আমাদের নিত্যসঙ্গী মোবাইল ফোনের পিছনে যেসব প্রযুক্তির কৌশল, তার একটা দিগন্ত হল সে যন্ত্রটাকে বাড়ির ঠাকুরঘর বা পড়ার ঘরের মত সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয়। মোবাইলের স্ক্রিন সেভার হিসাবে অনেকেই আরাধ্য দেবদেবীর ছবি সেট করে রাখেন, কারোর কলার টিউনে থাকে ঠাকুরের গান। গত বছরের ঠিক এই সময়টায় যখন রামমন্দির আর হনুমানজি নিয়ে দেশ বাড়াবাড়ি রকমের উদ্দীপ্ত, তখন বিভিন্ন মানুষের মোবাইলের কলার টিউনে বেজে উঠছিল রামনাম অথবা হনুমানের বন্দনা। সম্ভবত এরপরেই নেতাজি ও মহাত্মাজির পরে হনুমানের লেজেও একটা ‘জি’ জুড়ে যায়। আজকাল দেখি বা শুনি – আমাদের পূর্বপুরুষ ওই প্রাণিটিকে আমজনতা ‘জি’ বলে সম্বোধন করেন। আমাকে আমার মত থাকতে দাও এবং আমার মোবাইলকে আমার মত সাজাতে দাও – এই দুইয়ের অপার সম্ভাবনা নিয়ে ইদানীং বাণিজ্যও মন্দ হয় না। রিংটোন, কলার টিউন বা স্ক্রিন সেভারের রকমারি ছবি নগদ মূল্যে কেনা যায়, বিক্রিবাটাও খারাপ নয়। কিন্তু এমন এক ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থার মধ্যেও মাঝে মাঝে ছুঁচোবাজি ঢুকে পড়ে। যেমন স্বাধীনতা দিবসের সপ্তাহখানেক আগে থেকে আকস্মিক সকলের মোবাইলে স্পন্দিত হতে থাকল ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচির প্রচার। আপনি চান বা না-ই চান, অপর কেউ আপনাকে ফোন করলেই শুনতে পাচ্ছিলেন ঘরে ঘরে পতাকা টাঙানোর কথা, পতাকা টাঙানোর ইচ্ছে আপনার থাকুক বা না-ই থাকুক। ঠিক তেমনই ইদানীং একে ওকে ফোন করলেই শোনা যাচ্ছে সাইবার অপরাধের চেতাবনি – অমুক করবেন না, তমুক করবেন না। ঠিক এভাবেই কোভিডকালে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং’-এর কুবাতাস। ব্যক্তিগত উপার্জনে কেনা যন্ত্রে, ব্যক্তিগত পছন্দে মোবাইল কোম্পানির রিচার্জ করেও ব্যক্তিগত পরিসরে আপনি কী রিংটোন শুনবেন বা কলার টিউন রাখবেন তার সিদ্ধান্ত সবসময় আর আপনার হাতে থাকছে না। ইভিএমের বোতামও যেমন সবসময় আর আমাদের হাতে নেই।

আচ্ছা, সাইবার অপরাধের এমন নিটোল রমরমা হল কেন? একটু পিছন ফিরলেই দেখা যাবে, দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে যখন শ্রীযুক্ত নন্দন নিলেকানিকে (ইনফোসিস সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) অধিনায়ক করে দেশজোড়া নাগরিকের ইউআইডি তথা আধার কার্ড তৈরির শুভ মহরত হচ্ছিল তখন কেন্দ্রের বিরোধী দল ঘোর আপত্তি জানিয়ে বলেছিল – এর ফলে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হতে পারে। কিন্তু ইউপিএ আমলে কিছুটা পিছনে চলে যাওয়া আধার কার্ড কর্মসূচিতে নতুন জোয়ার এল ২০১৪ সালের পর। দেশের নতুন চৌকিদার ঘোষণা করলেন, তিনি নিজেও খাবেন না, কাউকে খেতেও দেবেন না। এই মানসিকতার পিছনে আসলে ছিল এইরকম একটা ভাবনা যে দেশের এতাবৎ ঘোষিত সরকারি কর্মসূচিগুলো আসলে ভুল লক্ষ্যে পরিচালিত এবং তাতে নাকি প্রচুর ভুয়ো উপভোক্তা তথা তথ্য রয়েছে, যা অবিলম্বে নিকেশ করা দরকার। এমন ভাবনা থেকে এই উপপাদ্যেই পৌঁছনো সম্ভব যে দেশের বেশিরভাগ মানুষ অসৎ, চোর এবং জুয়াচুরি করে তাঁরা সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে চলেছেন, ভুল মানুষের কাছে চলে যাচ্ছে ভর্তুকি। সুতরাং এই বেনিয়ম ঠেকাতে আধারের মত প্রকল্পের জুড়ি নেই। খেয়াল রাখা ভাল, বিরোধীরা যাতে আধার বাধ্যতামূলক করার বিলের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে নজিরবিহীনভাবে আধার সংক্রান্ত বিলকে অর্থ বিল হিসাবে লোকসভায় ও রাজ্যসভায় পাশ করানো হয়। যেন বা দেশসুদ্ধ লোকের আধার কার্ড তৈরি হয়ে গেলেই ভ্রষ্টাচার খতম, যেন সার্জিকাল স্ট্রাইকের মতই মোলায়েম সেই নিধন প্রক্রিয়া।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সেই সত্য যা রচিবে তুমি। সুতরাং দেশজুড়ে আধার কার্ড তৈরির মহাযুদ্ধই শুধু নয়, তার সঙ্গে ফতোয়া এল ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জুড়তে হবে আধার কার্ড, আয়কর দেওয়ার জন্যে প্যান কার্ডের সঙ্গে জুড়তে হবে আধার কার্ড, গ্যাসের কানেকশন অথবা সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা বা মোবাইলের সিমের সঙ্গেও। অথচ সেই আধার কার্ডের গায়েই রঙিন অক্ষরে লেখা থাকে আধার কার্ড নাগরিকত্বের পরিচয় নয়।

