতা অনুবাদ: অর্জন, অপচয়, সর্জন

অবশ্য এসব প্রত্যাশার ছিটেফোঁটাও গুগল অনুবাদকের কাছে রাখতে নেই। নিষ্ফলা যন্ত্র-অনুবাদের তর্জন গর্জনই সার। তাকে “a large bulk of content”-এর অনুবাদ করতে দিলে সে নিমেষে উত্তর দেয় “কন্টেন্ট একটি বড় বালক”। তাতে অবশ্য নতুন করে গৌরবহানির কিছু ঘটে না; অনুবাদের আসরে নেমে তার ধারাবাহিক নাকাল হওয়ার এই বেইজ্জতির খতিয়ান সুদীর্ঘ। গুগলকে মানুষ করতে সব পরিশ্রমই পণ্ডশ্রম, কারণ সিলিকনসর্বস্ব যন্ত্র শুরু থেকেই বিস্তর অবহেলা করেছে ভাষার প্রয়োজনীয়তা বোঝার প্রচেষ্টাকে। শব্দের প্রেক্ষাপট সে যাচাই করতে চেয়েছে আপাদমস্তক উদাসীনতা নিয়ে। বাগধারার অর্থ খুঁজতে তার প্রবল গড়িমসি আর তীব্র অনীহা। এ সবই অবশ্য তার অপারগতাই বটে। প্রসঙ্গ এবং উপলক্ষ্য – এই দুইয়ের সম্ভার যে আদপে অনুবাদের প্রধান চাবিকাঠি – এ শিক্ষা তাকে দেবে কে? প্রেক্ষাপটকে মুঠিবন্দি না করা অবধি ভাবার্থের নির্যাসকে শব্দবন্দি করা যায় না, পদে শিশুসুলভ বেসামাল হওয়াই তার নিয়তি – একথা বুঝিয়ে দেবার কোনো প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ হয় কি? ওদিকে যান্ত্রিক অনুবাদের জীবনপণ উদ্যোগের পুরোটা জুড়েই রয়ে যায় শব্দকে ‘ডিকোড’ করার মিথ্যে শোরগোল। যেন ভাষা কোনো দুর্বোধ্য হেঁয়ালি আর শব্দ হল তার সমাধানসূত্র। তাই অ্যালগরিদমের ছাঁচে উপুড় করে, সিনট্যাক্স-সিমানটেক্সের কল ঘুরিয়ে পেষাই করেই নির্ভুল মার্জিত অনুবাদের দিবাস্বপ্ন দেখা যায়। পাঠক দেখবেন যা হল তা অন্তঃসারশূন্য, সারবত্তাহীন শব্দকল্পদ্রুম।

শব্দ অঙ্ক নয়, যে “hence proved” লিখে দাসখত দিতে হবে। ঠিক-ভুলের সংকীর্ণ হিসাব যেদিন অনুবাদের গুণগত মান নির্ধারণ করবে সেদিন সাহিত্যে হয়ত তার কানাকড়ি প্রাসঙ্গিকতাও হারাবে। দুঁদে অনুবাদকও বেশক জানেন – ত্রুটিবর্জিত, পূর্ণাঙ্গ নির্ভুল নিটোল অনুবাদ প্রায় ইউটোপিয়া। কাজেই তাঁকে ভাষান্তরে হাত দিতে হবে সব বাধ্যবাধকতা মেনে, লোকসানের অঙ্ক কষে। “কতশত গভীর অনুভূতি, বিবৃতিও হারিয়ে যায় অনুবাদের দুর্গম অভিযানে” – এই ধারণাকে শিরোধার্য করেই অনুবাদককে নিয়ম ভাঙার খেলায় নামতে হবে। শর্ত থাকবে, কোনো জবাবদিহি না করেই রুলবুককে তিনি ছিঁড়ে কুটিকুটি করতে পারেন। উড়িয়ে দিতে পারেন শব্দের আবছায়া প্রান্তরে। তুলে নিতে পারেন শব্দভাণ্ডারের সব চেয়ে অবাঞ্ছিত অপ্রচলিত কোনো শব্দকেও। তাঁর কলমে নিয়মের অপ্রত্যাশিত ভাঙন নামতে পারে আগাম বলা কওয়া ছাড়াই, খাদের কিনারায় গিয়েও আসতে পারে কোনো শিরশিরে বাঁক। এসবই কিন্তু ঘটবে ভাষান্তরের প্রাসঙ্গিকতাকে বজায় রাখতে, নিজের বিনোদনের জন্য নয়। ভাষা আমরা শিখি না, অর্জন করি। খেলার সঙ্গী হয় সে, মিথ্যের নাছোড় সাক্ষী, নিজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের মত ব্যবহার করি তাকে, সে কখন যেন আমার রিফ্লেক্সের অংশ হয়ে ওঠে। আমি দ্বিভাষিক বা ত্রিভাষিক হলেও আমার নাড়া কিন্তু বাঁধা থাকে মাতৃভাষার চৌকাঠে। “…languages are formed in different landscapes through different experiences.” জানি না কে বলেছিলেন। তবে সত্যি করে বলুন তো, এর আদৌ কোনো বাংলা হয়? নাকি কেবলমাত্র দ্বিভাষিক হওয়ার তাজ্জব রেলা পেশ করলেই নিজেকে অনুবাদক বলে হামেশা কলার তোলা যায়?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.