সৌরভ সেন

তখনকার কাশফুল, ঢাকে কাঠির অনুষঙ্গে ছিল পূজাবার্ষিকী আর শারদ অর্ঘ্য। তখনকার মানে প্রায় পাঁচ দশক আগেকার সময়কাল, তার আশপাশ। ষাটের শেষ এবং সত্তরের গোড়া। কিশোর সাহিত্যের একরাশ টাটকা সম্ভার আর নতুন বাংলা গানের ডালি। রেকর্ড কোম্পানির মুদ্রিত পুস্তিকা শারদ অর্ঘ্য – গানের সংকলন। কোনোটাই কাছছাড়া করা যেত না। মাইকে নতুন গান বাজলেই মিলিয়ে নিতে হত বৈকি!

পূজাবার্ষিকীতে

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের তন্ময়তার শেষ কথা তখন পুজোসংখ্যা। দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী অতি প্রাচীন। দিকপাল লেখকরা লিখতেন সেখানে। আমাদের সময়ে তারাশঙ্কর, বনফুল, প্রবোধ সান্যাল, সরোজ রায়চৌধুরী, শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় – লেখক তালিকায় আরও কত নাম। কিছু গল্প আজও হানা দেয়। প্রতিবছর নতুন একটি ঘনাদা-কাহিনি – গল্পের নাম দু-অক্ষরের – কাঁচ, মাছ, টুপি, ছড়ি, লাট্টু, দাঁত, ঘড়ি, হাঁস, সুতো, ঢিল, শিশি, কেঁচো, জল, ছাতা প্রভৃতি। তখন ঠিক ঘনাদা-রসিক হওয়ার বয়স না হলেও এক অপার জিজ্ঞাসা ছিল – শুধুমাত্র দুটো অক্ষরের নাম কেন? এরই মধ্যে এসে গেল কিশোর ভারতী, শারদ সংকলনের মধ্য দিয়ে যার সূচনা ১৯৬৮ সালে। প্রথম সংখ্যার রোমাঞ্চ আজও ভোলার নয়। খুব তাড়াতাড়িই কিশোর ভারতী আমাদের মনোরাজ্য দখল করে নিল। দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুরন্ত ঈগল, কালের জয়ডঙ্কা বাজে, ভাবা (ভালুক বালক) সিরিজ, শ্যামাদাস দের রুণুর আখ্যান, অরুণ আইনের রোমাঞ্চকর গল্প, মনোরঞ্জন ঘোষের স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনি ইত্যাদির অমোঘ আকর্ষণ। সঙ্গে ব্ল্যাক ডায়মন্ডের রহস্য, নন্টে-ফন্টের মজা। বছর তিনেক বাদে এক শারদ প্রাতে চমক জাগানো আবির্ভাব আনন্দমেলা পুজো সংখ্যার। প্রথমটিতে ছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রোফেসর হিজিবিজবিজ’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু-উপন্যাস ভয়ংকর সুন্দর। ছিল অহীন্দ্র চৌধুরী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর নিজেদের কিছু কথা। তাঁদের মুখের ছবির সঙ্গে কার্টুনধর্মী রেখার অবয়ব মেলানো হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ছে, ভাস্কর দেবীপ্রসাদের ঘাড়ে ছিল বন্দুক, কারণ তিনি দক্ষ শিকারীও ছিলেন। পরের বছর ছিল সত্যজিৎ রায়ের শঙ্কু-কাহিনি ‘কর্ভাস’, মতি নন্দীর ‘স্ট্রাইকার’। হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের রহস্য গল্পে গোয়েন্দা ছিলেন ব্যোমকেশের ভাইপো পারিজাত বক্সী। ‘কর্ভাস’-এর সচিত্র শিরোনামে (সত্যজিৎ কৃত) এহেন বানান থাকলেও গল্পের মধ্যে আগাগোড়া ‘করভাস’। হয়তো পত্রিকার বানান রীতি অনুযায়ী। তবে মস্ত অসঙ্গতি তো বটে! (বিষ্ণু দের স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ-এর প্রচ্ছদ তুলনীয়)।

পূজাবার্ষিকী

তখন সবে যুদ্ধপরিস্থিতির অবসান, বাংলাদেশের অভ্যুদয়। নিজেদের কথা লিখেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, প্রাক্তন সেনাধ্যক্ষ জয়ন্তনাথ চৌধুরী আর তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ। ইন্দিরার শুরুটা ছিল এমন “আমি ষোলোয় পা দিলাম, বাবাও জেলে গেলেন। সেটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। তিনি টেলিগ্রামে শুধু জানালেন – ও-বাড়ি যাচ্ছি!’” জয়ন্তনাথ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আফ্রিকায় লিবিয়ার মরুভূমিতে জার্মান জেনারেল রোমেলের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অকারণে প্রাণিহত্যা না করার শপথ নিয়ে আশ্চর্যভাবে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা লিখেছেন। জেনারেল মানেকশর বয়ানে জেনেছিলাম, দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রথম ছাত্রদলের তিন সতীর্থ পরবর্তীকালে পাশাপাশি তিনটি দেশের সেনাধ্যক্ষ হন – জেনারেল স্মিথ ডান ব্রহ্মদেশের; জেনারেল মুসা পাকিস্তানের; জেনারেল মানেকশ ভারতের। এছাড়া উদয়শঙ্কর, চুনী গোস্বামী, লেসলি ক্লডিয়াসও লিখেছিলেন।

