দু-এক বাক্য মনে করার চেষ্টা করল ইউসুফ। কিছুতেই মনে আসছে না! অথচ হালফিলের অনেক রংটপ্পা টিকটকি গান ঠোঁটের ডগায় নাচছে! কথাটা যখন প্রথম শুনেছিল ইউসুফ তখন একরকম আশ্চর্যই হয়েছিল। নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক ওসব লোকগল্প নিয়ে গবেষণা করবেন! বাবা তো ‘গল্প’ কথাটাও মুখে আনেন না, মুখটা কেমন ভেংচে বলেন ‘গেঁয়ো গপ্প’। ইউসুফ অতটা হেয় না করলেও তার যে বিশাল একটা আগ্রহ ছিল এমন নয়। তবে অধ্যাপকটির মুখে তার ঠাকুরদার নামটা শুনে কৌতূহল বেড়েছিল। ট্রেন থেকে নেমে ট্রেকার ধরল তারা। স্টেশনেই সরাসরি পিরতলা যাওয়ার ট্রেকার পাওয়া যায়। এছাড়াও টোটো, অটো, বাস এমনকি মেইন রাস্তাতে উঠলে লছিমনও পাওয়া যায়। অথচ বিশ বছর আগে ওই ঘন্টা বাঁধা গোটাকয়েক বাস ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যেত না। তখন গ্রামে ঢোকার মুখে বিস্তীর্ণ মাঠ। শেয়ালের হুক্কা হুয়া ভেসে আসত। আকাশে মেঘ না থাকলে একটা রুপোলি রংয়ের চিকন আলো নেমে আসত নীচে। চাঁদ-তারার সে আলো গায়ে মেখে মানুষ বাড়ি ফিরত। এখন রাস্তার দুপাশে বাড়িঘর। দোকানপাট। নতুন মোড়েরও উদ্ভব হয়েছে।
ট্রেকারটা যখন পিরতলা মোড়ে ঢুকছে তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। বটগাছটার নিচে দলা হয়ে আছে অন্ধকার। পাশেই ব্যাঙদহ বিল। ব্যাঙদহ বিলের ওপারে কুবেরডিহি মাঠ। কুবেরডিহি মাঠ পশ্চিমে যেখানে শেষ হচ্ছে সেখান দিয়ে বয়ে গেছে ছোট ভৈরব। ইউসুফ ট্রেকার থেকে বসে দেখছে, আকাশে কামড় বসানো তরমুজের ফালির মত ঝুলে আছে চাঁদ। সে ক্ষয়াটে চাঁদের আলোয় খিলখিল করছে মাঠের পাকা ধান। কানের দুলের মত দুলছে ধানের শিষগুলো! আর মাঠখানা যেন চাঁদের আলোয় মাতাল হয়ে পড়ে আছে। এভাবেই নাকি হদ্দিন তাড়ি খেয়ে পড়ে থাকত সেখপাড়ার ইয়াকুব সেখ। কথাটা বাবার কাছে শুনেছিল ইউসুফ। ইউসুফের বাবা রকিবউদ্দিন গ্রামের চোর-ডাকাত, মস্তান-লম্পটদের কথা প্রায়শই বলেন। সব দুর্নাম বদনাম করার পর শেষে বলেন সেই বিড়বিড়ানি কথাটি, ও গ্রামে কেউ মানুষও হবে না মুনিশও হবে না। সব চোর ছ্যাঁচড়ই হবে। আসলে রকিবউদ্দিনের গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসার ওই একটাই তো পোক্ত যুক্তি? তাছাড়া আর কোন যুক্তিই বা খাড়া করবেন? এখন গ্রামে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের গাড়ি ঢুকে যাচ্ছে! ফোর জি, ফাইভ জি নেট আগারে-পগারে ঘুরঘুর করছে। আগে বটগাছের মটকার ডালে উঠে বহরমপুরের রেডিওর যে টাওয়ার দেখত গ্রামের লোক এখন সেরকম উঁচু উঁচু টাওয়ার বাড়ির আন্টায়-কান্টায় আকাশ ভেদ করে দাঁড়িয়ে আছে!
