প্রাককথন

কৈশোরে বা যৌবনে আমার আগ্রহ ছিল প্রবন্ধে। গত শতকের আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে নয়ের দশকের গোড়া অবধি শান্তিনিকেতনে, গতবছরের একটি কৌরব [i] বা বোবাযুদ্ধ [ii] পত্রিকা পাওয়ার থেকে, গ্রান্টা বা নিউ লেফট রিভিউ পত্রিকার গতমাসে প্রকাশিত সংখ্যাটি পাওয়া সহজ ছিল। মানে এভাবেই আমি নিজেকে বুঝিয়েছি। না হলে রাঢ়বঙ্গের মুদ্রণ সংস্কৃতি চর্চায় যার আগ্রহ সে বুড়ো বয়সের আগে উদয়ন ঘোষ পড়বে না কেন? বয়সকালে, মূলত প্রবন্ধ বা ইতিউতি কবিতা খুঁজলেও আমি লিটল ম্যাগাজিনের কাছে ফিকশন খুঁজিনি এবং সে কারণে অদ্যাবধি লজ্জায় কুঁকড়ে আছি।

শান্তিনিকেতন থেকে গত শতকের সাতের দশকে প্রকাশিত বারান্দা [iii] বলে একটি আপাত দীর্ঘদিন মৃত পত্রিকায় শিবাদিত্য সেন মোটামুটি এরকম একটা কিছু লিখেছিলেন যে লিটল ম্যাগাজিনগুলো মাঝে মাঝে মরে যায়। ফলে লিটল ম্যাগাজিন বাংলা সাহিত্যের একটি তর্কসাপেক্ষে মৃত মুহূর্ত। সেই জগৎটিতে আমার প্রথম প্রবেশ কৈশোরে, কবি সার্থক রায়চৌধুরীর হাত ধরে। এটা ওটা কবিতার পত্রিকা সে আমাকে পড়তে দিত আটের দশকে। সেজন্য প্রতি গ্রীষ্মের, শারদোৎসবের আর পৌষের ছুটিতে আমি অপেক্ষা করতাম – সার্থক কবে কলকাতা থেকে কী বই নিয়ে আসবে। পরে আমার প্রিয় বন্ধু-সম্পাদক বোলপুরেরই, তখন তরুণ, কবি সব্যসাচী সান্যাল আটের দশকের একেবারে শেষের দিকে কৌরবের কয়েকটি সংখ্যা পড়ায়। ততদিনে আমি কিছুটা এক্ষণ [iv] আর অনুষ্টুপ [v] নিজে যোগাড় করে পড়েছি। কিন্তু যাকে বলে লিটল ম্যাগাজিনের তীক্ষ্ণ লেখালিখি, তার সঙ্গে আমার পরিচয় আশ্চর্যভাবে অনেক পরে, মূলত স্বল্পপঠিত বাংলা বইপত্রের পুস্তক-তথ্য পঞ্জীকরণের কাজে জীবন উৎসর্গ করে ফেলা ভ্রাতৃপ্রতিম সোমনাথ দাশগুপ্তের পাল্লায় পড়ে। তার মাধ্যমে আলাপ হয় সৈকত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বাংলা ভাষার স্বল্পপঠিত লেখকদের আমি যতটুকু বুড়ো বয়সে প্রথম পড়েছি বা নতুন করে পড়েছি তার অনেকটাই আমার শিক্ষকসম এই দুই অনুজপ্রতিমের মাধ্যমে। আর কিছু পড়া হয়েছে পড়ুয়া বন্ধু তাপস দাশ এবং একেবারে তরুণ বয়সী লেখক শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উৎসাহে। গুরু সম্ভাষণ সেরে লেখাটি আরম্ভ করা গেল। বস্তুত উদয়নের কাজের প্রথম প্রকাশ গত শতকের ছয়ের দশক থেকে (যতদূর জানা যাচ্ছে) এ শতাব্দীর শূন্য দশক অবধি চলেছে এবং একেবারে অন্ধ ছিলাম বলেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তার প্রথম অভিঘাতের আঁচ গায়ে লাগেনি। যিনি একা একা মরে গেছেন, ঈশ্বরের আশীর্বাদে তাঁর লেখা একা একা আমায় পড়তে হচ্ছে না। সে কারণেই সৈকতকে রাজি করিয়েছিলাম এই আলোচনার জন্য।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বোধিসত্ত্ব: উদয়ন ঘোষের লেখা – এই হল আজকের মূল বিষয়। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই, কারণ সোমনাথ আর তোমার মধ্যেকার আলোচনায় আমার প্রথম উদয়ন নিয়ে আগ্রহ বাড়ে। সোমনাথ আমাকে বারবার বলে, বোধিদা, তুমি উদয়ন পড়নি কেন? তারপর ২০০৬-০৭ নাগাদ তোমার কাছে আমি প্রতিক্ষণ থেকে বেরনো গল্প সংকলনটা নিলাম, এবং কুয়োতলা সিরিজের গল্পে আসানসোলের জলকষ্টের প্রসঙ্গ আসছে দেখে চমৎকৃত হয়েছিলাম। মনে হল একটা জগৎ খুলে গেল। এ জন্যে আমি, সোমনাথ আর তোমার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। তোমার পড়াশুনোয় উদয়ন [vi] কীভাবে এলেন? ওঁকে পড়তে গেলে তো লিটল ম্যাগাজিন ছাড়া পড়া সম্ভব না। তো তোমার পড়ায় লিটল ম্যাগাজিন কীভাবে এল সেটাও একটু বলো।

সৈকত চট্টোপাধ্যায়: নয়ের দশকে, মানে ১৯৯৫ সালে, আমি প্রথম পড়ি। উদয়নের কিছু গল্প নিয়ে প্রতিক্ষণ [vii] যে সংকলনটা বের করেছিল, আমি সেবছরই বইমেলাতে বইটা কিনি। স্কুলজীবনের রহস্য রোমাঞ্চ, আনন্দমেলা ইত্যাদি ছাড়িয়ে একটু উঁচু ক্লাসে সল্টলেকের বি জে ব্লকের পাড়ার লাইব্রেরিতে ৯১-৯২ সাল নাগাদ আমি সতীনাথ ভাদুড়ি পড়ি। আবার জীবনানন্দের মাল্যবান [viii]এর নিউ স্ক্রিপ্ট থেকে বেরনো প্রথম সংস্করণটাও, সম্ভবত ১৯৭৩-৭৪ এ প্রকাশিত (অনুলিখনে অপরিবর্তিত) ওই লাইব্রেরিতেই আমার হাতে আসে, যেটাতে অমলেন্দু বসুর লেখা একটা ভূমিকা ছিল, প্রচ্ছদটা একেবারে অন্যরকম ছিল। পরে আমি ভেবে দেখেছি, জীবনানন্দের গদ্য বলতে ওই একটি লেখাই তখন দুষ্প্রাপ্য হলেও অন্তত পাওয়া যেত, জীবনানন্দের অন্য গদ্যের বড় করে প্রকাশ তো অনেক পরে…

বোধিসত্ত্ব: আমার একটু অবাক লাগছে, জানো? পাড়ার লাইব্রেরিতে বাংলা উনবিংশ শতকের ক্লাসিক্সের সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষাকৃত সমসাময়িক বিংশ শতকের তিনের দশকের পরের ‘আধুনিক’ সাহিত্য থাকছে এটা খুবই ইন্টারেস্টিং। এরও হয়ত কিছু বিশেষ সামাজিক ইতিহাস আছে।

সৈকত: …লাইব্রেরিটাতে বাংলা সাহিত্যের বিশ শতকের অনেক দিক বদল করা বই ছিল। আমি উনবিংশ শতকের ক্লাসিক্স বরং পরে পড়েছি। যে কোনো কারণেই হোক, আমি রবীন্দ্রনাথ ভাল করে পড়ার আগে কিন্তু সতীনাথ ভাদুড়ির জাগরী, তারাশঙ্করের মন্বন্তর পড়েছি। মাণিকবাবুর অনেক কিছুই পড়েছি। লেখা যখন লাইব্রেরিতে গিয়ে নিজের পছন্দ মত পড়ার সময় এল, ওই ক্লাস নাইন-টেন নাগাদ, অর্থাৎ ৯১-৯২ সালে, আমার মন কিন্তু বিংশ শতকের লেখার দিকেই আমাকে আগে টেনে নিয়ে গেছে। যাদবপুরে কলেজ ফেরত, উল্টোডাঙা স্টেশনের কাছে সুনীলদার দোকান [ix] থেকে দেবেশ রায় আমার হাতে আসে। মানে ওঁর সাতের দশকের লেখালিখি। আবার মাঝে মাঝে কলেজ স্ট্রিট যাওয়া শুরু করেছি। আমার মনে আছে হঠাৎ একটা ব্রাদার্স কারামাজভ-এর সংক্ষিপ্ত ভার্শন হাতে এল, পড়লাম। কী পড়ব একটা ধারণা তৈরি হচ্ছিল। একটা লেখা আরেকটা লেখার খবর দিতে থাকে, যেমন হয়…

বোধিসত্ত্ব: একটা সেলফ ডিসকভারি তোমার তখন চলছিল হয়ত।

সৈকত:…৯৪-৯৫ নাগাদ, পাঁচের দশকের গদ্যলেখকদের সম্পর্কে, মানে সুনীল, শীর্ষেন্দু বাদ দিয়ে, আমার একটা আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়ে গেছে। তখন থেকেই বইমেলায় যেতে শুরু করি। কোন স্টলে কী পেতে পারি, তার একটা ঘুরে ঘুরে খোঁজা শুরু হয়। নয়ের দশকের মাঝামাঝি প্রতিক্ষণের সিরিজটা থেকেই আমি হয়ত প্রথম অসীম রায়ের [x] লেখার কথা জানতে পারি। পরে হয়ত অরুণা প্রকাশনী থেকে বেরনো ওঁর বই কিনেছি। প্রতিক্ষণ পত্রিকা এবং যাকে বলা যায় তাঁদের ‘অফ-ব্রডওয়ে’ প্রকাশনা তখন সন্দীপন, দেবেশ, দেবর্ষি সারগী, উদয়নদের লেখা ছাপে। তখন আনন্দবাজার, দেশ পত্রিকার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে ওটা একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল [xi]।

গদ্যভাষা আমাকে টানতে আরম্ভ করে। তো আমি গদ্যের খোঁজে যেমন লেখক খুঁজছি, তেমন পত্রিকাও খুঁজছি, যেখানে তাঁদের পাব। কৌরব থেকে ১৯৯৮ নাগাদ কনকলতা কিনলাম। ২০০৫ নাগাদ প্রদীপ ভট্টাচার্যরা একালের রক্তকরবী [xii] (পরে যেটার নাম হয় উর্বী প্রকাশনী) থেকে অবনী বনাম শান্তনু [xiii] নাম দিয়ে উদয়নের বই বের করেছিলেন, দুটো নামচরিত্রকে নিয়ে কিছু গদ্যের সংকলন। স্বপন বলে যে রাজনৈতিক চরিত্রটা যাকে নিয়ে লেখা, বন্দুকের নল থেকে একদা [xiv], সেই বইটা ২০০৯-২০১০ নাগাদ বর্ণালী প্রকাশন থেকে জোগাড় করি। সেই মহাত্মা গান্ধী রোডের ইন্দ্রবাবুর [xv] সুবর্ণরেখার অফিস যেখানে, সেই বাড়িটা থেকে। বিষয়মুখ (বিকাশ গণ চৌধুরী এবং দেবাশিস বিশ্বাস সম্পাদিত) এবং বোবাযুদ্ধ পত্রিকারও খোঁজ পেলাম ২০০০-এর প্রথম দশকে। বিষয়মুখ পত্রিকার খোঁজ নিয়ে তো আমার বেশ রোমহর্ষক গল্প রয়েছে। আমি খোঁজ নিয়ে মনোহরপুকুর রোডে দেবাশিসবাবুর বাড়িতে যাই এবং আলাপ করি। তাঁদের পত্রিকায় কোনো একটা সংখ্যায় আমি অরূপরতন বসুর জীবনানন্দের উপরে একটা বিখ্যাত প্রবন্ধ পড়ি। পাতিরাম [xvi] থেকেই হয়ত জোগাড় করেছিলাম। জারি বোবাযুদ্ধ এবং বিষয়মুখ পত্রিকাতেই উদয়নের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়। বিষয়মুখ কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের লেখা ছাপিয়েছিল, পুনর্দর্শনায় উপন্যাসটা ছেপেছিল ২০০১ সালে [xvii]।

মানে ধরো, ১৯৯৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত আমি উদয়ন যোগাড় করে পড়ি। উদয়নের গদ্যের ঘোর আমাকে অনেক বই খুঁজে পড়তে বাধ্য করেছে। বিভিন্ন প্রকাশনীর খোঁজ রেখে আমি যেমন উদয়নের নয়ের দশকের আগের লেখাগুলো খুঁজে পড়ছিলাম; অবনী, শান্তনু ও স্বপনের খোঁজ রাখছিলাম, তেমনই নয়ের দশকের পরের উদয়নের লেখাগুলো আমি এই পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে জোগাড় করে পড়ছিলাম। শেষ উদয়ন ঘোষ হল ২০২৩ সালে, আমি এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে [xviii]। গ্রাফিত্তির বই, হাতিবাগান চত্বরের একটা পুরনো বইয়ের দোকান থেকে হাতে পাই। ওখানেই আমি দেবর্ষি সারগীর পুরনো বইও কিছু পাই।

আমার একটা কথা মনে হয়, জানো? স্বল্পপঠিত লেখকদের ক্ষেত্রে ধরো আমার মত যারা তাঁদের খুঁজে খুঁজে পড়েছে, আর যারা সেই লেখকের বিভিন্ন সময়ের সম্পাদক বা আর্কাইভিস্ট, তাদের যাত্রা একটি বন্ধুর পথে। গদ্যের টানে তারা এক অর্থে সহযাত্রী। লেখকরা হয়ত এরকম একটা কাকতালীয়ভাবে তৈরি হওয়া রিডার কমিউনিটি/পাঠকবর্গ তৈরি হবে, কখনো ভাবেনইনি।

বোধিসত্ত্ব: হ্যাঁ লেখার বা পড়ার কাজটা, এক ধরনের সৎ অর্থে, যতটা একলা ভাবা হয়, ততটা বোধহয় একলা নয়।

আচ্ছা সৈকত, এই যে বিষয়ের থেকেও ভাষা বা শৈলী তোমাকে টানে বেশি, উদয়ন কিন্তু ভাষা সৌকর্যে খুব যত্ন নিয়েছেন সবসময় তা নয় [xix]। বিষয় থেকেই ভাষা উঠে আসছে। শৈল্পিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা প্রকরণ – কোনোটাকেই তিনি খাটো করতে রাজি নন।

সৈকত: ওই প্রতিক্ষণ প্রকাশিত সংকলনের ‘ভূমিকা/লেখালিখি’ থেকে একটু পড়ছি:

‘সর্বাপেক্ষা বিপদে পড়ি যখন শুনি, আপনার স্টাইল সন্দীপনের মতো – সন্দীপন আপনাকে সম্প্রসারিত করেন।

গদ্য তো মুখের ভাষা – আমি তো মুখের ভাষাতেই লিখি বলে ভাবি। আমার আর সন্দীপনের ভাষা এক নয়, সন্দীপনের মুখের ভাষা তথা গদ্য কত আকর্ষণীয় – তুলনায় আমার মুখে ভাষা কত ক্লামজি, আর আমার গদ্য, আমার চিঠি যাঁরা পড়েন তাঁরা জানেন ভালো, কত এলোমেলো, মোটেই স্মার্ট নয়।

