‘তোমার নাম কী?’
‘জানি না। ও তো কোনো নাম দেয়নি আমায়।’
- ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, মেরি শেলি (অনুবাদ – সিদ্ধার্থ বিশ্বাস; লেখনী প্রকাশন, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ১৯৯৬)
স্রষ্টা ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে উত্তর মেরুর বরফের মধ্যে অদৃশ্য হওয়ার আগে উপন্যাসে এই ছিল দানবের শেষ সংলাপ। অথচ কী ট্র্যাজেডি! এই উপন্যাস প্রকাশের (১৮১৮) দুশো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন শব্দটা আমরা ব্যবহার করি স্রষ্টার ভুলে দানব হয়ে ওঠা মানুষকে বোঝাতে। আসলে স্রষ্টা, ক্ষমতাবান বা সংখ্যাগুরুর বয়ানই প্রতিষ্ঠা পায় সব যুগে। সে-ই নাম করে। তার অপছন্দের পক্ষের হয় বদনাম। নয়ত নামটা স্রেফ হারিয়ে যায়, অথবা যা খুশি একটা নাম চাপিয়ে দেয় ক্ষমতাশালী পক্ষ। আজ যেমন সোশাল মিডিয়ায় সব মুসলমান পুরুষই আবদুল, বহুকাল ধরে বাঙালিদের কাছে সব নেপালিই বাহাদুর।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই নামহীন দুর্নামই হল ‘অপর’-এর জীবনের, দাসের জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি। এর যন্ত্রণা অনুভব করা, যে কখনো অপরত্ব অনুভব করেনি তার পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। রিডলি স্কটের ব্লেড রানার (১৯৮২) ছবিতে যেমন মৃত্যুবরণ করার আগে দাসত্ব কী তা রিক ডেকার্ডকে (হ্যারিসন ফোর্ড) হাতেনাতে দেখিয়ে দেয় কৃত্রিম উপায়ে তৈরি মানুষ – ছবির ভাষায় ‘রেপ্লিক্যান্ট’ – রয় ব্যাটি (রাইটজার হাওয়ার)। তবু কেন ডেকার্ডকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে ব্যাটি নিজে নীরবে মৃত্যুবরণ করল শেষপর্যন্ত, তা ডেকার্ডের বোধগম্য হয় না। দাসের বা অপরের, জীবনের প্রতি মমত্ব, তার ভালবাসা, আমরা বুঝে উঠতে পারি না কিছুতেই। অপরকে দানব বা খুনি ভেবে যে স্বস্তি পাই, তা তাকে অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ ভেবে পাই না।
নামহীন অপরের এই ট্র্যাজেডি কলকাতার মঞ্চে জীবন্ত করে তুলেছে থিয়েটার ফাউন্ডেশন পরিবর্তক ও ক্যান্টিন আর্ট স্পেস ইনিশিয়েটিভের নাটক ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। শ্রাবন্তীর পরিচালনায় মেরির উপন্যাসে উত্থিত মৌলিক প্রশ্নগুলো – সৃষ্টির অনিশ্চয়তা, স্রষ্টার দায়, মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা, বিশ্বাসের বাস্তবকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা – সবই মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান তথা মানবসভ্যতা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আজও হিমশিম খাচ্ছে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ঈশ্বর হয়ে ওঠার দুর্দম লোভে, প্রকৃতির রহস্য ভেদ করার প্রবল উত্তেজনায় আবিষ্কারের পরিণাম ভেবে দেখেনি। ফলে ছারখার হয়ে গেছে নিজের, তার প্রিয়জনদের এবং তার সৃষ্টির জীবন। তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার বলা হয় যাঁকে, সেই নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টনও এখন এআই কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি ভয় পাচ্ছেন যে ‘এআই টেকওভার’ হয়ে যেতে পারে যে কোনোদিন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে যেতে পারে তার ফলে। তাই তিনি নিজের টাকাপয়সা তিনটে ব্যাংকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখছেন। তাঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তিনিই এ যুগের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।
