সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

এই লেখাটি ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট প্রকাশিত এফ পত্রিকা থেকে নেওয়া। প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল, তার উল্লেখ এফ পত্রিকায় নেই। এফ পত্রিকার ১৯৯২ সালের সংখ্যা থেকে লেখাটি নেওয়া হয়েছে। আজ সন্দীপনের জন্মদিবসে এই লেখার পুনর্মুদ্রণের জন্য নাগরিক ডট নেট তাপস দাশের কাছে কৃতজ্ঞ।

জ্বলন্ত লাফের থাবা

গত ৭ই আগস্ট, ১৯৭৩, ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে ছবিটি যখন শেষ হয়, তখন মধ্যরাত। বেরিয়েই প্রয়োজন হল একটি সিগারেট ধরাবার, যে-জন্যে বারুদে-বারুদে ঘষা মাত্র সশব্দে জ্বলে ওঠে আগুন এবং সঙ্গের ঐ বাক্যটির কনসেপ্ট মাথায় আসে, যা ভাষারূপ না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি ও সিগারেট ধরাই না। তারপর একটা কাঠি পুরোপুরি জ্বলে যাবার সময় জুড়ে ঋত্বিকের যুক্তি তক্কো গপ্পো সম্বন্ধে এ-রকম বাক্যটি রূপ পেতে থাকে: যে, কথা হচ্ছে এর চেয়ে মহান চলচ্চিত্র ভবিষ্যতেও হতে পারবে কি? জানি অনেক খচ্চর এ-রকম আছেন যারা বলবেন — চলচ্চিত্রের ভুবন সোম যে-ভাবে বলেছিল… ‘চালাকি’। এক্ষেত্রে খচ্চরের আগেও অবশ্যই মহান শব্দটি বসবে। কিন্তু সে যাই হোক, ঘটনা হুবহু ঐ-রকম।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দ্বিতীয় বাক্যটি এলো মনোসিলেবিলে, অর্থাৎ ‘যাক’!’ ছোট নিশ্বাস ঐ সঙ্গে বুকে এসে পড়েছিল মনে আছে। সেই কবে কী-যেন ছবিতে বোধ হয়তো। মেঘে-ঢাকা-তারায় ফিউজ-এ দেওয়া হয়েছিল আগুন; স্রিক স্রিক স্রিক-স্রিক ক’রে সাপের সশব্দ জিভের মত জ্বলতে জ্বলতে এবং শ্বাসরোধী এগিয়ে যেতে যেতে ‘সুবর্ণরেখা’র পর মনে হয়েছিল তা বুঝি সবটা যেতে পারল না; হয়তো কেন, নিশ্চিত মাঝপথে নিবে গেছে। তারপর ফিউজের বাকিটুকু ঘাসের জঙ্গলে পড়ে রইল দিনের পর দিন, বৃষ্টির পর বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল — রোদের পুড়ে খাক হয়ে যেতে থাকল। এ-ভাবে কত বছর! তারপর সহসা শোনা গেল যুক্তি তক্কো গপ্পোর কথা… ইনসুলেটরে মধ্যবর্তী গোপন আগুন জ্বলে উঠল, এক লহমায়, জ্বলন্ত লাফের থাবা অবশেষে চোখের পলকে ঝাঁপিয়ে পড়ল ডিনামাইটের ওপর।

ব্রিজ ভেঙে পড়ল।

এবং তারপরেই ঐ নিশ্বাস মোচন — যাক!

‘চোখের পলকে’ এটা কথার কথা নয়। কেননা, কেউ কেউ বলেছেন, যুক্তি তক্কো গপ্পোর সিনারিও নাকি লেখা হয় মাত্র দেড় দিনে!! আর ব্রিজ ভেঙে গেল মানেটা কি? মানে হল গিয়ে, আবারো ওপারে যাওয়া যাবে কি? অদূর ভবিষ্যতে যুক্তি তক্কো গপ্পোর চেয়ে মহত্তর কিছু কোনো ছবি, হতে পারবে তো?