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কুবেরডিহি মাঠের দিকে তাকাল ইউসুফ। এই মাঠেই ছিল স্বনামধন্য বাউল আলেপ সর্দারের আখড়া। রাত গড়াতে শুরু করলেই ভেসে আসত তাঁর মরমিয়া গান। সে গানে পাগলপারা হয়ে যেত মাঠ-ঘাট। আর ব্যাঙদহ বিলের এপারে বটগাছের মাচানে বসে তখন ‘কাহিনি’ শোনাতেন কাহিনিকার নূরউদ্দিন। সে ভাদর কাহিনি চলত ভোর অবধি। কোনো কোনো দিন রাত কাবার হয়ে সকাল হয়ে যেত। আবার কোনো কোনো কাহিনি চলত দুদিন তিনদিন ধরে! ‘আপনি কি কখনও কাহিনি শুনেছেন?’ জিজ্ঞেস করলেন অধ্যাপক সেন। ‘না, শুনিনি।’ ইউসুফ বলল। ‘শোনেননি!’ সিদ্ধার্থবাবু অবাক হলেন। ইউসুফের মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। যেন সে কোনো বড়সড় অপরাধের কাজ করে ফেলেছে! মনে ইউসুফ বলতে লাগল, অধ্যাপক যেন জিজ্ঞেস না করেন ‘কেন শুনিনি?’ সে উত্তর দিতে গিয়ে তার নাকানি চোবানি অবস্থা হয়ে যাবে। তার বাবা লোকটা অধ্যাপক সেনের কাছে খাটো হয়ে যাবেন! ইউসুফ জানে, তারা বাবা ‘কাহিনি’ কথাটা শুনলেই রাগে চিড়বিড় করে ওঠেন! বলেন, ‘ওসব গেঁয়ো গীত-গপ্পের কথা বলিস নে তো? কেমন গাঁ গন্ধ করে।’ তারপর রেগে চোখ-মুখ লাল করে বলেন, ‘ওসব শোনানোর জন্য কি আমি গ্রাম ছেড়ে শহরে উঠে এসেছি? ওসব গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি বলেই তো তোরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পেরেছিস? তা না হলে, ছাগল-গোরুর পাল নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতে হত। গা থেকে বিদ্যা বের হত না, বের হত ধুলো-কাদার গন্ধ।’ ইউসুফ তখন তার চোখজোড়া বন্ধ করে সুউচ্চ ফ্ল্যাট, আকাশঢাকা শহর আর মানুষের গ্যাঞ্জাম পেরিয়ে সেই সুদূর ব্যাঙদহ বিল, কুবেরডিহি মাঠ আর ছোট ভৈরবের তীরে চলে যেত। নাক দিয়ে নিত কাহানের ঘ্রাণ। তার দুবলা পাতলা পাকা আমের রঙের শরীরটা সতেজ হয়ে উঠত। ফিনফিনে গোঁফটার আড়ালে উঁকি ঝুঁকি মারত একটা মিষ্টি হাসি। ফালি চোখদুটো খিলখিল করত। ছেলের কীর্তি দেখে বাবা রকিবউদ্দিন রাগে গজগজ করতেন। মা, আয়েশা, ইউসুফকে বলেন, ‘তুই তোর ঠাকুরদার দিকে গেছিস। বাপের এককণাও নিসনি।’ ইউসুফের তখন বুকের ছাতিটা গর্বে ফুলে ওঠে। মনে করার চেষ্টা করে, ঠাকুরদার গাওয়া কাহিনির কোনো এক ফাংড়ি। কিন্তু মনে আসে না। কোনোদিন শুনলে তো মনে আসবে? শুধু জানে, তার ঠাকুরদা একজন বড় মাপের কাহিনিকার ছিলেন। এইটুকুই। তার দলিল দস্তাবেজ কিছুই নেই তার কাছে। বাবা রকিবউদ্দিন ছেলের সংস্রবে আসতে দেননি ওসব গল্প-গপ্প। কিন্তু রক্ত তো আর ঝেড়ে ফেলা যায় না। ইউসুফের শরীরে বইছে ঠাকুরদার সেই রক্ত যে রক্তে ঠেসে আছে রাজা-রানি-পঙ্খিরাজ নৌকা ইত্যাদি ইত্যাদির কাহিনি! অধ্যাপক সেনের সঙ্গ পেয়ে সেসব নতুন করে জেগে উঠছে ইউসুফের মনে।
‘জানেন, এই কাহিনির একসময় গ্রামে-গঞ্জে ব্যাপক চল ছিল। পুরো ভাদ্র মাস জুড়ে এই কাহিনি বলা হত।’ অধ্যাপক সেন বললেন। ইউসুফ বলল, ‘ওসবই তো ছিল তখন মানুষের মনোরঞ্জনের একমাত্র মাধ্যম। তখন গ্রামে টিভি আসেনি। ভিডিও হল গজিয়ে ওঠেনি। বাড়ির ছাদ ভেদ করে ওঠেনি অ্যান্টানা। কিন্তু মানুষের মন তো ছিল। সে মনের মনোরঞ্জনের খোরাক ছিল ওসব লোকগান লোকগল্প।’
‘তখন লোকগান আর লোকগল্পের নানান আঙ্গিক ছিল, কোনো এলাকায় কাহিনি তো কোনো এলাকায় আলকাপ। কোথাও কবিগানের পালা তো কোথাও রূপবান যাত্রা।’
‘ভাগ্যিস তখন ইন্টারনেট ছিল না! তাহলে সব গিলে খেয়ে নিত।’
‘সে কি আর বলতে? আচ্ছা, আপনার ঠাকুরদা কত বছর আগে মারা গেছেন?’
‘চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর তো হবেই? তখন আমার বয়স সাড়ে তিন বছর।’
‘ওঃ তাহলে তো আপনার কোনো স্মৃতিই মনে থাকার কথা নয়।’ অধ্যাপক সেন তাঁর রিমলেস চশমাটা নাকের ডগা থেকে একটুখানি উপরের দিকে তুললেন। মোটা নাক। চোখগুলোও মোটা মোটা। মুখের গড়নটা ঠিক ভাঁটপাতার মত। না অত লম্বা না অত গোল। টি-শার্টটার ফাঁক গলে বুকের যে লোমগুলো দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে বয়স অনেকটাই গড়িয়েছে। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। মাথায় কোঁকড়ানো চুল। চাঁদির ঠিক সামনে একখানা ছোট্ট টাক। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের নামী অধ্যাপক সিদ্ধার্থ সেন। বিদেশেও গবেষণা করেছেন। মেপে কথা বলছে ইউসুফ। ইউসুফও মেধাবী স্টুডেন্ট। খড়গপুর আইআইটির প্রাক্তনী। সল্টলেকের আইটি সেক্টরে তার অফিস। অধ্যাপক সেন জিজ্ঞেস করলেন, ‘লোকটির সঙ্গে আগে আপনার কখনো কথা হয়েছে?’
