ফিয়োডর অচলপত্রী

‘নতুন একজন আজ জয়েন করছে, জানো?’

কলেজে ছাত্র কমে এসেছে। চাকরিবাকরির বেহাল দশা, সামাজিক অস্থিরতা, জটিল সিলেবাস-বিন্যাস, মায় চার বছরের গ্র্যাজুয়েশনে কলেজশিক্ষার এখন অন্তর্জলিকাল। সকালের ক্লাসে পাঁচজন এসেছিল। তিরিশটা বেঞ্চির আঠাশটায় ধুলোর পরত পুরু হয় সেমিস্টার জুড়ে। এই ভাঙনের পথ যদি কোনো নবীন সহকর্মীর চরণপাতে ধন্য হয়, মন্দ লাগে না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

‘কোন ডিপার্টমেন্ট গো?’, আগ্রহভরে শুধোই।

‘ম্যাথস’! ভালই হল। অরুণেশদার তো এই বছরেই রিটায়ারমেন্ট। পুরো ফাঁকা হয়ে যেত ডিপার্টমেন্ট।’

গ্রামের কলেজে বিজ্ঞান পড়ার আগ্রহ কম। এখন তো একেবারেই নিভু নিভু দেউটি। গত দশ বছরে সাকুল্যে দুজন অঙ্কে অনার্স গ্র্যাজুয়েট হয়েছে কলেজ থেকে। অরুণেশদা নিজের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে কখনো সবার প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাব রাখেন, পরীক্ষার ডিউটি ভাগ করেন, ঊর্ধ্বতনকে উপহার দেন মাত্রাছাড়া স্তাবকতা। আর মাঝেমধ্যে জানলার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন ‘একটা কাউকে সঙ্গে পেলে খানিকটা লড়ে যেতাম জানো! একেবারে একা পড়ে গেছি শিপ্রাদি রিটায়ার করার পর…’

নতুন কেউ এলে আমাদের খানিক হা হা হো হো-র দলও ভারি হবে, এই ভাবনাতে খানিক খুশি খুশি মনে আরেকখানা ক্লাসের দিকে এগোই। বেলা গড়িয়েছে। এই ক্লাসে ছাত্রসংখ্যাটাও দশ ছাড়াল…

ক্লাস ও ক্যান্টিনের দু-চুমুকের চা সেরে ফিরে আসতে না আসতেই নবাগতের মুখোমুখি। অরুণেশদাই আলাপ করান। নবাগত ইতিউতি চায়। আড্ডা জমে না।

হা হা হো হো-র বাকিদের সঙ্গেও তার তালঠোক আড্ডা হয়ে ওঠে না সপ্তাহ পেরোলেও।

স্টাফরুমে যদিও নরক গুলজার। এক গাণিতিককে কীভাবে প্রায় সব বিভাগে কিছু না কিছু কাজে লাগানো যায়, তাই নিয়ে জল্পনা লেগে থাকে। কমার্সের তাকে লাগবে, ফিজিক্স-কেমিস্ট্রির ছেলেমেয়েগুলোও এবার তাদের হালভাঙা পাস পেপারের (হালের নাম মাইনর, আইডিসি ইত্যাদি) সারেঙ পেল। আচ্ছা, বাধ্যতামূলক এনভায়রনমেন্ট বা ডিজিটাল এমপাওয়ারমেন্ট একে দিয়ে পড়ানো যাবে, তাই না?

নবাগতরা কাড়ে না। ইতিউতি চায়। সোজা উত্তর পায় না প্রায় কেউই। কথাবার্তার ধরনেও কত যোজন যে তফাতে দাঁড়িয়ে থাকি!