এবং ঐ ডিনামাইট — যা ফেটে প্রমাণ করল যে, যারা বলে থাকেন অভ্যাসের সঙ্গে, নিয়মিততার সঙ্গে, তথাকথিত ডিসিপ্লিনের সঙ্গে আর্ট ও আর্টিস্টের কোনো সম্পর্ক আদৌ আছে, ইস, তারা কী বোকা। ঋত্বিক কতদিন ছবি করেননি? দশ বছর হবে? প্রায়ই শোনা যেত, এই দশ বছর ধরে উনি কী, না, রট করছেন। এত প্রতিভা ছিল লোকটার, কিন্তু মিসগাইডেড; মাল খায় আর টাকা ধার করে আর শোধ দেয় না বলাই বাহুল্য। ওকে ছবি করতে কে টাকা দেবে বাবা। গত দশ বছর ধরে গাইডেড মিসাইলগুলি যখন পুরস্কারপ্রতিম অ্যানোফিলিসগুলো চপেটাঘাতে মেরে উজাড় করে দিচ্ছেন, ঋত্বিক তখন ঘনঘন যাচ্ছেন পাগলা গারদে… বেরুচ্ছেন আর ঢুকছেন — হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভয়াবহ রক্তক্ষরণের কারণে — তাঁর ফুসফুসে শতাব্দীর অসুখ — হাজত থেকে হাজতে পায়ে শৃঙ্খল পরিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কুরঙ্গগতি উজ্জ্বল মাতালকে।

 

গপ্পো

নীলকণ্ঠ বাগচি কে, ঠিক বলা হয়নি, কিন্তু ‘হী ইজ অ্যান ওয়েলনোন পার্সন’, বীরভূমের শালবনের ভিতরে তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে আত্মগোপনকারী নকশাল দলের কিশোর নায়ক সহযোদ্ধা কমরেডকে বলেছিল, ‘বাট দা ম্যান হ্যাজ নো পলিটিকস্।’ মধ্যজীবনে পৌঁছে একদিন নীলকণ্ঠর ব্যক্তিগত বিবাহবিচ্ছেদ হল সম্পূর্ণ, কলকাতার গলি থেকে স্ত্রী ও শিশুপুত্রের সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। অতি তরুণ এক যুবক, নাম নচিকেতা, পাড়ার ছেলে, তাঁর সঙ্গ নিল। আমরা যখন কিছুটা দেরিতে ইন্ডিয়া ফিল্ম ল্যাবরেটরির প্রোজেকশান রুমে পৌঁছই, হ্যাঁ, পথে বোতল খোঁজাখুঁজি করতেই আমাদের মিনিট-পনের দেরি হয়ে যায় তখন নীলকণ্ঠ ও নচিকেতা গলি থেকে রাজপথের মুখে — প্রকাশ্য দিবালোকে নীলকণ্ঠ ঢকঢক করে বোতল থেকে টাগরায় ঢালছেন বাঙলা মদ, বস্তুত গোটা ফিল্ম জুড়ে, প্রায় প্রতিদৃশ্যপর্যায়ে এই নীলকণ্ঠ বাগচি — এবং তাকে নিয়ে এমন একটা শট নেই যখন সে কাঁধে-ঝোলানো ব্যাগ থেকে ছিপিখোলা বোতল তুলে মুখে কিছু-না-কিছু ঢালছে। হ্যাঁ; বুর্জোয়া বঙ্গসংস্কৃতির স্টিলের তারে তৈরি মাকড়সা-জাল ছিঁড়ে অবশেষে একজন পেতিবুর্জোয়া সত্যি সত্যি বেরিয়ে পড়েছে, গলি থেকে রাজপথে নামার আগে দিশি মদের বোতলের ঐ একটিমাত্র প্রকাশ্য আঘাতে। প্রেম, বাৎসল্য, বিপ্লব, শ্রেণীঘৃণা, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, চণ্ডীপাঠ, আউলগান, সঙ্গম, পাখির কুজন, নদীর-তীর, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বাহাদুর খাঁ-র ললিত থেকে বেটোফেনের ষষ্ঠ সিমফনি — ছবিতে এমন কিছুই নেই যেখানে বোতল থেকে টাগরায় ঢকঢক ঢকঢক ক’রে দিশি মদ ঢালার ‘কুরুচিকর’, ‘অশ্লীল’ ও ‘অশিক্ষিত’ দৃশ্যটি উপস্থিত নেই।