এই দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, আতঙ্ক অতি জটিল সংলাপ রচনা না করেও সফলভাবে সাধারণ দর্শকের সামনে উপস্থাপনার কৃতিত্ব শ্রাবন্তীর। পাশাপাশি যার অনুভূতি আছে, যে ভালবাসতে চায়, তাকে মানুষ বলে গণ্য করা যাবে না কেন – সে প্রশ্নও তুলে দেয় এই নাটক। স্কটের ছবিতে ‘রেপ্লিক্যান্ট’ প্রিস (ড্যারিল হানা) দার্শনিক রেনে দেকার্তের বিখ্যাত উক্তি ব্যবহার করে বলেছিল ‘আই থিংক দেয়ারফোর আই একজিস্ট’। শ্রাবন্তীর ‘ক্রিচার’ যেন বলতে চায় ‘আমি অনুভব করি, আমি ভালবাসি। এটাই আমার মনুষ্যত্বের প্রমাণ।’ কিন্তু মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণির বড় তফাত তো এই যে সে ঠান্ডা মাথায় অমানুষ হয়ে উঠতে পারে, মিথ্যে বলতে পারে। তার সৃষ্টিকেও সেই প্রতিহিংসা, সেই শঠতা শিখে নিতেই হয়। ক্রিচারও শিখে ফেলে, স্রষ্টা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের উপর প্রয়োগও করে।
আরো পড়ুন নোলানের ওপেনহাইমার: সৃষ্টির আনন্দ ও অনুশোচনার ছবি
মেরির উনবিংশ শতাব্দীতে লেখা উপন্যাসের এই সৃজনান্তর (adaptation) অনায়াসে সমসাময়িক হয়ে উঠেছে ক্রিচারের প্রতি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সন্দেহকে ব্যবহার করে। তার বোন উইলিকে ক্রিচারই হত্যা করেছে – এমন প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তাকেই সরাসরি অভিযুক্ত করে। কোনো সংশয় থাকে না তার কণ্ঠে। তখনই ক্রিচার (জয়রাজ ভট্টাচার্য) ছুড়ে দেয় সেই সংলাপ, যা সংবেদনশীল পাঠককে নিজের অবস্থান সম্পর্কেও ভাবিয়ে তুলবে – ‘আমি হত্যা করেছি এটা তোমার বিশ্বাস’। এরকম নিঃসংশয় বিশ্বাসে কত মানুষকে আমরা অভিযুক্ত করে চলেছি রোজ! পথে ঘাটে, অফিস কাছারিতে, স্কুল কলেজে, ঘরোয়া আড্ডায় আর সোশাল মিডিয়ায়। অপরাধ না করেও নিরন্তর অবিশ্বাসের শিকার হওয়া, ঘৃণার পাত্র হওয়া মানুষকে সত্যি সত্যি দানব করে তোলার ক্ষমতা ধরে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সেই ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন।
এই নাটকে প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত যিনি অভিনয় দিয়ে দর্শককে চুম্বকের মত টেনে রাখেন, তিনি জয়রাজ। নাটকের শুরুতেই প্রাপ্তবয়স্ক শিশুর মত মরণ থেকে জেগে ওঠার সময়ে সারা গায়ে অসংখ্য নল জড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাঁর শরীরী অভিনয় এবং জন্ম পরবর্তী আশ্চর্য আর্তনাদ অলৌকিক মুহূর্ত তৈরি করে। জন্মের অব্যবহিত পরে তাঁর ভাল করে হাঁটতে না শেখা শিশুর মত নড়াচড়া, সদ্যোজাতের মতই মুখ দিয়ে অর্থহীন আওয়াজ করা থেকে ক্রমশ দৃষ্টিহীন বৃদ্ধ ডি ল্যাসির সাহায্যে একটু একটু করে কথা বলতে শেখা, হাঁটাচলা স্বাভাবিক হয়ে আসা – একজন অভিনেতার ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়া পেরনো চোখের সামনে দেখা এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। বৃদ্ধের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে জয়রাজ যে শিশুসুলভ সারল্য দেখিয়েছেন, গাছের পাতা ঝরা বা বরফ পড়ার দৃশ্যে যে অপাপবিদ্ধ আনন্দ দেখা দিয়েছে তাঁর চোখেমুখে, তা বজায় রেখেই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সঙ্গে বৌদ্ধিক ঠোকাঠুকির দৃশ্যগুলোতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় এবং দার্শনিক প্রশ্ন তোলা এই অভিনয়কে স্মরণীয় করে রাখে। কেবল ওই অভিনয় দেখার লোভেই এ নাটক একাধিকবার দেখা যেতে পারে।
