গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-২৬ আর্থিক বর্ষের বাজেট পেশ করল তৃতীয় নরেন্দ্র মোদী সরকার। লোকসভা নির্বাচনের জন্য দ্বিতীয় মোদী সরকার ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেছিল। ভোটে জিতে তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে সরকার জুলাই মাসে ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করে। আয়কর ছাড় নিয়ে প্রচারের আতিশয্যে ২০২৫-২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটের অন্যান্য দিকগুলি অনেকখানি আড়ালে চলে যাচ্ছে। অথচ তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের সিংহভাগ মানুষের জীবন, জীবিকার প্রশ্ন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকার সমস্যা, কাজের নিশ্চয়তা গায়েব হওয়া, কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা, পুষ্টিকর পেট ভরা খাবারের অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষের অস্তিত্বই সংকটে। এই বাজেট সংকটমোচনের পরিবর্তে তা আরও ঘনীভূত করবে। মোদী সরকারের আমলে আরও একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাজেটে যত টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, বাস্তবে খরচ করা হচ্ছে তার কম। আবার জিএসটি বা আয়কর আদায়ের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করছে, কোনো কোনো বছর ছাপিয়েও যাচ্ছে। অন্যদিকে কর্পোরেট কর লক্ষ্যমাত্রার থেকে কম আদায় হলেও, কোম্পানি কর্তাদের ঘুরপথে ভর্তুকি সহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা দিতে এতটুকুও কার্পণ্য নেই সরকারের।

২০২৫-২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ হয়েছে ৫০,৬৫,৩৪৫ কোটি টাকা। যদিও পুরো টাকা খরচ করা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ সালের বাজেটে চলতি আর্থিক বছরের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৪৮,২০,৫১২ কোটি টাকা। সংশোধিত বরাদ্দে দেখা যাচ্ছে তার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ছেঁটে ফেলা হয়েছে। ২০২৪-২৫ সাল এখনও চলছে, শেষ হবে ৩১ মার্চ। চলতি আর্থিক বর্ষে সরকার বাজেট বরাদ্দের থেকে ১,০৪,০২৫ কোটি টাকা কম খরচ করছে। দেখা যাচ্ছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই বাজেট বরাদ্দ থেকে অর্থ ছেঁটে ফেলা হয়েছে। বাজেটে সরকার কোনো খাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করে, বাস্তবে তার থেকে কম বা বেশি খরচ হতে পারে। তার জন্য আর্থিক বছরের মাঝে প্রয়োজনে হিসাব সংশোধন করা হয়। আয়ের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়। সাধারণভাবে বাজেটে ব্যয় বরাদ্দের থেকে সংশোধিত বরাদ্দে অর্থের পরিমাণ বাড়ে। বিশেষত দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা আরও বেশি। কিন্তু মোদী সরকারের আমলে হচ্ছে তার ঠিক উল্টো। গত ২০২৩-২৪ আর্থিক বর্ষেও বাজেট বরাদ্দের থেকে ৬১,০০০ কোটি টাকা কম খরচ হয়েছিল। বাজেটে গতবারের থেকে বরাদ্দ কমল না বাড়ল তা দেখার পাশাপাশি কতখানি অর্থ কম খরচ করা হল তাও বিচারে আনা দরকার।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

*সমস্ত টাকার পরিমাণ কোটিতে

উপরের দুটি সারণি দেখলে বাজেটের আসল চরিত্র বোঝা যাবে। কৃষি মন্ত্রকের বরাদ্দ গতবারের বাজেট বরাদ্দের চেয়ে বাড়লেও সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে কমেছে। কৃষকদের জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে যেসব প্রকল্পের কথা প্রচার করা হয়, সেগুলিতে বরাদ্দ কমেছে বা একই আছে। কিষাণ সম্মান নিধিতে চলতি ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে যত টাকা খরচ হবে বলে দেখানো হয়েছে (সংশোধিত), এবারের বাজেটে সেই টাকাই বরাদ্দ করা হয়েছে। ফসল বিমায় বরাদ্দ গতবারের বাজেট বরাদ্দের চেয়ে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা কমেছে। সারে ভর্তুকি বেড়েছে সামান্য। যদিও সংশোধিত বরাদ্দের হিসাবে সারে এবারে ভর্তুকি প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকা কমেছে। সেচের জন্য প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দের থেকে সংশোধিত বরাদ্দে ১,৬০০ কোটি টাকার বেশি ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এবার বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র দশ কোটি টাকা। কৃষি ঋণ দেওয়ার সীমা তিন লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লক্ষ টাকা করা, কয়েকটি ডালকে গুরুত্ব দেওয়া, একশোটি জেলার জন্য ধনধান্য কৃষি যোজনা ছাড়া কৃষকদের জন্য কোনো সুখবর এই বাজেট আনেনি। ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের নিশ্চয়তা, কৃষি উপকরণের দাম কমানো সহ কৃষকদের দাবিগুলিকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি।

ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের নিশ্চয়তার জন্য প্রয়োজন সরকারের ফসল কেনা। রেশন, মিড ডে মিল, অঙ্গনওয়াড়ির মত নানা প্রকল্পে বেশি খরচ করলে কৃষকরা উপকৃত হতেন। ভারতের মত অপুষ্টিতে জর্জরিত দেশের পক্ষেও সেটা প্রয়োজন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে খাদ্য ও গণবন্টন দফতরে গত বাজেট বরাদ্দের থেকে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা ছেঁটে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ চলতি ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে সরকার এই দফতরের জন্য বরাদ্দ টাকার বড় অংশ খরচ করছে না। ২০২৫-২৬ সালের বাজেট বরাদ্দও গত বাজেটের থেকে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা কমেছে। এই দফতরের গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনায় ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়া নিয়ে সরকারের প্রচারের অন্ত নেই। তাতেও গত বাজেট বরাদ্দের চেয়ে সংশোধিত বরাদ্দে ৮,২৫০ কোটি টাকা ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এবারের বাজেট বরাদ্দ গতবারের থেকে ২,২৫০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। মিড ডে মিল প্রকল্পের গাল ভারি নাম দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী পোষক শক্তি নির্মাণ (পি এম পোষণ)। এই প্রকল্পে গত বাজেট বরাদ্দের থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি।

শিশু ও প্রসূতিদের পুষ্টির জন্য সুসংহত শিশু বিকাশ প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রকল্পকে জুড়ে অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পের নতুন নাম হয়েছে সক্ষম অঙ্গনওয়াড়ি ও পোষণ ২.০। সেই প্রকল্পে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৭৬০ কোটি। যদিও চলতি বছরে এই প্রকল্পের বাজেট বরাদ্দ থেকে ১,১০০ কোটি টাকারও বেশি সরকার ছেঁটে ফেলেছে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক, শিশু ও প্রসূতিদের অপুষ্টি – এসবের বিচারে বিশ্বে ভারতের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে। খাদ্যদ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সেখানে রেশন, মিড ডে মিল, অঙ্গনওয়াড়ি প্রভৃতিতে সরকার বাজেট বরাদ্দের চেয়েও কম অর্থ খরচ করছে। এবারেও যত টাকা বরাদ্দ হয়েছে তত খরচ করা হবে কিনা সন্দেহ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আইন অমান্য করে, নানা প্রকল্পের নাম বদলে প্রচারের জন্য খরচ করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। আসল খরচ কমছে।

কর্মসংস্থান বা শ্রমিকদের জন্য কোনো আশার আলো এই বাজেট দেখায়নি। গত বাজেটে সরকার নিজে কর্মসংস্থানের কথা না বলে বেসরকারি সংস্থাগুলিতে নিয়োগে জোর দিয়েছিল। তার জন্য নতুন নিযুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের মাসিক ভাতা, প্রফিডেন্ট ফান্ডের অর্থের একাংশ দেওয়া, শিক্ষানবিশদের ভাতা সহ নানা প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। আসলে শ্রমিক-কর্মচারীদের মালিকের থেকে যা প্রাপ্য, তারই একাংশ সরকার বহন করতে চেয়েছে। ঘুরিয়ে এভাবে মালিকদের ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থা করে কর্মসংস্থান কতখানি হল তার হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন স্কিমে বরাদ্দ দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু বাজেট বরাদ্দ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকারও বেশি ছেঁটে ফেলায় বোঝা যাচ্ছে, কাজের কাজ বিশেষ হচ্ছে না। গিগ শ্রমিকদের জন্য কিছু সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া শ্রমিকদের জন্যও এই বাজেটে কোনো সুখবর নেই। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের বরাদ্দ ১০,০০০ কোটি টাকা বেড়েছে। কিন্তু এই মন্ত্রকেও ৪,০০০ কোটি টাকার বেশি ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