পথে, কলকাতাতেই, এদের সঙ্গে যোগ দিল বঙ্গবালা নামে একটি তরুণী গ্রামের মেয়ে, হাতে তার যথাযর্বস্ব পোঁটলা — বাঙাল মেয়েটি ৩০-মার্চের মিলিটারি বর্বরতার শিকার — বাঙলাদেশ থেকে পালিয়ে এসেছে — একা ও আশ্রয়প্রার্থী, এবং এক টোলো পণ্ডিত, তিনিও অভাবগ্রস্ত, একা শহরে চলে এসেছেন রোজগার ও রুটির খোঁজে। কলকাতার ফুটপাতে রাস্তায় ও পার্কে ওদের একরাত কাটে। তারপর শহর ছেড়ে পায়ে হেঁটে ওরা চারজন গ্রাম-বাঙলার দিকে অভিসন্ধিহীন এগিয়ে যায়: এই জার্নিই গল্প।

পথে পড়ে পুরুলিয়া। সেখানে ছৌ-নাচ ও ভূমিদখলের লড়াই — জমিহারা একজন ভাড়াটে কৃষকের বন্দুকের গুলিতে টোলের পণ্ডিত প্রাণ হারালেন। সেখানে একরাত কাটে একজন গরীব শিল্পীর বাড়িতে — সে ছৌ-এর মুখোশ তৈরি করে। তারপর বীরভূম। বীরভূমের এক আধা শহরে নীলকণ্ঠের স্ত্রী শিক্ষয়িত্রী ও তাদের একমাত্র শিশু-পুত্র সত্যকে নিয়ে থাকেন। ভ্রমণকারী তিনজন শহরের বাইরের পথে দেখা শালবনে রাত কাটাতে যায়। যাবার আগে দ্বিধাবিভক্ত স্ত্রীকে নীলকণ্ঠ সুরাজর্জর অনুরোধ ক’রে যান ‘কাল ভোরে সত্যকে একবার শালবনে এনো। সূর্য ওঠার আলোয় একবার ওকে দেখতে চাই। যাবার আগে ওটাই তো সম্বল হয়ে থাকবে।’ আনুমানিক বাংলা সংলাপটিতে তোলপাড় যে মনে হয় নীলকণ্ঠ যেন একমাত্র সন্তানের এক ৩”x১২” ফটোগ্রাফ চাইছেন যা ফ্লাডলাইতে ভেসে যাচ্ছে।

ঘন পত্রপল্লবের আড়ালে ধাবমান বাঘচোখ। এবং তারপর একদল সশস্ত্র নকশাল তাদের বনের গভীরে ধরে নিয়ে যায়। ‘তুমি কে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে নীলকণ্ঠ বললেন, ‘আমি মাতাল।’ তারা যে-কোনো মুহূর্তে অ্যাটাক আশা করছে শুনে নীলকণ্ঠ বাগচি বললেন, ‘আমি থাকব। আমি বুঝব। এবং আমি দেখব।’ রাত বাড়ে। গভীরতর রাতে নীলকণ্ঠ ও তরুণ কিশোরের মধ্যে চলে তর্ক — মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও-সে-তুঙ গুয়েভারার বিপ্লবী অ্যাডভেঞ্চারইজমে এসে তারা আর খেই পায় না — তখন শালগুঁড়িতে হেলান দিয়ে পাশে উপবিষ্ট নচিকেতার কাঁধে বঙ্গবালা তৃতীয়বার ঢলে পড়ল এবং ঈষৎ ক্রুদ্ধভাবে তাকে সরিয়ে দিতে গিয়ে এই প্রথম তারা পরস্পরের চোখের দিকে তাকায়। এ সময় রাত এত স্তব্ধ যে মনে হয় এই বনে একটি সরীসৃপ বা কীটপতঙ্গও নেই।

সেই মুহূর্তে যখন বিপ্লবীতত্ত্ব সাময়িক খেই হারিয়েছে এবং দু’টি চোখ অবলোকন করেছে অপর দু’টি চোখ — তখনই শোনা যেতে থাকে মৃদু গুমগুম — ধরিত্রীর সুখী গোঙানি — নারীর শীৎকারের পদ্মগন্ধ ‘উম উম’ শব্দ ও পুরুষের পরিতৃপ্ত নিঃশ্বাস বেড়ে বেড়ে যেন বাস্তবিক উড়িয়ে দিতে চায় মিনিয়েচার প্রোজেকশান রুমটি — অদেখা নারীর শীৎকারজাত ওই শেষহীন-ক্রমবর্ধমান ‘উম’ ‘উম’ শব্দে পুরুষের সাইক্লোনিক নিঃশ্বাসে চারদেওয়াল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, হলের মধ্যে ভূমিকম্প শুরু হয়ে যায় বল্লে একটুও বাড়িয়ে বলা হয় না, কেননা সঙ্গমরত নরনারীকে কখনোই দেখানো হয় না। ধরিত্রীর কামনার সঙ্গেই এর সম্পর্ক।