ক্রিচারের জন্ম, একাকিত্বের যন্ত্রণা, ভালবাসা, প্রতিহিংসা ফুটিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে শুভঙ্কর, রাজু ধর, বিশ্বজিৎ, প্রীতম, তারক, অক্ষয় ও সুজয়ের আলোকসম্পাত। সময়ে সময়ে, বিশেষত ক্রিচারকে যখন শেষবার দেখা যায়, সে আলো হয়ে উঠেছে অলৌকিক। অন্যান্য চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্ধ বৃদ্ধের চরিত্রে তাপস রায় প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন চরিত্রে ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য একটু উচ্চকিত।
তবে নাটকে মঞ্চের পিছনের পর্দার সিনেম্যাটিক ব্যবহার সময়ে সময়ে বাহুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, অভিনেতারা যা করছেন তাতে মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে গেছে কোনো কোনো মুহূর্তে। যেখানে মঞ্চের উপরে পাতা ঝরানো হয়েছে বা তুষারপাত দেখানো হয়েছে, সেখানে পিছনের পর্দাতেও একই দৃশ্য দেখানোর প্রয়োজন ছিল না। প্রায় প্রত্যেক দৃশ্যে পিছনের পর্দার ছবি বদলে দেওয়ারও বোধহয় দরকার ছিল না। কোনটা ডি ল্যাসি, ফেলিক্স, আগাথাদের বাড়ি আর কোনটা জঙ্গল বা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জেনিভার বাড়ি – তা বুঝে নিতে নাটকের দর্শকের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ নাটক তৈরি হয় নির্দেশক, অভিনেতা আর দর্শকের মিলিত কল্পনাশক্তির জোরেই। এই নাটকে সামান্য কয়েকটা কাঠের টুকরো, বাক্স ইত্যাদিকে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের বিয়ের রাতের শয্যা ভেবে নিতে যখন দর্শকের অসুবিধা হচ্ছে না, তখন নির্দেশক আরেকটু বেশি বিশ্বাস রাখতেই পারতেন। আর বেমানান লেগেছে ফেলিক্স-আগাথার কণ্ঠে একদা ভারতের শ্রমিক আন্দোলনে ব্যবহৃত সেই গানটা, যা কোরাস (১৯৭৪) ছবিতে মৃণাল সেন ব্যবহার করেছিলেন। কারণ ইংরিজি উপন্যাসের এই সৃজনান্তরে আর কোথাও ভারতীয়করণের চেষ্টা নেই। চরিত্রগুলোর নাম, স্থানের নাম, পোশাক আশাক – সবকিছুই ইউরোপিয় রাখা হয়েছে। এমনকি জন মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট আবৃত্তি করে ক্রিচার তার সংকট, তার একাকিত্বকে আরও জীবন্ত করে তোলে। সেই নাটকে ওই হিন্দি গানের ব্যবহার একেবারেই খাপ খায় না।
কিন্তু শ্রাবন্তীর সবচেয়ে বড় সাফল্য এই যে, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আজকের নাটক হয়ে উঠেছে। বস্তুত, ঠিক এখনই এই নাটক মঞ্চস্থ হওয়া দরকার ছিল। তবে এই সৃজনান্তরকে হয়ত আরও সমসাময়িক করে ফেলার, আরও বেশি দেশি করে তোলার সুযোগ ছিল। কারণ মেরির উপন্যাসে আছে ইংগোলস্টাডে প্লেগের কথা, যা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের পক্ষে বিভিন্ন শবদেহ থেকে দেহাংশ জোগাড় করা সহজ করে দিয়েছিল। আমরাও মাত্র বছর পাঁচেক আগে পেরিয়ে এলাম একটা অতিমারী, যেখানে নদীর পাড়ে পোড়ানো হচ্ছিল শবদেহ। ঠিক কত লোক মারা গেছে তা লুকোবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল এদেশের সমস্ত সরকার। মরণ থেকে কাউকে জাগিয়ে তোলার সেই তো প্রকৃষ্ট সময়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









[…] নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত […]