সৌরভ হোসেন
কালো কুচকুচে চুলের এলোগোছাটাকে পোক্ত করে ধরে একটা জোর হ্যাঁচকা টান মারতেই ‘ইস’ করে উঠল ফরিদা। কট করে উঠল আলুথালু বিহনির গাঁট। লম্বা দোহাতি চুল। কদমথোকা চুল বাঁধলে, মাথাটা ঝোপ হয়ে ওঠে। আইবুড়োতে সবাই তাকে বলত ‘চুলোমেয়ে’। এখনও চুল ছেড়ে দিলে কোমরে এসে ঠেকে। এই চুলেই কদিন হিজাব পরিয়েছিল ফরিদা। চুলে পুরুষ মানুষের নজর পড়লে গোনাহ হবে। সে গোনাহ তাকে পরকালে দোজখে নিয়ে যাবে! ইউনুস আরব থেকে হাদিস-কোরআনের আয়াত উল্লেখ করে বলেছিল, মনে রেখো, আল্লাহ ইজ্জতের হিসেব মীযানের পাল্লায় বুঝে নেবেন! ভয় পেয়েছিল ফরিদা। সে ভয় তাকে হিজাব তো পরিয়েছিলই সারা গায়ে বোরখাও পরিয়েছিল। নিমগাছের ছায়াটা কার্নিশ ছুঁয়ে সুড়সুড় করে উঠোনে পা মেলছে। মাথা ঝুঁকে ঝুঁকে দেওয়াল চুঁইয়ে নামছে কাঁচা হলুদ রোদ। ততক্ষণে ডেটো করা ছাদটায় পিঠ খাড়া করে দাঁড়িয়েছে পড়ন্ত বিকেল। সিঁথির ফাঁকে খয়েরি নেলপালিশ মাখা মিহি আঙুলে বিলি কাটতে কাটতে সখিনা জিঞ্জেস করল, “তোর মরদডার কী খবর রিয়ে?”
“এখুন আসবে না খ।” ঠোঁট বিলি কেটে ওঠে ফরিদার। চুল স্পর্শের মিহি আদরে চোখের পাতা বুজে আসছে তার। যেন আরামের ঠান্ডা স্রোত চুলের বিলি দিয়ে ঝিরঝির করে নেমে আসছে চোখে। আধমোদা চোখ থিত্থির করে ফরিদা বলল, “আর তোর ক্যাবা? ইদে কি বাড়ি আসচে?”
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
“না রিয়ে না, উ পুরা পাঁচ বচ্ছর থেকি আসবে। একনাগাড়ে টানা না থাকলে, টাকা কী কইরি গুছভে?”
“তোর কষ্ট হয় না? একা একা শুতে ভাল লাগে?” দুম করে প্রশ্নটা করল ফরিদা। তারপর ঠেস মেরে বলল, “অবশ্য একা আর থাকিস কই।” আর অমনি খলসে মাছের মতো চিড়বিড় করে উঠল সখিনা, “একা থাকি ন্যা মানে? একা থাকি ন্যা তো তোর মুতন ঢ্যামনা লিয়ি শুই?” সখিনার অ্যাচাংফ্যাচাং দেখে মনে হল ফরিদার কথার সুড়সুড়িতে তার শরীরে কাতুকুতু না লেগে ঝ্যান করে উঠল। ঠেস মারা কথাটা এবার ঠেসে গুঁজে দিল ফরিদা, “অত খেপছিস ক্যানে? সত্যি কথাটা বুললেই রাগ?” সখিনা ফোঁস করলেও ছোবল মারল না। ভেতরে ভেতরে একটা আলাদা মজা পেল। কথাটাকে তেঁতুলবাটার মত বেটে খেল। চুকচুক করে জিহ্বায় জল চলে এল। এ জলে শরীর না ভিজলেও মন ভেজে। আর সে ভেজা মনে সাঁতার কাটে অন্য মানুষ। নারীর কাছে এ মানুষ মরদ। শরীরী লড়াইয়ে ঘানি টানা পুরুষ।
হাঁটুদুটো খাড়া করে বসল সখিনা। চুলের বিহনিতে জোর প্যাঁচ লাগাল। আঙুল আঁচড়েপাচড়ে বিলি কাটল। চুলের গোড়ায় তেল গুঁজে দিতে দিতে তার ভিতরটা মিচকি হেসে ওঠে। ভাবে, ফরিদার কথায় কোনো মিথ্যে নেই। আমি কি একা? গোটা গাঁয়ের সবকটা জোয়ান বউ শরীরের খিদে তো অমনি করেই মেটায়? গায়ে-গতরে কামড় উঠলে কী করবে? জ্বালা মেটাবার পুরুষটাই তো সাত সমুদ্র তের নদী পার! শুধু ভাত-কাপড়ের লেগেই তো মানুষ বাঁচে না? নাড়ির খিদের থেকে শরীরের খিদে কি কম?