অথচ শুনি উদয়ন ঘোষের গদ্য কত স্মার্ট, শুনে শুনে এক সময় মনে হয়, আমি কি উদয়ন ঘোষ?’[xx]

অথবা, অবনী বনাম শান্তনু সংকলনটিতে ছাপানো, বোবাযুদ্ধের সম্পাদক প্রচেতা ঘোষ, তাপস ঘোষদের দেওয়া সাক্ষাৎকার [xxi] থেকে:

‘আমাদের বাংলা গদ্যের একটা ট্র‌্যাজেডি আছে। ট্র‌্যাজেডিটা হল এই যে, আমরা যারা শিক্ষিত, শহুরে শিক্ষিত, তারা উত্তরাধিকার সূত্রে যে গদ্যটা পেয়েছিলাম, সেটা কিন্তু আদিতে ছিল, টেক্সট বুক অ্যান্ড ট্রান্সলেশন, অর্থাৎ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গদ্যটাকে আমরা বহন করছি। যেটা লেখার ব্যাপার, বলার ব্যাপার নয়। কিন্তু গল্পটা বলাই ভালো এটা মনে হতো। এটা আমি ধরতে পেরে গেছিলাম।’

অবনী এবং শান্তনু সম্পর্কে যে লেখাগুলো, দেখবে তার একটা প্রবহমানতা আছে কারণ উদয়ন লিখতে চাইছেন মুখের ভাষায়।

বোধিসত্ত্ব: ওঁর লেখায় সাংবাদিকসুলভ প্রতিবেদনধর্মিতা সত্যিই নেই। উনি গদ্য কাহিনীর একটা নতুন ভাষা খুঁজছেন। বাঙালী লেখকরা মার্কেজ পড়ার পরে, প্রতিবেদনধর্মিতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন, সাংবাদিকধর্মী গদ্যের ব্যবহার বাড়ছে সমসাময়িক বিশেষত রাজনৈতিক প্রেক্ষিত তৈরি করার ক্ষেত্রে, কিন্তু উদয়নদের প্রজন্ম তার আগের প্রজন্ম।

এটা কি কাকতালীয় যে সমর সেন, জীবনানন্দ স্বয়ং, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, যাঁরা গত শতকের তিনের দশক থেকে স্টলওয়ার্ট, তাঁরা প্রত্যেকেই ইংরেজি বা অন্য ইউরোপিয় ভাষায় যথেষ্ট দক্ষ, কেউ ইংরেজির অধ্যাপক? জয়েস, প্রুস্ত এঁদের ভাবাচ্ছেন। সর্বৈব এবং শর্তহীন সততা তথা সত্যকথনের তাগিদেই কি ‘স্ট্রীম অফ কনশাসনেস’ পদ্ধতিটি তাঁর মনে ধরছে?

সৈকত: যা দেখছেন যা ভাবছেন, সেটাকে কেবল বলে যাচ্ছেন। ঠিকই বলেছ। বিংশ শতকের পাঁচের দশক থেকে পৃথিবী জুড়ে নানা দেশের নানা ভাষার সাহিত্যে, কলোনিগুলোতে যা কাজ হয়েছে, সেগুলো কিন্তু কাফকা, জয়েস, প্রুস্ত, কামুকে এড়াতে পারেনি। যে যেমন লেখাই লিখুন না, যে রাজনীতিতেই আকৃষ্ট হোন না কেন, ওই চারজনের সমসাময়িকতা নিয়ে, মানবজীবন নিয়ে যে মূল ভাবনাচিন্তা, তা কিন্তু প্রায় সকলকেই প্রভাবিত করেছে। সারা পৃথিবীর সাহিত্য পড়ুয়াদের কাছে এই চারজন এবং দস্তয়েভস্কি, আবার সিনেমা পরিচালকদের মধ্যে বার্গম্যান (উদয়ন উল্লেখ করেছেন বিয়ারম্যান হিসাবে), ফেলিনি – এঁরা আর বিদেশি দূরাগত কেউ নন। উদয়ন এঁদের সবার সঙ্গে আবার নিজের প্রভাবের মধ্যে জীবনানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথকে জুড়ে নিয়েছেন। উদয়ন নিজেই বলতেন, পাঠক বলেন উদয়ন বলে কেউ নেই, আছেন জীবনানন্দের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, গানের রবীন্দ্রনাথ, গদ্যভূমির দস্তয়েভস্কি, গ্যাম্বলার দস্তয়েভস্কি, না বুঝে কেবল মন্তাজে ফেলিনি, বার্গম্যান, গভীরে না গিয়ে কামুর প্লেগ, কাফকার মেটামরফোসিসের কিছু ইমেজ ইত্যাদি [xxii]। অর্থাৎ আধুনিকতার চিহ্ন সবই ব্যবহার করছেন। মিলান কুন্দেরা একটা কথা বলতেন, যে এখন ৫০০-৬০০ পাতার উপন্যাস যাঁরা লিখছেন, তাঁরা হয়ত অস্বীকার করছেন যে মানুষের মধ্যে সময়ের ধারণাটাই পালটে গেছে [xxiii], সিনেমার ইমেজের একটা প্রভাব চলে এসেছে। বাংলায় গত শতকের পাঁচের দশকের লেখকরা সন্দীপন, উদয়ন, দেবেশ, দীপেন্দ্রনাথ, মতি নন্দী – এঁরা কীভাবে নতুন করে এগুলোর দ্বারা এবং প্রায় সমসাময়িক পশ্চিমের কাজগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন, নতুন পশ্চিমের সাংস্কৃতিক নিরীক্ষাগুলোকে নিজেদের কাজ করার সময়ে নিয়ে আসছেন, সেই বিষয়টাতে আমি খুবই আগ্রহ পাই।

বোধিসত্ত্ব: উদয়নের লেখা প্রসঙ্গে এবার যৌনতা বিষয়ে আসি। প্রথমত গদ্য, মুখে বলা কথার মত করে লেখা গদ্যে যৌনতার কথা বলা বিষয় হিসাবে আড়াল থেকে বের করার একটা দিক রয়েছে। সত্যকথনের দায়বদ্ধতা থেকে সেটা আসছে। কিছু গল্পে যৌনতার টানাপোড়েনই মূল বিষয় হয়ে উঠলেও কখনোই সেটা শুধু অবদমিত পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় প্রক্রিয়ার বর্ণনায় পর্যবসিত হয়নি। আবার উল্টোদিকে সময়ের দিক দিয়ে দেখলে, যৌনতা তাঁর লেখায় পরবর্তী আন্তর্জাতিক লেখকদের মত সাধারণভাবে একটা রসিকতাপূরণ সাবভার্শনের প্রতীক হয়ে ওঠেনি। উদয়নের লেখায় যৌনতা, চরিত্রগুলোর যৌন অভিজ্ঞতা প্রায়ই আসছে। তাতে নানা স্তর রয়েছে। কখনো সেটা পর্যবেক্ষণ বা অংশগ্রহণের কুণ্ঠা, কখনো হয়েছে কথিত সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক ধরনের আপেক্ষিক অবস্থানের উচ্চতাজনিত প্রাবল্য বা সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স। আর যৌনতা কখনোই একাকিত্বের মেটাফর [xxiv] হয়ে আসেনি এবং মহিলা চরিত্রের যৌন আকাঙ্ক্ষাকে আড়ালও করেনি, অকারণ উচ্চকিত করে সেটা পুরুষ পাঠকের চোখ দিয়েই শুধু দেখার চেষ্টা করেনি। এবং উদয়ন সম্পর্কে আরেকটি কথাও বলা যায়, তাঁর রাজনৈতিক প্রসঙ্গে লেখার বিষয়েও একই কথা বলা যায়। সৃষ্টির প্রতি আশ্চর্য সততাজনিত কারণেই হোক বা অন্য যে কোনো কারণেও হতে পারে, কোথাও কোন প্রাজ্ঞতার দাবি তাঁর নেই। সংশয়ের গভীরে গিয়েও, এমনকি যৌনতা প্রসঙ্গেও, লেখক হিসাবে শুধু পর্যবেক্ষক হবার স্বাধীনতা তিনি নিজের কলমকে দেননি। উদয়নের লেখার এই দিকটা সম্পর্কে তোমার কী মনে হয়েছে?