শালগুঁড়ি ধরে বঙ্গবালা ও নচিকেতা উঠে দাঁড়ায়। তারা দু’জনেই কামনায় থরথর ক’রে কাঁপছে। তারা দুদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখে। নীলকণ্ঠ ও কিশোর বিপ্লবীর মুখেও বহুসময় কথা নেই। সঙ্গমের শব্দ কমে আসছে। ঠিক এই সময় ভোর হয়। ভোরের সঙ্গে এগিয়ে আসে এক ব্যাটেলিয়ান সশস্ত্র নেকড়ে। শুরু হয়ে যায় অসম কিন্তু তুমুল যুদ্ধ, নীলকণ্ঠর বিবেচনায় পথভ্রষ্ট কিন্তু খাঁটি দেশপ্রেমের সঙ্গে বন্য ও বর্বর অমানবিকতার।

সব শেষ। টিলার ওপর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নীলকণ্ঠর ছেলে সত্যর গলায় শোনা যায় ভোরের প্রথম কাকলি — ‘বাবা’। বাহাদুর খাঁ-র ললিতে এখানেই কেঁদে ওঠে সরোদ। পিছনে মাকে দেখা যায়। নীলকণ্ঠ চেঁচিয়ে সাড়া দেয় এবং সচকিত পুলিশ বনের মধ্যে জীবিত আর-একজনকে দেখতে পেয়েই গুলি চালায়।

পেটের বাঁ-দিকে গুলি লেগেছিল। মৃত্যুর আগে তাই নীলকণ্ঠ বাগচি স্ত্রীকে মানিক বাড়ুজ্যের মদন তাঁতির গল্পটি শুনিয়ে যাবার সময় পায়। গ্রামের তাঁতিরা ধর্মঘট করেছিল। মদন তাদের নেতা। অনটনের তাড়ায় যখন আর চলে না তখন একদিন মধ্যরাতে মদনের কুঁড়ে থেকে তাঁত-চলার শব্দ। শেষ পর্যন্ত তবে স্বয়ং নেতাই কি হার মানল? না! সমবেত তাঁতিরা সবিস্ময়ে দ্যাখে মদন খালি তাঁত চালাচ্ছে। হাত নিসপিস করে, তাঁত না চালিয়ে গাঁটে গাঁটে ব্যথা, তাই সে মাঝরাতে উঠে চালিয়ে যাচ্ছে তার হস্তচালিত খালি তাঁত।

অবিরাম দৃশ্যপরম্পরা জুড়ে নীলকণ্ঠ বাগচি এভাবেই চালিয়ে যায় তার হস্তচালিত প্রাণ-তাঁত, যা খালি, যতক্ষণ না, ঋত্বিক এসে বেবী ইসলামের মুভি-ক্যামেরার লেন্সের ওপর ঢেলে দেন ছিপি খুলে অনর্গল মদ। তাঁর হাতের শাশ্বত মদের বোতলটিকে এতক্ষণে মদন তাঁতির মাকু বলে চেনা যায় যদিও হায়, সে, নীলকণ্ঠ, একজন বিবেকবাদী, ‘ভাঙা বুদ্ধিজীবী’, একটি সুতোও যে বুনতে পারেনি। আশ্চর্য এই যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই গল্পটির নাম ‘শিল্পী’। বঙ্কিমচন্দ্র বাদে এবং রবীন্দ্রনাথসহ আপামর বাঙালী গদ্যলেখক যাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ক’রে ধন্য, সেই মানিক বাড়ুজ্যের মতই ঋত্বিক কুমার ঘটক হাজার হাজার সুতো টেনে বিছিয়ে যথার্থ পরিচালনা ক’রে নির্মাণ করেছেন এই অদৃষ্টপূর্ব কারুকাজ এবং এর নাম দিয়েছেন ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। ঋত্বিক পেরেছেন। কিন্তু নীলকণ্ঠ বাগচি কিছুই পারেনি।

 