“কী রিয়ে ঝিমিয়ে পললি নাকি?” চুলের ঝোড়ে কিলবিল করে নড়ে বেড়ানো আঙুলগুলো ক্লান্ত হয়ে এলে, ঘাড় ঘুরিয়ে উঠল ফরিদা। আঁচলের গোছাটা সড়সড় করে কাঁধ থেকে কোলে পড়ে গেল। হুঁশ ফিরল সখিনার। বিহনির আলগা বাঁধনটায় একটা জোর খিঁচুনি মারল। কচ করে শব্দ হল। ‘আঃ’ করে উঠল ফরিদা। বিরক্তি প্রকাশ করল,“কী রে, চুলগুলেন ছিড়ি ফেলবি নাকি?” সখিনা ফরিদার কথায় কান করল না। সে অন্য আমোদে ডুবে থাকল। সে আমোদের রসকষের ঢেকুর দুই ঠোঁটে এসে টোকা দিলে বলল, “গ্যালো রাতে বাবলুর সাতে ক্যামুন ফষ্টিনষ্টি কল্লি?”
“কী ল্যাওড়া যে বুলিস! ওসব লাড়িজ্বলা কথা অ্যাখুন গাহাস ন্যা তো?” উফল মাছের মত তিড়বিড় করে উঠল ফরিদা।
“লটরপটর ভালই কচ্ছিস। আর আমি বুললেই, লাড়িজ্বলা?”
“আর তুই? পশশু ভদদুফুরে তোর বাড়ি থেকি গামছা মুখে দিয়ি হালিমকে বের হতে দেখনু! উ ছুঁড়া কী কততে ঢুকিছিল, তা বুঝি আমি জানি ন্যা? আমি কি কচি খুকি?
“উ এমনি এসছিল।” আলগা করে বলল সখিনা। পানপাতার মত মুখটায় কে যেন শরমের আলতো ছোঁয়া দিয়ে গেল!
“উ ছুঁড়ার চোখমুখ দেখি আমি কি কিছুই বুঝত্যে পারি ন্যা? তুই কি আমাকে এতই বুকা ভাবিস? মরদের চোখের খিদ্যে বুঝতে মাগি মানুষের কতটুকুন লাগে? এক তুড়িতেই বুঝা যায়।” আঙুলে তুড়ি কাটল ফরিদা। শরীরের ঢেউয়ে হাওয়ার ঝাঁকানি লাগতেই সে ঢেউ ঝুঁটি বেঁধে উঠল। ফরিদা আরও কিছু বলতে যাবে অমনি গ করে গেয়ে উঠল ঢাউস মোবাইলটা, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার…।’
“সাহিনার আব্বা ফোন করিচে রিয়ে!” তড়াক করে উঠে পড়ল ফরিদা। যেন এই ফোনটার জন্য সে অপেক্ষা করেছিল বহুকাল! ভিডিও কলিং! আজকাল আর সাধারণ কলিংয়ে গা জুড়ায় না। কথা বলে মেটে না আশ। ঘন্টার পর ঘন্টা এই চলচ্ছবির কথোপকথনেই বুঁদ হয়ে থাকে ফরিদারা। যাদের স্বামী মরদরা সম্বচ্ছর রুটিরুজির জন্যে ভিনদেশে ভিনরাজ্যে পড়ে থাকে তাদের কাছে এই দূর দেখা মানে যে ইহকালের বেহেশত দেখা! ছাদের এক কোণে সরে দাঁড়াল ফরিদা। মুঠোফোনের দৌলতে সৌদি আরবের চিকনাই মারা ঘরবাড়ি আর এই অজপাড়া গাঁয়ের সদানন্দপুর গ্রামটা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে! ইউনুস আরব দেশের যে জায়গাটা থেকে ফোন করছে তার পিছনে ঝাঁ চকচকে রাস্তা। ধূ ধূ মাঠ। মাঝেমধ্যে খেজুরের গাছ। সেই মাঠের মধ্যে একখানা ঘর। রোদ তামা পুড়া হয়ে পড়ছে। ইউনুসের পরনে জুব্বা। মাথায় তুর্কি টুপি। মুখে দাড়িও গজিয়েছে। এই