আরো পড়ুন মধ্যবিত্তকে ভুল বুঝিয়ে গরিবকে ভুলে থাকা বাজেট

বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। শিক্ষায় বরাদ্দ গতবারের থেকে ৮,০০০ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১,২৮,৬৫০ কোটি টাকা। মোট বাজেট বরাদ্দের মাত্র ২.৫%। যদিও গত বাজেট বরাদ্দের থেকে শিক্ষায় ৬,৫০০ কোটি টাকার বেশি খরচ ছেঁটে ফেলা হয়েছে। আগামী ২০২৫-২৬ আর্থিক বর্ষেও বরাদ্দ অর্থ পুরোপুরি খরচ না করার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্যে প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ৯৯,৮৫৯ কোটি টাকা। মোট বাজেট বরাদ্দের দুই শতাংশেরও কম। ধরেই নেওয়া যায় যে স্বাস্থ্যেও বরাদ্দের থেকে কম টাকা খরচ করা হবে। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ১,২০০ কোটি টাকা। বহু বিজ্ঞাপিত আয়ুষ্মান ভারতের জন্য বরাদ্দ দুই কোটি টাকারও কম বাড়ানো হয়েছে। এই প্রকল্পেও চলতি বছরে বাজেট বরাদ্দের থেকে কম টাকা খরচ করা হচ্ছে।

গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের বরাদ্দ বাড়লেও, দেখা যাচ্ছে গতবারের বরাদ্দ পুরো টাকা খরচ হবে না। মনরেগায় (একশো দিনের কাজ) বরাদ্দ একই রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় গত বাজেটের সব টাকা খরচ করা হয়নি। ২০২৪-২৫ সালের বাজেটে গ্রামীণ ক্ষেত্রে আবাস যোজনায় বরাদ্দ ছিল ৫৪,৫০০.১৪ কোটি টাকা। বিপুল অর্থ ছাঁটাই করে খরচ করা হচ্ছে মাত্র ৩২,৪২৬.৩৩ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ আর্থিক বর্ষের জন্য বরাদ্দ সামান্য বেড়ে হয়েছে ৫৪,৮৩২ কোটি টাকা। শহরে আবাস যোজনায় গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩০,১৭০.৬১ কোটি টাকা। চলতি বছরে খরচ করা হচ্ছে মাত্র ১৩,৬৭০ কোটি টাকা। এবারে বরাদ্দ প্রায় ১১০০০ কোটি টাকা কমে হয়েছে, মাত্র ১৯৭৯৪ কোটি টাকা। নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রক, সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকেও বাজেট বরাদ্দের টাকা ছেঁটে ফেলা হয়েছে। জল জীবন মিশনে বাজেট বরাদ্দের অর্ধেকও খরচ হবে না। ছেঁটে ফেলা হয়েছে ৪৭,০০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ আর্থিক বর্ষের বাজেটে বরাদ্দ গতবারের থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা কমেছে।

রেশনে খাদ্যশস্য, ফসল বিমা, সকলের বাড়ি, সব বাড়িতে জল, আয়ুষ্মান ভারত ইত্যাদি নিয়ে ঢাক পেটাতে সরকারের বিরাম নেই। বিগত লোকসভা নির্বাচনে মোদীর গ্যারান্টি বলে এসবের অনেক প্রচার হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বাজেটে বরাদ্দ অর্থও পুরো খরচ করা হচ্ছে না। এভাবেই গরিব, শ্রমজীবী মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলিতে খরচ ছেঁটে ঘাটতি কমাতে চায় সরকার। পরিবেশের ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে।

