পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল রাজ্যের ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল মানুষের কাছে কোনও উৎসাহব্যঞ্জক বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে না। আট দফা নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় আবারও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে চলেছেন বামপন্থীরা। নির্বাচনী হিসাবে শোচনীয় ফল করতে চলেছে সংযুক্ত মোর্চা। অন্যদিকে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও তার বাম ঘেঁষা শুভানুধ্যায়ীদের খুশি করার মতো ফলাফল করতে পারবে বলে মনে করার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। ভারতীয় জনতা পার্টি বিগত লোকসভা নির্বাচনের সাফল্যকে সংহত করে আরও বেশ কিছুটা এগোতে সমর্থ হবে বলেই মনে হয়। বিজেপি প্রথমেই সরকার গঠন করতে পারবে নাকি অন্য দল থেকে বিধায়ক কেনার জন্য দরদস্তুর করতে তার কিছুদিন সময় লাগবে, তা অবশ্য বলা মুশকিল। আমরা আশা করতে পারি, বিজেপি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তাহলে অন্তত কিছুদিনের জন্য, কয়েক মাসের জন্য হলেও বাংলার অ-বিজেপি সরকার বিপুল অর্থ ও প্রশাসনিক শক্তির মোকাবিলা করে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত সরকারকে যদি অর্থ এবং ক্ষমতার জোরে ফেলে দেওয়া হয়, আশা করব গণতন্ত্রের উপর সেই নির্লজ্জ আক্রমণের প্রথম প্রতিবাদ করবেন রাজ্যের বামপন্থীরা। একই সঙ্গে তাঁরা নিশ্চিতভাবেই এই প্রশ্ন তুলবেন, গত কয়েক বছরে কীভাবে এই রাজ্যে বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদের কিনে নেওয়া, ঝাঁকে ঝাঁকে দলবদল করানোর নোংরা খেলাকে রাজনীতির মূল স্রোতে প্রতিষ্ঠা করেছেন কারা। যদিও  বিজেপি সরকার গঠন করতে পারলে সেই প্রশ্নের জবাবদিহি করার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের কেউ অবশিষ্ট থাকবেন কিনা জানি না।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নির্বাচনের গোটা সময়কালটা জুড়ে বারবার যে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা হল কারা জিতবে? এটা নতুন কিছু নয়। একজন সংবাদকর্মীকে প্রতিটি নির্বাচনেই এই আগ্রহের উত্তর দিতে হয়। কিন্তু চলতি নির্বাচনে এই প্রশ্নটাই একটু অন্যভাবে সামনে আসছে। কে জিতবে সেটা আর খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল কারা সরকার গঠন করবে। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র তিনটি আসন পেয়েছিল। তারপরের পাঁচ বছরে তারা সংখ্যাটাকে চল্লিশের কাছে নিয়ে যেতে পেরেছে। ১২-১৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা। এই বিপুল বৃদ্ধির পিছনে সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টি লুকিয়ে রয়েছে, তা হল, আমাদের রাজ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের যে ছিটেফোঁটা চর্চা ছিল, তার সমূহ বিনাশ। এর শুরুটা তৃণমূলের হাত ধরে। বিজেপি তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। সাড়ে তিন দশক ধরে এই রাজ্যে কমিউনিস্টরা সরকার চালিয়েছেন। তাঁরা কলঙ্কমুক্ত ছিলেন না। গা-জোয়ারি, বিরোধী দলের উপর হামলা, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ — সবই তাঁরা করেছেন। কিন্তু কংগ্রেস বা এসইউসিআই বা পরবর্তীকালে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ পঞ্চায়েত সদস্য, জেলা পরিষদ সদস্য, কাউন্সিলর বা এমএলএ-কে ধরে এনে আলিমুদ্দিনের সামনে মাচা বেঁধে সিপিএমে যোগদান করানো হচ্ছে — এমন কুৎসিত, অপমানজনক দৃশ্য এই রাজ্যের নির্বাচকমণ্ডলীকে কখনও দেখতে হয়নি। রাজ্যে পালাবদলের পর যে অস্ত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিপিএম-কংগ্রেসকে খতম করেছেন, সেই অস্ত্রই ইতিহাসের নির্মম পরিহাসে আজ তাঁর দিকে ঘুরে গিয়েছে।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে কোনও পাটিগণিতের ভিত্তিতে বিচার করলে ভুল হবে। বিচার করতে হবে রসায়নের আঙ্গিকে। এত বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক প্রচার এর আগে কখনও এই বাংলার কোনও নির্বাচনে হয়নি। আমি ভুল হলে নিজেই সবচেয়ে বেশি খুশি হব, কিন্তু জেলায় জেলায় ঘুরে মনে হয়েছে, হিন্দু ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে জোটবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে দলিত ভোট প্রায় পুরোটাই তৃণমূলের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে এখনও তৃণমূলের ভরসা মুসলিম এবং মহিলা ভোট। সংযুক্ত মোর্চার বিপর্যয়ের বড় কারণ হতে চলেছে তার পুরনো ঘাঁটিগুলির মুসলিম ভোট কংগ্রেসের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে তৃণমূলের দিকে চলে যাওয়া। মুর্শিদাবাদে সম্ভবত বড় ধাক্কা খেতে চলেছেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। মালদহ জেলাতেও সম্ভবত কংগ্রেস তৃতীয় শক্তিতে পরিণত হতে চলেছে। এনআরসি আতঙ্ক এই দুই জেলায় মুসলিম ভোটকে তৃণমূলের পক্ষে সংহত করেছে। সংযুক্ত মোর্চার পক্ষ থেকে এনআরসি প্রশ্নে তৃণমূলের অবস্থানের সমস্যাগুলি নিয়ে প্রচার নির্বাচকমণ্ডলীর মধ্যে খুব প্রভাব ফেলতে পেরেছে বলে মনে হয়নি।