ব্রিজ উড়ে গেছে

ঋত্বিক কুমার ঘটক কখনোই কোনো মিডিওকার কাজে হাত দেননি, যদিও তাঁর সমস্ত কাজই সার্থক এমন বলা অর্থহীন হবে। সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে কিন্তু পরবর্তীকালে মিডিওকার কাজ পাওয়া গেছে। তাঁর প্রথম দিকের ছবিগুলোই ছিল একের পর এক মাস্টারপীস। অনুরূপে ভুবন সোমের আগে মৃণাল কোনো ছবিটবি করেছেন বলে মনে পড়ে না। এছাড়া আর একটি সেমি-মেজর ফিল্ম হল, আমার মতে, চিদানন্দ দাশগুপ্তের ‘বিলেত ফেরৎ’। তির্যক ভিসুয়াল মন্তব্যে ভরা এই খাঁটি আর্বান ছবিটিকে একদিক থেকে একটি ব্রেক-থ্রুও বলা চলে হয়ত। মোটকথা প্রমথেশ বড়ুয়ার দেবদাস ও মুক্তি (যা বড় বয়সে আমরা প্রথম দেখেছি), পথের পাঁচালী, অপরাজিত থেকে প্রায় একটানা সত্যজিৎ রায় এবং চারুলতায় যে আরোহণ-পর্বের শেষ, মাঝখানে ভুবন সোম ও সুবর্ণরেখা, অংশতঃ অযান্ত্রিক এবং আরো অংশতঃ মেঘে-ঢাকা তারা ও উল্লেখযোগ্য ‘বিলেত ফেরৎ’ — এছাড়া কোনো বাঙলা ছবি দেখা হয়নি বা নেই বলা চলে। এরকম এলিমিনেশান বাঙলা চলচ্চিত্রের ভাবী গৌরবকালের কথা ভেবেই করতে হয়। ভাবীকালের সম্ভাবনার কথা ভেবে বাকি বায়োস্কোপকারদের ও তাদের ছবির রীল-ফিল এভাবে টেনে নামিয়ে নিতে হয়; কারণ অমরত্বের নৌকোখানা ছোটই। আর ঐ নৌকো থেকে অদূরে ও অন্ধকারে একটা বয়া আঁকড়ে ভেসে রয়েছে পূর্ণেন্দু পত্রী।

তো, এভাবেই এসেছে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো, যে-ভাবে একদিন এসেছিল পথের পাঁচালী বা ভুবন সোম — এখন, এর আগে কোনো বাঙলা ছবি হয়েছিল বলেই মনে পড়ছে না। সব মুছে গেছে। কিন্তু তখন, যখন পথের পাঁচালী, আমরা ক’বারই বা দাড়ি কামিয়েছি! ইতিমধ্যে আমরা বড় হয়েছি — বেয়ারিম্যা… না, আমি একজনও সাহেব চলচ্চিত্রকারের নাম তথা ভিস্যুয়াল আর্ট-ফর্ম, ফিল্ম ল্যাংগুয়েজ, মিড শট, ফেড-ইন, ক্লোজআপ আদি ক্লিশে ব্যবহার করব না বলে প্রতিজ্ঞা করেছি — এবং অনেকানেক সাহেব এবং সত্যজিৎ রায় এবং ভুবন সোম এবং সুবর্ণরেখা দেখেছি। এবং এই সেদিন দেখেছি প্রমথেশ বড়ুয়ার মুক্তি। ডিনামাইট প্রসঙ্গ তুলে আবার বলা যাক, সব উড়ে গেছে।

 

ঋত্বিক ও প্যারানোয়িআ

বস্তুত, প্রমথেশ-এর অভিনয়ের মতই ঋত্বিকের রয়েছে প্যারানোয়িআর নিজস্ব জগৎ। প্যারানোয়িআর আভিধানিক মানে হল নিজের বাইরে চলে যেতে থাকা — চলে যাওয়া নয় ঠিক — গ্রীক এটিমোলজিতে তাকে বলবে এটনোয়িআ। প্যারানোয়িআকে আমাদের তথাকথিত সাইকিয়াট্রিস্টরা বলে মস্তিষ্ক-বিকৃতি এবং তাদের পাগলা গারদে দিতে বলে এবং দেওয়া হয়।

এ্যাণ্টি-সাইকিয়াট্রি কিন্তু অন্যরকম মনে করে। কেননা, এর পূর্ব-অবস্থা একনোয়িআ-য় যারা — এই ডাক্তার, উকিল, জার্নালিস্ট, অধ্যাপক, উপমন্ত্রী, পপ-সাহিত্যিক, মাড়োয়ারী, ফিল্ম-ক্রিটিক, গৃহস্থ আদি — এ্যাণ্টি-সাইকিয়াট্রির মতে এরাই প্রকৃত পাগল — কারণ, তিলে তিলে প্রতিদিন যেভাবে নিজেকে খুন ক’রে এরা এইসব ‘হয়েছে’ — তাতে ক’রে এদের এক-একটি বহু উন্মাদ ও ব্যাধিগ্রস্ত বলতে হয়।

