কাবেরী কর গুপ্ত

গত বছরের শেষের দিকে গ্রেটা থুনবার্গ আরও একবার খবরের শিরোনামে এসেছিলেন।

না, জলবায়ু সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে নয়— যদিও তা হচ্ছে। না, কার্বন নির্গমন আরও বেড়েছে বলে নয়— যদিও তা বাড়ছে। না, আরও একটা শীর্ষ সম্মেলন ব্যর্থ হল বলেও নয়— যদিও ব্যর্থতাই মোটামুটি এখন নিয়ম হয়ে গিয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গ্রেটা খবরে ফিরলেন কারণ তিনি প্যালেস্তাইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। কারণ তিনি জলবায়ু সংকটকে মানব সংকটের থেকে আলাদা করতে চাননি। কারণ তিনি পরিবেশ আন্দোলনকে কনফারেন্স হলের বাইরে নিয়ে আসতে পেরেছেন, পরিবেশ আন্দোলনকে দেখাতে চেয়েছেন জবরদখল আর গণহত্যার চশমায়। কারণ তিনি এমন এক অলিখিত সীমা পার হয়ে গিয়েছেন যা আগে দেখা যায়নি, কিন্তু সর্বদাই কার্যকর ছিল।

খবরে ফিরলেন বলছি বটে, তবে তা যেন ক্ষণিকের জন্য। ছবিগুলো অল্প সময়ের জন্যই আমাদের সামনে এসেছিল, তারপর উধাও— পুলিশের ঘেরাটোপে বন্দি গ্রেটা, ক্ষমতা আর ক্ষমতার অস্বস্তির মাঝে টানটান তাঁর উপস্থিতি। মুখেও অদ্ভুত শান্ত ভাব। ওই শান্ত ভাবটাই ক্ষমতার জন্য আরও অস্বস্তিকর। রাগকে তবু বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু অমন শান্ত ভাব যে দৃঢ় বিশ্বাসের ইঙ্গিত।

এহেন পরিস্থিতিতে মূলধারার সংবাদমাধ্যম পড়েছে মহা ফাঁপরে। কিছু সংস্থা কোনো খবরই করেনি। বাকিরা উপর উপর লিখে দায় সেরেছে। বিবিসিই যেমন। কয়েক বছর আগে পরিবেশ সংকট নিয়ে গ্রেটা যখন বিশ্বনেতৃত্বকে ধমকধামক দিয়েছিলেন, তখন ষোড়শী মেয়েটার প্রতি তাদের দরদের শেষ ছিল না, কিন্তু আজ তারাও মোটামুটি হাত গুটিয়ে নিয়েছে। গ্রেটাকে এখন হজম করা শক্ত।

আসলে প্রতিষ্ঠান যে গ্রেটাকে চাইত, আজকের গ্রেটা তেমনটি নন। তিনি আর সেই হাততালি কুড়নো কিশোরীটি নেই। তিনি আর সেই ছোটটিও নেই যার রাগকে অভিমান বলে অল্পস্বল্প কাব্যি করা যায়, আবার দিব্যি এড়িয়েও যাওয়া যায়। এই গ্রেটা পরিবেশ সংকট নিয়ে বলতে গিয়ে জবরদখলের কথা বলেন, সেনা অত্যাচার, গণহত্যার কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি সোজাসুজি বলেন— যে রাষ্ট্রব্যবস্থা বিরাট অংশের মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা আর পরিবেশ আন্দোলন এক পথে চলতে পারে না। এই সাহসেরই মাসুল দিতে হচ্ছে তাঁকে।

আমি নিজে একজন বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, সমাজকর্মী। আমাদের বাড়িতে পরিবেশ রাজনীতি নিয়ে সর্বক্ষণই আলোচনা চলে, আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও আমরা চেষ্টা করি যথাসম্ভব অনুশীলনের। মনে আছে, আমার দুই মেয়ে যখন মার্কিন মুলুকে বেড়ে উঠছে, আটলান্টিকের অন্য পারে সুইডেনে গ্রেটা তখন নিয়মিত স্কুল যাওয়া বন্ধ করেছে, প্রতি শুক্রবার সুইডেনের পার্লামেন্টের সামনে গিয়ে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসছে।