ঘাটতি কমানোর আরেকটি দিক হল আয় বাড়ানো। সেক্ষেত্রেও গরিবকে ভাতে মারার ব্যবস্থা পোক্ত করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৪,৯৬,৪০৯ কোটি টাকা। অনুমান করা হয়েছে যে বিভিন্ন কর বাবদ আদায় হবে মোট ৪২,৭০,২৩৩ কোটি টাকা। রাজ্যগুলিকে তাদের প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়ে কেন্দ্রের হাতে কর বাবদ নিট রাজস্ব থাকবে ২৮,৩৭,৪০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের আয়ের ৮১ শতাংশই আসে বিভিন্ন কর থেকে। বাজেটে ধরা হয়েছে ২০২৫-২৬ সালে ১৫,৬৮,৯৩৬ কোটি টাকা ধার করতে হবে। কর বাবদ সরকার সবচেয়ে বেশি টাকা পায় আয়কর থেকে। অনুমান করা হচ্ছে ২০২৫-২৬ সালে আয়কর বাবদ আয় হবে ১৪,৩৮,০০০ কোটি টাকা। কর কাঠামোয় পরিবর্তন এনে বহু মানুষকে আয়করের আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়া হলেও আয়কর থেকে সরকারের আয় বাড়বে কী করে? দেখা যাচ্ছে, বিগত কয়েক বছর ধরেই আয়কর আদায় লক্ষ্যমাত্রার থেকে বেশি হচ্ছে। ২০২৪-২৫ সালের বাজেটে অনুমান করা হয়েছিল ১১,৮৭,০০০ কোটি টাকা আয়কর পাওয়া যাবে। সংশোধিত হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫ সালে তার থেকেও ৭০,০০০ কোটি টাকা বেশি আয়কর আদায় হতে চলেছে। এরপরেই সরকার সবচেয়ে বেশি কর পায় জিএসটি থেকে। গত আর্থিক বছরে জিএসটি আদায় লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০২৪-২৫ সালেও লক্ষ্যমাত্রা (১০,৬১,৮৯৯ কোটি টাকা) পূরণের আশা করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে জিএসটি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, ১১,৭৮,০০০ কোটি টাকা। অথচ কর্পোরেট করের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। সংশোধিত হিসাব অনুসারে ২০২৪-২৫ বছরেও কর্পোরেট করে লক্ষ্যমাত্রার থেকে ৪০,০০০ কোটি টাকা কম আদায় হবে। ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে কর্পোরেট করের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে ১০,৮২,০০০ কোটি টাকা। আয়কর থেকে তো বটেই, জিএসটির চেয়েও ভারতে কর্পোরেট কর কম।

জিএসটি আমজনতাকে দিতে হয়। জিএসটির ৬৩% দেন গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষ। দ্রব্যমূল্য কমাতে জিএসটি কমানোর দাবি করা হলেও সরকার তা মানবে না। অথচ কর্পোরেট মহলের দাবিতে কর্পোরেট কর কমানো হয়েছে। অসাম্য কমাতে কর্পোরেট কর বাড়ানো, সম্পদ কর বসানোর দাবি নানা মহল থেকে উঠলেও সরকার নিশ্চুপ। আসলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে বিকাশের তত্ত্বে সরকার অটল রয়েছে। বিনিয়োগ বাড়লে চাকরি হবে, দারিদ্র্য কমবে – এই নয়া উদারবাদী টোটকা যে অকেজো, বিশ্বজুড়েই তা টের পাওয়া যাচ্ছে। অথচ সেই টোটকা অনুসারেই এদেশে এখনো কর্পোরেট কর কমানো সহ কর্পোরেট মহলকে নানা সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে আর্থিক সংকট কাটছে না। এবারেও গবেষণায় বেসরকারি সংস্থাগুলির জন্য আর্থিক অনুদান, পরিকাঠামোয় পিপিপি মডেল, বিমায় ১০০% বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন সহ নানা পদক্ষেপে নয়া উদারনীতির পথই অনুসরণ করা হয়েছে।

ভারতে আয়কর দেন জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র অংশ। সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডাইরেক্ট ট্যাক্সেজ (সিবিডিটি) সংস্থার তথ্য অনুসারে ২০২৩-২৪ আর্থিক বর্ষে দশ কোটিরও কম মানুষ আয়কর রিটার্ন ফাইল করেছিলেন, কর দিতে হয়েছিল আরও কম ব্যক্তিকে। তাঁদেরও একটি অংশকে আয়করের আওতার বাইরে নিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির লাভ হবে না। চাহিদা বাড়িয়ে বাজার চাঙ্গা করার লক্ষ্য পূরণ হবে না। বরং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সিংহভাগ মানুষের দুর্দশা আরও বাড়ার আশঙ্কা। আয়ের নিশ্চয়তা দিয়ে, বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক, সামাজিক ক্ষেত্রে ও প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে, ধনীদের উপর কর বাড়িয়েই এই সংকট থেকে কিছুটা স্বস্তিলাভ সম্ভব। কিন্তু এবারের বাজেটও চলল তার উল্টো পথে। নয়া উদারনীতি চাহিদার চেয়ে জোগানকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। মানুষের কেনার ক্ষমতা কমে গিয়ে বাজার সংকুচিত হলেও তার ভাবনা নেই। তার পরিকল্পনা মুষ্টিমেয় মানুষকে কেন্দ্র করে। অধিকাংশ মানুষ সেখানে ব্রাত্য, ফালতু আদমি। আমজনতার বিনাশের বিনিময়ে পুঁজি বিকাশের নীতিতেই চলছে বিশ্ব। ২০২৫-২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট সেই পথেরই পথিক। দেশের আমজনতার বিরুদ্ধে অঘোষিত আর্থিক যুদ্ধে নেমেছে কর্পোরেটবান্ধব মোদী সরকার।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.