দাড়ি রাখা নিয়ে ইউনুস ফরিদাকে গর্ব করে বলেছে, “আল্লাহর দেশে থাকাকালীন আমার দাড়ি রাখলাম। এই দাড়িই আমাদের দুজনকে পরকালে বেহেশতে নিয়ে যাবে।” তারপর ফরিদাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, “তুমি কিন্তু নামাজটা পড়ো। আর বাইরে বের হলে বোরখা পরো।” আসলে ইউনুস ধর্মের অনুশাসনে বেঁধে রেখে বউকে পবিত্র রাখতে চেয়েছিল। বউ যেন পরপুরুষের দিকে নজর না দেয়। ইউনুস মানুষের দুই কাঁধে পাপ-পুণ্যের হিসাব লিখতে দুই ফেরেশতার কথাও মাঝেমধ্যে স্মরণ করে দিত। যেন বলতে চাইত, “সাবধান, আল্লাহর ফেরেশতারা সব দেখছে কিন্তু!” ফরিদা প্রথম প্রথম নামাজ ধরেছিল। কিন্তু তা আর বেশিদিন এগোয়নি। বোরখাটাও আলমারিতে তোলা আছে। তার শরীরের এখন রং ধরার বয়স। সে রং মরদের শরীরে মাখানোর বয়স। আর গায়ে বোরখা পরে বেগম হয়ে বসে থাকবে? সে মানুষ না মূর্তি? প্রশ্নগুলো চাওর দিয়ে উঠত ফরিদার মনে। বউর এমন বেয়াদপি কথাবার্তা শুনে ইউনুস ‘তওবা’ পড়ে বলেছিল, “সাবধান! তোমাকে শয়তানে টানছে! ওসব কুফরি কথা বলে জাহান্নামকে কাছে টেনে এনো না।” “তো তুমি কাছে এসো না কেন?” বলেছিল ফরিদা। ইউনুস রেগে বলেছিল, “কাছে গেলে কী খাবে? আমার হাড়-মাংস খাবে?” “হ্যাঁ। খাব। ভাত-রুটি খেয়ে পেট ভরে, জান তো ভরে না?” ফরিদা চনমন করে বলেছিল।
কথার বহর বাড়তে থাকে। হেঁশেল ঘরকন্নার কথা শেষ হলে পাড়াপড়শির হাঁড়ির খবরে ঢোকে ফরিদা। কথাতে কথা আঠার মত লেগে যায়। যেন পিরীত ফুটে ঢেঁকিতে কুটছে! সখিনা তেলে ভেজা হাতদুটো নিজের চুলে খসখস করে ঘষে। সুগন্ধি তেলের গন্ধ ম ম করছে। ফরিদাকে ফোনে ঢলে পড়তে দেখে মনে মনে টিস কাটল, আহারে! লোক দেখানো ভালোবাসা, ভাদ্দর মাসের কচি শশা!
আঁচলটা ঝেড়ে কোমরে ঠেসে গুঁজে দিল সখিনা। খাড়া হয়ে দাঁড়াল। ফরিদার কথার ঢং শুনে তারও মনের খিদেটা যেন হঠাৎ জেগে উঠল। তার নির্মেদ চামটা পেটে পড়ন্ত সূর্যের রোদ এসে টোকা দিচ্ছে। চোখের দিগন্তহীন উপকূলে চনমন করে উঠছে কামনার খিদে। যেন অনন্তকালের পড়ন্ত উর্বর খেতি। মাগনা খাস জমি। আবাদ করার লোক নেই। যেই বীজ বপন করবে, তারই ফসল ফলে উঠবে। যেন বলছে, এসো, এসো বৃষ্টি, আমাকে জুবুথুবু করে ভিজিয়ে দাও। আকাশের গর্ভে সূর্যটাকে তলিয়ে যেতে দেখে সখিনা ভাবল, এভাবে প্রতিদিন দিগন্তের বাহুমূলে ডুবে যায় বলেই তো সূর্য এত চির নবীন, তার এত তেজ, ধক। এও তো শরীরের খিদে মেটানোর ধাত? নিজেকে বাহুমূলে গেঁথে দেওয়ার বাতিক?