সব সংকলনেই অবধারিত উপস্থিতি শিবরাম চক্রবর্তীর। সেইসঙ্গে থাকত ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনি। পরবর্তী সময়ে অদ্রীশ বর্ধন, সঙ্কর্ষণ রায় এই গোত্রের গল্প লিখেছেন। টেনিদার গল্প ছাড়াও লিখেছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, দেব সাহিত্য কুটীরে। হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে-র তাঁর লেখা একটি অসাধারণ প্যারডি প্রকাশিত হয়েছিল পুজো সংখ্যার কিশোর ভারতীতে, তাঁর মৃত্যুর পরে। ময়ূখ চৌধুরীর সচিত্র কাহিনির এক আলাদা আকর্ষণ ছিল। বিধায়ক ভট্টাচার্যের অমরেশ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পিন্ডিদা, রাজকুমার মৈত্রের বগলামামা – এসব চরিত্র ভোলা যায়! বার্ষিক শিশুসাথী সংকলনটির কথাও বেশ মনে পড়ে। উচ্চমানের লেখা থাকত এতেও। পূজাবার্ষিকী আনন্দ-ও উল্লেখ করার মত।

অতীতের অনুসন্ধান করে এখনকার বাস্তবেও চলে আসা যায় এইসব পূজাবার্ষিকী পত্রিকার দৌলতে। অদ্ভুত যোগসূত্র।

ভানুয়াটু

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের অখ্যাত দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াটু (Vanuatu) সাম্প্রতিককালে সংবাদ শিরোনামে চলে এসেছে কয়লা ও গরু পাচারকাণ্ডে কলকাতাবাসী এক অভিযুক্ত সেখানকার নাগরিকত্ব নেওয়ায়। ভানুয়াটু ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কও তেমন মজবুত নয়। বাংলার এক যুবক দূর অজানা দেশে পাড়ি দিয়ে সেখানকার নাগরিক হয়ে গেছেন জেনে চমক লাগে।

বহু আগে, ভারতের প্রাক-স্বাধীনতা যুগে এক বঙ্গসন্তান এই ভানুয়াটুতেই একাধিকবার গেছেন। শুধু যাননি, ব্যবসার সূত্রে বছর কয়েক ওই দ্বীপপুঞ্জে রীতিমতো জাঁকিয়ে বসেছিলেন – এ তথ্যে ভিরমি খেতে হয় বইকি। অবশ্য সেই মানুষটি দুনিয়াময় টহলদারি করে বেড়ানো এক ডাকসাইটে বাঙালি।

কে তিনি? কে আবার? এক এবং অদ্বিতীয় ঘনশ্যাম দাস, ওরফে ঘনাদা। আন্তর্জাতিক মহলে যাঁর পরিচিতি ‘ডস্’ নামে। আবির্ভাব প্রেমেন্দ্র মিত্রের কলমে ১৩৫২ বঙ্গাব্দে (১৯৪৫), দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী সংকলন আলপনায়, ‘মশা’ গল্পে। পরবর্তী ঘনাদা কাহিনি ‘নুড়ি’ ১৩৫৪ সালে (১৯৪৭) প্রকাশিত হয় স্বাধীনতার প্রহরে, পূজাবার্ষিকী রাঙারাখী-তে। এ গল্পের শেষে ঘনাদা ছটাকখানেক ওজনের একটা নুড়ি তুলেছিলেন বলে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের মিকিউ নামের দ্বীপটি ফেটে চৌচির হয়ে সমুদ্রে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। (বৈজ্ঞানিকভাবে তা সম্ভব)।

ঘনাদার গল্প গাঁজাখুরিও নয়, কল্পবিজ্ঞানও নয়। বাস্তব। ঘোর বাস্তব। এই বিশ্বে, মহাবিশ্বে ভূগোল ও বিজ্ঞান অনুমোদিত অকুস্থলে, ‘ঘটা সম্ভব’ এমন কোনো রোমাঞ্চকর কাহিনি। চালচিত্রে ৭২ নং বনমালী নস্কর লেনের মেসবাড়ি। এই ‘নুড়ি’ গল্পটিই এখন আমাদের আলোচ্য।

