উত্তর কলকাতার একটি আয়তাকার এলাকা। পুবে বিধান সরণি (আগেকার কর্নওয়ালিস স্ট্রিট), পশ্চিমে সিমলা স্ট্রিট (এখনকার ডা. নারায়ণ রায় সরণি), উত্তরে রামদুলাল সরকার স্ট্রিট (আগে ছিল মানিকতলা স্ট্রিটের অংশ), আর দক্ষিণে বিবেকানন্দ রোড। এই চতুষ্কোণে আছে হারানো কলকাতার অনেক স্মৃতি। এখানেই নরেন দত্ত, মানে সিমলে পাড়ার বিলে-র বাড়ি। তাঁদের গলির মুখটাতেই ছিল চাচার হোটেল। এই চতুষ্কোণেই রয়েছে নকুড়ের মিষ্টির দোকান। আবার এইখানেই আরেক সর্বভারতীয় চরিত্রের নিবাস— তাঁর জন্ম, বড় হওয়া, বেড়ে-ওঠা সব কিছু। বিলেও ছিল ব্যায়াম ও শরীরচর্চায় দক্ষ, সংগীতবিদ্যায় পারদর্শী। ইনিও তা-ই। দু’জনের বাড়িই এই আয়তক্ষেত্রের মধ্যে, সামান্য একটু ব্যবধানে— বিলে-র ৩ নং গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিট, আর মানা-র ৯ নং মদন ঘোষ লেন। মানা অর্থাৎ মান্না— মান্না দে। গতকাল ২৪ অক্টোবর পার হয়ে গেল তাঁর প্রয়াণ-দিবস।

        এলাকার গা ঘেঁষে আজাদ হিন্দ্ বাগ (হেদুয়া), বেথুন স্কুল ও কলেজ, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রাইস্ট্ চার্চ, স্কটিশ চার্চের বিদ্যায়তন, ডাফ চার্চ, মির্জা গালিবের বাসস্থান এবং আরও অনেক কিছু। হেদুয়ায় রয়েছে কলকাতার সাঁতারশিক্ষার দুই পীঠ— সেন্ট্রাল সুইমিং ক্লাব ও ন্যাশনাল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশন। আরেকটু এগোলেই গোয়াবাগানে ঢোকার মুখে প্রবাদপ্রতিম মল্লবীর গোবর (যতীন্দ্রচরণ) গোহ-র আখড়া। মান্নাবাবুদের বাড়ির ছেলেরা সক্কলে সেন্ট্রাল-এর দক্ষ সাঁতারু, এই নিয়মে উনিও। আর ও-বাড়ি হচ্ছে মোহনবাগান ক্লাবের ঘাঁটি। কিশোর বয়সে মানা ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর পাকা খেলোয়াড়। উত্তর কলকাতায় ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে যেগুলো আয়ত্ত করতে হয়— ছাদের আলসে বেয়ে, পাঁচিল টপকে ঘুড়ি ধরতে অপরাপর বাড়ির ছাদে অক্লেশে যাওয়া-আসার অভ্যাস— ডানপিটে মানা-র কাছে সে-সব ছিল জলভাত। পরবর্তী জীবনে, মুম্বইয়ে বিকেলগুলোয় মহম্মদ রফি-র সঙ্গে তাঁর ঘুড়ির লড়াই হত। রফি সাহেব বিস্মিত হতেন, কী ভাবে মান্নাবাবু তাঁর ঘুড়ি অবলীলায় কেটে দেন!

        মান্না দে এ-দেশের খ্যাতনামা মল্লবীরও হতে পারতেন। ছিলেন গোবরবাবুর সাক্ষাৎ শিষ্য। গায়ক হিসেবে তাঁর মধ্যে কোনও অহংবোধ কখনও কেউ দেখেনি। কিন্তু গোবর গোহ-র শিষ্য— এটা ছিল তাঁর অহংকার। আমৃত্যু তিনি এই অহংকার লালন করেছেন। একটা সময়ে, নিতান্ত বালক বয়সে ওনাদের বাড়িতে আমি নিয়মিত গিয়েছি। ১৯৭০ সাল থেকে বেশ কিছুদিন। আসলে মান্নাবাবুর ছোটভাই প্রভাস দে-র কাছে সংগীতের তালিম নিতে যেতাম। উনিও এক মস্ত সংগীতগুণী। একতলার গানের ঘরটি খুব মনে পড়ে। ১৯৭১, মান্নাবাবু ‘পদ্মশ্রী’ পেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর একটি আবক্ষ অয়েল পেন্টিং গানের ঘরে টাঙানো হয়েছিল, তাতে লেখা ছিল ‘পদ্মশ্রী মান্না দে’। এই খেতাব, অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ইত্যাদিতে ওনার নামের আগে ব্যবহৃত হত। গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আর পদ্মশ্রী মান্না দে, এই রীতিতেই বাঙালি ছিল অভ্যস্ত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

