এই নিবন্ধটি পুস্তক সমালোচনা নয়, একে পুস্তক পরিচয়ের আওতায় ফেলাই ভাল। আলোচিত বইটি ৩০টি ছোট নিবন্ধের সংকলন। প্রতিটির বিষয় রাজনীতি – যে রাজনীতি সমসাময়িক হলেও, তা কেবলমাত্র বর্তমানকেই ভর করে থাকে না। বিষয়-বিচারে কালিক বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও, নিবন্ধগুলি কালিকতাকে অতিক্রম করে ইতিহাস ছুঁয়ে থাকে, সর্বদা। এবং সে ইতিহাসচর্চা ও তা থেকে নিঃসৃত বিশ্লেষণ সকলের কাছে সুখকর নয়। বা, কারও কাছেই, কোনো পক্ষের কাছেই সুখকর নয় সম্পূর্ণত। যেমনটা প্রত্যাশিত। এই বইয়ের ভূমিকায় প্রবীণ সাংবাদিক রজত রায়ও মনে করিয়ে দিয়েছেন, দর্পণ যতই সুন্দর হোক না কেন, দর্পণে যার প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে, তা যেমন তাকে তেমনভাবেই দর্পণ দেখায়।

প্রবীণ সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্রের লেখার সংকলন গণতন্ত্র বনাম গেরুয়া ভারত ২০২২ সালের বইমেলার আগে বা সে সময়ে প্রকাশিত হয়। তারপর থেকে বইটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা চোখে পড়েনি। বাঙালি, (হত)চেতন বাঙালির একটা ঔপনিবেশিক অভ্যাস রয়েছে। তাঁরা ইং ভাষায় লিখিত না হলে কোনো বইকে তেমন প্রশ্রয় দিতে না চাইবার যে রেওয়াজ বজায় রেখেছেন, তাতে শুভাশিস মৈত্রের লেখা সংকলন তাঁদের আওতায় আসবে না। ফলে, আমাদের এরকম একটা বাস্তবতা মেনে নিয়েই এগোতে হবে। ইংপ্রিয় (হত)চেতন বাঙালির অপেক্ষায় বসে থাকলে হবে না।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার যে ক্রমঅবনমন ঘটে চলেছে, উত্তর সম্পাদকীয় লেখালেখির চর্চা একটু মন দিয়ে দেখলেই তা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। সেদিক থেকে বিচার করলে, বিভিন্ন সময়ে লেখা এই নিবন্ধগুলির সংকলন সে অবনমনই যে একমাত্র সত্য নয়, তেমন একটা আলোকদিশা দেয় বৈকি।

কয়েকটা উদাহরণ না দিলে বক্তব্যটা ঠিকমত পৌঁছনো মুশকিল। বইয়ের একটি নিবন্ধের নাম, ‘উচ্চবর্ণ না চণ্ডাল, কাদের দখলে কমিউনিস্ট পার্টি, প্রশ্ন দলিত বুদ্ধিজীবীর’। এখানে দলিত বুদ্ধিজীবী বলতে কাঞ্চা ইলাইয়া শেপার্ডের কথা বলা হয়েছে। তিনি নিউজ মিনিট নামক ওয়েব পোর্টালে একটি লেখা লিখেছিলেন। আলোচ্য নিবন্ধটি সে সম্পর্কিত। এই নিবন্ধে আলোচনাক্রমে সন্তোষ রাণা, কুমার রাণা লিখিত পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী নামক বইয়ের উল্লেখ করে দেখানো হয়েছে, গণশক্তি থেকে প্রকাশিত ডায়াল নামক টেলিফোন ইনডেক্সে লেখক-শিল্পী-সমালোচক তালিকায় প্রথম ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জন বর্ণহিন্দু। এ নিবন্ধেই মনে করানো হয়েছে, মণ্ডল কমিশনকে রাজ্যের মন্ত্রী বিনয় চৌধুরী চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, এ রাজ্যে পশ্চাৎপদ শ্রেণি বা ওবিসি নেই।