পূজাবার্ষিকী
শিল্পী: অজিত গুপ্ত

গল্পের গোড়াতেই ঘনাদা তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ রাম, শিবু, সুধীর, গৌরাঙ্গ, শিশিরের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়েছিলেন, নিউ হেব্রাইডিজের নাম তারা কখনো শুনেছে কিনা। এরপর ঘনাদার বয়ান, “নিউ হেব্রাইডিজ হল নিউজিল্যান্ডের ঠিক উত্তরে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব কোণে কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপের জটলা। পৃথিবীর মাইল পঞ্চাশ ওপর থেকে দেখলে মনে হবে যেন সমুদ্রের ওপর ক-টা পাথর-কুচি ফাঁক ফাঁক করে সাজিয়ে ইংরেজি ‘ওয়াই’ অক্ষরটা লেখা। এই ‘ওয়াই’-এর তিনটে হাতা যেখানে এসে মিলেছে সেখানকার এফাটা দ্বীপটাই হল সমস্ত দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী। এফাটায় দুটো বন্দর, ভিলা আর হাভানা। ভিলা বন্দরেই সরকারি আস্তানা।” চন্দনকাঠের ব্যবসার জন্য ঘনাদা তখন দ্বীপমালার একেবারে দক্ষিণে আনিওয়া নামের একটি দ্বীপে থাকেন। “নিউ হেব্রাইডিজের রাজধানী এক, কিন্তু রাজত্ব দুজনের। ইংরেজ আর ফরাসি এক সঙ্গে মিলে সেখানে শাসন করে।” এই ভিলা বন্দরেই থাকার জায়গা নিয়ে ভয়ংকর এক বিবাদের পরিণতিতে ঘনাদার সঙ্গে পোক্ত এক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল জনৈক ফরাসি মঁসিয়ে পেত্রার। এই পেত্রাই ঘনাদার হাতে উত্তম মধ্যম জোটার পর তাঁকে তুষ্ট করতে গিয়ে বলেছিল পারিতে রাবীনদ্রা নাত্ তাগোরের সঙ্গে তার আলাপের কথা। পেত্রা কিন্তু মনে করে দ্বীপপুঞ্জের ‘আসল মাল’ হল গন্ধক।

পূজাবার্ষিকী
মঁসিয়ে পেত্রা ও ঘনাদা। শিল্পী : অজিত গুপ্ত

গল্পটি পড়লে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দ্বীপপুঞ্জের চেহারাটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হ্যাঁ, সেই নিউ হেব্রাইডিজই আজ নাম ও ভোল পাল্টে হয়েছে ভানুয়াটু। প্রায় আশিটির মতো দ্বীপের সমষ্টি। আর, ঘনাদা কথিত সেই এফাটা দ্বীপের ভিলা বন্দরই (পোর্ট ভিলা), যা বর্তমানে এই দ্বীপরাষ্ট্রের রাজধানী।

পূজাবার্ষিকী

বিস্মিত হতে হয়, ঘনাদার সৃষ্টিকর্তা প্রেমেন্দ্র মিত্র আজ থেকে প্রায় পৌনে শতক আগে এহেন অজানা এক দ্বীপমালার কী স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছিলেন।

ভাইপো

পশ্চিমবঙ্গের চলতি রাজনৈতিক তরজায় ভাইপো শব্দটি অষ্টপ্রহর শোনা যাচ্ছে। এই আবহে স্মৃতিতে ঘা দিচ্ছে আমাদের কম বয়সের আরেক ভাইপো। বাংলা কিশোর সাহিত্যের অদ্বিতীয় ভাইপো শ্রীমান বীরু। ধনঞ্জয় বৈরাগী ছদ্মনামে ভাইপোর নানান কাণ্ডকারখানা নিয়ে দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকীতে একটি করে গল্প উপহার দিতেন বাংলার স্মরণীয় নাট্যব্যক্তিত্ব তরুণ রায়। যেমন, ‘ভাইপো যদি মঞ্চে নামে’, ‘ভাইপোর পাল্লায় শিকারী’, ‘ভাইপো যদি লেখক হয়’, ‘ভাইপো যদি গাড়ী কেনে’ প্রভৃতি।

পূজাবার্ষিকী
শিল্পী: প্রতুলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

অত্যন্ত গুণী নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা তরুণকে বাঙালি সেভাবে মনে রাখেনি। তাঁর তৈরি করা নাট্যালয় থিয়েটার সেন্টারও আজ আর নেই।

আরো পড়ুন সময় ও স্বপ্নবোধ: শঙ্খ ঘোষের একটি বই

এবার ভাইপোর পরিচয়ে আসা যাক। একটি গল্পে আছে “আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার নাম কি? সে সপ্রতিভ কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিল, পোশাকী নাম বীরেন, ডাকনাম বীরু আর লেখকী নাম বীরবাহু। — লেখকী নাম, সে আবার কী? বীরু কিন্তু এখানেই থামে না, প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে দেয়, একটা গালভরা নাম না থাকলে লেখক হিসাবে নাম করা যায় না। ভেবে দেখুন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আহা নামের কী ঝংকার! সেখানে ‘বীরু’ ‘বীরেন’ এ সব নাম অচল। তাই বিখ্যাত হবার জন্যে নাম পালটে রেখেছি বীরবাহু বন্দ্যোপাধ্যায়।”

তখনকার কিশোর পাঠকবর্গ, এখন যাঁরা প্রৌঢ় – এই ভুলে যাওয়া ভাইপোকে মনে করলে নিশ্চয়ই আমোদিত হবেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.