        চার ভাইয়ের মধ্যে বড় যিনি, প্রণব দে, ইনিও সংগীতগুণী, কাকা কৃষ্ণচন্দ্রের ডানহাত ছিলেন একসময়ে। ছিলেন নিউ থিয়েটার্স-এর সংগীত পরিচালনায়। পরবর্তী সময়ে তাঁকে দেখেছি হেদুয়ায় বৈকালিক আড্ডা দিতে। মেজভাই ডা. প্রকাশ দে, তাঁকেও পরিষ্কার মনে পড়ে। অনেক স্মৃতি এই বাড়িকে ঘিরে।

        এক সন্ধেয় মনে আছে, ১৯৭১, আমার ক্লাস তখন চলছে, এমন সময়ে জনাতিনেক ঘরে ঢুকলেন। তাঁরা আসতে গুরুজি ভিতরে খবর পাঠালেন। একজনকে চিনলাম— সুধীন দাশগুপ্ত, আরেকজনকে বুঝলাম ওনাদের কথাবার্তায়— পার্কাশানিস্ট অমর দত্ত (টোপাদা), মান্না দে’র অনুষ্ঠানে অপরিহার্য সহশিল্পী। ‘নিশিপদ্ম’ ছবির “না না না, আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না” গানটি অনুষ্ঠানে গাইলে একেবারে শেষে মান্নাবাবু বলে উঠতেন— “বুঝলে টোপাদা, তুমিও যাবে না, আমিও যাব না!” যা বলছিলাম, এমন সময়ে ওপর থেকে নেমে এসে ঘরে ঢুকলেন মান্নাবাবু, লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা। বসলেন হারমোনিয়ামের সামনেই। তাঁর পাশেই আমি! বুঝলাম, গানের রেকর্ডিং নিয়ে কথা চলছে। এরই মধ্যে এসে গেলেন মান্নাবাবুর অতি প্রিয় বন্ধু মানিক— মানিক গোহ, গোবরবাবুর ছেলে। মানিকবাবু ছিলেন কুস্তিতে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। সেদিন কিন্তু স্পষ্ট নজর করেছিলাম, আজও মনে রেখেছি, মানিক গোহ-র চাইতে মান্নাবাবুর কব্জি কিন্তু চওড়া। ওনাদের কথা চলছে। ‘ছদ্মবেশী’ ছবির গানের প্রস্তুতি, না ‘পিকনিক’? কে জানে! এরই মধ্যে মান্নাবাবু হঠাৎ চুপ করে গেলেন। তাঁর হাত চলে গেছে হারমোনিয়ামে! আমি থরথর। শুরু করলেন “এ তো রাগ নয় গো, এ যে অভিমান”। গতবছরের (১৯৭০) পুজোর গান। বাড়িতে দিদির আর আমার পুরো কণ্ঠস্থ, বলতে গেলে কমা-ফুলস্টপ-সেমিকোলন সমেত! তো উনি শুরু করলেন, সামনে খাতাপত্তর কিছু নেই, আমি চাপা স্বরে ওনাকে গানের কথা প্রম্পট্ করে যাচ্ছি। পুরো গানটা হয়ে গেল। উনি বললেন, এর তো দেখছি সব মুখস্থ!