রানি লক্ষ্মীবাইয়ের জন্মদিবসোপলক্ষে লিখিত নিবন্ধের নাম, ‘ঝাঁসির রানির জন্মদিন, সিপাহি বিদ্রোহ ও কলকাতার হুতোমরা’। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে তৎকালীন ভারতের প্রেক্ষিত ও বাংলার সাংবাদিকতার চেহারা তুলে ধরেছেন লেখক। উদ্ধৃতি সহকারে বর্ণনা করে দেখিয়েছেন, হুতোম, ঈশ্বর গুপ্ত ও অন্যান্য সম্পাদকদের অবস্থান। এই প্রসঙ্গেই তিনি উল্লেখ করেছেন সিপাহি বিদ্রোহের ইতিহাস সম্পর্কিত তিনটি বইয়ের। এই নিবন্ধটির উল্লেখের কারণ হল, এতে অন্তত দুটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। প্রথমত, লক্ষ্মীবাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষে একটি নিবন্ধের সঞ্চারণা, ও সেখান থেকে অন্যতর এক খোঁজ দেওয়া ও নেওয়া।

এই খোঁজ দেওয়া-নেওয়াই এই বইয়ের নিবন্ধগুলির সবিশেষতা। একেকটি উত্তর সম্পাদকীয় একই সঙ্গে বিশ্লেষণাত্মক ও পাঠকের মনে আগ্রহ ও কৌতূহলের সঞ্চার ঘটাবে – এমনটাই কাঙ্ক্ষিত। এখনকার চলতি উত্তর সম্পাদকীয়গুলির মত নয়, যেগুলির উচ্চারণভঙ্গিই পাঠককে দূরে ঠেলে দিতে ব্যাপক সমর্থ।

কিন্তু তাই বলে এ বইয়ে স্পষ্ট ও কারো তোয়াক্কা না করা মতপ্রকাশে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি লেখক। ‘ফেক এনকাউন্টার ফ্যাসিবাদী গণতন্ত্র’ শীর্ষক নিবন্ধে অর্চনা গুহ মামলার উল্লেখ রয়েছে। “সেই সময়ে একদিন অর্চনা গুহকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘এই যে লড়াই করে চলেছেন, প্রতিপক্ষ বিরাট শক্তিশালী, আপনারা বিচারের আশায় আছেন, মামলা এগোচ্ছে না, দিনের পর দিন ডেট পড়ছে, জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে, কিছু কি হবে? কী মনে হয়?’ অর্চনা গুহর উত্তর ছিল, ‘চেষ্টা করছি আমরা, না হলে কী করব! তবে এটাও তো মনে রাখতে হবে, যত মহৎ উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, আইনের চোখে আমাদের অনেক বন্ধুও তো অপরাধ করেছে, এত রাজনৈতিক খুন হল, তার জন্যও তো কারও ফাঁসি হয়নি, সেই নিহতদের বাড়ির লোকজনের বিচার চাওয়া এবং পাওয়ার অধিকার আছে, সেই কথা ভেবে আমার বিচার না-পাওয়াটা মেনে নেব।’ অর্চনা গুহ খুব লম্বা নন। এই উত্তর শুনে সেদিন আমি দেখছিলাম, উনি আমার সামনে উঁচু আরও উঁচু আরও উঁচু হয়ে যাচ্ছেন।” এই নিবন্ধের শেষটুকু, যেমন রজত রায় ভূমিকায় দর্পণের কথা লিখেছেন, তা মনে পড়ায়। “সময় বোধহয় এসেছে, অন্যকে ফ্যাসিবাদী বলার আগে নিজের দিকে তাকানোর। যাঁরা স্তালিনের হাতে নির্বাসিত কবি, লেখকদের পক্ষে কথা বলেন না, যাঁরা তিয়েন আন মেন স্কোয়ার নিয়ে চুপ থাকেন, যাঁরা গরিব কনস্টেবল খুনকে মুক্তির পথ মনে করেছিলেন এবং পরে কখনও তা নিয়ে কোনো আত্মসমালোচনা করেননি, যাঁরা সাঁইবাড়ি থেকে নন্দীগ্রামের দীর্ঘ রক্তাক্ত পথ নিয়ে লজ্জিত নন, তাঁদের হাতে গণতন্ত্র নিরাপদ? সন্ত্রাসী রং বদলালে ভালো?”