প্যারানোয়িআ তাই সুস্থতার দিকে, নিজের দিকে যাত্রা। এই প্যারানোয়িআর জগতে বাঙলাদেশে ঢুকেছেন জীবনানন্দ দাশ ও বিনয় মজুমদার, অভিনেতা প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া এবং চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক। শেষ দু’জন ছিলেন একই সঙ্গে আলকোহলিক — আর বিনয় ও ঋত্বিককে বারবার পাগলা গারদে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জীবনানন্দ গারদে যাননি, আদৌ পানাসক্ত ছিলেন না। কিন্তু জীবনানন্দ বারবার অপর-নারী ও অপর-জলের কথা লিখেছেন। নিজের বাইরে চলে গিয়ে অপর-নিজেকে লক্ষ্য, পর্যবেক্ষণ ও এই পলকহারা অবলোকন… একে পাগলামি বলবে কোন উন্মাদ?

এই অপর-ঋত্বিকই ছবির নীলকণ্ঠ, যে ঋত্বিককে লক্ষ্য করছে। পর্যবেক্ষণ করছে। ঋত্বিকের দিকেই সে, অপর-ঋত্বিক, এর কোনো বন্ধন নেই, সে এলিমেন্টাল। নকশাল নায়কের ‘তুমি কে?’ এই প্রথম প্রশ্নের উত্তরে তাই সে বোতল তুলে বলেছিল, ‘আমি মাতাল’। আমার শেকল নেই। অবলোকন ছাড়া আমার কিছু করার নেই। নীলকণ্ঠ কয়েকবার যা বলে, তা হল — এভরিথিং ইজ বার্নিং। এভরিথিং উইল বার্ন।’ তারপরেই ঝুপড়ির নীচে মহাস্থবির, পিছনে, রোদে, ভারতবর্ষের জ্বলন্ত প্রান্তর, তখন সমস্ত শিকলছেঁড়া, উজ্জ্বল মাতালের গলায় বস্তুতঃ দৈববাণী শোনা যায়। ছবির থীম-মিউজিক বেটোফেনের ধ্বংসের গানও এখানেই বাজে। এবং নীলকণ্ঠ এবং ঋত্বিক, এত অবিভাজ্য যে, ভবানীপুরের গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জী লেনের যে বাসাবাড়ী থেকে ঋত্বিক ও তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী ঘটকের একদিন বিচ্ছেদ — ঠিক সেই বাড়ী থেকেই নীলকণ্ঠ ও তৃপ্তি মিত্রের ছাড়াছাড়ি — এবং সাঁইথিয়ার যেখানে নীলকণ্ঠর স্ত্রী শিক্ষয়িত্রী — ঠিক সেখানেই লক্ষ্মী ঘটক আজো শিক্ষিকা এবং ঋত্বিকের ছেলেকে নিয়ে থাকেন যে স্বয়ং যুক্তি-তক্কো-গপ্পের সত্য। পাঠককে বোধহয় বলে দিতে হবে না যে ঋত্বিক এই ছবিতে নীলকণ্ঠ বাগচির ভূমিকায় ও অভিনয় করেছেন। বাস্তবিক পাঠক, আপনার চরিত্রে আপনি ছাড়া আর কে রূপদান করতে পারবে? এই ভাবেই বিনয় ঈশ্বর হয়ে ঈশ্বরীর উদ্দেশে কবিতা লিখে থাকে।

 