মহিলা ভোটের প্রসঙ্গে আসা যাক। একমাত্র মহিলারাই পারেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গড়া রুখতে, তৃণমূলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” প্রচার থেকে শুরু করে কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্প, স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে পরিবারের অভিভাবক হিসেবে বর্ষীয়সী মহিলা সদস্যের স্বীকৃতি, সবুজ সাথীর সাইকেল-সহ বিভিন্ন প্রকল্প নিশ্চিতভাবেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লাভবান করবে। বহু হিন্দু পরিবারের মহিলা ভোটার এই নির্বাচনে স্বামী বা পরিবারের পুরুষ সদস্যের নির্দেশ উপেক্ষা করে ইভিএমে মমতার প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। মমতার নির্বাচনী জনসভাগুলিতেও মহিলাদের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। অন্তত ২০১৯ সালের তুলনায় বেশি। ফলে একমাত্র এই ফ্যাক্টরটি তৃণমূলকে রক্ষা করতে পারে।

প্রথমেই বললাম সংযুক্ত মোর্চা আসন পাওয়ার নিরীখে হতাশাজনক ফলাফল করতে পারে। যে তরুণ প্রার্থীদের নিয়ে নেট দুনিয়া উত্তাল তাঁদের অধিকাংশই পরাজিত হবেন, অনেকেই হয়ত দ্বিতীয় স্থানেও থাকবেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, চলতি নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের আগামী এক দশকের অক্সিজেন জুগিয়ে দিল। একদল নতুন ঝকঝকে ছেলেমেয়ে, যাঁরা ৩৪ বছরের ব্যাগেজ নিয়ে চলেন না, তাঁদের এই উত্থান আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিকে নতুন দিশা দেবে এমন আশা করা অন্যায় নয়। কেবলমাত্র জেএনইউ বা যাদবপুরের প্রাক্তনীরাই নন, একদম প্রান্তিক এলাকাতেও বামেরা যে তরুণ তরুণীদের প্রার্থী করেছেন, তাঁদের এবারের পরাজয় আগামীর অগ্রগতির সোপান হতেই পারে। অন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির উত্থান। এত আগে থেকে বলা ঠিক নয়, তবুও খানিকটা প্রগলভ হয়েই মন্তব্য করি, এই যুবকটি আগামীতে বাংলার সংখ্যালঘু-দলিত সমাজের কাছে নিজেকে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালায় পরিণত করতে পারেন। তাঁর আশ্চর্য বাচনভঙ্গি, সরল এবং অনাড়ম্বর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতা এবং সর্বোপরি একজন পীরজাদা হয়েও রাজনীতির ময়দানে ধর্মকে সরিয়ে রেখে রোজগার, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্রের মতো মৌলিক চাহিদাগুলিকে তুলে ধরা আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। বিধানসভায় আব্বাস সিদ্দিকির দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে বলেই মনে হয় যদি কমিউনিস্টদের সঙ্গে তাঁর জোট অটুট থাকে এবং তাঁর রাজনৈতিক বোধের আরও বিকাশ ঘটে, যদি তিনি ক্ষমতার রাজনীতির বোড়ে না হয়ে যান, কমিউনিস্টরা যদি তাঁকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করেন, তাহলে তাঁর ভাগীদারির স্লোগান আগামী কয়েক বছরের বঙ্গ রাজনীতির অন্যতম নির্ণায়ক প্রশ্ন হতে চলেছে। বাংলার সংখ্যালঘু সমাজ বহুদিন পর এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পেয়েছে যিনি রাজনীতিকে ধর্মের সঙ্গে মেশাতে চাইছেন না। চাইছেন শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সমাজের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি। এখানেই আব্বাসের সঙ্গে সিদ্দিকুল্লাহদের ফারাক। আব্বাস মুসলিম রাজনীতির চেনা মাঠে খেলছেন না। তাঁর মাঠ নিজের তৈরি করা।

নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতি চরম নৈরাজ্যের দিকে বাঁক নিতে চলেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে দেখিয়ে দিয়েছে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। পথের কুকুরের মতো মরতে হচ্ছে মানুষকে। যে বিপুল সংখ্যক যুবজনতা শিক্ষান্তে কর্মসংস্থানের প্রশ্নে, টেট-এসএসসির দুর্নীতির প্রশ্নে তৃণমূলকে হারাতে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, অচিরেই তাঁদের বড় অংশ মোহমুক্ত হবেন। মেরুকরণের প্রচারে প্রভাবিত মানুষও জীবন-জীবিকার তীব্র সংকটে নাজেহাল হয়ে বিকল্প খুঁজবেন। এই অবস্থায় রাজ্যে বিরোধী রাজনীতির পরিসর অনেকটাই খোলা মাঠের মতো হতে বাধ্য। আশা করা যায় বামপন্থীরা তাঁদের ঐতিহাসিক কর্তব্য পালন করবেন। নির্বাচনী ব্যর্থতাকে আগামী সাফল্যের সোপান হিসাবে ব্যবহার করবেন তাঁরা। আর যদি তাঁরা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে রাজ্যের মানুষ নিজেদের বাঁচা মরার প্রয়োজনেই অন্য কোনও সমীকরণের জন্ম দেবেন।

অন্ধকার সত্য। শেষ সত্য নয়। বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগের দিন এটাই শেষ মন্তব্য।

পশ্চিমবঙ্গ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন – ছবি Facebook ও Wikipedia থেকে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.