        এর পরেও বাড়িতে ওঁকে দেখেছি  আরও বারদুয়েক। তারপর নিয়মিত গান গাওয়ায় আমার ছেদ পড়ে। ও-বাড়িতে যাওয়ার পর্ব শেষ হয়। কিন্তু বাড়ির কারও-কারও সঙ্গে দেখা হলে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলার সম্পর্কটা আজও রয়ে গেছে।

        ও-বাড়ির গানের তিনপুরুষ তো হল। তো এখন একটা ঘরানা বলাই যায়। এই ধারার বৈশিষ্ট্য দেখা যাক। কোনও ধারার সংগীতকে অচ্ছুত মনে না করা, সে-সবের গ্রহণযোগ্য প্রকরণ আত্তীকরণ ও নিজের গায়কি-তে সুযোগমতো প্রয়োগ। একই সঙ্গে নিজেদের যে-ভিত্তি, শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে কীর্তন, তা থেকে বিচ্যুত না হওয়া। পিতৃব্য কৃষ্ণচন্দ্র দে এমনই এক পথপ্রদর্শক তাঁর অমিত বহুমুখিনতায়। এমন অসাধারণ এক শিল্পী যখন যে-আঙ্গিকের গান গেয়েছেন, মনে হয়েছে তাতেই যেন তাঁর সিদ্ধি! গানের নিজস্ব যে-ভাষা, তাতে সমৃদ্ধ হয়ে এক চূড়ান্ত দক্ষতায় পৌঁছনো। মান্না দে এই সাধনাতেই ব্রতী থেকেছেন আজীবন।

        যিনি “পুছো না ক্যায়সে” বা “লাগা চুনরি মেঁ দাগ” গাইছেন, তিনিই আবার “এ ভাই জরা দেখকে চলো” অথবা “আও ট্যুইস্ট করে” গাইছেন। আবার তাঁর গলাতেই লোকসংগীতের আধারে “তুঝকো চলনা হোগা” কিংবা নিখাদ দেহাতি গান “চলত মুসাফির”। আবার কাওয়ালি গাইছেন “না তো কারবাঁ তালাশ হ্যায়”। অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। প্রতিটিতেই যথোপযোগী মেজাজ। প্রতিটি গানই অভ্রভেদী হয়ে গেছে। ভোলা যায় ভীমসেন যোশীর সঙ্গে তাঁর ‘দ্বৈরথ’-গীত “কেতকী গুলাব জুহি”? বাংলা গানের ক্ষেত্রেও একই বিচিত্রগামিতা— আধুনিক, কাব্যগীতি, শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি, কীর্তন, পুরাতনী, গণসংগীত, দেশাত্মবোধক, কবিগান; প্রতিটি ক্ষেত্রেই মনে হয় তিনি যেন সেই বিশেষ আঙ্গিকেই সিদ্ধ। এটা তখনই সম্ভব যখন গানের নিজস্ব ভাষা চূড়ান্ত আয়ত্তে থাকে। সে-জন্যে প্রয়োজন সংগীতের প্রতি নীরন্ধ্র মনোযোগ, প্রকরণের নিরন্তর আহরণ, চূড়ান্ত তাৎক্ষণিক প্রয়োগবিদ্যা প্রভৃতি, যা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাঁর গায়নের যে-বিস্ময়কর ফ্লেক্সিবিলিটি, তা বোধহয় তখনই সম্ভব হয় যখন নমনীয় অন্তর দিয়ে কোনও শিল্পী সংগীতের বিভিন্ন আঙ্গিকের প্রতি সত্যকার শ্রদ্ধাবান হন। বলতে গিয়ে শিহরিত হচ্ছি— ১৯৭৮-এ তাঁর ‘সারা বছরের গান’ ডিস্ক্-টি প্রকাশিত হল, শ্রোতৃমহলে তার দিকপ্লাবী প্রতিক্রিয়া— সর্বস্তরের শ্রোতারা, বিশেষত তরুণ সমাজ শুনছে, কেবল শুনছে, শুনেই চলেছে। অনেকটা এমনই এফেক্ট হয়েছিল, যখন তিনি পুজোয় তাঁর কাকার দু’টি গান নতুন করে গাইলেন— “ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে” আর “স্বপন যদি মধুর এমন”। আরও এমন বহু কিছু বলার থেকে যায়।

