ভার্টিগোর কবলে পড়ে তখন জীবন নাজেহাল, বন্ধুর পরামর্শে দেখাতে গেলাম কলকাতার প্রাক্তন শেরিফ প্রখ্যাত নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ দুলাল বোসকে। হাজরা রোড ধরে শম্ভুনাথ পন্ডিত স্ট্রিট যাচ্ছি, গুপ্তা ব্রাদার্সের কিছুটা পরে, বাঁদিকে একটা রাস্তা ঢুকে গিয়েছে, ওই রাস্তাটার মোড়ে গোঁত্তা খেয়ে ডানদিকে ঢুকলেই ডাক্তারের বাড়ি, জায়গাটার এককালে বনেদিয়ানা থাকলেও, এখন তা ক্ষয়িষ্ণু, দু চারটে বাড়ি ভেঙ্গে তৈরী হয়েছে ফ্ল্যাট।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ওখানে গিয়েই আরও কয়েক পা এগোলেই ৮২, এ-র পরেই ছোট্ট গলি দিয়ে ঢুকলেই ৮২, সি। সবুজ দরজা, দেওয়ালের গায়ে  লেটার বাক্সে,এই সেদিনও নামটা জ্বলজ্বল করছিল। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত রেমিংটন টাইপ রাইটারের খট খট শব্দ, দরজায় বেল দিলেই সবুজ দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেন লুঙ্গি ও সাদা হাফ শার্ট পরা এক বৃদ্ধ। বড্ড সাধারণ, কাঁসারিপাড়ার আর পাঁচজন ছাপোষা গৃহস্থের মতোই। কিন্তু কাঁসারিপাড়ার তাবৎ মানুষ জানেন, উনি এ পাড়ার গর্ব, বিদ্বান, সজ্জন লোক, ইংরেজিতে বই লেখেন, আর সেই বই বিদেশে পন্ডিত মানুষেরা পড়েন। তবে ওঁর সব লেখাই ইংরেজিতে, তাই সাধারণ মানুষের বড়ো অংশের কাছেই অধরা ওই মূল্যবান লেখাগুলো। কিন্তু এই কলকাতার সব অলি ঘুঁজির ইতিহাস ওঁর নখদর্পণে। নিজেদের লেখার তথ্য সংগ্রহের জন্য ওঁর শরণাপন্ন হননি, এমন বুদ্ধিজীবী বিরল। তবুও তিনি থেকে গেলেন একাকী নির্জনে সারস্বত সাধনায় মগ্ন তাপসের মতো।

তখন পরমেশ্বর থাঙ্কপন নায়ারের মাত্র ২২ বছর বয়স, ১৯৫৫ সালের এক অক্টোবরের সকালে  মাদ্রাজ মেল থেকে নামলেন তিনি, সহায় সম্বল বলতে একটা সুটকেস আর একটা ফাইলে অলওয়ে স্কুল থেকে তাঁর ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট, আর কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। কেরালার কালাদিতে, মাঞ্জাপারায়, আদি শঙ্করাচার্যের গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন পরমেশ্বর নায়ার, স্কুলে সংস্কৃত শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি সংস্কৃত, মালয়ালাম, ইংরেজি ভাষায় স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তবুও জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় আসা, তখনও জানতেন না, জীবন তাঁর জন্য কি বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছে।

মাদ্রাজ মেল থেকে নেমেই সোজা হেঁটে ডালহৌসি স্কোয়ার, কালাদির টাইপ,শর্ট হ্যান্ড স্কুল থেকে জেনে এসেছিলেন তার গ্রামেরই একজনের কথা, যিনি জি পি ও-তে চাকরি করেন। তিনিই থাকার ব্যবস্থা করে দেন দেশপ্রিয় পার্কে। টাইপিস্টের চাকরি পান, ট্রামে করে, পায়ে হেঁটে কলকাতা দেখার সেই শুরু। কলকাতা মহানগরীর ঔপনিবেশিক অতীত, বৌদ্ধিক ঐতিহ্য, এবং ধনী, দরিদ্রের সহাবস্থান তাঁকে মুগ্ধ করলো। রাস্তায় যেতে যেতে দুপাশের অনেক অতীত ইতিহাসের সাক্ষী পুরনো বাড়িগুলো তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করতো।

এই সময়েই আনথ্রোপলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায় ১২৫ টাকা মাইনেতে টাইপিস্টের চাকরি পান তিনি কিন্তু বদলি হতে হয় শিলংয়ে। তখন তিনি আনথ্রোপলজিকাল সার্ভের লাইব্রেরিতে পড়াশুনা শুরু করেন। রাতে সেন্ট অ্যান্থনি পড়াশোনা। কিন্তু তখন তাঁকে কলকাতার জনজীবন, নগরসভ্যতার তিলে তিলে গড়ে ওঠা ইতিহাস তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। একবছর পরেই তাই আবার কলকাতার সেন্ট্রাল অফিসে  প্রত্যাবর্তন করলেন।

সামনে তাঁর অনেক কাজ, তার জন্য প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। দেশপ্রিয় পার্কের আস্তানা ছেড়ে তিনি উঠে এলেন, এই কাঁসারীপাড়া রোডে, কলকাতায় কাটানো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এটাই ছিল তাঁর বাসস্থান। এখান থেকে ১০ মিনিটের হাঁটাপথ ছিল ন্যাশনাল লাইব্রেরি, একদিন অন্তর একদিন সেখানেই কাটতো তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময়। এখান থেকে কলকাতা শহরের যে কোনও জায়গায় যাওয়া অনেক বেশী সহজ ও সুগম ছিল আর নিরিবিলিতে পড়াশুনা করতে পারতেন বলে জায়গাটি তাঁর পছন্দ হয়েছিল।

সুমিষ্ট বাংলা ভাষা ও সিনেমার টান যাতে তাঁর কাজের ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে সেইজন্য শুধুই পড়াশোনায় , ইতিহাসের গবেষণায় তিনি সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করেন। ছেড়ে দেন চাকরি, পুরোপুরি মন দিতে চান এই কলকাতার ইতিহাস রচনায়।  সেই সময় ইতিহাসবেত্তাদের কলকাতার ইতিহাস নিয়ে মনোযোগের অভাব,আঞ্চলিক ইতিহাস, নগরজীবনের ইতিহাস সম্পর্কে অনাগ্রহ ছিল। তাই তাঁর সামনে ছিল একেবারেই অনালোকিত, অনালোচিত এক বিরাট ক্ষেত্র, যেখানে পূর্বসূরীদের দেখানো পথ ছিল না। তাই তাঁর কাজ ছিল সম্পূর্ণভাবে স্বকীয়।

অধিকাংশ সফল পুরুষের সঙ্গেই থাকে একজন নারীর সহায়তা। তিনিও তাঁর ব্যতিক্রম নন,  সন্তানাদি হয়ে যাওয়ার পরে, তাঁর স্ত্রী সীতাদেবী যিনি নিজেও ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক সিদ্ধান্ত নেন,সীতাদেবী সন্তানদের নিয়ে মাঞ্জাপারায় তাঁদের গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ মা, বাবার দেখাশোনার জন্য থাকবেন।

কলকাতায় নায়ারবাবু (হ্যাঁ এই নামেই পরিচিত ছিলেন কাঁসারী পাড়ায়) তাঁর নিরলস, অকৃত্রিম সারস্বত সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন। তিনি অফিসের দৈনন্দিন কাজের ঘেরাটোপে তাঁর আসল কাজের এতটুকু সময় নষ্ট হোক আর চাইছিলেন না, চাহিদা তাঁদের ছিল সামান্য, নিজের জন্য খরচ ছিল খুবই সামান্য, কোনও বিলাসিতা তো ছিলই না, খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন, খাওয়া দাওয়া ছিল খুব সাদাসিধে, এতো বছর কলকাতায় থেকেও বাঙালী খাদ্যভ্যাস মাছে ভাতে অভ্যস্ত হতে পারেন নি। নদীর মাছ খেতে পারেন না। তাই স্বহস্তে পেট ভরানোর যোগাড় করেই, সবটুকু সময় তিনি দেন এই কলকাতা গবেষণায়। একটা সময় আনথ্রোপলোজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারী চাকরির নিরাপত্তা বলয় থেকে নির্দ্বিধায় বেরিয়ে আসার, চাকরি ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত তিনি নেন, তাঁর এই কাজে সম্পূর্ণ সমর্থন ও সহায়তা তিনি সীতাদেবীর কাছ থেকে পান।

১৯৬৭ তে তিনি কিছুদিন মাদ্রাজের বিখ্যাত জার্নাল ইঞ্জিনিয়ারিং টাইমসে তিনি কাজ করেছিলেন। সেইসময় তিনি কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্ণকের ওপর প্রচুর তথ্য যোগাড় করেন মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জের তথ্যাগার থেকে, তারপরেই প্রকাশিত হয় কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জব চার্ণককে নিয়ে তাঁর গবেষণাপত্র, Job charnock : the founder of Calcutta in facts and fictions :an antheology.

কলকাতা সম্পর্কে  সাতের দশকে যখন তিনি কাজ আরম্ভ করেন, তাঁর হাতে কোনও বই পত্র, দলিল দস্তাবেজ কিছুই ছিল না, বিদেশের বহু আর্কাইভস বা লেখ্যাগার থেকে অনেক মেহনত করে তাঁকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে, ধর্মতলা স্ট্রীটে যে নতুন, পুরনো ইংরেজি বইয়ের দোকান, সেখান থেকে অনেক বই তিনি সংগ্রহ করেছেন। ছুটতে হয়েছে পুলিশ সংগ্রহশালা, তথ্যাগার, নির্ভর করতে হয়েছে উপযুক্ত সরকারী দলিলের ওপর। ততদিনে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের স্নাতক হয়ে গিয়েছেন।