আমাদের বাড়ির পরিবেশটা অনেকটা এরকম, বেশি বয়সিরা কথা বলেন সম্ভাবনা নিয়ে, কম বয়সিদের আলোচনা টিকে থাকা নিয়ে। ওই ২০১৯ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় সানরাইজ আন্দোলন। আমার ছোট মেয়ে তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। সেও তার নিজের স্কুলে ওই আন্দোলনে নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। সেইসময় ওদের সঙ্গে নানা মিটিং মিছিলে গিয়েছি। ওদের আলাদা করে অ্যাক্টিভিস্ট বানাতে হয়নি, প্রশ্ন করার ক্ষমতাটা ওদের ভিতরেই রয়েছে। এককথায় বলা যায়, গ্রেটা আর ওদের ভাবনা প্রায় একই। পার্থক্য বলতে, ওরা যেটা বুঝতে পেরেছিল, গ্রেটা সেই কথাটা স্পষ্ট ভাষায় বলতে পেরেছে। প্রাপ্তবয়স্করা ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা করছেন, ওটাকে দর কষাকষি বলে, অথচ তাঁরা বলছেন, এটাই নাকি বাস্তববাদ।

ওই একই সময়ে কয়েক হাজার মাইল দূরের একদল কিশোর-কিশোরী আবার গ্রেটাকে দেখছে অন্য এক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কলকাতার সুখচর পঞ্চম রেপার্টরি থিয়েটারের কয়েকজন ছেলেমেয়ে ২০১৯ সালে স্থির করে তাদের পরবর্তী প্রযোজনা হবে গ্রেটার জীবন ও কাজ নিয়ে। যদিও তার আগেই বায়ুদূষণ, বর্জ্য দূষণ, জল সংকটের মত প্রাত্যহিক সংকটের প্রসঙ্গ তাদের নাটকে উঠে এসেছে। ফলে তাদের দুনিয়ায় গ্রেটা কোনো সেলিব্রিটি নন, বরং জীবন্ত উস্কানি।

তথাকথিত অ্যাক্টিভিজম নয়, বরং তাদের অনেক বেশি অবাক করেছে গ্রেটার সাহস। প্রতিবাদের সাহস, রাষ্ট্রপুঞ্জের মত গ্রাম্ভারি জায়গায় ঢুকে সোচ্চারে নিজের কথা বলার সাহস। তাবড় রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রীদের সামনে ছোট্ট গ্রেটা মাথা ঝোঁকাননি। তিনি চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন, পরিবেশ সম্পদের বেলাগাম চুরির অভিযোগ তুলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে।

সুখচরের ছেলেমেয়েরা মন দিয়ে ভিডিওগুলো দেখেছে। কেবল গ্রেটার বক্তৃতাই নয়, সভার পুরো ঘরটাকেই তারা খুঁটিয়ে লক্ষ করেছে। ঘর জুড়ে পোড়খাওয়া রাষ্ট্রনেতাদের দল। বিমানে, ব্যক্তিগত বিমানে চেপে তাঁরা পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পও, তিনি তো সকলের চেয়ে এককাঠি উপরে। তাঁর ফ্যাসিবাদী সরকার তো পরিবেশ সংকট ব্যাপারটাই মানতে নারাজ।

গ্রেটা কিন্তু সেভাবে আমেরিকায় যাননি। তিনি গিয়েছিলেন একটা নৌকোয় চেপে। নৌকোটা চলে হাওয়ায়, তার গতিও কম, আরামের বন্দোবস্তও নামমাত্র। না কোনো শর্টকাট, না কোনো তাপরোধী ব্যবস্থা। রাষ্ট্রপ্রধানরা যেখানে কয়েক হাজার লিটার জ্বালানি পুড়িয়ে পরিবেশ সম্মেলনে আসছেন, গ্রেটা সেখানে পুরোপুরি এক অন্যরকম দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন এবং তাও বক্তৃতা দিতে মঞ্চে ওঠার আগেই। কলকাতার ছেলেমেয়েদের কাছে বক্তৃতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে এই ভাবনাটা।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা হয়, মুখে সংকটের কথা বলা আর ব্যক্তিগত জীবনে তার অনুশীলন, এই দুইয়ের নৈতিক ফারাক থাকে প্রবল। গ্রেটার সমুদ্রযাত্রা এই ভণ্ডামিকে সোজাসুজি চিহ্নিত করেছে। সঙ্গে এও প্রমাণ করেছে যে রাজনীতি করতে এলে আরামপ্রিয়তা চলে না। সুখচরের কুশলীরা এই ফারাকটাকে ধরতে পেরেছে।

এমনিতেও ভারতে স্কুলপড়ুয়াদের যা চিরকালীন পরিস্থিতি, তা বিচার করলেও গ্রেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। মধ্যবিত্ত ঘরে ছোটদের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে পরিবারের, আর কিছুটা নেপথ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে বৃহত্তর সমাজ। শিক্ষা এখানে শেখার মাধ্যম নয়, বরং প্রতিযোগিতার অস্ত্র। স্বাভাবিকভাবেই সাফল্যের মানদণ্ড হয়ে ওঠে পরীক্ষার নম্বর, প্রতিষ্ঠানের চাকচিক্য আর মোটা মাইনের চাকরি। যতক্ষণ বিদ্যায়তনিক পড়াশোনায় ব্যাঘাত না ঘটছে বা বাড়ির নাম না ‘ডুবছে’, ততক্ষণ একটু-আধটু সমাজকর্ম চলতে পারে। কিন্তু সরাসরি প্রতিবাদ বা রাজনীতি একেবারেই চলবে না, ওতে লেখাপড়া লাটে উঠবে। কমবেশি সব মধ্যবিত্ত পরিবারই এই ধারণায় চলে। তার উপর বর্তমানে দেশের মসনদে অতি দক্ষিণপন্থী শক্তি। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমনিই বাবা-মায়েদের আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক নয়।

ছোট থেকেই মোটামুটি আমাদের শেখানো হয়ে এসেছে, বাধ্য থাকো, তাহলে তুমি নিরাপদ। আর, সামাজিক নিয়ম নীতি না মানলে তুমি খারাপ। গ্রেটা এই শিক্ষাটারই মূলে আঘাত করেছেন।

সুইডেনের শিক্ষাব্যবস্থাও এক্ষেত্রে কিছুটা সাহায্য করেছে। ওদেশের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি শুক্রবার স্কুল কামাই করার অধিকার আছে। গ্রেটা এই সুযোগ নিয়ে প্রতি শুক্রবার পার্লামেন্টের সামনে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসতেন, তাতে স্কুল থেকে নাম কাটা যায়নি। তাঁর বাবা-মাও তাঁর প্রতিবাদকে শুরু থেকেই সমর্থন জানিয়েছেন, অহেতুক শৃঙ্খলে বেঁধে ‘ভাল মেয়ে’ করে তোলার চেষ্টা করেননি।

সুখচর পঞ্চমের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এ ধরনের চিন্তার অনুশীলন আগে থেকেই ছিল, তাদের নাটকেও উঠে আসছিল প্রতিবাদের স্বর, ফলে গ্রেটা হয়ে উঠলেন তাদের যথার্থ অনুপ্রেরণা। নাটকের অন্যতম কুশলী শরণ্যা মজুমদার আমায় বলছিলেন, এই প্রযোজনা কেবল গ্রেটার কাজ নিয়ে নয়, বরং তাঁর বেড়ে ওঠা, পরিবার, চারপাশের যে পরিস্থিতি তাঁকে সামাজিক চাপ সামলাতে শিখিয়েছে, সেই সবটা নিয়ে। গ্রেটার এক ব্যতিক্রমী মানসিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে নিউরোডাইভারজেন্স। কিন্তু ওটা তাঁর সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়নি, বরং সবকিছুকে অন্যভাবে দেখার চোখ তৈরি করতে সাহায্য করছে। গ্রেটা তাই নৈতিক আপস ঝেড়ে ফেলে সোজাসুজি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারেন। নাটকটার নির্দেশক মলয় মিত্রও এমনভাবে নাট্যরূপ লিখেছিলেন যাতে গ্রেটার কাজের বিবর্তন অনুযায়ী প্রয়োজনমাফিক সংযোজন-বিয়োজন করা যায়।

তা বিবর্তন ঘটেছে বটে। পরিবেশ সংকটের কথা বলেই গ্রেটা থেমে যাননি। বরং ক্ষেত্রটাকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তিনি যে প্যালেস্তাইনের পক্ষ নিয়েছেন, তা কোনো পথবিচ্যুতি নয়। যে বিস্তারের কথা বলছি, এটা সেটাই। পরিবেশের ক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সেখানে সীমান্ত, অবরোধ, বোমাবর্ষণ— সবই জড়িয়ে থাকে। যখন জলের উপর নিয়ন্ত্রণ নেমে আসে, জমির রাষ্ট্রীয় জবরদখল শুরু হয় কিংবা ত্রাণসামগ্রীর উপরেও চাপানো হয় নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশের সংকট সেখানে অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

‘গ্লোবাল সাউথ’ বলতে যে অঞ্চলকে বোঝানো হয়, সেখানে এই চিত্র অবশ্য নতুন কিছু নয়।

আমরা চিরকালই জেনে এসেছি, সংরক্ষণ আসে সেনাবাহিনীর হাত ধরে, জঙ্গল বাঁচাতে গেলে জঙ্গলবাসী মানুষকে সরাতে হয়। এও জেনেছি যে উন্নয়ন প্রকল্পের ফাঁদে জমি, শ্রম, ভবিষ্যৎ— বই একে একে নষ্ট হয়ে যায়, সেই উন্নয়ন প্রকল্পই নাকি অগ্রগতির কথা বলে। আজ হঠাৎ জলবায়ু সংকট নিয়ে কথা হচ্ছে বলে এসব অন্যায় অবিচারের কথা উঠছে, কিন্তু সবই আগে থেকেই ছিল। জলবায়ু সংকট কেবল তাকে ত্বরান্বিত করেছে।