বোমাটা ফাটে ওই সপ্তাহখানেকের মাথাতেই। জয়েনিংয়ের ডকুমেন্ট ও তার ভিত্তিতে পে ফিক্সেশনের কাজ এগোতে হবে। আজকাল পড়াও, না পড়াও; এইসব হাবিজাবি কাজে চুপচাপ লেগে না থাকলে রোষানল ধেয়ে আসবে চতুর্দিক থেকে। কলেজে শিক্ষাকর্মী নিয়োগ হয় না প্রায় ৮-১০ বছর। অগত্যা প্রয়োজনে ক্লাস কুরবানি দিয়েও সামলে দিতে হবে আমলাতান্ত্রিকতার হাজার বায়নাক্কা। সারাদিনের প্রায় ৩০ রকম কাগজ সাজিয়ে নিয়ে একেবারে শেষবেলায় এক পক্ককেশ অধ্যাপক বসেছিলেন নবাগতের রেজাল্ট, সার্টিফিকেট ইত্যাদির কপিগুলি সাজাতে। সঙ্গে এই অধম।

এবং চক্ষু চড়কগাছ…

কোনো রেজাল্ট হাতে লেখা, কোনোটার উপরে ছাপ মারা আছে ‘ডুপ্লিকেট’। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এমনকি পিএইচডি করা হয়েছে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, সেসবের নাম শোনার আমাদের সুযোগ হয়নি এতবছর উচ্চশিক্ষার সাথে যুক্ত থাকার পরেও।

সাত তাড়াতাড়ি অধ্যক্ষার নজরে ব্যাপারটা আনার জন্য দৌড়ই। পক্ককেশ দাদা থামতে বললেন। ফোনে ডাকলেন বিভাগীয় প্রধান অরুণেশদাকে। প্রায় সমবয়সী ওঁরা। বহু কুনাট্য একেবারে সামনে থেকে মঞ্চস্থ হতে দেখেছেন।

‘কেমন পড়ায় রে নতুন ছেলেটা?’

‘কেন বল তো?’ অরুণেশদা থমথম করেন।

‘আহা, বলই না।’

দীর্ঘ নীরবতা কাটিয়ে অরুণেশদা যা বলেন, তার সারার্থ এই – কিছুই পড়ায় না। ক্লাসে যায় না। সিলেবাস ভাগ করার সময়ে পছন্দের পড়ানোর বিষয় জানতে চেয়েছিলেন। নবাগত তাতেও ইতিউতি চেয়েছিল। ভাসা ভাসা দু-একটা নাম উচ্চারণ করে থেমে যায়। গতিক সুবিধার নয় বুঝে অরুণেশদা তাকে একটা দশ নম্বরের ক্লাস টেস্টের প্রশ্নপত্র তৈরি করতে বলেন। এমসিকিউ ধাঁচের। নবাগত দুদিন সময় চায়। অরুণেশদা রাজি হননি। নবাগত ঘন্টাখানেক খাতা, কাগজ ও মোবাইল নিয়ে বসে একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে। ফলস্বরূপ যে প্রশ্নপত্রটা আসে, তাতে অঙ্কের চিহ্নকগুলিরই কোনো ছিরিছাঁদ নেই। অন্তত ৩০% প্রশ্ন নির্দিষ্ট মডিউলটারই নয়। তাকে সঠিক উত্তরগুলো বেছে দিতে এবং অঙ্কগুলো করে দিতে বলায় কাঁচুমাচু মুখে জানায় সে এই বিষয়গুলি পড়েনি ছাত্রাবস্থায়। কারণ তার বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা ছিল। অরুণেশদা বলতে থাকেন ‘বেসিক ক্যালকুলাস কোন ইউনিভার্সিটি বাদ দিয়ে দেয়? কোন অঙ্কের মাস্টার হাইপারবোলিক ফাংশন না শিখে কলেজে পড়াতে আসে?’

‘নেট-সেট পাশ করল কী করে?’, জিজ্ঞাসা করি।

‘করেনি তো। সরাসরি পিএইচডি দেখিয়ে জয়েনিং!’