কিন্তু আইন নয় তাঁর মন জুড়ে তখন এই শহর, তিনি একথা স্বীকার করেছেন, ভারতবর্ষের কোনও শহরে ইতিহাস গবেষণার কাজের এতো সুযোগ, আর ক্ষেত্র কোনোটিই নেই। তাই পাঁচ দশক ধরে তাঁর গবেষণার বিষয় শুধুই কলকাতা।

১৯৯৪ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ৭৫ বছর পূর্তিতে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের সময়,রাওলাট কমিটির অফিসের অবস্থান ছিল এলস্যুম রো। সেটি আজকের কলকাতায় কোথায়, কেউ নির্ধারণ করতে পারছিলেন না। পি. টি. নায়ারের শরণাপন্ন হন উদ্যোক্তারা, তিনি বলে দিলেন, আজকের লর্ড সিনহা রোড ই তখনকার কালের এলস্যুম রো |ঐতিহাসিক ড :তনিকা সরকার এবং ড : শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত Calcutta : the story, decade বইতে বলা হয়েছে, ১৭-১৯ শতাব্দীর কলকাতার রাস্তাঘাট, পুলিশি ব্যবস্থা, হাই কোর্টের ইতিহাস, এবং মহানগরীর দক্ষিণ ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে জানতে তাঁদের পি. টি. নায়ারের লেখার ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করতে হয়েছে।

তাঁর  কৃচ্ছসাধনের জীবনে নিজের পয়সা জমিয়ে কেনা,ছয় হাজার দুর্লভ বইয়ের সংগ্রহ কিনে নিতে চেয়েছিল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি তাঁকে ব্ল্যাংক চেক পাঠিয়ে, তিনি সসম্মানে তা ফিরিয়ে দিয়ে, শহর ছাড়ার আগে কলকাতা টাউন হল সোসাইটিকে সেই দুর্লভ গ্রন্থাবলীর বিপুল সম্ভারের স্বত্ব দিয়ে গিয়েছেন। পয়সার পেছনে ছোটেন নি তিনি, ৬২টি বই লিখেছেন, সবই ইংরেজিতে, ছোট, ছোট প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর আনন্দ শুধু ছিল একটাই, এই শহরকে তিনি চিনেছেন, চিনিয়েছেন তো বটেই, যদিও সেই অহংকার তাঁর নেই। কারণ তিনি বলেন, আমি নতুন কিছু করিনি, কলিকাতা ছিল এবং আছে কলিকাতাতেই।

পি. টি. নায়ার যতদিন এই শহরে ছিলেন, কাজ করেছেন,সংবাদমাধ্যম আশ্চর্যরকমের উদাসীনতা দেখিয়েছেন তাঁর সম্পর্কে। সংবর্ধনা, সাক্ষাৎকার, পুরস্কার এই সব থেকে অনেক দূরে ছিলেন তিনি। যখন তিনি এই শহর ছাড়বেন মনস্থির ও নিশ্চিত করে ফেলেছেন, তখন সংবাদ মাধ্যমের ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। তবু ভাবতে অবাক লাগে, যে মানুষটা তাঁর জীবনের প্রায় সবটাই একটা শহরের ইতিহাস খোঁজায় ব্যস্ত থেকে নিজের শিকড়, পরিবার, নিরাপত্তার জীবনকে স্বেচ্ছায় সরিয়ে রেখে এই শহরকে দিয়ে গেলেন তাঁর মেধা, শ্রম, একাগ্রতা, তারুণ্য তাঁর  কি একটুও মনোযোগ, উৎসাহ, সংবর্ধনা পাওয়ার কথা ছিল না? সবার উদাসীনতা নিয়েই এই শহর ছেড়ে চলে গেলেন কলকাতার ইতিহাসকার পি. টি. নায়ার তাঁর শিকড়ের কাছে, ২০১৮ সালের ২২শে নভেম্বর।

কলকাতার প্রেমিক পি টি নায়ার এখন ত্রিবান্দমের অনতিদূরে কালাদিতে, নাতি নাতনির সাথে,তাঁর খামারবাড়ির দেখাশোনা করেন। কিন্তু গবেষকের স্বপ্ন কখনও শেষ হয় না। কাজ আরম্ভ করতে চান ৮৬ বছরের বৃদ্ধ এখনও, তাঁর গ্রাম থেকেই শুরু করবেন গবেষণা– প্রিন্টিং প্রেস নিয়ে, তাতে খ্রিস্টান মিশনারীদের অবদান নিয়ে। কলকাতাকে তাঁর মনে পড়ে, কিন্তু কোনও ক্ষোভ, দুঃখ নিয়ে নয়। ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সংরক্ষণ করে কলকাতার উন্নয়ন হোক, মহানগরীর ইতিহাস তার মর্যাদা পাক, অতীত ঐতিহ্য ও আধুনিকতা হাত ধরাধরি করে চলুক এই আশা রাখেন কলকাতার ইতিবৃত্তকার।

তথ্য ঋণ — টাইমস অফ ইন্ডিয়া।

2 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.