ছিন্নমস্তার অভিশাপ শুধুই আমার প্রিয়তম ফেলুদা কাহিনি নয়। বাংলা গোয়েন্দা গল্পের সম্ভারে আমার প্রিয়তম গল্পগুলোর একটা। অঞ্জন দত্ত রুদ্র সেন বলে এক অসাধারণ গোয়েন্দাকে নিয়ে টিভি সিরিজ বানিয়েছিলেন, সেই চরিত্রে সব্যসাচী চক্রবর্তী যে অভিনয় করেছিলেন, তা সিগনেচার‌। ওঁর ফেলুদার অভিনয়কে দশ গোল দেবে। সেই সিরিজে জয় বাবা রুদ্রনাথ বলে একটি টেলিছবি হয়, সে ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই ছবিতে সৌমিত্র এক অন্ধ ফেলুদা-ভক্ত। রুদ্র সেন পছন্দ করেন রেমন্ড শ্যান্ডলারের গোয়েন্দাকে। ওদিকে গোয়েন্দা গল্প গুলে খাওয়া প্রীতিশ মিত্র (সৌমিত্রর চরিত্রের নাম) পছন্দ করে কেবল ফেলুদাকে। যখন রুদ্র সেনকে বৃদ্ধ প্রীতিশ মিত্র জিজ্ঞেস করে, শিশু-কিশোর সাহিত্য বলে সে ফেলুদাকে অবহেলা করেছে কিনা, রুদ্র সেন কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়, ছিন্নমস্তার অভিশাপ মন্দ লাগেনি। এই গল্পটা অনেক অ-ফেলুদাপাঠকও উপেক্ষা করেননি বিশেষ।

ছোটবেলায় এই গল্পটা পড়ে যে বাকরুদ্ধ করা মুগ্ধতা ছিল, তা এখন অন্যতর। একটা বিষয় এই গল্পটার ক্ষেত্রে আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে এখন। সেটা বলার আগে একটা অন্য কথা বলতে হয়, তা হল সত্যজিৎ শিকার এবং শিকারী — এই দুটো বিষয়কে বারবার তাঁর গল্পে ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁর সমগ্ৰ সাহিত্যে তো বটেই, শুধু ফেলুদা কাহিনিতেই এই রেফারেন্স বারবার ফিরে আসে। পাণ্ডু মিথুনরত হরিণ ভেবে ভুল করে ঋষি কিন্দম এবং তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গমরত অবস্থায় তীরবিদ্ধ করে, সেই অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিশাপ তার মৃত্যুর কারণ হয় শেষমেশ। দার্জিলিং জমজমাট-এর বিরূপাক্ষ মজুমদার এর কাছাকাছি অপরাধই করেন, যার পরিণাম তাঁকে মৃত্যু অবধি তাড়া করে। নেমেসিস, অপরাধ করে যে শাস্তি সাময়িকভাবে এড়িয়ে গেলেও পরে ভোগ করতেই হয় — গ্রিক দেবীর প্রসঙ্গ এভাবেই এসেছিল ডাঃ মুনসীর ডায়রি-তে। মনে রাখতে হবে, ডাঃ মুনসী কিন্তু এককালে শিকারী ছিলেন। এবং নেমেসিসের ভয় এ, জি এবং আর — এই তিন আপাত-কালপ্রিটের মতো মুনসীরও ছিল। তার অতীতের অপরাধের জন্যই শেষমেশ সে খুন হয়। এই দুটো ক্ষেত্রেই দুই অব্যর্থ শিকারীকে একটা আয়রনির মুখোমুখি হতে হয়। তারা নিজেদের অজান্তেই নিজেরা শিকার হয়ে ওঠে। তারা ধরতে পারে না কীভাবে শিকারী ওঁত পাতছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ইতিহাসে বাংলার দুর্দান্ত সব শিকারীর তালিকা হলে সেখানে প্রবোধকুমার সান্যালের নাম থাকবে উপরদিকে। লক্ষ্যভেদে যাঁর প্রায়-পৌরাণিক দক্ষতার বিবরণ পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হতে হয়, সঙ্গে সঙ্গত করে ময়ূখ চৌধুরীর রোমহর্ষক সব ইলাস্ট্রেশন। সেই প্রবোধ সান্যাল তাঁর শিকার কাহিনিতে লিখছেন, “আমিও অরণ্যেও, বোধ করি মর জগতেই প্রতিষ্ঠিত আছি।… এর পরে কী পাব সেই সামগান-মুখরিত প্রাচীন তপোবন, বল্কলধারী সন্ন্যাসীর কাছে? যাদের আশ্রমপ্রান্তে পাব ব্যাঘ্র আর হরিণের অদ্ভুত সমন্বয়, হিংসা ও অহিংসার নিবিড় যোগসূত্র, সংহার ও শান্তির পরম সংগম?” এই উপলব্ধি কি একজন শিকারীর? যে উপলব্ধি থেকে অন্তঃসত্ত্বা মানুষখেকো চিতাবাঘের পাশে বন্দুক নামিয়ে রাখেন শোকাতুর করবেট? শিকারী মস্তিষ্ক ছাপিয়ে যেন এক আশ্চর্য অনুকম্পা জেগে ওঠে এখানে, যে অরণ্যে তাঁরা অনুপ্রবেশ করছেন, সেই অরণ্য তাঁদের আবাহন করে। লক্ষ করার মতো বিষয়, এইসব শিকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ভূ-সামন্ত বা সামন্তপ্রভু। সত্যজিতের গল্পে এই ক্ষয়ে যাওয়া সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণিকে যেন উত্তর-ঔপনিবেশিক নবজাগৃতির দৃষ্টিতে দেখতে থাকে ফেলুদা। সঙ্গী হয় তোপসে, এবং পাঁচকড়ি দে থেকে স্বপনকুমার পর্যন্ত বাংলা গোয়েন্দা গল্পের পাল্প ঘরানার প্রতিনিধি লালমোহনবাবু। যেসব কেস ফেলুদাকে নাম কিনে দেয়, সেগুলো বাদে বাকি গল্পগুলো দেখুন। ধরুন, রয়েল বেঙ্গল রহস্য। মহীতোষ সিংহরায় অবিশ্যি শেষত তার প্রবঞ্চনার শাস্তি পায়নি। কিন্তু ভেবে দেখুন, পারিবারিক শিকারের পরম্পরা বজায় রাখার জন্য মহীতোষ শিকারীর ভেক ধরেছিল। কিন্তু তার হয়ে শিকার করত শশাঙ্ক। সেই শিকার হত ভারতের অন্য জঙ্গলে, যেখানে কেউ চেনে না মহীতোষ বা শশাঙ্ককে। যেখানে কেউ চেনে না তাদের। তাহলে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা হল কোথায়? কালবুনির জঙ্গলে তাদের নিজস্ব জমিদারি গড়ে। যেখানে মহীতোষের পাগল দাদা এখনও কালাপাহাড়ের ইতিহাস আওড়ে যায়। আধুনিক নব্য পুঁজির বাস্তবতা থেকে দূরে এই অবক্ষয়ী বিশ্বম্ভর রায়রা থাকে, ফেলুদা কিন্তু তাদের গোপনীয়তার শর্ত রক্ষা করে চলে। জলসাঘর-এর প্রতিটি ফ্রেম যে সহমর্মিতা ধারণ করে, ফেলুদাও তা ধারণ করে যেন। তাই মহীতোষের অতীত ঢেকে রাখার প্রতিশ্রুতি দেয় সে।

কোন মঙ্গলবোধ থেকে মৃগয়াকারীরা সত্যজিতের গল্পে শাস্তি পান, তা ভেবে দেখার মতো। ডাঃ মুনসী সম্পর্কে ফেলুদার ব্যবহৃত প্রবাদটা ভাবুন, “ফিজিশিয়ান হিল দাইসেলফ্”, ডাক্তার আগে নিজের ব্যারাম সারাও। কোন ব্যারাম? মুনসীর শিকারীজীবন কি আসলে ধাওয়া করছে তাঁকে? সেটা উহ্য থাকছে? ভারতীয় পুরাণ বা মহাকাব্যে মৃগয়ায় গিয়ে পাওয়া অভিশাপের কথা ভেবে দেখুন। মহেশ চৌধুরী শিকারী না হয়েও তাহলে সেই অভিশাপের শিকার হলেন কী করে? কারণ, যে শ্রেণির প্রতিনিধি এই শিকারীরা, সেই শ্রেণির প্রতিনিধি মহেশও। শিকারীর বেপরোয়াভাব তাঁর মধ্যেও ছিল, যা বাহিত হয়েছে অরুণেন্দ্রর মধ্যে।

আর অরুণেন্দ্র যাকে বোঝেনি, মহেশও যাকে বুঝতে দেরি করেছে, সেই বীরেন্দ্র কিন্তু এই প্রতিনিধিত্ব থেকে বেরিয়ে এসেছে। এই গল্পের আসল আকর্ষণ, সুলতান ও কারান্ডিকারের তীব্র ভালবাসা, বিচ্ছেদ এবং আবার মিলন। বাঘ পালানোর আতঙ্কের মধ্যে যেন একটি মানুষ ও একটি জানোয়ারের আন্তঃসম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বীরেন্দ্র ওরফে কারান্ডিকারের মধ্য দিয়ে যেন শিকার-শিকারীর ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। “জানোয়ারের সঙ্গে মানুষের আসল তফাত, জানোয়ার ভান করতে জানে না, মনের ভাব লুকোতে জানে না”, ফেলুদার ডাঃ মুনসীর ডায়রি-র এই সংলাপ মনে করুন, মুনসীর শিকারী সত্তার প্রতি যেন পরিহাস ছুড়ে দেয় সেই মন্তব্য। সেই নিয়তির পরিহাসকে এড়িয়ে যেতে পারে না অরুণেন্দ্রও। কিন্তু বীরেন্দ্র নিজেকে আবিষ্কার করে সুলতানের মধ্যে। ছিন্নমস্তার অভিশাপ-এর এই চাপান উতোর অনবদ্য!

আবার ডুমনিগড়ের মানুষখেকো, তারিণীখুড়োর গল্প। মানুষ খুনের শাস্তি দিতে এল মানুষখেকো জখম বাঘ। যেভাবে মানুষ খুন করার অপরাধবোধে মিঃ শাসমলের কাছে ফিরে এসেছিল আজন্মের শিকার করা সব প্রাণী। যেভাবে সেপ্টোপাসকে শিকার করার দরকার হয়েছিল, অথচ সেই শিকারের পরেই মাংসাশী গাছ খুঁজে বেড়ানো কান্তিবাবু শুরু করলেন ঝিঙে, পটলের চাষ। বৃহচ্চঞ্চু-র প্রদ্যুৎবাবুর বন্দুক নেমে গেল তুলসীবাবু ও চঞ্চু বা প্রাগৈতিহাসিক অ্যান্ডালগ্যালর্নিসের ভেতর অন্তঃসলিলা অপত্য টানের সামনে। শিকারের মনন আসলে মানবিক মাঙ্গলিকতার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল সত্যজিতের গল্পে। হত্যাকারীর দ্বন্দ্ব, বিবেক দংশনকে শিকারীর মনেও নিয়ে এসেছেন তিনি, অথচ একের পর শিকার ও শিকারীর গল্প বলেও গিয়েছেন। এ যেন সত্যজিতের নিজেরও বিবেকের এক আশ্চর্য টানাপোড়েন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.