‘না।’ উত্তরটা দিয়েই ইউসুফ আশঙ্কা করল, ‘মারা গেলেন কিনা তাই সন্দেহ! নিউমোনিয়ার পেশেন্ট।’
‘বলছেন কী!’ অধ্যাপক সেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠলেন।
মোড়ের কাছে এসে ‘ঘ্যাঁচ’ করে ট্রেকারটা থামল। প্রথমে নামল ইউসুফ। তারপর নামলেন অধ্যাপক সেন। ঘাড়ে ঝুলছে বিস্কুট কালারের কাপড়ের ব্যাগ। হাতে চাকা লাগানো স্যুটকেস। ইউসুফের পিঠে ভারি ব্যাগ। কাঁধে আরও একখানা সাইড ব্যাগ। ইউসুফরা তাদের পৈতৃক বাড়িতে উঠলেন। চোখেমুখে জল দেবে এমন সময় একজন ছিপছিপে তরুণ এসে বলল, ‘এখনই চলেন। কুদ্দুছ দাদো ঘুমিয়ে পড়বে। হাঁপটানা লোক তো। কখন আছে কখন নেই। হয়ত এই ঘুমই শেষ ঘুম হয়ে যেতে পারে!’ ছেলেটি ইসমাইল। ইউসুফের দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই। ‘বলছেন কী! চলুন চলুন। তাড়াতাড়ি চলুন। ওই লোকটি মারা গেলে আর কোনোকিছুরই খোঁজ পাওয়া যাবে না।’ গায়ে নতুন টি-শার্টটা গলাতে তাড়া লাগালেন অধ্যাপক সেন। আর কালবিলম্ব না করে হন্তদন্ত হয়ে তিনজন বেরিয়ে গেলেন।
ঢালাই রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানেই বাড়িটা। ইটের দেওয়াল আর টালির ছাউনি। বাড়ির পিছনেই ব্যাঙদহ বিল। ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন এক থুত্থুরে বৃদ্ধ! উঠোনটা নেমে গেছে বিলের দিকে। বিলে তখন অঘ্রানের রাত ঘুচুরমুচুর করছে। বৃদ্ধর ঘোলাটে চোখগুলো সেদিকেই তাকিয়ে আছে। গায়ে হাফ-হাতা স্যান্ডো গেঞ্জি। পরনে আলুথালু করে বাঁধা তেলচিটে লুঙ্গি। ঠোঁটে বিড়ি খাওয়ার দাগ। মাথায় উস্কোখুস্কো সাদা চুল। মুখে পাকা দাড়ি। ইসমাইল ইশারায় বলল, এই বৃদ্ধই হলেন কুদ্দুছ সেখ। ইউসুফ কাছে এগিয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল, ‘কেমন আছেন দাদো?’ বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না। চৌকাঠে ঘোমটা মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভদ্রমহিলা বললেন, ‘জোরে বুলুন। কানে কম শুনে।’ ইউসুফ বৃদ্ধর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কিছুটা উচ্চস্বরে বলল, ‘কেমন আছেন দাদো?’ বৃদ্ধ এবার শুনতে পেলেন। ঘোলা চোখগুলোকে বিলের দিক থেকে তুলে ইউসুফের মুখের উপর রাখলেন। ইউসুফ দেখল, জড়ানো চোখগুলোতে এক শতাব্দী সময় লেগে আছে! ঘোলা থলথলে চোখগুলোর দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকাল ইউসুফ। খোঁজার চেষ্টা করল, চোখগুলোর ভেতরে তার ঠাকুরদা নূরউদ্দিন লুকিয়ে রয়েছেন কিনা। ‘কেডা গ তুমি?’ বৃদ্ধর জড়ানো কণ্ঠ। ইউসুফ বলল, ‘আমি নূরউদ্দিনের নাতি।’ ইউসুফ ইচ্ছে করেই বাপের নামটা বলল না। বৃদ্ধ কুদ্দুছ সেখের চোখগুলো কেমন হেসে উঠল, বললেন, ‘বড় উস্তাদের লাতি!’ থড়বড়ে হাতখানা তুলে ইউসুফের মাথায় দিলেন বৃদ্ধ কুদ্দুছ। ঠাট্টা করে বললেন, ‘তা ই গাঁয়ে কী কত্তে এসচ! ই গাঁয়ে তো কুনু মানুষ থাকে না খ। তুমার বাপ লিশ্চয় তুমাধেরকে বড় মানুষ করিচে?’ ইউসুফ লজ্জা পেল। ‘মানুষ তো হলেন আমাদের ঠাকুরদা নূরউদ্দিন। তাঁকে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে! তাঁর নামে গ্রামের নাম হবে! গ্রামে তাঁর মূর্তি বসবে! আর আমরা হলেম শুধু খাওয়া-পরা লোক মাত্র। ওই তুষ-পাতান!’ মনে মনে বলল ইউসুফ।