        হিন্দিতে ওনার ফিল্মি গান নিয়েই আমরা বেশি চর্চা করে থাকি। কিন্তু ফিল্মের বাইরে হিন্দি/উর্দুভাষীদের কাছে ওনার গীত ও গজলের সম্ভার রীতিমতো লোকপ্রিয়। আবার ভজনের সংখ্যাও তাঁর কম নয়। ঠুংরি অঙ্গেও সমান সাবলীল। ধ্রুপদ, ধামার সবই ছিল আয়ত্তে। কিন্তু ওনাদের পরিবারের মূল ধারাটি ছিল কীর্তন। বাংলার কীর্তন হয়তো ওঁর কণ্ঠে খুব বেশি ধরা নেই, কিন্তু কীর্তনেও ছিল অসামান্য দক্ষতা। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে, মনে আছে, কলকাতায় এক শিল্পীর কীর্তনের সি.ডি. উদ্বোধন করতে এসে বলেছিলেন, এই আবহে আমার নিজেরও খুব ইচ্ছে করছে কীর্তনের একটা সি.ডি. বের করার। কাজটা সম্পন্ন হলে শ্রোতারা সম্পন্ন হতেন। মনে রাখতে হবে, তখন তাঁর বয়স আশি ছুঁইছুঁই, তখন নতুন এক উদ্যোগ  ভাবছেন! আশি-র কথা যখন উঠছে, তখন দেখে নিন আশি-অতিক্রান্ত শিল্পীর পারফর্মেন্স, হাজার-হাজার শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ রেখে।

কী ভাবে সম্ভব হয় গায়নের ওপর এমন আশ্চর্য সার্বিক নিয়ন্ত্রণ, এমন দক্ষ ম্যানেজমেন্ট, এমন দুর্দান্ত ইম্প্রোভাইজেশন? গানের নিজস্ব ভাষার প্রতিটি প্রকোষ্ঠে তাঁর যাতায়াত, সেই ভাষার যাবতীয় আয়ুধে তিনি সজ্জিত, সেই আয়ুধ প্রয়োগের কৃৎকৌশল সবই তাঁর জানা। প্রকরণ ও প্রহরণের সমন্বয়ে এ এক অবিরাম সাধনা, এক নিরন্তর অভিযান। ভারতীয় লঘুসংগীতে একমাত্র লতা মঙ্গেশকর ছাড়া এমন যাত্রী আর কেউ আছেন কি? মান্না দে-র প্রয়াণে তাই লতাজি বলে ওঠেন : যে-সম্মান মান্না দে-র পাওয়ার কথা ছিল, তা তিনি পাননি।

       শেষজীবনে বড় সাধ ছিল তাঁর, এই শহরে কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে-র স্মৃতিতে সংগীত অ্যাকাডেমি করবেন, সল্ট লেক-এ জমির কথা বলেওছিলেন কোনও-কোনও মহলে। আশা পূর্ণ হয়নি, উল্টে সব ব্যবস্থা করে দেবে বলে কোনও এক প্রতিষ্ঠান নাকি তাঁকে দিয়ে ফোকটে অনুষ্ঠানও করিয়ে নিয়েছে বলে শোনা যায়! আঘাত পেয়েছেন, কিন্তু নিরুচ্চার থেকেছেন। যা হোক, সিমলে পাড়া দিয়ে শুরু করেছিলাম, তা দিয়েই শেষ করি। পাড়ার প্রতি তাঁর টান ছিল বরাবর। আজ থেকে বছর বারো-তেরো আগেও তাঁকে দেখেছি ওনাদের বাড়ির অদূরে মহাদেবের মিষ্টির দোকানে দাঁড়িয়ে বিকেলের দিকে গরম সিঙাড়া খেতে, রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে, পরনে লুঙ্গি ও শার্ট। (সে-দোকান এখন আর নেই)। কাছাকাছি সময়েই সিমলা স্ট্রিটে কালীপুজোর একটি জলসায় শেষবারের মতো সামনাসামনি ওঁর অনুষ্ঠান শুনি। গেয়েছিলেন দু’টি বাংলা গান। সঙ্গে হারমোনিয়ামে শুভ্রকান্তি চট্টোপাধ্যায়। ওনার বয়স তখন নব্বই ছুঁইছুঁই। গান-দু’টি যেন নতুন রূপে শুনলাম।  শিহরিত, রোমাঞ্চিত! বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল। ফের মুখোমুখি শুনতে পাব তো!

        নাহ্, সে-ই শেষ।
Manna dey and tintin

1 মন্তব্য

Leave a Reply