কয়েকটি দৃশ্য

ছবির শুরুর সেই মহাস্থবির বুড়ো একটা ঝুপড়ির নীচে ব’সে যার পিছনে ফসলহারা ধূ ধূ প্রান্তর যা জ্বলে যাচ্ছে যা পুরো ছবিতে মোট তিনবার দেখানো হয় — জ্যোৎস্নায়, মেঘময়তায় ও একবার যখন মাঠ জ্বলে ওঠে। বুড়োর বয়স কত বোঝা যায় না, ভারতবর্ষেরই বা বয়স কত? খেলনা অটোমেটিক দিয়ে সত্য মাথা থেকে পা পর্যন্ত বাবা নীলকণ্ঠকে ঝাঁঝরা ক’রে দিচ্ছে এবং তার পরই জানালার রোদে পড়ে আছে তার নীলকণ্ঠর ভস্মীভূত অটুট ছাইশরীর — যেরকম ক্রিমেটোরিয়ামে পোড়ার পর হয়। বা পুরুলিয়ার দুর্গামূর্তির মুখোশ হাতে বঙ্গবালার মেটামরফসিস, সে দনুজদলনী হয়ে উঠছে; জমি দখলের দৃশ্য, (জানা গেল এটাও নাকি ডকুমেন্টারি নয়!) আউটরাম ঘাটে আউলের গান — সে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চিরস্থির গেয়ে যায়। ‘আমার নামাজ আদায় হলো না…।’ একটা মাষ্টার শট যেন সে ছোট স্টেজের উপর — পিছনে নদীসহ কলকাতা টাঙানো। এবং সর্বোপরি পুলিশ ও নকশালদের যুদ্ধ — একটি ছেলের পিঠে গুলি এসে লাগে। বীরের মতন আদৌ নয় — ভীতু মুরগির মত সে থর্থর করে কাঁপতে থাকে যে কতক্ষণ ধরে। তারপর তার চোখের পাতা স্থির হয়। সে মেসিনগান নিয়ে গড়িয়ে পড়ে। নতুন পোরা ম্যাগাজিনের ট্রিগারের ওপর পড়ে থাকে তার লাশ।। লাশের ভারে মেসিনগানিং চলতে থাকে চলতেই থাকে। অস্ত্রের ওপর সে তখনো থরথরিয়ে কাঁপছে। যেন সে বেঁচে থেকে মৃত্যুর পরপার থেকে গুলিবর্ষণ করে চলেছে। এবং শেষদৃশ্য যেখানে পুলিশবেষ্টিত বঙ্গবালা ও নচিকেতা — হঠাৎ উলুধ্বনি — সদ্যবিধবা তৃপ্তি শাশুড়ি হিসেবে একটু ঘোমটাও টেনে নেন। এবং শেষের পরেও অবশেষের দৃশ্য হিসেবে যা জেগে থাকে তা হল নীলকণ্ঠ যখন বোতলের তলানিটুকু ক্যামেরা লেন্সের ওপর ঢেলে দিলেন। সব ঝাপসা হয়ে এল। আর শালবনে সঙ্গমের শব্দদৃশ্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। আর একটি দৃশ্যপর্যায় হল নকশাল ছেলেটির সঙ্গে রাত্রিকালীন নীলকণ্ঠের তর্ক।

২১ শতাব্দী শুরু

হ্যাঁ, যুক্তি তক্কো আর গল্পো সম্পর্কে আমি এতক্ষণ যা একটানা লিখলুম তাকে উচ্ছ্বাস বলেও মনে করা যেতেই পারে। পাতিবুর্জোয়া মিলিউ-এ ভরা সমালোচকরা ছবিটা রিলিজ হবার পর কেউ কেউ এটা কত অশ্লীল কদর্য সে বিষয়ে লিখবেন — কেউ কেউ ঘাড় নেড়ে বলবেন ‘কিন্তু — উম্— রসস্থ হল কী?’ অনেকেই চুপ করে থাকবেন, যে দেখি কী দাঁড়ায়। পরে এরা যথারীতি প্রশংসামুখর হবেন।

আমি কিন্তু আগেই গলা বাড়িয়ে দিচ্ছি ও হাড়িকাঠে রাখছি। আমি বলছি, ১। নিজের চরিত্র নিজেই রূপদান করছেন এবং পরিচালক ও কাহিনীকারও তিনি নিজেই এটা পৃথিবীর শেষতম আশ্চর্য ঘটনা। এরপরেও ভাল ছবি হবে। কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রের ২১ শতাব্দীর শুরু এই যুক্তি তক্কো আর গপ্পো দিয়েই আমি বলছি।

২। আমি বলছি ঋত্বিকের নীলকণ্ঠ বাগচির চরিত্রের অভিনয় আমেরিকার অ্যাকাদেমিসহ পৃথিবীর সেরা পুরস্কারগুলি পাবার যোগ্য।