সখিনা চোখ ফেড়ে দেখছে, ফরিদা খিলখিল করে হাসছে। কী আর করবে? বিহেতি স্বামীর সাথে এটুকুই তো ফষ্টিনষ্টি করার ফুরসত। স্বাদ, আহ্লাদ যাই বলা হোক না কেন, এই কথার মধ্যে দিয়েই তো শরীরের হালাল জ্বালা মিটিয়ে নিতে হয়। ফরিদা কথায় একেবারে ঢলে পড়লে, সখিনা ঠেস মেরে উঠল, “এ ছুঁড়ি তো অ্যামুন কচ্চে, মুনে হচ্চে কথাতেই প্যাট হয়ি যাবে!”
ফরিদা কথা থেকে কথার তলে ডুবে যায়। তার তেল চুকচুকে চুলগুলোয় যেন পশ্চিমের আকাশ উড়ে এসে গাঁথছে! কালো চুল যেন বিকেলের ক্যানভাস। যেন কামনার ছোঁয়ায় গলে পড়ছে লালচে রঙ। গায়ে সেরকম দুচারটে বেটাছেলেও নেই যে, এট্টুআট্টু গল্প করে দুধের সাদ ঘোলে মেটাব! বেটাছেলের সাথে কথা না বললে কি আর জান জুড়ায়? বেটাছেলে হল কিনা কাঠি, বারুদের কাঠি, আর আমরা হলেম কি খোল, মাঝেসাজে ঘষামাজা না হলে কি আগুন জ্বলে? আগুনে গনগন করে না পুড়লেও একটু তাপ উত্তাপে নিজেকে ছেকে নিলেও তো গায়ের স্বাদ কিছুটা জুড়োয়। বাঁশঝাড়ের ঠ্যাঙা বাঁশটার মাথায় সাদা বকটার দিকে তাকিয়ে নিজেকে পিষতে থাকে সখিনা। দূরদেশের মরদটার জন্যে তার অন্তরটা হু হু করে ওঠে। কদিন আর মরদটার শরীর পেল? মানুষটার শরীরের স্বাদ বুক থেকে নাভিতে নামতে নামতেই, মানুষটা বিদেশে ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল! ক্যাবা ওরফে কাবাতুল্লা জোয়ান পুরুষ। শরীরী লড়াইয়ে সে ঘানি টানা উস্তাদ। সখিনা প্রায় উন্মাদ হয়ে যায়। চোখেমুখে যখন তৃপ্তির সুখ লেপ্টে থাকে, তখন সখিনা ফিসফিস করে বলে ওঠে, “আমাকে এভাবেই সারাজীবন পাগলি করে দিতে থেকো”। সেই কাবাতুল্লা এখন গ্রামের অন্যসব ছেলেদের সাথে বিদেশ খাটতে। পেটের ভাত না হলে যে দুনিয়ার সবকিছুই উচ্ছেন্নে যায়। সবকিছুই পানসে মনে হয়। গ্রামে সেরকম কোনো কাজ নেই। জেলা-রাজ্যেও নতুন কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি। ঘুরেফিরে ওই রাজমিস্ত্রি আর জুগাল খাটা। তাও সমবচ্ছর নেই। গেরস্তর জমিতে মুনিষ খেটে ওই চাল-তেল-নুন কেনাই হয়। সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য আর আসে না। সখিনা কিছুদিন বিড়ি বেঁধেছিল। কিন্তু তামাকের সে কাজ তার শরীরে সয়নি। এক শীতে কাশতে কাশতে হঠাৎ মুখ দিয়ে রক্ত উঠল! তড়িঘড়ি হাসপাতাল। ডাক্তারবাবু কড়া করে বলে দিলেন, আর বিড়ি বাঁধা কাজ করা যাবে না। সেই শেষ। আর কোনো রোজগারের কাজে লাগেনি সখিনা। আর এখন তো দরকারও নেই। মাস গেলেই মোটা টাকা ঢুকছে অ্যাকাউন্টে! আরবে ভাল কাজ পেয়েছে কাবাতুল্লা। মক্কার হারাম এলাকার ভেতরে কাজ। ধোয়া-মোছা আর হজ্বযাত্রীদের সহযোগিতা করা। বেতন তো রয়েছেই তার ওপরে রয়েছে উপরি ইনকাম। দুনিয়ার নানান দেশ থেকে আসা হাজীদের কাছ থেকে পাওয়া দান। আরবে কাজের সুত্রে থাকায় কাবাতুল্লা ‘উমরাহ্ হজ্ব’-ও করেছে। সেদিক দিয়ে কাবাতুল্লা এখন একজন হাজী মানুষও। কাবাতুল্লা সখিনাকে গর্ব করে বলে, “যে মাটিতে আল্লাহর নবী হেঁটেছেন, বসেছেন, শুয়েছেন, দুনিয়ার মানুষের জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য কেঁদেছেন সেই মাটিতে আমি হাঁটছি, খাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি, এ কি আল্লাহর কম নিয়ামত! তুমি কিন্তু এই জীবনের জন্য আল্লাহকে শুক্রিয়া আদায় করো।” সখিনা তখন মনের ভেতর একরাশ ক্ষোভ নিয়ে বলে, “কাছের মানুষটাকে ছিনিয়ে নিয়ে দূরদেশে চলে গেলেন আল্লাহ, সেই আল্লাহকে শুক্রিয়া দেব? কেন, আল্লাহ পারতেন না, এই গ্রামেই একটা পাকাপাকি রোজগারের ব্যবস্থা করে দিতে?” তখন সখিনা দেশের, রাজ্যের সরকারকেও গালমন্দ করে। “একটা কাজ দিতে পারে না আর শুধু ভোট আর ভোট!” দিনে দুশো-আড়াইশো টাকা রোজগার করতে হন্যে হয়ে যাওয়া কাবাতুল্লা এখন মোটা টাকার মানুষ! আরব খাটা সেই টাকায় তার ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুলে পড়ছে। ভাল খাচ্ছে ভালো পরছে। বউ সখিনার পেটেও জমেছে সুখের ভুঁড়ি! চেহারায় এসেছে চিকনাই। মুখের হিমানি-পাউডার আর পোশাকে খরচ হয় গাঢ়ি গাঢ়ি টাকা! মস্ত বড় দুতলা পাকা বাড়ি! বাথরুম-পায়খানা। অথচ বছর দশেক আগেও কাবাতুল্লার বাপ-মায়েরা মাঠে বদনা হাতে দৌড়ত। সখিনা আর এখন গরিব মানুষ নেই। গরিব সে শুধু এক জায়গাতেই, শরীরের কামড় মেটানোর আল্লাহর বেঁধে দেওয়া লোকটি কাছেপিঠে নেই! গোটা গ্রাম প্রায় পুরুষশূন্য! সবাই ভিন খাটতে ভিন মুলুকে! পুরুষ মানুষ বলতে গেলে কিছু আইবুড়ো ছুঁড়া, কিছু থড়বড়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আর গুচ্ছের বাচ্চাকাচ্চা। এই আইবুড়ো ছুঁড়াদের মধ্যে কেউ কেউ এ বাড়ির ও বাড়ির গন্ধ শুঁকে বেড়ায়।
২
ঝাঁপির কাছে এসে টুক করে একটা মিসড কল দিল বাবলু। নম্বরটা তো সেভ ছিলই, ইঙ্গিতটাও আগে থেকে দেওয়া ছিল সখিনার। ঘুটঘুটে আঁধার গা-হাত-পা ছড়িয়ে আয়েশ করে শুয়ে আছে। ঝুঝকিও ঝেপে আছে। পা টিপে টিপে ঝাঁপির কাছে এসে দাঁড়াল সখিনা। হাতের মোলায়েম ছোঁয়ায় আলতো করে খুলে দিল ঝাঁপিটা। তবুও ‘কচ’ করে একটা মিহি শব্দ গেয়ে উঠল! ভিতরটা ধড়াক করে উঠল তার! অন্ধকার ফুঁড়ে দেখল, ঝাঁপির আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে একটা তাগড়া মুনিষ! কালবাহুস শরিল! চোখদুটোয় ভয়ংকর খিদে! কারো কোনো ঠোঁট নড়ে উঠল না। শুধু সখিনার তৃষ্ণার্ত চোখ কিছু একটা ইঙ্গিত করে উঠল। দুজনে থপথপ করে ঢুকে পড়ল ঘরে। বড়সড় বেডরুম। মেঝেতে পাথর বসানো। বক্সখাট। খাটের একধারে গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে নাইম। নাইমের পায়ে পা তুলে দিয়ে হাঘোরে ঘুমোচ্ছে সাবানা। সখিনার ব্যাটা-বিটি। ছঞ্চেতেও চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে কেউ একজন! বাবলু চোখের ইশারায় জানতে চাইল, “কে এটা?” সখিনা ফিসফিস করে বলল, “মর্জিনা, আমার ফুফাতো বোন। এই কদিন হল এসচে। চিন্তা নাই, আধ-পাগলি। মাথায় ছিট আচে।”
সখিনা হাত ইশারা করল। সখিনার ইশারায়, পাশের ঘরে ছুপছুপ করে ঢুকল বাবলু। সখিনাও টুক করে সেঁধিয়ে পড়ল ঘরটায়। ছোট্ট ঘর। যেন দেওয়ালে দেওয়াল কথা বলছে। একপাশে পাতা আছে ঘড্ডি খাট। আলুথালু বিছানা। দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিল বাবলু। সখিনা থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ঘুঁত ঘুঁত করে শ্বাস নিচ্ছে। যেন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে নিজেকে একটু তাতিয়ে নেওয়া আর কি। বুকের ভেতরটা ধড়াক ধড়াক করে তড়পাচ্ছে তার। বাবলু খপ করে হাতটা টেনে খাটে বসিয়ে দিল সখিনাকে। গাটা হেলে উঠল সখিনার। খাটটাও কচ করে শব্দ করে উঠল। পুরুষের ছোঁয়া পেয়ে সখিনার ভিতরটা কামড় দিয়ে উঠল। গা-গতরে তপ্ত ঢেউ খেলে গেল। সখিনার বুক থেকে আঁচলটাকে সরিয়ে দিল বাবলু। ফোঁস করে উঠল ঢেউ। ধবধবে ফর্সা রঙ। যেন ঢেলা চোখ বের করে তাকাচ্ছে। আঙুলের মিহি ছোঁয়ায় আলতো সুড়সুড়ি দিল বাবলু। সখিনা এলিয়ে পড়ল। যেন তার সমস্ত গিঁট আলগা হয়ে পড়ল। টনটনে লাল চোখের সামনে ভেসে উঠল, ফুটন্ত সমুদ্রের ঢেউ। সে ঢেউয়ের বেহায়াপনা উচ্ছ্বাস। বাবলু নিজের গা থেকে খড়মড় করে খুলে ফেলল নীল-সাদা শার্টটা। ভারি চোখদুটো আলতো করে খুলল সখিনা। মায়াবি দৃষ্টিতে ঝলসে উঠল বাবলুর সুপুরুষ গড়ন! তক্তার মত হাত! নৌকোর পাটাতনের মত চওড়া বুকের ছাতি! বুকে ঘন চুলের ঝোপ! শরীরের গিঁটে গিঁটে মাংসের শক্ত দলা! তেতে উঠছে কালো মোষের মত দোম! ফিসফিস করে সখিনা বলল, “তুমি নাকি ভালই সুখ দিতে পারো? ফরিদা বুলছিল। সাহিদাভাবিকে নাকি কান্দি ছেড়িচ? আসমার বাড়িতে নাকি দুবেলা খ্যাপ মারো? আমার কথা কি একবারও মুনে পড়ে না? আমি কিসে কমা? আমার গা-গতর কি পেনসে?”
আরো পড়ুন মিস শেফালি নামক দর্পণে সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও নারী
বাবলু কোনো কথা বলল না। তার কালো কুচকুচে ঠোঁটটা সখিনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে ডুব দিতে থাকল। সখিনার চোখ মিহি করে মুদে এল। পুরুষের কামুক শরীরের গন্ধে তার চোখমুখ দিয়ে নেমে যাতে থাকল সুখ। গদগদে শরীরটায় পড়পড় করে পুড়তে থাকল বিহেতি স্বামীর দোয়া-কালাম! হাদিস-কোরানের ফন্দি-ফেউর! কাঠুরিয়ার বউর পতিভক্তি গল্প। বোরখার নিজামত। বরকত। স্বামীর মাসোহারা টাকা। শরীরের খিদের কাছে হেরে যেতে লাগল ধর্মের অনুশাসন। আলগা হয়ে যেতে লাগল ধর্মের আঁটসাঁট বাঁধন। কলেমার গিঁট। জাহান্নামের আগুনকে পরোয়া করল না যৌবনের আগুন। আগুনে আগুনে বাধল সংঘাত। পবিত্র শরীরটায় লেগে গেল ভিনপুরুষের দাগ। সোহাগের সমুদ্রে ডুব দিল সখিনা। গভীর জলের নিচে সাঁতার কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করল, “বাবলু, তুমি আরব যাবা না?”
বাবলু তখন সমুদ্র মন্থনে নিজের সবটুকু ডুবিয়ে দিয়েছে। অমৃত তুলে আনার শেষ পাতালে মারছে ডুব। ফ্যাসফেসে গলায় বের হয়ে এল একটা কুঁতপারা স্বর,“আমি আরবে গ্যালে, ই খ্যাতাল কে সামলাবে?”
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








