আমাদের বড় হয়ে ওঠা গত শতকের নয়ের দশকে। সে বড় আশ্চর্য সময়। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই মাঠ। মাঠের পাশের লাইব্রেরিতে বন্ধুরা একসাথে গল্পের বই পড়া, আর সন্ধ্যা হলেই পড়তে বসা। লোডশেডিংয়ের দিনগুলোয় রাতের আকাশ দেখা অথবা হারমোনিয়াম নিয়ে গান। তবে গান বলতে অধিকাংশ বাঙালি বাড়িতেই তখন ধ্রুপদী সঙ্গীত অথবা রবীন্দ্রনাথ কি নজরুলের গানের চর্চা চলত। সপ্তাহের দুটো দিন আমরা একটু হিন্দি গান শুনতে পেতাম, সেটা ‘চিত্রহার’ এবং পরবর্তীকালে ‘সুপারহিট মুকাবলা’ – র দৌলতে। তাও সেটা খুব নিয়মিত হত না। মনে পড়ে, ক্লাস এইট বা নাইনে পড়ার সময়ে পাড়ার এক দাদার বাড়িতে বিভিন্ন ছায়াছবির ভিডিও ক্যাসেট নিয়ে আসা হত কখনো-সখনো। সেখানে দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দি আগলি (১৯৬৬); গুপি গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯), দ্য টাওয়ারিং ইনফারনো (১৯৭৪) ইত্যাদি ছবি দেখেছিলাম। আমাদের মত নিতান্ত অর্বাচীন দর্শকদের কাছে সে ছিল এক মহৎ ব্যাপার। সেখানেই হঠাৎ করে কোনো এক গ্রীষ্মাবকাশে দেখতে পেলাম এক হিন্দিতে ডাব করা তামিল ছবি। সে ছবির রেশ যে আমার গোটা যৌবনকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে তা আমি সেদিন বুঝিনি। কিন্তু বুঝেছিলাম যে এক নতুন সাউন্ডস্কেপ আর আশ্চর্য মেলোডি নাড়িয়ে দিয়েছে আমার মন ও মননকে। এর দু-এক বছরের মধ্যে দেখে ফেলেছিলাম বম্বে (১৯৯৫)। দুই ছবিরই মুখ্য বিষয় প্রেম। আমরা সৌভাগ্যবান, নয়ের দশক আমাদের ভালবাসতে শিখিয়েছিল, ঘৃণা করতে নয়। বম্বে আবারও উড়িয়ে নিয়ে গেল আমাদের সাগরপাড়ের হাওয়ায়। বিষাদমাখা প্রেমের সুর বাজতে থাকল আমাদের বুকে। সেই যে আল্লারাখা রহমানের সঙ্গে আমাদের প্রেম শুরু হল, সে আর ঘোচার নয়।
এই কথাগুলো না বললে আজকের এই বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটে এ আর রহমান কতটা অসহায়, তা হয়ত বোঝানো যেত না। গত দশ বছরে বলিউড থেকে মুক্তি পেয়েছে যে সমস্ত ‘বিগ বাজেট’ ছবি, তার বেশিরভাগেরই মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল সন্ত্রাস এবং লক্ষ্য এক নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীকে আসুরিক শক্তি হিসাবে প্রতিপন্ন করা। এখন এ দেশে আর কেউ বম্বে-র মত ছবি করার কথা ভাবেন কি? করলেও ভাবেন, প্রযোজক রাজি হবেন কিনা। তাই যে ঘৃণার চাষ করে আজ সাংঘাতিক হিংস্র সব ছবি তৈরি করা হচ্ছে, হয় সেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন পরিচালকরা, নতুবা চেনা ছকের ‘ক্রাইম থ্রিলার’ বানাচ্ছেন। এই কারণেই আজ রহমানের মত সৃষ্টিশীল মানুষের কাজ পাওয়া দুষ্কর।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এর মধ্যে আবার অরিজিৎ সিংয়ের মত ক্ষণজন্মা প্রতিভাও সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি আর প্লেব্যাক করবেন না। অতএব বিবিসি এশিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রহমান যে কানাঘুষোর কথা বলেছেন, যে (সৃষ্টিশীলতাহীন) কর্পোরেট ব্যবসায়ী ফিল্ম নির্মাতাদের কথা বলেছেন, যাঁরা এখন আর রহমানের সঙ্গে কাজ করতে চান না, তাঁরাই হয়ত বা অরিজিৎকে দিয়ে না গাইয়ে এআই অ্যাপ দিয়ে গান তৈরি করতে এবং গাইয়ে নিতে চাইছেন। রহমান বলেছেন, তাঁকে সরাসরি কেউ কোনো সাম্প্রদায়িক কথা বলেনি, কিন্তু নানারকম ফিসফিসানি কানে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টিই বা হবে কেন, যেখানে আমাদের দেশের গর্ব যাঁরা, তাঁরা অসহায় বোধ করবেন?