৩। শাঁওলি মিত্রের বঙ্গবালা হচ্ছে সেই দুর্লভ জিনিস যা ভোলা যায় না। সেই কবে, ছোটবেলায়, ডাকঘরে অমলের পর বঙ্গবালা শাঁওলিসৃষ্ট দ্বিতীয় ফেনোমেনা। এবং তৃপ্তি, জ্ঞানেশ, নচিকেতাসহ সকলেই এ-ছবিতে অমোঘ-নায়ক নীলকণ্ঠর সঙ্গে ঋত্বিকের ঐ অমোঘ আত্মীয়করণই যেন এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। অসামান্য চরিত্র সৃষ্টি করেছেন নকশাল-নেতার ভূমিকায় তরুণতম কবি অনন্য রায়। ছবির আবহসঙ্গীত এককথায় অভূতপূর্ব এবং মহাস্থবিরকে দেখাবার সময় ষষ্ঠ সিম্ফনির প্রয়োগ কল্পনাতীত মেধাবী। এবং বেবী ইসলামের আলোকচিত্র — যা নির্লজ্জতম অস্ত্রাঘাতের মত এই ছবির কনটেন্টকে কেটেকুটে এমন একটি বহু-কৌণিক হীরকখণ্ডে পরিণত করেছে — ক’রে টেনে এনেছে প্রকাশ্য দিবা-আলোয়।

৪। আর, ব্যাটালিয়ানের কমাণ্ডার শ্যামল ঘোষাল অভিনয় করেছেন আস্ত একটি জানোয়ারের মতন, একটা বাদুলে চিতা বা ক্লাউডেড লেপার্ড যেন, যাদের ১৬ থেকে ২৭ কিলোগ্রাম ওজন হয়ে থাকে।

 

অবধারিত জনপ্রিয়তা

আর, ছবিটি আগাগোড়া কী এনটারটেনিং — এর প্রতিফুট উপভোগ্য। সমস্ত আর্টকেই জনগণকে এনটারটেন করতে হবে: ব্রেখট মনে করতেন। ব্রেখটীয় দিক থেকে ছবিটি তৈরি হয়েছে আসলে জনসাধারণের জন্যে। মূক বা যারা নীরব সেই মেজরিটির জন্যে এই ছবি, একে সমর্থন করতে তারা এগিয়ে আসবে — দ্য সাইলেণ্ট মেজরিটি। ক্রিটিকে কী মীমাংসায় করবে বা সিনে-আঁতেলরা কী বলে না বলে তাতে যুক্তি-তক্কোর চুলও ছেঁড়া যাবে না। ছবিটির কোনোরূপ লবিয়িং-এর প্রয়োজন হবে না। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি বা যে কোন সিনেপণ্ডিতকে একশত যা পর্যন্ত (জুতা) বাজি রাখতে ডাকছি যে এই যুক্তি-তক্কো-গপ্পো বক্স অফিসকে ভাসিয়ে দেবে।

 

রঞ্জিত গুপ্তকে অনুরোধ

রঞ্জিত গুপ্তকে আমি অনুরোধ করছি তিনি যেন ‘১৫ই আগস্ট — স্বাধীনতা — ফুঃ।’ এই ডায়ালগসহ ছবিটির প্রতিটি দৃশ্য অক্ষুণ্ণ রাখেন। এটা নকশালদের নিয়ে ছবি, এর সেন্সর করবেন আপনি। আপনি একজন প্রথম স্তরের বুদ্ধিমান বাঙালী। আপনি জানেন, আপনি যাঁর প্রহরী সেই ভারতমাতাসহ আমাদের দেশ পুড়ে যাচ্ছে। ‘অ্যান্ড উইল বার্ন।’ এখন আত্মসম্মানবোধে অন্তত মহাপাতক হবার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবেন আমি আমি আমি আশা করি — আপনি এর ১ ফুটও সেন্সর করবেন এটা আশা করি না। নতুন ইতিহাসের অভিসম্পাত গ্রহণ করুন।

 

পরিশিষ্ট

উপসংহারে তিনটি কথা বলার রয়েছে।

প্রথম কথা: ঋত্বিক কুমার ঘটক ছাড়া এ-রকম একটা চলচ্চিত্র এদেশে আর কেউ নির্মাণ করতে পারেন না।

দ্বিতীয় কথা: ঐ। অর্থাৎ প্রথম কথাটা।

তৃতীয় কথা: ঐ। অর্থাৎ দ্বিতীয় কথাটা।

*বানান অপরিবর্তিত। একই শব্দের একাধিক বানানের ক্ষেত্রে অধিক ব্যবহৃত বানানটি রাখা হয়েছে।

 

আরো পড়ুন

পথের পাঁচালী — একটি আদ্যিকালের সমালোচনা

Leave a Reply