তাহলে হে আধার কার্ড, আপনি আসলে কে? ‘নই সাপ নই ব্যাং নই আমি কিচ্ছু!’ কিন্তু বহু বিচ্ছুরিত এই ফতোয়ায় সাধারণ মানুষের মাথায় হাত। ডিজিটাল দুনিয়া বিষয়ে চেতনারহিত আমজনতা তখন সকালে ছুটছে ব্যাংকে তো দুপুরে গ্যাসের দোকানে, সন্ধ্যায় মোবাইল স্টোরে। কার্যত এখান থেকেই শুরু হয়ে গেল প্রবল নিরাপত্তার ঝুঁকি। ইতিমধ্যে শস্তা ইন্টারনেট পরিষেবা ও সহজলভ্য স্মার্টফোনের মধ্যস্থতায় বেশিরভাগ মানুষের হাতে ফোন, কানে ফোন, চোখে ফোন। আপাতত সুলভ শৌচালয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া ছাড়া সবকিছুতেই ক্রমশ বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোনের সঙ্গে আধারের তথ্য, ব্যাংকের তথ্য ,আয়করের তথ্য জুড়ে দেওয়ার যে মহাযজ্ঞ তার ষোলোকলা সম্পূর্ণ হয়েছে আর সেই আনন্দযজ্ঞে যাঁরা অংশ নিতে পারেননি, মূলত তাঁরাই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন ডিজিটাল ছায়াপথের দিকে। আর এই অংশটাই মূলত সাইবার অপরাধের নিশ্চিন্ত শিকার। ঠিক যেভাবে নোটবন্দির পর দিশাহারা মানুষ উদভ্রান্তের মত লাইন দিয়েছিল ব্যাংকের সামনে, মরে পড়ে ছিল; অথচ দুর্নীতি বা সন্ত্রাসবাদ – কোনোটারই ‘নিধন’ হয়নি, মাঝখান থেকে কারো কারো কালো টাকা ‘সফেদ হাতি’ হয়ে ঢুকে পড়েছিল ভারতের অর্থনীতিতে।

একটু পিছনে তাকালেই আমরা দেখতে পাব, দেশজুড়ে মানুষের আধার কার্ড তৈরি করার কর্মযজ্ঞে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল প্রচুর বেসরকারি এজেন্সিকে। তারা গ্রামে গঞ্জে শহরে আধার কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করেছিল। এসব তথ্যের সুরক্ষা কি নিশ্চিত করা হয়েছে কোনোদিন? না। অথচ এই ব্যবস্থায় একটা ব্যাপার হয়েছে। যে কোনো লোকের মোবাইল নম্বর জানা থাকলে তার নাড়িনক্ষত্র এখন জেনে ফেলা সম্ভব। প্রধানত এই লিংকেজের কারণেই সাইবার অপরাধের রমরমা। একজনের সুরক্ষিত তথ্য অন্য কারোর হাতে চলে যাচ্ছে এবং সেই সুযোগে যার তথ্য সে প্রতারিত হচ্ছে। একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, এই ব্যবস্থা লাগু হওয়ার পরপরই বিভিন্ন কাজে নাগরিকের মোবাইল নম্বর চেয়ে নেওয়ার একটা অঘোষিত প্রথা চালু হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যাংকিং, অন্যান্য সরকারি পরিষেবা, এমনকি আজকাল হোটেল, রেস্তোরাঁয় খাওয়া দাওয়া করলে বা কোনো নামি দোকানে কেনাকাটা করলেও ক্রেতার মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়। নিজের আয় করা অর্থে রেস্তোরাঁয় খেলে বা কেনাকাটা করলে মোবাইল নম্বর কী কাজে লাগে কার্যত তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অথচ সব কিছু লিংক হয়ে গেলে সমস্ত নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া যাবে বা দেশের সুরক্ষা প্রতিষ্ঠিত হবে বলে যে আওয়াজ তোলা হয়েছিল, তা ফাঁকা বুলি বলে প্রমাণিত হয়েছে ঢের আগেই। এই সময়কালেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ঋণখেলাপিরা, পাচারকারীরা, চিটফান্ডের প্রতারকরা পুলিশ প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে পগার পার হয়েছে, বিদেশে নিজেদের পাকা বসত করে নিয়েছে। অন্যদিকে সাইবার প্রতারকদের হাতে সব খুইয়েছেন এক শ্রেণির মানুষ, ওটিপি সংস্কৃতিতে যাঁরা নিতান্তই বেমানান। এই পরিস্থিতির দায় কি মোবাইলে কলার টিউন পালটে দিয়েই ঝেড়ে ফেলা যায়?