সৈকত: দ্যাখো, উদয়ন কী নিয়ে লেখেন এটা যদি আমাকে বলতে হয়, তাহলে ধরো প্রথমত রাজনীতি এবং রাজনৈতিক বিতর্ক, স্বপন বলে চরিত্রটি এবং তার আত্মত্যাগ, তার প্রশ্নাবলী। শান্তনু চরিত্রটা যদি দ্যাখো। প্রতিক্ষণ প্রকাশিত সংকলনটার ভূমিকায় ফিরে যাচ্ছি:

‘পাঠক বলেন উদয়ন ঘোষের লেখাতে তর্ক নেই। শান্তনু, অবনী অথবা স্বপন। পাঠক বিশ্বাস করুন ঐ তিনজনকে আমি দেখিনি কখনো। শান্তনুর মতো সাবমিসিভ আমি নই, অবনীর মত উচ্চপদে আমি নেই, স্বপনের মত স্যাক্রিফাইস আমি করিনি।’ [xxv]

শান্তনুর যে মধ্যবিত্ত দাম্পত্য তার এক ধরনের যৌনতা, সেটা উদয়নের লেখায় একটা বড় বিষয়। ওদিকে স্বপন বিপ্লবী, সে যেহেতু বিপ্লবী, তার সমাজ সংসার কিছু নেই, তার গল্পে যৌনতা অনুপস্থিত।

বোধিসত্ত্ব: সম্পূর্ণ একমত। আমার মনে হছিল, উদয়নের রাজনৈতিক প্রকরণ সম্পর্কে ও তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যে দুশ্চিন্তা, সেটা তিনি হয়ত তাঁর প্রজন্মের মানুষ বলেই, প্রকৃত বিপ্লবীকে খানিকটা কামমুক্ত করেছেন। এবং এটাকে আমি সরাসরিই বলছি, এইটে এক ধরণের প্রি-ফেমিনিজম কুণ্ঠা। সাতের দশকের বামপন্থী পুরুষ বিপ্লবী লেখকদের মধ্যে এক ধরনের প্রবল পৌরুষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীবিরোধিতার কাজ করত। নারীকে সমাজ বদলের কাজের বাধা হিসাবে দেখার চল ছিল। কিন্তু উদয়নের মধ্যে সেসব সংস্কার নেই, বরঞ্চ নিজের সংশয়কে তিনি কখনো গোপন করছেন না, সংশয়ই বিষয় হয়ে উঠছে কখনো কখনো। প্রশ্নে প্রশ্নে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করছেন প্রায়ই। তাঁর সমসাময়িকদের থেকে অনেক এগিয়ে প্রচুর সত্যিকারের যৌন প্রসঙ্গের অন্তর্ভুক্তি আছে তাঁর লেখায় [xxvi], কিন্তু স্বপনকে উনি সেই পরীক্ষায় ফেলেননি [xxvii]। এটাকেই আমি কখনো কখনো কুণ্ঠা বলে থাকি।

সৈকত: শান্তনু এবং গৌরী – এই যুগলকে দিয়ে যদি মধ্যবিত্ত দাম্পত্যকে বোঝাতে হয়, তাহলে আমরা একটু দেখে নিই, উদয়নের বা সন্দীপনের সামনে উদাহরণ কী ছিল বাংলায়। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের পরে মাণিক আছেন আর জীবনানন্দের গদ্য কিন্তু তখনো বেরোয়নি। যুগলের মধ্যেকার যৌন ব্যাপার, যৌন অভ্যাস কি চুম্বনের একটা দৃশ্যে শেষ হয়ে যাবে? আকাঙ্খার পুঙ্খানুপুঙ্খতাকে খুব সচেতনভাবেই বিষয় হিসাবে আনছেন তাঁরা (উদয়ন এবং সন্দীপন), এবং সুখী অথবা নিশ্ছিদ্র গৃহকোণের বিষয়টাকে আক্রমণ করছেন। বলাই যেতে পারে সরাসরি তাঁদের আক্রমণের লক্ষ্য পরিবার প্রতিষ্ঠানটা। মনোগ্যামি যে আসলে একটা সম্পত্তি রক্ষা ও বন্টনের পদ্ধতি, বিশেষ রাজনৈতিক ধারণা থেকেই আসছে, এঙ্গেলসের লেখাপত্রে তার উল্লেখ তো রয়েছেই। রাষ্ট্র বা সমাজ যে ব্যক্তির অবদমন চায়, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠান সেটাকে কার্যকর করছে – এরকম একটা বক্তব্য রয়েছে। ফ্যামিলি ইজ দ্য স্মলেস্ট ফ্যাসিস্ট ইউনিট। এবং তার সঙ্গে জুড়ে আছে পুরুষ চরিত্রটার নানা রাজনৈতিক স্খলন এবং ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ।

বোধিসত্ত্ব: পোলিশ লেখক উইটোল্ড গোমবরোউইচের লেখা পর্নোগ্রাফিয়া [xxviii], বা ধরো হালের রুশ লেখক ভ্লাদিমির সোরোকিনের লেখা [xxix] বইগুলোতে যৌনতার কিন্তু আরেকটা ভূমিকা আছে। সেটা হল ক্ষমতার তারতম্যজনিত টানাপোড়েন। সেটা কিন্তু উদয়নে অনুপস্থিত। উদয়নের মূল বিষয় হল রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত সত্যকথনের নিরিখে মধ্যবিত্তের যৌনতা। আবার বিংশ শতকের প্রথম দিকে আঁদ্রে জিদের দি ইমমরালিস্ট (১৯০২) বা করিডন (১৯২০) বইয়ে কুণ্ঠা অথবা অতিবিশ্লেষণ প্রচুর রয়েছে, সেটার থেকে কিন্তু উদয়ন বেরিয়ে এসেছেন।

সৈকত: আমার আগের কথাটা শেষ হয়নি। ধরো উদয়ন যে বারবার বলতেন তিনি শান্তনু, অবনী, স্বপন বা অতনু কেউই নন, কিন্তু এসব বাদ দিতে দিতে আবার এক জায়গায় বলেও দিচ্ছেন, তাঁর জীবনে ব্যক্তিগত নৈকট্য রয়েছে কিছুটা অতনুর সঙ্গে। অতনুর কথা বলে যে বইটা, অমৃতলোক প্রকাশনীর, নয়ের দশকে সেটা হাতে এসেছিল [xxx]। অতনু তার কাকিমার কাছে বড় হচ্ছে এবং একটা ইডিপাস ও তার মায়ের মত যৌনগন্ধী সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। তাতে সম্পত্তি ও পরিবারের জটিলতাবিহীন আদিম মানবগোষ্ঠীর অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত যৌন সংসর্গের কথা এবং নারীর যৌনসঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতার কথা আসছে।

বোধিসত্ত্ব: সমাজে যে দাম্পত্যের বিশুদ্ধতার ধারণা, যে রক্ষণশীল মূল্যবোধের সঙ্গে যুঝতে গিয়ে ভদ্রলোক এসব কথা ফিকশনে আনছেন, নিজেকে যেভাবে নিংড়োচ্ছেন, লেখক হিসাবে ন্যূনতম যশঃপ্রার্থনা থাকলে এসব করা যায় না। এ একেবারে অনস্বীকার্য।

এ যাত্রায় আমার শেষ প্রশ্নটা করছি। আমি শান্তিনিকেতনের কো-এড স্কুলে পড়েছি বলে কিনা জানি না, আমার বড় হওয়াটা একেবারেই অ্যাসেক্সুয়াল। তাতে সব কামচেতনাই অ্যাবারেশন হিসাবে এসেছে। সময় লেগেছে তার স্বাভাবিকতাকে অনুধাবন করতে, আবার তীব্রতা কখনোই খুব বড় করে বিচলিত করার জায়গায় পৌঁছয়নি বলেই মনে হয়। শিক্ষিত সভ্য জগতের স্বার্থে এক ধরনের সফল অবদমন ঘটেছে বলা যায়। সে কারণে কিনা জানি না, অল সেইড অ্যান্ড ডান, আমায় উদয়নের পোলিটিকাল লেখাগুলোই বিচলিত করেছে। তার মধ্যে বিশেষ করে আসানসোলের জলকষ্ট সম্পর্কিত কুয়োতলা সিরিজ ইত্যাদি। একটা ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বলছি। আমার বাবা কৃষিবিজ্ঞানী ছিলেন, অন্যদিকে ব্যক্তিগতভাবে খাদ্যাভাবের অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল এবং একটা দীর্ঘ অসচ্ছল জীবন তাঁকে পেরোতে হয়েছে। সে কারণে কিনা জানি না, তিনি কিন্তু পেশাজীবনের প্রথম দিকটায় অন্তত এই উচ্চ ফলনশীল জাতের খাদ্যশস্য উৎপাদনের বিষয়ে সরকারি নীতি অনুযায়ীই চলেছেন এবং আনুষঙ্গিক যা কিছু, অর্থাৎ নতুন কৃষির অনেকটাই হবে ল্যাবরেটরিতে, এরকমভাবে এগিয়েছেন। কিন্তু ১৯৬৬ সালে শ্রীনিকেতনে চাকরি করতে এসে,ধীরে ধীরে কৃষকের প্রতিদিনের জীবন, গ্রামীণ পুষ্টির প্রয়োজন এবং সবশেষে ভূপালের দুর্ঘটনা তাঁর ভাবনাচিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং রবীন্দ্রনাথের পরিবেশচেতনার সঙ্গে সমসাময়িক পরিবেশচেতনাও [xxxi] তাঁকে প্রভাবিত করতে থাকে। এবার আমার যেটা আশ্চর্য লেগেছে সেটা হল উদয়নের পরিবেশ সংক্রান্ত আশঙ্কা, খনি অঞ্চলের অসম্ভব জলকষ্ট অথচ জলের অপব্যবহার এসব নিয়ে লেখা, ছোটো শহরের নিজস্ব আর্বানিটির খোঁজ, বারবার ব্যবহৃত রক্তকরবী নাটকের রেফারেন্স অতদিন আগে। তোমার কাছ থেকে নিয়ে পড়া বইটা পড়তে গিয়ে, আমাকে যৌনতা সংক্রান্ত লেখাগুলির থেকেও এই বিষয়টা বেশি আকর্ষণ করেছিল। উদয়নের লেখার এই দিকটা নিয়ে তোমার কী মনে হয়? আমার তো মনে হয়, রক্তকরবী উদয়নের কাছে একটা সেন্সিবিলিটি হয়ে উঠেছিল।

সৈকত: তুমি একটা শব্দ ব্যবহার করলে – আর্বানিটি। হ্যাঁ পাঁচের দশকে যাঁরা লিখছেন, তাঁদের মধ্যে এক দেবেশ ছাড়া কারোর লেখাতেই গ্রামের কথা বিশেষ নেই। উদয়ন, মতি নন্দী, সন্দীপন গ্রামের কথা বিশেষ লেখেননি। দেবেশ উত্তরবঙ্গের একটা জগৎকে আনছেন। এছাড়া কলকাতা, মন্বন্তর ও স্বাধীনোত্তর কলকাতাই নতুন সাহিত্য নিরীক্ষার প্রেক্ষিত। উদয়নের ক্ষেত্রে আসানসোল যেহেতু কর্মক্ষেত্র, সেখানেই তিনি শিল্প অর্থনীতি, রাজনীতি – সবকিছুকেই কাছ থেকে দেখছেন। আসানসোল তাঁর বিশ্ব দর্শনের লেন্স। তো সেই ছোট শহরের যে জীবন, রাজনৈতিক নেতা, বামপন্থী রাজনীতির বদ্ধ পাঁক, মধ্যবিত্ত জীবন, স্থানীয় মানুষ – সবকিছুই তাঁর লেখায় আসছে। কুয়োতলা সিরিজের গল্পগুলো, শুরু হয়ত হচ্ছে স্থানীয় জলকষ্ট নিয়ে, শেষ কিন্তু হছে সভ্যতার সংকটে গিয়ে। ‘আমতলা’ গল্পটাই দেখো:

‘পূর্বে ও পশ্চিমে গিয়েছিল জলের খোঁজে। সেদিনই প্রথম তারা লোকমুখে শুনেছিল তাদের দুজনের নাম আসলে নদীর নাম। তবু তারা সেদিন জল পায়নি কুয়ো চেঁছে।

এদিকে জলতেষ্টায় নারায়ণীর ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম হয়েছে। দূরে আমবাগানের তিন মাইল দূরে, যেখানে রেল কলোনী, যেখানে ৭৭ হাজার সাতশো ৭৭ লিটার জলের ট্যাংক আছে, সেখানে সেদিন নাকি ট্যাংক উপচে বৃষ্টির মত জল পড়ছিল। শুনে মানস ও দামোদর ছুটে গিয়েছিল তিন মাইল। কিন্তু বড় রাস্তা পেরিয়ে জল আনতে গিয়ে তাদের সহসা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। জল ভরতি বালতি তো রাস্তায় গড়িয়ে পড়েছিল, উপরন্তু ট্রাকের তলায় বালতি প্রায় চাদর হয়ে গেছিল।

ততক্ষণে নারায়ণীর নাভিশ্বাস উঠেছিল। তার মা তখনো পাড়ায় একঘটি জলের সন্ধানে। সে নারায়ণী একা মাদুরের থেকে মেঝেতে কিছু জল শীতলতার আশায় গড়িয়ে গেলে জল বা শীতলতা কোনোকিছুই না পেয়ে অপরিসীম যন্ত্রণায় একবার উত্তর একবার দক্ষিণে, যে দুই মেরুতে দুই মিটার বরফ জমে আছে, সেই মেরুর চৌম্বক টানে স্থির হয়ে গিয়ে সে তার অমূল্য গর্ভ থেকে জল ছেড়েছিল। যে জলে তার ভবিষ্যতের সন্তান মানুষ হচ্ছিল – যে জল কোনো খরা কোনোকালে শুকাতে পারেনা কদাচ, সেই জল ভেঙে গিয়েছিল। তার চোখের সামনে সে জল ভাঙার জল গড়িয়ে গিয়েছিল মেঝেতে। সে ও তার সন্তান উভয়ে জলভাঙার জলের নাগাল না পেয়ে তৃষ্ণায় কাঠ হয়ে গিয়েছিল। কেবল তৃষ্ণার্ত মেদিনীর যে অংশ তাদের ঘরের মেঝে, যেখানে একদিন ভবিষ্যতের সন্তান হেঁটে বেড়াবে, সেখানে সেই মেঝে, মানুষের ফাউন্ডেশন, কিছু জল বড় দ্রুত শুষে নিয়েছিল। তখনো মানস ও দামোদর দূরের বড় রাস্তায় শুকনো খটখটে পিচ গলা ন্যাশনাল হাইওয়েতে পড়ে ছিল কাঠ হয়ে।

ঠিক সেই সময়ে চেরাপুঞ্জীতে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। সারা ভারতবর্ষে তার মুষ্টিমেয় জলের ট্যাংকে অবিশ্রান্ত জল দিচ্ছিল। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের ভালো থাকার সবুজ লনে তির তির করে জল বইছিল।’ [xxxii]

জল আনতে গিয়ে লোকে মারা যাচ্ছে গাড়ি চাপা পড়ে, সন্তানসম্ভবা মা জল পাচ্ছে না, এই যে সংকট – সেটা তিনি দেখতে পাচ্ছেন দেশজুড়ে। তার পরের লাইনটাই হল, সে সময়ে চেরাপুঞ্জীতে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। অর্থাৎ সম্পদ বন্টনের যে দেশব্যাপী সমস্যা এবং তীব্র অসাম্য সেটাকে চিহ্নিত করতে তাঁর এক মুহূর্তের জন্যও কোনো সংশয় হচ্ছে না।

