মৌনী অমাবস্যায় মহাকুম্ভ মেলায় কতজন স্নান করেছেন তার তথ্য দেওয়া হচ্ছে অবিরত। অথচ পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা জানাতে লেগে গেল ১৭ ঘন্টা। পুণ্যার্থীদের জীবনের গুরুত্ব প্রশাসন ও সরকারের কাছে কতখানি, তা এতেই স্পষ্ট। গত ২৮ জানুয়ারি মৌনী অমাবস্যা তিথিতে স্নান করতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে মারা যান অনেক পুণ্যার্থী। রাত একটা থেকে দুটোর মধ্যে ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনা সংবাদমাধ্যমকে জানাতে এসে যায় ২৯ জানুয়ারি বিকেল। সরকারি পক্ষ থেকে মাত্র ৩০ জনের পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর কথা জানানো হলেও, বিভিন্ন মহলের মতে সংখ্যাটা তার থেকে অনেক বেশি। বহু মানুষ ঘটনার দিন পাঁচেক পরেও নিখোঁজ। নিহত ও আহতদের খবর নিতে গিয়ে চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে পরিবার পরিজনকে। হিন্দুরা বিপদে আছেন বলে যারা দেশজুড়ে বিদ্বেষের রাজনীতি করছে, হিন্দুদের ধর্মীয় মহোৎসবে তাদের পরিচালিত সরকারের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিজেপিবিরোধীদের অভিযোগ – বিজেপি তথা সংঘ পরিবারের ধর্মে যত না মতি, তার চেয়ে বেশি মতি ধর্ম নিয়ে রাজনীতিতে। মহাকুম্ভ মেলা সেই অভিযোগের যাথার্থ্য প্রমাণ করেছে।

২৯ জানুয়ারি সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, মৌনী অমাবস্যায় তখন পর্যন্ত তিন কোটি মানুষ স্নান করেছেন। কিন্তু ঘন্টা ৬-৭ আগের ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা তখনো প্রকাশ করা হয়নি। আসলে হয়ত সোশাল মিডিয়ায় পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল বলেই উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ সরকার খবরটা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করার পর রাজ্য সরকার সরকারিভাবে ওই ঘটনা জনসমক্ষে আনে। সঙ্গত কারণে অনেকেরই ধারণা, সোশাল মিডিয়ায় এই সংবাদ ও সেই সংক্রান্ত ভিডিও চাউর হয়ে না গেলে সরকার দুর্ঘটনার কথা বেমালুম চেপে যেত। দুর্ঘটনার কথা চাপতে না পারলেও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা থেকে দুর্ঘটনার কারণ – সবকিছুই ধামাচাপা দিতে চাইছে যোগী সরকার। অথচ, দুর্ঘটনার ঠিক আগেই (২৭ জানুয়ারি) দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কুম্ভস্নানের সংবাদ প্রচার করতে এতটুকুও ত্রুটি রাখা হয়নি। অমিত, আদিত্যনাথ, রামদেবের স্নানদৃশ্য নানা প্রচারমাধ্যমে দেখেছে গোটা দুনিয়া। শুধু তাই নয়। রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় নেতা, সিনেমার নায়ক-নায়িকা, শিল্পপতি, বিদেশের স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিখ্যাত লোকেদের আগমন নিয়ে চলেছে অন্তহীন প্রচার। আইআইটি বাবা থেকে শুরু করে একদা বলিউডি নায়িকার সন্ন্যাস গ্রহণের সংবাদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে গোদি মিডিয়া এবং উত্তর-সত্য যুগের নানা সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল। তারাই আবার এখন সরকারের হাতে হাত মিলিয়ে পুণ্যার্থী মৃত্যুর ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে বা যথাসম্ভব লঘু করে দেখাতে ব্যস্ত।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মৌনী অমাবস্যায় মহাকুম্ভে স্নান করতে ৮-১০ কোটি মানুষ হাজির হয়েছিলেন। এত লোকের উপস্থিতি সম্পর্কে প্রশাসনেরও আগাম ধারণা ছিল। ২৮ জানুয়ারি রাতে ডিভিশনাল কার্যালয় থেকে পুণ্যার্জনের জন্য তাড়াতাড়ি স্নানে যেতে হাত মাইকে ঘোষণা করা হয়। তারপরেই পুণ্যার্থীদের মধ্যে স্নান করতে যাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। বিপুলসংখ্যক মানুষের একসঙ্গে স্নান করতে যাওয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা প্রশাসন করেনি। অস্থায়ী অনেক পুলই বন্ধ করা ছিল। অনেকের অভিযোগ – পুলিস লাঠিচার্জ করায় নাকি পুণ্যার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। সেদিনের চূড়ান্ত অব্যবস্থা বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে। দুর্ঘটনার সময়ে পুলিসকে বিশেষ দেখা যাচ্ছে না, অথচ দুর্ঘটনাস্থল সঙ্গমের একেবারে কাছে, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ রাখার স্বাভাবিক দায়িত্ব প্রশাসনের ছিল। জানা যাচ্ছে, মৌনী অমাবস্যায় আরও দুটো পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যু ঘটেছে। যার মধ্যে অনেক পরে হলেও একটার কথা প্রশাসন স্বীকার করেছে। দুবার মেলা চত্বরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার ত্রুটিও প্রকাশ হয়ে পড়েছে।