আরো পড়ুন আধার ও ভোটার কার্ড লিঙ্ক: ভয়াবহ বিপদ

কার্যত আজ মানুষের রক্তের পরেই সবথেকে প্রয়োজনীয় ও জরুরি মূলধন হল তথ্য, আর সেই তথ্যের নিয়ন্ত্রণহীন হাতবদল হল সবচেয়ে বিপজ্জনক। কেউ স্বীকার করবে না, কিন্তু আদপে বহু সংস্থাই উপভোক্তাদের তথ্য অন্য সংস্থাকে বিক্রি করে। না হলে আমার আপনার মোবাইল নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর প্রতারকের কাছে যায় কী করে? এমনকি সর্ষের মধ্যেই যে ভূত আছে তাও বোঝা যায়, যখন দেখা যায় সরকারি ব্যাংকের উপভোক্তার তথ্য চলে যায় অন্যের কাছে, কোনো এক ভুঁইফোড় সংস্থা ফোন করে বলে ‘আপনি আমাদের সংস্থায় বিনিয়োগ করুন, কারণ বিনিয়োগ করার মত অর্থ আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আছে।’ কিমাশ্চর্যম! সরকারি প্রকল্পের টাকা ঢুকে যাচ্ছে অন্যের খাতায়, পুলিশের ওয়েবসাইট হ্যাক হয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, শুধু এই আধার তৈরি নিয়েই বড় মাপের একটা অসাধু চক্র বহুদিন ধরে সক্রিয়। ঠিক এই মুহূর্তে সারা দেশেই আধারের কাজে যুক্ত বেসরকারি এজেন্সিগুলোর সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে সরকারি ব্যাংক বা ডাকঘরগুলোকে ‘আধার কেন্দ্র’ তকমা দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। কিন্তু সেসব কেন্দ্রে গেলেই যে নাগরিক সুষ্ঠু পরিষেবা পাচ্ছেন তা নয়। ঠিক যেমন সরকারি স্কুলে ‘পড়াশোনা হয় না’ বলে সরকারি হাসপাতালে ‘চিকিৎসা হয় না’ বলে মানুষ বেসরকারি স্কুলে বা হাসপাতালে যান, তেমন অজস্র নিয়ন্ত্রণহীন সাইবার কাফে আছে যেখানে ঠিক কীভাবে আধার তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে তার রহস্য অজানা, অথচ কাজটা হচ্ছে। সম্প্রতি এই রাজ্যেই সন্ত্রাসবাদীদের আধার তৈরি করার এমন অনেক বিপজ্জনক কেন্দ্রের হদিশ মিলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাধারণ মানুষের বায়োমেট্রিক তথ্য একান্ত নিরাপদে রাখার অঙ্গীকার করেছিল দেশের সরকার। তার কণামাত্রও রক্ষিত হচ্ছে বলে মনে হয় না। কার্যত সাইবার প্রতারকদের মৃগয়াক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অথচ বহুকাল হল, আধার কার্ড বিষয়ক মোকদ্দমায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তাদের জন্য আধার কার্ড বাধ্যতামূলক করা যাবে না। বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার অধিকার নাগরিকের মৌলিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। আপাতত সেইসব নির্দেশের সারাৎসার সরকার খুব দায়িত্ব নিয়েই তামাদি করে দিয়েছে। পড়ে মরুক সাধারণ নাগরিকরা। তার চেয়ে মোবাইলে মোবাইলে চেতাবনির কলার টিউন শুনিয়ে নিজেদের দায় এড়ানো ঢের সহজ।

একটা সময় যখন এইডস রোগ সম্পর্কে সচেতনতার প্রচার চলত, তখন একটা স্লোগান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল – নো এইডস ফর নো এইডস (Know AIDS for NO AIDS)। সাইবার প্রতারণা বিষয়ে আজকের প্রচারও প্রায় একই সুরে বাঁধা। অর্থাৎ আপনার নিরাপত্তা আপনার হাতে। গেলে আপনারই গেল, থাকলে আপনারই থাকল। অথচ প্রযুক্তির অ আ ক খ না জানা বিপুলসংখ্যক মানুষ, যাঁরা ওটিপি বোঝেন না, পাসওয়ার্ড মানেই জানেন না, তাঁরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে? মোবাইলের কলার টিউনে আপাতত তার কোনো জবাব নেই। নবারুণ ভট্টাচার্য থাকলে বলতেন, এ আসলে পেট্রল দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.