পীযূষ দত্ত

দোসরা মে-র নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর আমরা অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। ভেবে ছিলাম, “যাক, বাংলাকে তো বাঁচানো গেল!” হ্যাঁ, বিজেপির হাত থেকে বাংলা এ যাত্রায় বেঁচে গেলেও, যা বাঁচানো গেল না, তা হল গণতন্ত্র। আরো সরল ভাষায় বললে, স্বাধীনভাবে ভাববার, কাজ করবার, কথা বলবার পরিসর। আর তার জলজ্যান্ত প্রমাণ গত কয়েক মাসের ঘটনা।

মহামারি, অতিমারি, “গণ জমায়েত একদম না!”, এই সমস্ত কপচানি ভুলে একদিকে যখন উপনির্বাচনের বাজার গরম; সভা, জমায়েত, মিছিল, বৈঠক সবই যখন চলছে কলার উঁচিয়ে, তখন মাঝখান থেকে বন্ধ করে দেওয়া হল দেশের সর্ববৃহৎ মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (এপিডিআর)-এর দুদিন ব্যাপী সম্মেলন। অক্টোবরের ২৩ এবং ২৪ তারিখ, হুগলি জেলার শেওড়াফুলিতে আয়োজন করা হয় এই সম্মেলনের। আগে থেকে শেওড়াফুলি থানা এবং চন্দননগর পুলিশ কমিশানারেটকে জানিয়ে রাখা হলেও, পুলিশি হস্তক্ষেপে এই সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এপিডিআরের কর্মীদের এই সম্মেলন যে করা যাবে না, এই বিষয়েও কোনোরকম তথ্য প্রশাসন আগে থাকতে দেয়নি। একপ্রকার বলপ্রয়োগ করেই এই সম্মেলন বাতিল করে দেওয়া হয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এপিডিআরের এই সম্মেলনে ৫০ বছর পূর্ণ হল। ১৯৭২ সালে একাধিক সমাজসচেতন মানুষের ডাকে গড়ে ওঠে এই সংগঠন। মানুষের দৈনন্দিন লড়াইয়ের প্রশ্নে, মানবাধিকারের প্রশ্নে এপিডিআর বরাবর সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। সত্তরের দশকে যখন ব্যাপক পুলিশি নিপীড়ন বাংলার সমাজকে তছনছ করে দিচ্ছিল, শয়ে শয়ে রাজনৈতিক কর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল, খুন করা হচ্ছিল, তখন এই সংগঠন এগিয়ে আসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জোর আওয়াজ তুলতে। আশপাশের মানুষকে তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে। তাই আজ যখন এপিডিআরের সম্মেলনকে এমন পুলিশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাতিল করা হয়, তখন এ রাজ্যে ‘গণতন্ত্র’ রক্ষা করা গেল কি না বা মানবাধিকার রক্ষা হচ্ছে কিনা, এই প্রশ্নগুলো খানিক ভ্রু কুঁচকে দেয় বই কি।

কোভিড পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে যখন দিনের পর দিন স্কুল কলেজ বন্ধ করে রাখা হচ্ছে, মিটিং মিছিল সভা করতে গেলে ডিএম অ্যাক্টে গ্রেফতার করা হচ্ছে, সম্মেলন চলাকালীন তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, তখন এমন বাজার গরম করে উপনির্বাচন হবে কেন? সেখানে কি কোভিড ছড়ায় না? নাকি নিজেদের গদি ধরে রাখতে কোভিড ছড়ালেও সমস্যা নেই?

এপিডিআরের সম্মেলন বাতিল করে দেওয়া স্রেফ একটা ঘটনা নয়। একটা মস্ত বড় ইঙ্গিত।

হ্যাঁ, ইঙ্গিত। ফিরে যাওয়া যাক কয়েক সপ্তাহ আগের একটি ঘটনায়। পুজোর দিন। ১২ই অক্টোবর, সপ্তমীর রাত। হঠাৎই রাত ১১:৩০ নাগাদ শান্তিনিকেতনের গুরুপল্লী অঞ্চলে গণআন্দোলনের কর্মী টিপু সুলতানের বাড়িতে হানা দেয় নজন অপরিচিত ব্যক্তি, যারা নিজেদের পরিচয় দেয় শান্তিনিকেতন থানার পুলিশ বলে। এখানে উল্লেখ্য, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল সাধারণ পোশাকে। তারা বলপূর্বক টিপু সুলতানকে তুলে নিয়ে যায়। সেসময় টিপুর বাড়িতে কেবল সে এবং তার বৃদ্ধ দাদু উপস্থিত। টিপুকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জিজ্ঞেস করায় জানানো হয়, কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কাজ মিটলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তারপর থেকে ১৩ তারিখ অবধি একপ্রকার নিখোঁজ করে রাখা হয় টিপুকে। বোলপুর থানায়, শান্তিনিকেতন থানায় খবর নিতে গেলে তারা বলে, ওই নামে তারা কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। পরে, ১৩ তারিখ রাতের দিকে জানা যায় ঝাড়গ্রাম থানার পুলিশ টিপুর বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের একটি মামলায় ইউএপিএ, অস্ত্র আইন সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করেছে। প্রায় একটা গোটা দিন বেআইনিভাবে পুলিশি হেফাজতে রেখে তারা টিপুকে ১৪ তারিখ আদালতে পেশ করে।