চূড়ান্ত অব্যবস্থা ও প্রশাসনের গাফিলতির জন্য ভিআইপি সংস্কৃতিকে দায়ী করা হচ্ছে। মন্ত্রী, সান্ত্রী সমেত রাজনীতিবিদ, সেলিব্রিটিদের স্নানের পথ সুগম করতে সাধারণ পুণ্যার্থীদের যাতায়াতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনেক অস্থায়ী পুল বন্ধ রাখা হয়েছে। জায়গায় জায়গায় ব্যারিকেড তুলে পুণ্যার্থীদের স্নান করতে যাওয়ার পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে। বিখ্যাত ব্যক্তিদের গাড়ি চড়ার জন্য সাধারণ পুণ্যার্থীদের যেতে আসতে ২০-৩০ কিলোমিটার অবধিও হাঁটতে হচ্ছে। স্নান করতে যাওয়া ও আসার পথ আলাদা না করাতেও সমস্যা সৃষ্টির অভিযোগ আগেই অনেকে করেছিলেন। উত্তরপ্রদেশ সরকার ভিআইপি থেকে ভিভিআইপি পর্যন্ত নানারকম পাশের ব্যবস্থা করে বিখ্যাতদের পুণ্যার্জনের পথ মসৃণ করেছে। ২০১৭ সালে ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদী নতুন ভারতে ভিআইপি সংস্কৃতি তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নতুন ভারতে প্রত্যেকটা মানুষই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ভারতে ভিআইপির বদলে ইপিআই (‘every person is important’) সংস্কৃতি চালু করা হবে। অথচ তাঁদের বহুল প্রচারিত মহাকুম্ভ মেলায় ভিআইপি সংস্কৃতির নিকৃষ্টতম নমুনা দেখছে ভারত। এর জন্য অনেক পুণ্যার্থীকে প্রাণ দিতে হল। ১৯৫৪ সালে মৌনী অমাবস্যায় এলাহাবাদে স্নান করতে গিয়ে কয়েকশো পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনী প্রচারে সেই দুর্ঘটনার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে দায়ী করেছিলেন মোদী। এবারে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনার দায় কি তাহলে স্বয়ং মোদী উপরে বর্তাবে?

মেলার শুরু থেকেই চূড়ান্ত অব্যবস্থার অভিযোগ আসছিল। যে অব্যবস্থা কেবল প্রয়াগরাজকে নয়, বারাণসী, অযোধ্যাকেও প্রভাবিত করেছে। প্রয়াগরাজমুখী পুণ্যার্থীদের গতিরোধের জন্য বারাণসীর আশেপাশে বহু স্কুল, কলেজ সরকার সাময়িকভাবে নিয়ে নিয়েছে। প্রয়াগরাজের ৫০ কিলোমিটার জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার এসব অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা না করে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এই মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত। পুণ্যার্থীদের মৃত্যুর পর অগত্যা ভিআইপি পাশ বাতিল করা হয়েছে। প্রয়াগরাজে গাড়ি প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই ভিআইপি সংস্কৃতি আগে বন্ধ করা হল না কেন? সাধারণ মানুষের প্রাণহানির পর সরকারের বোধোদয় হল?

যদিও সরকারের বোধোদয়ের প্রমাণ কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার পর থেকেই সত্য ধামাচাপা দিতে সরকার অতি তৎপর। মৃত ব্যক্তিদের দেহ পরিবার পরিজনদের হাতে তুলে দেওয়া, তাঁদের দেহ বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ – কিছুই করা হয়নি। নিখোঁজদের সন্ধান করতেও বিশেষ তৎপরতা প্রশাসন দেখাচ্ছে না। মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের তরফ থেকে অভিযোগ আসছে, মৃতদেহ গ্রহণ করা, বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাঁ হাতে টাকা চাওয়া হচ্ছে। ময়না তদন্ত তো হচ্ছেই না, উপরন্তু মৃতদের মৃত্যুর শংসাপত্র (death certificate) পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে। সরকারি সিলমোহর ছাড়া কাগজে কেবল দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার কথা লিখে দেওয়া হচ্ছে। সেই কাগজের আইনি বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তো আছেই, পাশাপাশি সিলমোহরহীন এই কাগজের জন্য পরবর্তীকালে নানা ক্ষেত্রে পরিবারের হেনস্থার আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আড়াল করতেই এই অব্যবস্থা, অরাজকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির মাতব্বররা পুণ্যার্থীদের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতিতেও সমান নির্লজ্জ।

আরো পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্র ঠিক কেমন দেখতে?

যোগ্য সঙ্গত করছে গোদি মিডিয়া। অধিকাংশ মূলধারার প্রচারমাধ্যমই দুর্ঘটনাকে লঘু করার চেষ্টা করে চলেছে। তবে কিছু ব্যতিক্রমী সংবাদমাধ্যমের পরিবেশিত তথ্যে খোদ উত্তপ্রদেশ ও কেন্দ্রের ডবল ইঞ্জিনের সরকারের দায় স্পষ্ট হয়েছে। একটি বহুল প্রচারিত হিন্দি সংবাদমাধ্যম এই ঘটনার জন্য ছজন প্রশাসনিক আধিকারিকের ভূমিকাকে দায়ী করেছে। তাঁদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বিশ্লেষণও করেছে। এক সর্বভারতীয় হিন্দি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক মেডিকাল কলেজে নিহতদের অনুসন্ধানে গেলে পুলিস আধিকারিকদের হাতে হেনস্থার শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন ওয়েবসাইট, সংবাদ পরিবেশনকারী ইউটিউব চ্যানেলগুলো থেকেই মূলত যথাযথ খবর পাওয়া যাচ্ছে। কুম্ভমেলার সরকারি বিজ্ঞাপনের প্রলোভন ছাড়া আর কোন চাপের কারণে মূলধারার সংবাদমাধ্যম ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিল – সে প্রশ্ন উঠছে। মোদীর আমলে ভারতের সংবাদমাধ্যমের পরাধীনতা, সরকারপক্ষের হয়ে নির্লজ্জ প্রচার নতুন কিছু নয়। বিজেপি সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে এখন আমজনতার মৃত্যু সংবাদও তাদের হয় ঢাকতে হচ্ছে, নয় লঘু করে পরিবেশন করতে হচ্ছে।

মহাকুম্ভ মেলাকে রাজনীতির হাতিয়ার করতে বিজেপি চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। বারো বছর অন্তর পূর্ণকুম্ভ হলেও, এবারের মত মহাকুম্ভ হয় ১৪৪ বছর অন্তর। সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে চলেছে উত্তরপ্রদেশ ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঠান্ডা যুদ্ধও বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। অযোধ্যার রামমন্দির উদ্বোধনে প্রচারের কেন্দ্রে ছিলেন মোদী। মহাকুম্ভকে কাজে লাগিয়ে যোগী এবার কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিয়েছেন। উগ্র হিন্দুত্ববাদ আর বুলডোজাররাজ কায়েম করা ছাড়া আদিত্যনাথ সরকারের আর কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বহু আন্দোলন দমনে বুলডোজারের অপব্যবহারে উত্তরপ্রদেশ সরকার কুখ্যাত। নারী নিরাপত্তা, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, কৃষকদের ফসলের ন্যায্য মূল্য দেওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য দূরীকরণ – সবদিক দিয়ে এই সরকার ব্যর্থ। এমনকি সরকারি হাসপাতালে শিশুদের জীবন রক্ষা করতে গেলেও চিকিৎসককে হাজতবাস করতে হয়। ডাক্তার কাফিল খান এর উদাহরণ।

আদিত্যনাথ সরকারের আমলেই ২০১৭ সালে উন্নাওয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ১৭ বছরের এক তরুণী। মেয়ের বিচার চাওয়ায় তার বাবাকে প্রথমে এক মামলায় গ্রেফতার করা হয় এবং তারপর খুন করা হয়। সেই অপরাধে আদালতে বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সিং সেঙ্গারের কারাদণ্ড হয়। ২০২০ সালে হাথরাসে ধর্ষিতা তরুণীর মৃত্যুর পর তথ্য প্রমাণ লোপাট করতে তড়িঘড়ি তাঁর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই ঘটনার প্রতিবেদন লিখতে যাচ্ছিলেন বলে সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানকে ইউএপিএ সমেত একাধিক মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এসবের পর ২০২২ সালে বিধানসভা নির্বাচনে জিতলেও গত লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি ধাক্কা খেয়েছে। এখন কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেই পরের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছে যোগীর দল।

কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরও অভিপ্রায় তাই। নমামি গঙ্গে প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্র বারাণসীকে ঢেলে সাজিয়ে ধার্মিক সাজতে চায় তারা। অথচ গঙ্গা নদীকে বাঁচানোর জন্য অনশন করলে কেন্দ্র বা বিজেপি পরিচালিত উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ডের সরকারের হাতে সাধুদেরও হেনস্থা হতে হয়। গঙ্গা বাঁচাতে গিয়ে অনশনে শহিদ হন আশ্রমিক সাধুরা। আসলে নিজেদের ভক্তি নয়, সাধারণ মানুষের ভক্তিকে হাতিয়ার করে ক্ষমতালাভই বিজেপির রাজনৈতিক লক্ষ্য। তাই প্রধানমন্ত্রী কুম্ভস্নানের জন্য ৫ ফেব্রুয়ারি দিনটাকে বেছে নিয়েছেন – যেদিন দিল্লিতে বিধানসভা নির্বাচন। ২৮ জানুয়ারি রাতের দুর্ঘটনার পর ভিআইপি পাশ বাতিল হলেও প্রধানমন্ত্রীর ৫ ফেব্রুয়ারির প্রয়াগরাজ সফর বাতিল হওয়ার কোনো খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ পুণ্যার্থীদের পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা, চূড়ান্ত অব্যবস্থা, প্রশাসনিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে লঘু করে মহাকুম্ভকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে এখনো বিজেপি নির্লজ্জের মত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আদিত্যনাথের রাজত্বে নাম বদলের রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এলাহাবাদের নাম আগেই হয়ে গেছে প্রয়াগরাজ। মহাকুম্ভ আয়োজনের জন্য সরকার ৭,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। অখিল ভারতীয় আখড়া পরিষদের দাবি মেনে মেলায় অহিন্দুদের দোকানপাট দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। এতকিছুর পরেও পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তায় এত গলদ কেন? দুর্ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশ সরকার তিন সদস্যের বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু অনেকের আশঙ্কা, দোষীদের চিহ্নিত করার বদলে তাদের আড়াল করতেই এই কমিশন গঠন করা হয়েছে। এখনো ব্যাপারটাকে অন্য ধর্মাবলম্বী বা উগ্রপন্থীদের কাজ বলে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করা যায়নি। অহিন্দুদের মেলায় দোকান খোলা নিষিদ্ধ হলেও, দুর্ঘটনাগ্রস্ত অনেকেই মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইসলাম এবং শিখ ধর্মাবলম্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে পুণ্যার্থীদের সেবার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের এই ভারতকেই তো ধ্বংস করতে চায় বিজেপি।

মহাকুম্ভ কাজে লাগিয়ে ভোটে জিততে গেলে যেমন ভিআইপিদের আগমন প্রয়োজন, তেমন বিপুল জনসমাগমও দরকার। সেই লক্ষ্যেই বিখ্যাতদের সুবিধা করে দিতে, নিরাপত্তা দিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, পরিষেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি সরকার। বিশিষ্টদের আগমন ঘিরে সংবাদমাধ্যমে উন্মাদনা সৃষ্টির জন্য সরকারি কোষাগার, প্রশাসনিক ক্ষমতা সবকিছুই ব্যবহার করা হয়েছে। প্রচারে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি হলে, সাধারণ পুণ্যার্থীদের আগমনও বেশি করে হবে। তাঁরা তো কেবলই সংখ্যা। তাঁদের মানুষ হিসাবে মর্যাদা, জীবনের নিরাপত্তা দিতে সরকারের বয়েই গেছে। হিন্দুত্ববাদের জিগির তুলে ভোটে জেতার মহাযজ্ঞে কয়েকজন হিন্দু পুণ্যার্থী মারা গেলেও তারা বিচলিত নয়। কোটি কোটি মানুষের সমাগমে কয়েকজনের মৃত্যুতে কী-ই বা এসে যায়? সেসব সাধ্যমত ধামাচাপা না দিতে পারলে মহাকুম্ভের আয়োজন মাঠে মারা যাবে। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির কারবারীদের কাছে ধর্মভীরু মানুষ যে কেবলই সংখ্যা, মানুষ নন – এবারের মহাকুম্ভ সেকথা আবার প্রমাণ করল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.