তিনি যে অসহায়তার কথা বলেছেন, তা কতখানি বাস্তব তা বোঝা যায়, যখন ওই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পরে রহমানকে প্রবল ট্রোলিংয়ের মুখে পড়তে হয় এবং তার চাপে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে বিবৃতি দিতে হয়। এমনটা ঘটল সেই দেশে, যেখানে দেশপ্রেম এত বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে সংসদে ‘বন্দে মাতরম’ গান নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বিতর্ক চলে। রহমানকে আক্রমণ করার সময়ে আমাদের মনেও রইল না যে ওই গানকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তুলেছিল তাঁর সুরারোপ। গুণমানের দিক থেকে কাজটা যেমনই হোক।
সম্ভবত এসব কারণেই সব বাঘা বাঘা কম্পোজার, গায়করা মিলে এক বিকল্প মঞ্চ তৈরি করেছেন। আজকের এই অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে, প্রোপাগান্ডা সিনেমার স্রোতে গা না ভাসিয়ে মুম্বাইয়ের শিল্পীরা মিলে গুনগুনালো নামের সাঙ্গীতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন, তার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বৈ কি।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সংগীতের উৎপত্তি ও উপযোগিতা’ প্রবন্ধে লিখেছেন: ‘সংগীতে এতখানি প্রাণ থাকা চাই, যাহাতে সে সমাজের বয়সের সহিত বাড়িতে থাকে, সমাজের পরিবর্তনের সহিত পরিবর্তিত হইতে থাকে, সমাজের উপর নিজের প্রভাব বিস্তৃত করিতে পারে ও তাহার উপরে সমাজের প্রভাব প্রযুক্ত হয়।’ রহমানের সুরারোপিত বম্বে ছবির থিম মিউজিক সেই কারণেই আজও সমকালীন এবং প্রাসঙ্গিক। আজও প্রাসঙ্গিক ১৯৪৭ আর্থ (১৯৯৮) ছবির ক্রেডিট রোল করার সময়ে ভেসে আসা জাভেদ আখতারের লেখা এবং রহমান সুরারোপিত গান ‘ঈশ্বর আল্লা, তেরে জাহাঁ মেঁ/নফরত কিঁউ হ্যায়/জঙ্গ হ্যায় কিঁউ?’ ছবির শেষে দর্শক এই গানটির সুর বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। নির্লজ্জ মানুষের ঘৃণা ও দ্বেষ মাখা সমাজ, মোহভাঙা সংসারের পাকে জর্জরিত, ভারাক্রান্ত হৃদয়ের ক্যাথারসিস ঘটাত এই গান।
একই কথা বলা যায় পুকার (২০০০) ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে ‘এক তু হি ভরোসা’ গানটি সম্পর্কে। তাই রহমান যদি উপেক্ষিত হন, তা আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতির উপেক্ষা ও লাঞ্ছনা বলেই ধরা যায়। তবে আমার বিশ্বাস, গানের সুরের হাত ধরেই আমাদের সর্বংসহা ভারতবর্ষ এ দুর্দিনও পার করে যাবে একদিন। যাবেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