বোধিসত্ত্ব: অসম্ভব ভাল বললে। শিউরে উঠতে হয়, গদ্যের যা জোর। আরেকটা কথা একটু ছুঁয়ে যাচ্ছি। বাংলা লেখকদের লেখা আলোচনা করার সময়ে আজকাল একটা পদ্ধতি হয়েছে দশক ধরে বলা এবং ‘যখন উনি এই লেখাটা লিখেছেন, তখনো মার্কেজ এখানে আসেননি, তার আগেই ম্যাজিক রিয়ালিটি অমুকে করে ফেলেছেন। আচ্ছা সেক্সুয়ালিটির কথা? সে আর এমন কী? সে অনেক আগেই তমুক করে ফেলেছেন।’ এই পদ্ধতিটার উদ্দেশ্য হয়ত সৎ, গদ্যের সৃজনশীলতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই পদ্ধতির আলোচনায় আলোচ্য লেখকের মৌলিক অবদানকে সঠিক স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। অতএব উদয়ন পরিবেশের কথা অনেকের আগে লিখেছিলেন, সেটাই একমাত্র ইন্টারেস্টিং বিষয় না। কীভাবে লিখেছিলেন, কী আশ্চর্য রূপকল্প হাজির করেছিলেন, সেটাই হয়ত মূল দিক।

সৈকত: খরার বর্ণনা দিয়ে শুরু হলে, ডকুমেন্টেশন দিয়ে শুরু হলেও, সেটাকে মহৎ সাহিত্যের কর্তব্য অনুযায়ী ব্যাপকতর সুদূরপ্রসারী অর্থ আরোপণ করার কাজ উদয়ন করেছেন। সারভান্তেসের লেখা সম্পর্কে কুন্দেরা বলেছিলেন ‘প্রোজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ [xxxiii]। ওই যে তোমায় বলছিলাম না আমি ভাষা খুঁজে বেড়াই? ওই ভাষার জন্যেই আমি উদয়নে আটকা পড়েছিলাম, এবং লেখার যে প্রবহমানতা, তার মধ্যে একের পর এক বিষয় যেন এসে পড়ছে, অথচ কাহিনীর কন্টিনুইটির ধার ধারছে না, তাকে নিটোল করার কোনো প্রচেষ্টাও নেই। তাত্ত্বিক আলোচনাও এই যাপনের মধ্যে দিয়েই আসছে, যেমনটা জীবনে ও পৃথিবীতে ঘটে থাকে। আসানসোলের খরা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাণহীনতায় পৌঁছে যেতে পারছেন। যারা উদয়ন ঘোষ পড়েছে, তারা পেলে সবই পড়বে বলে মনে হয়। এই গদ্য আবিষ্কার আমাকে চালনা করেছে দীর্ঘদিন।

বোধিসত্ত্ব: সত্যি। আমার নিজের সচেতনতার অভাব ছিল, অথবা লিটল ম্যাগাজিনের জগতের বামপন্থী সেকটারিয়ানিজমের মত বহুধা বিভাজন নিয়ে বিরক্তি ছিল, অথবা হয়ত শান্তিনিকেতনে আমার বড় হওয়ার সময়টাতে একজন আমেরিকান বা ইউরোপিয় কবির নিরীক্ষামূলক লেখার শেষ প্রচেষ্টাটি হাতে পাওয়া কৌরবের একটা সংখ্যা হাতে পাওয়ার থেকে সহজ ছিল। আমি খুবই লজ্জিত যে আমি মন দিয়ে আট বা নয়ের দশকে উদয়ন ঘোষ পড়িনি, যার জন্য তোমার সঙ্গে কথা বলা। তোমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। অনেক লেখককে নিয়ে সোমনাথের বিবলিওগ্রাফি তৈরি করার পরিশ্রম আর তোমার পড়াশুনো আমাকে সবসময়েই উদ্বুদ্ধ করে। আজকে কিছু সংকলন হয়ে বেরলো পড়লাম, সেটা যেমন একটা প্রচেষ্টা, তেমনি তোমার সঙ্গে কথা বলার মূল কারণটাই হল, এ লেখা যখন প্রথম মানুষের হাতে আসছে, তখন কী অভিঘাত হচ্ছে সেটা বোঝার চেষ্টা করা। তাছাড়া আমি তো একটা বিচিত্র সময়ে পড়তে শিখছি। নকশাল আন্দোলন পরাজিত, বামপন্থী আন্দোলন বলতে যা বোঝায় সেটা মধ্যবিত্তের স্বপ্ন থেকে অপসারিত, অন্যদিকে কিছুদিন পরে বিশ্বায়ন নামক অশ্বমেধ যজ্ঞ এবং তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে এবং গোষ্ঠী সংস্কৃতির দিক থেকে সম্পূর্ণ সমর্পণের মাঝে তো একটা ফাঁক আছে। একটা অনমনীয় গহ্বর আছে। তাকে তো মনে মনে ধরতে চাই মাঝে মাঝে, তার তো একটা দার্শনিক ব্যাখ্যা লাগে। তাই এই উদয়ন খুঁজে পড়া আর আগে যারা পড়েছে, তাদের খোঁজা। অনেক ধন্যবাদ, সৈকত। অনেক অনেক ধন্যবাদ।

পুস্তক পরিচয় (সংকলিত উদয়ন)

১। উদয়ন ঘোষের ছোটগল্প; প্রতিক্ষণ প্রকাশিত সংকলন, জানুয়ারি ১৯৯৫, কলকাতা
২। সার্বিক লেখাজোখা: উদয়ন ঘোষ – প্রথম থেকে চতুর্থ খণ্ড; কেতাব-ই প্রকাশনী; সম্পাদনা তাপস ঘোষ, প্রচেতা ঘোষ; ২০২৩-২০২৪, কলকাতা
৩। অনিবার্য উদয়ন – কৌরব, কমল চক্রবর্তী সম্পাদিত, প্রথম প্রকাশ, ২০১৮, কলকাতা

আরো পড়ুন সন্দীপ দত্তের পর কে আগলাবেন লিটল ম্যাগাজিন?
তথ্যসূত্র

– উপরে উল্লিখিত সংকলনগুলিতে সম্পাদকীয় ভূমিকা সমূহ, সম্পাদকীয় মন্তব্য, তথ্যপঞ্জী
– বিদ্যায়তনিক গবেষণায় আগ্রহীদের সাহিত্য গবেষক শ্রী প্রত্যুষ পালের গবেষণাগ্রন্থ পাঠ করতে হবে (আমার পক্ষে পড়ে ওঠা সম্ভব হয়নি)। গবেষণাগ্রন্থটি বই হয়ে বেরিয়েছে কিনা আমার ব্যক্তিগত ভাবে জানা নেই, এই মুহূর্তে।
এই সময় পত্রিকায় কমল চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণে, কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের মাধ্যমে উদয়নের সঙ্গে তাঁর আলাপের চিত্তাকর্ষক কাহিনীটি রয়েছে। আমাদের পূর্বপুরুষের পরম সৌভাগ্য, সেটি এখন অন্তত ইন্টারনেটে পড়া যাচ্ছে

শেষোক্তি

উদয়নের জীবদ্দশায় তাঁর সম্পাদকদের, তাঁর বন্ধুদের এবং যাঁরা তাঁর একলা সময়ে কাছে ছিলেন, তাঁর পরিবারকে, তাঁর সম্পর্কে আগ্রহী গবেষক, পুস্তক তথ্যপঞ্জী রচয়িতাদের, তাঁরা যাঁদের সাহায্য পেয়েছেন এই কাজে, সকলকেই শ্রদ্ধা জানাই। বলা বাহুল্য, অধুনা লভ্য কোনো সংকলন বা তথ্যপঞ্জীই সম্পূর্ণ নয়। অনাবিষ্কৃত উদয়নও হয়ত ভবিষ্যতে আরো পাওয়া যাবে। জানি না, শুধু ইচ্ছের কথা বলতে পারি। তবে কালে কালে পাঠকদের দাবিতে একদিন নিশ্চয় সমগ্র উদয়ন পড়া যাবে এবং ধরে নেওয়া যাক, সেদিন কদিনের জন্য অন্তত কলেজ স্ট্রিট আন্তরিকভাবে নিজেকে ছাপিয়ে যেতে পারবে। যদিও মৃত লেখক ভদ্রলোক জীবিত থাকলেও তাঁর হয়ত ভারি বয়ে যেত। নিতান্ত অর্ধশিক্ষিত পাঠক হিসাবে আশা করব, সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের পেশাদারিত্বের ছাপ রেখে যে অনুবাদকরা কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের, সুবিমল মিশ্রের বা মনোরঞ্জন ব্যাপারী সহ অনেকের অনুবাদ করছেন বা করবেন, তাঁরা যেন পরিবারের অনুমতিক্রমে উদয়নের কাজগুলি অনুবাদের কথাও ভাবেন। আর গবেষক, অনুবাদক, সম্পাদক ও তথ্যপঞ্জী রচয়িতাদের মধ্যে যেন সৌহার্দ্যপূর্ণ যৌথ কর্মসূচি ও কর্মপ্রচেষ্টা গড়ে ওঠে স্বল্পপঠিত লেখকদের ঘিরে, উদয়নকে ঘিরে। সেটিই শ্রদ্ধা জানানোর সঠিক পদ্ধতি। বাঙালি যে কেবল কিশোরপাঠ্য লেখা পড়েনি এবং লেখেনি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এটুকু মনে করানোর জন্য এসব জরুরি।

(তথ্যপঞ্জী বা অন্যত্র উল্লিখিত ওয়েবসাইট অ্যাড্রেসগুলো ১৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দেখা তথ্যানুযায়ী)


[i] কৌরব বাংলা লিটল ম্যাগাজিন, কমল চক্রবর্তী সম্পাদিত, ১৯৭০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় জামশেদপুর থেকে।

[ii] বোবাযুদ্ধ পত্রিকার পরিচালকবর্গের একাংশ জারি বোবাযুদ্ধ পত্রিকা শুরু করেন, উদয়ন ঘোষ ও সুবিমল মিশ্রের লেখাকে সাহসী হয়ে সমর্থন করেছেন বরাবর। আসানসোল থেকে প্রকাশিত পত্রিকা, প্রচেতা ঘোষ, তাপস ঘোষ সম্পাদিত, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৭।

[iii] শিবাদিত্য সেন সম্পাদিত পত্রিকা, শান্তিনিকেতন থেকে প্রকাশ হয়েছিল, সম্ভাব্য প্রথম প্রকাশ ১৯৭২।

[iv] এক্ষণ নির্মাল্য আচার্য ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত পত্রিকা, ১৯৬১ সালে কলকাতা থেকে প্রথম প্রকাশিত।

[v] অনুষ্টুপ অনিল আচার্য সম্পাদিত পত্রিকা কলকাতা থেকে প্রকাশিত, ১৯৬৬ সালে প্রথম প্রকাশ।

[vi] উদয়ন ঘোষ, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৫ – ১৯ নভেম্বর, ২০০৭, তথ্যসূত্র: https://udayanghosh.blogspot.com/2014/02/

[vii] গত শতকের নয়ের দশকে, প্রতিক্ষণ প্রকাশনা সংস্থা এবং আজকাল পত্রিকার তৎকালীন পরিচালক সংস্থা নানাভাবে স্বল্পপঠিত বাঙালি লেখকদের একাংশের লেখা ছাপতে শুরু করে। নিরীক্ষামূলক লেখার পাঠকরা আজও প্রচেষ্টাগুলিকে ভালবেসে মনে রেখেছেন।

[viii] জীবনানন্দের মাল্যবান উপন্যাস, রচনাকাল ১৯৪৮, প্রথম প্রকাশ ১৯৭০, নিউ স্ক্রিপ্ট, কলকাতা। তথ্যসূত্র https://www.scribd.com/document/343963618/Malyaban-by-Jibanananda-Das

[ix] কলকাতার উত্তরাঞ্চল বা কলকাতার উত্তরের যে শহরতলি, সেখানে বসবাসকারী বহু পড়ুয়া মানুষের স্মৃতিচারণে এই দোকানটির কথা জানা যায়। বলা বাহুল্য, সুনীলদা স্বয়ং বহু দশকের পুস্তকপ্রেমী, পড়ুয়া, পুস্তক বিক্রেতা হিসাবেই পরিচিত।

[x] অসীম রায় (১৯২৭-১৯৮৬) বিশিষ্ট গদ্যকার এবং সাংবাদিক। তাঁর বিভিন্ন রচনা, উপন্যাস ও ডায়রি পাঠক সমাজে সমাদৃত।

[xi] একটি সংশয় রয়েছে। প্রতিক্ষণ যে লেখকদের সংকলনের সিরিজ করেছিল, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্যপঞ্জী করা গেলে ভাল হত। কারণ কোনো সূত্রে পাচ্ছি সিরিজটি ১৯৮৯ সালে শুরু, কোথাও পাচ্ছি নয়ের দশকের মাঝের কথা।

[xii] একালের রক্তকরবী, প্রদীপ ভট্টাচার্য সম্পাদিত পত্রিকা, উর্বী প্রকাশনী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে পরে।

[xiii] অবনী বনাম শান্তনু, ১৯৭১ সালে কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের উদ্যোগে প্রকাশিত। পরিবেশক হিসাবে নাম ছিল অধুনা সংস্থার। (তথ্যসূত্র: সার্বিক লেখাজোখা: উদয়ন ঘোষ – ২য় খণ্ডের ভূমিকা)।

[xiv] বন্দুকের নল থেকে একদা (গল্প) – প্রথম প্রকাশ দ্রোহ পত্রিকা, সেপ্টেম্বর ১৯৯০।

[xv] প্রবাদপ্রতিম প্রকাশক, সুবর্ণরেখা প্রকাশনার কর্ণধার, প্রাতঃস্মরণীয় ইন্দ্রনাথ মজুমদার।

[xvi] পাতিরাম, কলেজ স্ট্রিটের প্রখ্যাত পত্রিকা বিক্রেতা বিপণি, দীর্ঘদিন ধরে লিটল ম্যাগাজিন বিক্রয়ের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

[xvii] বাংলা সাহিত্যের অনন্য লেখক কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের জন্ম ১৯৩৬ সালে, ১৯৬৭ নাগাদ স্টেটসম্যান পত্রিকা থেকে অবসর গ্রহণ করে বাংলা লেখালিখি ও প্রকাশনায় মনোনিবেশ করেন। সংসারী মানুষ ছিলেন, গৃহদেবতার আরাধনা করতেন, সমকামী ছিলেন এবং নিজের যৌন পছন্দ/পরিচয় যিনি কখনো গোপন করেননি। বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের পক্ষে কৃষ্ণগোপালের বন্ধুর পন্থা, ব্যূহপ্রবেশ, আমার প্রেমিকারা অবশ্যপাঠ্য বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। অধ্যাপক নীলাদ্রি চ্যাটার্জির সাড়া জাগানো অনুবাদগ্রন্থটিও (Entering the Maze: Queer Fiction of Krishnagopal Mallick, Niyogi Books, New Delhi, 2023) পড়া উচিত বলে মনে হয়, বিশেষত ভূমিকাটি। ঘটনাচক্রে উদয়ন একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘কৃষ্ণগোপালের গল্পকবিতা’ নামে, যেটি প্রচেতা ঘোষ সম্পাদিত জারি বোবাযুদ্ধ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে (অগাস্ট ২০০৩, জানুয়ারি ২০০৪ যুগ্ম সংখ্যায়), পরে নির্বাচিত কৃষ্ণগোপাল গ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল (প্রদীপ ভট্টাচার্য সম্পাদিত উর্বী প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৬)। (এই তথ্য সংগ্রহে সাহায্য করার জন্য এবং প্রবন্ধটি পড়ানোর জন্য তাপস দাশকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই)।