নেট-সেট পৃথিবীর অন্যতম অবৈজ্ঞানিক পরীক্ষাপদ্ধতি, জানি। গবেষণার গুরুত্ব তার চেয়ে ঢের বেশি।

‘কাজ কী নিয়ে?’ পক্ককেশ দাদা শুধোন।

‘আরে রাখ তো কাজ!’ অরুণেশদা একরকম ঝাঁঝিয়ে উঠলেন। ‘এই এক প্রশ্ন করেছিলাম। ভাবলাম, আমরা তো তামাদি হয়ে গেছি। নতুনরা কী করছে, কী ভাবছে একটু জানি। কোনো উত্তরই দিতে পারল না! খালি থিসিসের টাইটেলটা আউড়ে গেল বারদুয়েক। লজ্জার মাথা খেয়ে তাও জানতে চাইলাম রিসার্চ কোয়েশ্চেনটা কী ছিল? ফোন আসছে, বলে উঠে চলে গেল। সারাদিন তাকে আর দেখতেই পেলাম না…’

অধ্যক্ষার ঘরে তখন বহুবছর আগে পাশ করে যাওয়া এবং এক্ষণে সারাদিন কলেজে মাতব্বরি করে যাওয়া দুই শিক্ষাদরদি ত্রিশোর্ধ ছাত্রনেতা বুঝে নিচ্ছেন আগামী ফেস্টের অ্যাডভান্স। আমাদের আসতে দেখে যারপরনাই বিরক্ত তাঁরা। অধ্যক্ষা গুটিসুটি মেরে বসে থাকেন। শিক্ষাদরদিরা বিদায় নিলে তাঁকে সবটা জানাই। তিনি আরও খানিকটা গুটিয়ে যান। ঘাম জমে কপালে। তড়িঘড়ি ফোন যায় পরিচিতদের কাছে। প্রাজ্ঞ পরামর্শ আসে ‘জিবি করে সিদ্ধান্ত নিন। নিজের ঘাড়ে রাখবেন না।’

ছেলেমেয়েগুলো কিন্তু নিজেদের ঘাড়ে অন্যরকম নিঃশ্বাস টের পায়।

‘স্যার ক্লাসে আসেন না। কত করে বললাম, দুটো চ্যাপ্টারের কিছু কিছু অঙ্ক পারছি না একদম। একটু দেখিয়ে দিন। কাল আসব, বলে আর কোনোদিনই এলেন না।’

‘টিউটোরিয়ালের যে টপিক দিয়েছেন, সেটা অব্দি আলোচনা করলেন না। শুধু হোয়াটস্যাপে লিখে দিলেন।’

‘ইউনিয়নকে বললাম। ওরা কিছু করবে না। আমরা প্রিন্সিপালকে চিঠি দেব স্যার।’

চিঠি পেয়ে অধ্যক্ষা একবার ডেকে পাঠান নবাগতকে। ক্লাস করতে কোথায় অসুবিধা হচ্ছে জানতে চান।

নবাগত ইতিউতি চায়। দায়সারা জানায়, যে ক্লাস সে খুবই করে। আগামীদিনে আরও ভালভাবে ক্লাস নেবে।

অধ্যক্ষা চুপ করে যান। পে ফিক্সেশনের কাগজ জমা পড়ে যথাসময়ে।

একদিন ক্যান্টিনের দু-চুমুক চায়ের ফাঁকে দেখি আমাদের সঙ্গে আড্ডা না জমলেও, সেই শিক্ষাদরদিদের সঙ্গে তার সান্দ্র সখ্য জমে উঠেছে ইউনিয়নের চাতালে।

আরও দেখি, রোগাপটকা যে মেয়েটা ৪০ মিনিট সাইকেল চালিয়ে ক্লাস করতে এসেছিল, যে অকালবিবাহ আটকে স্কলারশিপ, টিউশনির টাকায় গবেষণাগারভিত্তিক বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে পড়তে চেয়েছিল, যে অধ্যক্ষাকে মরিয়া চিঠিটা লিখেছিল – গনগনে দুপুরে একরাশ ঘেন্না নিয়ে সে বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছে। সে বুঝেছে, এই অঙ্কের ক্লাসটা আর কোনোদিন হবে না।

সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মতই শাশ্বত হয়ে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা আসে। পোর্টালে নাম তুলে নবাগত এখন পরীক্ষক। ফিক্সেশনের সেই কাগজ নিয়ে নানা জল্পনা চলতে থাকে। ওই ডিগ্রিগুলো নাকি ভুয়ো, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নাকি ভুরিভুরি অভিযোগ। নবাগতের হেলদোল দেখি না।

ভরা খাতা দেখার মরসুমে অরুণেশদা আরেকটা বোমা ফাটালেন।

পরীক্ষার খাতা নবাগত কেমন দেখেছে, একবার সরেজমিনে দেখতে চেয়েছিলেন। ততদিনে নম্বর উঠে গেছে বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত পোর্টালে। যা দেখলেন, তাতে ওঁর নশ্বর জীবন ধন্য। রং পেন্সিল দিয়ে কিছু খাতায় দাগ দেওয়া। বেশিরভাগ খাতাই অপরীক্ষিত। অথচ সমস্ত নম্বর জমা পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। জিজ্ঞাসা করায় নবাগত জানায়, প্রথমবার, তাই গুস্তাকি যেন এবারের মত মাফ করা হয়। অরুণেশদা তাকে সামনে বসিয়ে একটা খাতা সঠিকভাবে দেখতে বলেন। যাতে ভুলচুক হলে দেখিয়ে দিতে পারেন। নবাগত খাতার গায়ে হাত বুলোয়, লাল কলম স্থাণুবৎ থেকে যায়। মহাকাল এগোয় প্রহরান্তরে। এবারও দুদিন সময় চায় নবাগত। জানায়, দুদিনে সে সমস্ত কিছু ঠিক করে দেবে।

অরুণেশদার তিনমাস পরে রিটায়ারমেন্ট। তিনি আর কিছু বলেন না।

ছেচল্লিশ জন তরুণের পরিশ্রম, ভবিষ্যৎ পাটের দড়িতে বাঁধতে বাঁধতে নবাগত, যোগদানের পর এই প্রথম, অমলিন হাসে।

কলেজে কলেজে আজকাল সম্বৎসর উৎসবের মরসুম। নানা অনুষ্ঠান, উদযাপন না করলে সর্বভারতীয় র‍্যাংকিংয়ে কল্কে পাওয়া যায় না। জাতীয় গণিত দিবস এসে পড়ল। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে গণিত বিভাগ। ব্যানারে শ্রীনিবাস রামানুজন এবং তাতে জ্বলজ্বল করছে ‘National Mathamatic Day’ লেখাটা! অরুণেশদা হাল ছেড়ে দিয়েছেন বুঝতে পারি। ইতিমধ্যে নবাগত কলেজে নানা কমিটি আলো করে বসেছে। শোনা যায়, ছাত্রছাত্রীদের হাতে রাখতে তার অস্ত্র ইন্টারনাল, টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় ঢালাও নম্বরের খয়রাতি এবং, দুর্জনে বলে, ‘ডিরেক্ট ক্যাশ ট্রান্সফার’! যা-ই হোক, নবাগতকে জানাই এই চ্যুতির বিষয়ে। সে-ই দায়িত্ব নিয়ে ঢাউস ব্যানারটি বানিয়েছে। অরুণেশদা এখন বেশ খানিকটা কোণঠাসা।

নবাগত অমলিন হাসে। ‘আমার বানান খুব ভুল হয়। ইংরেজি, বাংলা দুটোরই বানান আমি খুব ভুল করি।’

আব্রু রক্ষার মত করে ব্যাপারটাকে কাগজ-টাগজ আটকে সামলানো হল কোনোমতে। শিক্ষাদরদিদ্বয় ও তাঁদের জনা দশেক স্যাঙাত ব্যতীত কোনো ছাত্র চোখে পড়ে না অনুষ্ঠানে। অধ্যক্ষা, অন্যবিধ তালেবরদের মঞ্চে রেখে নবাগত ততক্ষণে শুরু করেছে তার লিখিত বক্তৃতা: ‘মাননীয় সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের অনুপ্রেরণায়…..’