আরো পড়ুন বহু মানুষের প্রার্থনা লিপিবদ্ধ করেছেন লেখক
‘কাহিনিকার নূরউদ্দিন কেমন কাহিনি বলতেন? মনে আছে কিছু? আপনি তো ওঁর দোহার ছিলেন।’ অধ্যাপক সেন জানতে চাইলেন। বৃদ্ধ চোখগুলোকে আরও ঘোলা করে কেমন একটা সন্দেহের দৃষ্টিতে অধ্যাপক সেনের দিকে তাকালেন। প্রশ্নটা শুনে কেমন একটা বিরক্তও হলেন। নূরউদ্দিন কেমন কাহিনি বলতেন সে নিয়ে প্রশ্ন করছে লোকটা! লোকটার আস্পদ্দা তো কম নয়! ইউসুফ পরিচয় করিয়ে দিল, ‘ইনি অধ্যাপক সিদ্ধার্থ সেন। দাদোর বলা কাহিনি নিয়ে গবেষণা করছেন।’ এবার কুদ্দুছের ঠোঁটে আলতো হাসি খেলে উঠল। সেই সুযোগে ইউসুফ বলল, ‘দাদোর বলা কাহিনির কি কোনো কাগজপাতি আছে আপনার কাছে?’ বৃদ্ধ কুদ্দুছের চোখগুলো এবার ঘুলঘুল করে উঠল। হাতের লাঠিটায় ভর দিয়ে আচানক খাড়া হলেন। ‘আমার সাথে আসো’ বলে সাংকেল পাখির মতো পাগুলো ফেলে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। যেন তিনখানা বাঁশের সরু লাঠি হাঁটছে! ঘরের এক কোণে রাখা পোঁটলাপুঁটলির পালার কাছে এসে ইউসুফকে বললেন, ‘এগুলেন সরাও’। বৃদ্ধ কুদ্দুছের কাজ দেখে বাড়ির লোকে অবাক! যে জায়গায়টায় বাড়ির কাউকে ঢুকতে দেন না, কোনোকিছু স্পর্শ করতে দেন না সেখানে হঠাৎ একদিন আসা নূরউদ্দিনের নাতিকে সব নাড়াঘাঁটা করতে বলছেন! পোঁটলাপুঁটলিগুলো সরাতেই একটা মরচে পড়া টিনের ছোট্ট ট্রাঙ্ক বেরিয়ে এল! ট্রাঙ্কটাকে চোখ ফুঁড়ে দেখলেন কুদ্দুছ। তারপর তাঁর লুঙ্গির ঘুনশি থেকে একটা চাবি ইউসুফের হাতে দিয়ে বললেন, ‘বাক্সডাকে খুলো।’ ইউসুফ তালাটা খুলল। ট্রাঙ্কটার ভেতরে কাঁসার একটা বড় পানদানি! পানদানিটা মরচে পড়ে লাল হয়ে গেছে। ‘পানদানিডা খুলো।’ হুকুম করলেন কুদ্দুছ। ইউসুফ যেই পানদানিটা খুলেছে অমনি একটা জীর্ণ পাতলা খাতা দেখা গেল! পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে! কয়েকটা পাতা উইয়ে কেটেও দিয়েছে। ইউসুফ খাতাটার পাতা উল্টাতে শুরু করলে বৃদ্ধ কুদ্দুছ চোখ খিলখিল করে বললেন, ‘তুমার দাদোর বুলা কাহিনি। ছিরিপপুরের মছলেম গোমস্তার কাছে এই একখানা ভাদর কাহিনি লিখি লিয়িছিল বড় উস্তাদ।’ ইউসুফ একবার করে খাতাটার পাতা উল্টায় আর একবার কুদ্দুছ সেখের চোখের দিকে তাকায়। হঠাৎ বৃদ্ধ কুদ্দুছ মিনমিন করে কাহিনি বলতে শুরু করেন, ‘হোসেনপুরের রাজা ছিলেন মস্ত বড় রাজা! একদিন তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করলেন, ময়ূরপঙ্খি নাওয়ে কইরা বাণিজ্যে যাবেন…।’
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