[xviii] আমি এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে (উপন্যাস) – প্রথম প্রকাশ যোগসূত্র পত্রিকার পরপর দুটি সংখ্যায়। গ্রন্থাকারে প্রকাশ জানুয়ারি ১৯৯৫, গ্রাফিত্তি। তথ্যসূত্র: https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=9454&page=4#pages

[xix] একটা কথা বলে রাখা ভাল, চাইলে ভাষা সৌন্দর্য নিয়ে যে কী করতে পারতেন তার দুটি উদাহরণই যথেষ্ট। কুয়োতলা সিরিজের ‘আমবাগান’ গল্পটি এবং ১৯৭৫ সালে কৌরব পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ভীম’ নামক লেখাটি।

[xx] প্রতিক্ষণ প্রকাশিত সংকলন, উদয়ন ঘোষের ছোটগল্প, জানুয়ারি ১৯৯৫।

[xxii] প্রতিক্ষণ প্রকাশিত সংকলন, উদয়ন ঘোষের ছোটগল্প, জানুয়ারি ১৯৯৫, ভূমিকা/লেখালিখি থেকে।

[xxiii] হতে পারে সৈকত মনে করাচ্ছেন, কুন্দেরার কোনো তাত্ত্বিক প্রবন্ধের কথা। তবে এটুকু জুড়ে দেওয়া যায়, মিলান কুন্দেরার স্লোনেস (হার্পার পেরেনিয়াল, ১৯৯৭) নামক ফরাসি ভাষায় লেখা নভেলাটি ফাঁদা হয়েছে এইভাবে যে ফ্রান্সের একই জায়গায় ২০০ বছরের ব্যবধানে কয়েকটি চরিত্র একত্রিত হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে। প্রথমটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে, দ্বিতীয়টি বিংশ শতকে। প্রথমটির শ্লথ অথচ গভীর আলোচনাপ্রসূত চিন্তার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ শূন্যে পর্যবসিত হচ্ছে বিংশ শতকে এসে, কারণ ততদিনে সময়ের ধারণাটিই বদলে গিয়েছে। ততদিনে যে কোনো কারণেই হোক, মানুষের তাড়ার অন্ত নেই।

[xxiv] দুটো উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটো উপন্যাস থেকে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাইতে রয়েছে প্রধান চরিত্রের আত্মরতির দীর্ঘায়িত বর্ণনা। সেখানে একাকিত্ব জিনিসটা রাজনৈতিক তানাশাহীর বিরুদ্ধে, দখলদার সেনাবাহিনীর তাণ্ডবের মধ্যে, একলা একটা মানুষের যেন অসহায়তার চিহ্ন। অন্যদিকে ধরুন, বিতর্কিত ফরাসি ঔপন্যাসিক মিশেল হুলেবেক বা উলেবেকের কথা যদি ধরা যায়, তাঁর অ্যাটোমাইজ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর যৌনতা যেন কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রগতিশীল অন্তর্ভুক্তির মুখে পড়ে একটা কর্মহীন শ্বেতাঙ্গ মানুষের একাকিত্ব, কারণ তারা নাকি রাষ্ট্রীয় প্রগতিশীলতার চোটে নিজস্বতার সন্ধান পাচ্ছে না, বিচিত্র হলেও সত্যের একটা দিক হওয়া অসম্ভব না, কারণ রাষ্ট্র অতীব বিচিত্র বস্তু ইত্যাদি। মানে এইটেই লেখকের অবস্থান।

[xxv] প্রতিক্ষণ প্রকাশিত সংকলন, উদয়ন ঘোষের ছোটগল্প, জানুয়ারি ১৯৯৫, ভূমিকা/লেখালিখি থেকে।

[xxvi] ভেবে দেখতে গেলে, কবিতা সিংহের (১৯৩১-১৯৯৮), বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী ‘স্বামী নয় প্রেমিকও নয়’ গল্পটির প্রতিপাদ্যের পাশাপাশি রেখে যদি উদয়নের মধ্যবিত্ত দাম্পত্যের সংকটের গল্পগুলি পড়ি, তাহলে হয়ত নারীর মুক্তিকামনার ইচ্ছার বর্ণনার পরীক্ষায় বা পরিবারকে একটা অবদমনের প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখার পরীক্ষায় উদয়ন তাঁর সমকালীন অনেক পুরুষ লেখকের থেকে অপেক্ষাকৃত এগিয়ে থাকবেন, আগেই উল্লিখিত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও।

[xxvii] এটা মনে করার কোনো কারণ নেই, আমাদের রক্ষণশীল সমাজের ফসল বলে উদয়ন এই বিযুক্তির পথে গেলেন। সার্ত্রর এজ অফ রিজন-এর ব্রুনো চরিত্রটিকে মনে করে দেখুন। সেও এরকম বিশুদ্ধ কমিউনিস্ট, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা শব্দটার মানে তার কাছে আলাদা। তার সংশয় যদি থেকেও থাকে, তা প্রচলিত অর্থে ব্যক্তিগত নয়।

[xxviii] পর্নোগ্রাফিয়া, উইটোল্ড গোমবরোউইচ, গ্রোভ প্রেস, ১৯৬৬। মূল পোলিশে প্রকাশ ১৯৬০ সালে, প্রকাশক হিসাবে নাম রয়েছে Instytut Literacki (Kultura).

[xxix] ভ্লাদিমির সোরোকিন, Day of the Oprichnik, Penguin Classics, 2018, Farar Strauss and Giroux, 2011

[xxx] অতনুর কথা (উপন্যাস), প্রথম প্রকাশ অমৃতলোক পত্রিকার ১৪০০ সালের শারদ সংখ্যা। গ্রন্থাকারে প্রকাশ জানুয়ারি ২০০৩, অমৃতলোক সাহিত্য পরিষদ। তথ্যসূত্র https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=9454&page=4#pages

[xxxi] নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ১৯৭৩ সালেই এফ শ্যুমাখারের প্রখ্যাত স্মল ইজ বিউটিফুল প্রকাশের পর থেকে পরিবেশচেতনায় একটা নতুন দিক খুলে যায়, কারণ রাজনৈতিকভাবে ধনতান্ত্রিক বনাম সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের লড়াইয়ের মাঝে নারীবাদী ভাবনার পাশাপাশি পরিবেশভাবনা তৃতীয়, চতুর্থ ফ্রন্ট খুলে ফেলে। তাতে শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির জন্য রাস্তার লড়াই পিছিয়েছে না এগিয়েছে বলা তর্কসাপেক্ষ হলেও, পরিবেশ ধ্বংসকারী মানব প্রয়াসের একটা ধারণা পাওয়া গেছে।

[xxxii] ‘কুয়োতলা আমবাগান’ (গল্প), প্রথম প্রকাশ ১৯৮৫, সংবিত্তি পত্রিকা (https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=9454&page=4#pages)

[xxxiii] সৈকত সম্ভবত মিলান কুন্দেরার দ্য কার্টেন (ফেবার অ্যান্ড ফেবার, ২০০৭, পেপারব্যাক) নামক সাতটি প্রবন্ধের সংকলনটির কথা বলছেন, যেখানে কুন্দেরা বলছেন ‘A magic curtain, woven of legends, hung before the world…Cervantes sent Don Quixote journeying and tore through the curtain. The world opened before the knight-errant in all the comical nakedness of its prose.’

[xxxiv] ব্লগস্পট এবং গুরুচণ্ডালি ওয়েবসাইটের অসম্পাদিত বিভাগের তথ্যপঞ্জী। দুটিই যাকে বলে অসম্পূর্ণ হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে ঠাসা। সোমনাথ দাশগুপ্তের আরেকটি বেশ কিছুদিন আগেকার ‘ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস’ বলা যেতে পারে হয়ত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.