আমরা রা কাড়তে পারি না।

ইতিউতি চাই।

মরুপথ থাকলে মরুদ্যানও থাকে। তাই সপ্তাহান্তের আড্ডা জমাই গত শতাব্দীর গন্ধ লেগে থাকা শস্তার ক্যাফেতে। আড্ডাতেও একই পেশার সিনিয়র দাদা আসেন। ‘বার্ডস অফ এ ফেদার’। লজ্জা ভেঙে আড়ালে একবার জানিয়েই ফেলি সবটা। কফির কাপে থমকে যায় প্রগতির আখ্যান।

‘আমাদেরও আছে একটা। বাংলার। মহিলা। সহায়িকা বই নিয়ে ক্লাসে যায়। রিডিং পড়ে চলে আসে। ছুটির নোটিশ লিখতে বলা হয়েছিল। সরস্বতী বানানের দিকে তাকানো যায় না। কোন কলেজ, কী-ই বা স্পেশাল পেপার ছিল – জিজ্ঞাসা করলে বিরক্ত হয় খুব। এদিকে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই হেড একজামিনার। এই কমিটি, সেই কমিটির মাথায় তার দাপাদাপি।’

শীতশহরের বুকে জমাট বাঁধতে থাকে দূষণ আর অন্ধকার। দাদা বলে চলেন ‘মেয়েকে তাই এই ইউনিভার্সিটির কলেজে পড়ালাম না, জানিস? এরা পড়াবে, খাতা দেখবে, ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠবে – ভাবতে পারছিলাম না।’

শহরের উপকণ্ঠে এখন ঝলমল করছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ইংরেজি, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞানের মত বিষয়ে স্নাতকের কোর্স ফি ৪-৫ লাখ ছুঁয়ে ফেলে অনায়াসে। দাদার মেয়ে তাতেই জায়গা করে নিয়েছে। ওদের সেমিস্টার শুরু হয় যথাসময়ে, পরীক্ষাও হয় নিয়মমত। গরীবের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পর্ব নভেম্বর গড়িয়ে গেলেও পেরোয় না। পরীক্ষা, রেজাল্ট বেরনো চলে তার একান্ত নিজস্ব আহ্নিক-বার্ষিক গতি অনুসারে।

রোগাপটকা মেয়েটাকে বোঝাতে পারি না – কেন থার্ড সেমিস্টারের পরীক্ষার রুটিন আসে না, অথচ ফার্স্ট সেমিস্টারের পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়? কেন পঞ্চম ও ষষ্ঠ সেমিস্টারের মধ্যে কার্যকরী ব্যবধান মাত্র দুমাসে এসে দাঁড়িয়েছে? কেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ দিতে বহুজাতিক আসে, আর তার কলেজে বলা হয় বিউটিশিয়ান কোর্স করতে, ট্রাক চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে? কেন তার ডিপার্টমেন্টে দুজন শিক্ষক? তার মধ্যে একজন কেন পড়াতে না পেরে দিব্যি ঘুরে বেড়ান? আর সেই ঝাঁ চকচকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন শিক্ষকসংখ্যা বাড়ন্ত হয় না কোনোদিন?

আরো পড়ুন বাজেট: কী পাইনি তার হিসাব মেলাতে নাজেহাল ছাত্রের বিলাপ

অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছি দেখে দাদা কথা ঘোরাতে চান।

‘মেয়ের ইউনিভার্সিটিতে প্রাঞ্জল জয়েন করেছে জানিস?’

‘কে প্রাঞ্জল?’