আরো পড়ুন ধ্বংসের পথে পশ্চিমবঙ্গ: ঐতিহাসিক দলিল হয়েও সমসাময়িক

এই দীর্ঘ উদ্ধৃতির কারণ হল, এটির মাধ্যমে লেখককে চিহ্নিত করার কাজ চলতে পারে। তাঁকে অমুক বিরোধী ফলে তমুকপন্থী বলে তকমা দেওয়া যেতে পারে। তেমন শঙ্কা থেকেই যায়, এ বাংলায়, এখন। এখন তো সেই সময়, যখন বাংলায় বেশি করে বিজেপি-বিরোধিতা তৃণমূল কংগ্রেসের দালালি বলে চিহ্নিত হয় আর তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতা সরকারে-যেতে-ইচ্ছুক বামেদের পক্ষাবলম্বন হিসেবে। আলোচ্য বই সেসবের তোয়াক্কা করেনি। ৩০টি নিবন্ধের অধিকাংশই কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি-আরএসএস-এর নীতি ও কৌশল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। এ বইয়ের প্রথম লেখা, ‘খুন করেও মুছে দেওয়া গেল না’ – গান্ধীহত্যার চক্রান্ত নিয়ে। শেষ লেখা, ‘এই বিপজ্জনক খেলা সহজে শেষ হবে না’ – বিজেপির ফেক নিউজ ছড়ানোর কৌশল ও তাতে উচ্চতম পর্যায়ের বিজেপি নেতাদের যোগসাজশের বর্ণনাসমেত। ৩০টির মধ্যে ১০টিরও বেশি লেখা এই অতি দক্ষিণপন্থা ও পন্থীদের বিষভাণ্ড উপুড় করার ইতিহাসকে তুলে ধরেছে। ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জেল খাটার দাবি কি সত্যি’ নিবন্ধে তিনি প্রমাণ করেছেন, আইনজীবীর দক্ষতায় – যে এ দাবি ভুয়ো। লাভ জিহাদ সম্পর্কিত নিবন্ধে তিনি আমাদের দেখান, কীভাবে হিন্দু জনজাগৃতি সমিতি ২০১০ সালে অভিযোগ তুলেছিল কর্নাটক থেকে ৩০ হাজার হিন্দু যুবতী নিখোঁজ হয়েছেন, এবং পুলিশ তদন্তের শেষে জানায় সংখ্যাটা ৪০৪, যাঁদের মধ্যে ৩৩২ জন বাড়ি থেকে পালিয়ে মুসলমান নয়, হিন্দুধর্মের মধ্যে অসবর্ণ বিবাহ করেছিলেন।

মিথ্যা প্রচার, গুজব ছড়ানো এক প্রাচীন রণকৌশল। ভারতের অতি দক্ষিণপন্থী সরকার তাকে নতুন করে সামনে এনেছে, নয়া ফুয়েরারের নেতৃত্বে। মিথ্যা প্রচার আর গুজব আর অতিসরলীকরণ এই সময়ে প্রায় সর্বগ্রাসী। কদিন পর, আগের বাক্যটি থেকে প্রায় শব্দটি তুলে দিতে হবে এমন একটা শঙ্কা হয়। কিন্তু তেমন শঙ্কা যেন প্রয়োজনীয় মতপ্রকাশে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সাংবাদিকতার শিক্ষা তেমনই। ফেক নিউজ আর গুজব আর অতি-পাতি ভুল সাংবাদিকতার বলয়ে দাঁড়িয়ে তা মিথ্যা হয়ে যায় না। গণতন্ত্র বনাম গেরুয়া ভারত সর্বসমক্ষে দার্ঢ্য সহকারে বিশ্বাসমত সৎ উচ্চারণকে পেশ করার একটি উদাহরণ।

লেখক-সম্পাদক-প্রকাশক লেখাগুলি প্রকাশের তারিখ উল্লেখ না করে এগুলিকে এক মলাটের অন্দরে আনার পক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে, ঐতিহাসিকতার নিরিখে সে উল্লেখ থাকা যথাযথ হত বলেই মনে হয়। আমরা, বাংলার আলোচক-সাংবাদিক-সম্পাদক-প্রকাশকরা, সম্ভবত নিজেদের তত বিশ্বাস করি না, নিজেদের উপর তত আস্থা রাখি না, যে তাঁদের কাজগুলিরও ক্যালেন্ডার হতে পারে।

গণতন্ত্র বনাম গেরুয়া ভারত
লেখক: শুভাশিস মৈত্র
প্রচ্ছদ: পার্থপ্রতিম রায়
প্রকাশক: ভিরাসত ট্রেড
দাম: ৩৫০ টাকা

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.