এবার আসা যাক কেন এই গ্রেপ্তারিকে বেআইনি বলা।

আইনানুযায়ী, অভিযুক্তকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করার কথা। সেখানে টিপুকে একদিন প্রায় নিখোঁজ করে রেখে ১৪ তারিখ পেশ করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে ডিকে বসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যে মামলাটি হয় তাতে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দেয়, তা এখানে উদাহরণ হিসাবে রাখলে এই গ্রেফতারি কেন বেআইনি তা আরো স্পষ্ট করে বোঝানো যাবে। সেই রায়ে একথা স্পষ্ট বলা হয়, যে পুলিশকর্মীরা অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে আসবে তাদের উর্দিতে তাদের পদ এবং নাম, এই দুটি জিনিসের উল্লেখ থাকা চাই। কিন্তু টিপুর গ্রেফতারির ক্ষেত্রে দেখা যায় যারা গ্রেফতার করতে আসে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল সাধারণ পোশাকে। তাদের পদ, নাম কিছুই জানা যায়নি। এমনকি গ্রেফতারির সময় টিপুর বৃদ্ধ দাদুকে স্পষ্ট করে জানানোও হয়নি টিপুকে কিসের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, কর্মরত পুলিশকর্তাকে গ্রেফতারের সময় অ্যারেস্ট মেমো তৈরি করতে হবে এবং তা অভিযুক্তের পরিবারের কোনো সদস্য বা কোনো সাক্ষীকে দিয়ে সাক্ষর করাতে হবে।

যে মুখ্যমন্ত্রীকে কয়েক মাস আগে স্ট্যান স্বামীর কারাগারে হত্যার প্রতিবাদে, ইউএপিএ আইনের অপপ্রয়োগের বিরোধিতা করে অন্যান্য বিরোধী নেতা-নেত্রীদের সাথে রাষ্ট্রপতিকে চিঠিতে দিতে দেখা গেছিল, তাঁর রাজ্যেই এমন রাতের অন্ধকারে টিপু সুলতানকে গ্রেপ্তার করা হল।

যদিও এ তেমন নতুন কিছু নয়। এর আগেও একাধিকবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইউএপিএ আইনের বিরোধিতা করতে দেখা গেছে, রাজবন্দিদের মুক্তি দেওয়ার আশ্বাস দিতে দেখা গেছে। ২০১১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের দেওয়া একাধিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম ছিল এই রাজবন্দিদের মুক্তি দেওয়া। তবু, আজ ২০২১, আজও বাংলার জেলে শয়ে শয়ে গণআন্দোলনের কর্মী সেই ইউএপিএ আইনেই বন্দি হয়ে রয়েছে। কেউ ১০ বছর, কেউ ১২ বছর। অসুস্থ বন্দি বুদ্ধদেব মাহাতোকেও মুক্তি দিতে নারাজ রাজ্য সরকার।

ভাবলে দেখা যাবে, ভোটের পর ভোট গেছে, সরকারের রঙ বদলেছে, চেয়ারে বসার মুখগুলো পাল্টেছে, তবে সেই ‘শাসকের চরিত্র’ নামক ঠাটবাটের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আজ যারা বাংলার জেলগুলিতে বন্দি, তাঁদের অধিকাংশই গ্রেপ্তার হয় বামফ্রন্ট আমলে। তাঁদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ আইনে মামলা করা হয়েছিল। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, ভারতে প্রথম ইউএপিএ আইন প্রয়োগ করা হয় বাংলায়, বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই। ইউএপিএ আইনের প্রথম শহীদও বাংলায়, বামফ্রন্ট আমলে। অর্থাৎ, সেই একই গল্প, একই ঢং, কেবল চেহারার ফারাক।

আজ এপিডিআরের সম্মেলন বাতিল, টিপু সুলতানের গ্রেপ্তারি যেমন ইঙ্গিত দেয় রাজ্যে মানবাধিকার সংকটে, গণতন্ত্র সংকটে, ঠিক তেমনই এই দুটি ঘটনা, যা অল্প সময়ের ফারাকে অতি দ্রুত ঘটে গেল, তা আমাদের কল্পনার দুনিয়া থেকে এক টানে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনে। গোটা গোটা অক্ষরে, স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, ২রা মে বিজেপি হারলেও, ফ্যাসিবাদ কিন্তু হারেনি।

~লেখক বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.