‘আরে বর্ষণাদির ছেলে রে। হায়দরাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করে পিএইচডি জমা দিল আইআইটি চেন্নাইতে। ইকোনমিক্স। সার্ভিস কমিশনে বসেছিল। হয়নি। এখানে মাইনেপত্রের সমস্যা আছে। কোনো স্কেল-টেল নেই। নেগোশিয়েট করে নিজের মূল্য ঠিক করে নিতে হয়। সে তুমি যতই মারকাটারি ছাত্র বা গবেষক হও না কেন। তবু একটা চাকরি তো। বর্ষণাদির শরীর ভাল নেই। আর মাস্টারের বাড়ির ছেলে মাস্টারি করতে চেয়েওছিল। লেগে থাকলে আরও এগিয়ে যাবে।’

প্রাঞ্জলের সাড়ে আট ঘন্টার শিফট। প্রাঞ্জলকে তারপর প্রশ্ন করতে, খাতা দেখতে, রিপোর্ট লিখতে হয়। গবেষণাপত্র প্রকাশ না করলে তার চাকরি সংকটে পড়বে। রাত বাড়ার তালে তালে এত ভালবাসার পড়াশোনা, লেখালিখি কীরকম যেন একপেশে, ক্লান্তিকর হতে থাকে। মায়ের পেসমেকার বসলে বহু কাকুতি মিনতির পর তার দুদিনের ছুটি মঞ্জুর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচ আর।

হাজারের উপর স্কুল বন্ধ হওয়ার খবর আসে। মন্ত্রী সে বিষয়ে নীরব থেকে হুহুংকারে জানান ১৩-১৪ খানা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা। গ্রামান্তরে গজিয়ে ওঠে ইংলিশ মিডিয়াম। গ্রামের রোগাপটকা গরিব মেয়েটা, শহুরে সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রাঞ্জল, সেই বিশাল কর্মযজ্ঞে আহুতিতে পরিণত হয়। প্রফেট সুকান্ত ঝলসে ওঠেন। খাদ্য হয়েই মোরগ প্রবেশাধিকার পায় রাজপ্রাসাদে।

ছেলেমেয়েরা বুঝে যায় সবার আগে। কলেজে ছাত্রছাত্রী জোগায় যে স্কুলগুলো সেখানেও ভুয়ো শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর খোঁজ আসে। তাদের চাকরি যায়, আবার ফিরেও আসে। মামলা, ধর্না চলতে থাকে। ছেলেমেয়েদের কথা ওঠে না। বয়ঃসন্ধি, তারুণ্যের সতেজ বয়সে তাদের মনে স্থির বিশ্বাস জন্মায় দুর্নীতির ধ্রুবপদে। বাড়ির অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা করতে চাওয়া ছেলেটা হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। মাসখানেক আসে না। ফোন করলে মা জানান, ‘বম্বে চলে গেছে স্যার। হীরের কাজে। ছোটবোন আছে। বে-থা দিতে হবে। পড়াশোনা করে তো কিছু করতে পারবেনি।’

আরও মাসখানেক পরে ঝলমলে জামা পরে দেখা করতে আসে।

‘পড়লি না কেন? ভাল করছিলি তো। কী হল?’

‘কী করব স্যার? প্রাইমারিতে সাত লাখ, হাইস্কুলে দশ। আচ্ছা স্যার, ওই অঙ্কের স্যার কত দিয়েছেন? মানে আপনাদের কত লাগে?’

একথা, সেকথা বলে সরে পড়ি।

নবাগতর ফিক্সেশন হয়ে গেছে। হাতে লেখা মার্কশিট, অস্বচ্ছ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, পড়াতে না পারা, খাতা দেখতে না পারা – কিচ্ছু, কিচ্ছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

কলেজে ছেলেমেয়ে কমতে থাকে। কানে আসে, ক্রমক্ষীয়মাণ একাধিক সরকারি স্কুল-কলেজ এবার মিলিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমে একে অন্যের সাথে। তারপর বোধহয় মহাশূন্যে।

বুঝতে পারি, সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যয়সংকোচন আপসে হয়ে যায় যদি দুর্নীতি আর মূল্যবোধের এই সার্বিক বিনষ্টি যুগপৎ সংঘটিত করা যায় নিঃশব্দে। বাংলা পথ দেখাচ্ছে।

কলেজে ফেস্ট শুরু হয়।

হেভিওয়েট নেতা আসবেন। শিক্ষাদরদিরা শশব্যস্ত।

দোতলা সমান লাউডস্পিকার গর্জে ওঠে: ‘টুট যাই পলং রাজা জি…!’

সব চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.