একইভাবে, গ্রেটা এই যে প্যালেস্তাইনের পক্ষ নিয়েছেন, তাতে তিনি আলাদা করে পরিবেশ আন্দোলনকে রাজনৈতিক করে তুলেছেন তা নয়। বরং এতে পরিষ্কার হল, পরিবেশ আন্দোলন বরাবরই রাজনৈতিক। ঠিক এই কারণেই পুরনো বন্ধুরা চুপিচুপি পাশ থেকে সরে গিয়েছেন। তাঁরা আন্দোলনে থাকবেন, কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করবেন না। তাঁরা সহমর্মী হবেন, কিন্তু সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভাববেন না। গ্রেটা এই অলিখিত চুক্তিটা ভেঙে দিয়েছেন, তিনি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকতে চাননি।

এই ব্যাপারটা আমার চেনা। বিদ্যায়তনিক গবেষণায়, সংরক্ষণের দুনিয়ায় হামেশাই শুনতে হয় ‘শুধু বিজ্ঞানটা নিয়েই ভাবো।’ ভাবটা এমন, যেন ইতিহাস ছাড়া দিব্যি বিজ্ঞান হয়। যেন বাস্তুতন্ত্রের নির্মাণে যুদ্ধ, সীমানা বা জবরদখলের কোনো ভূমিকা নেই। গাজার দূষিত জল আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিকাঠামো নিয়ে কথা বলব, অথচ যারা দায়ী, তাদের নাম বলব না।

গ্রেটা যা করেছেন, তা হল তথাকথিত মূলধারার পরিবেশবাদের মুখোশটা টেনে খুলে দিয়েছেন। এই মূলধারার পরিবেশ আন্দোলন হিমবাহের বরফ গলা নিয়ে চোখের জল ফেলতে পারে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুতে সে আন্দোলনের কিছু এসে যায় না। তারা কার্বন নির্গমন নিয়ে কথা বলার জন্য সদাই প্রস্তুত, কিন্তু আজ যে গুটিকয়েক পুঁজিপতির আরামের খেসারত দিতে হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষকে, সে প্রসঙ্গ তুলতে চায় না।

জলপথে প্যালেস্তাইন পাড়ি দিয়ে তাঁর গ্রেফতার হওয়ায় আরও একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। গ্রেটা বড় হোন, এটাও বোধহয় রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়নি। তাঁকে শিশু প্রতীক হিসাবে কল্পনা করাতেই যে স্বস্তি— কারণ যতক্ষণ সে শিশু, ততক্ষণ সে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিপজ্জনক নয়। তাকে নিয়ে উৎসাহ থাকলেও, নিয়ন্ত্রণের রাশ থাকবে রাষ্ট্রব্যবস্থার হাতে। প্যালেস্তাইনের সংকট সেই বিভ্রমটা ভেঙেচুরে দিয়েছে। এতখানি রাজনৈতিক বোধ, তাও আবার যুবতী মেয়ের, এসব মানা যায় নাকি! অতএব, বেটি পাকড়াও অভিযান। গ্লোবাল সাউথের নিরিখে এই প্রতিক্রিয়াটা স্বাভাবিক। অবরোধ আর ভিটেছাড়া হওয়ার দোলাচলেই যাঁদের দিনরাত কেটে যায়, তাঁদের কাছে জলবায়ু সংকট ভবিষ্যতের জুজু নয়, ওটার মধ্যেই তাঁরা রোজ বাঁচেন।

আরো পড়ুন গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা: অলৌকিক নৌযান

বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান-শিক্ষক হিসেবে আমাকে প্রায়ই একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়— এ ধরনের অ্যাক্টিভিজম কি সত্যিই প্রয়োজনীয়? মজার কথা হল, প্রশ্নটা নিজে থেকেই অনেক কথা বলে দিচ্ছে। আমার প্রশ্ন— অতি বিনয়ীদের ন্যায়বিচার আন্দোলন কবে সফল হয়েছে? কবেই বা ইতিহাস সংযমীর পক্ষে থেকেছে? আর কবেই বা নিরপেক্ষতাকে হাতিয়ার করে বিপন্নকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয়েছে?

আমার মেয়েরা অবশ্য এই প্রশ্ন করে না। সুখচরের ছেলেমেয়েরাও এই প্রশ্ন তোলেনি। ওদের নাটকটা ক্রমাগত বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছেন গ্রেটাও। কেবল বিশ্বব্যবস্থা এখনও এমন ভান করছে, যেন এই বদলটা একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল।

গ্রেটা পরিবেশ আন্দোলনের পথ থেকে সরে আসেননি। তিনি সেই আন্দোলনকে একটা যুক্তিনিষ্ঠ চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যদি সেটা আমাদের অস্বস্তির কারণ হয়, তবে তার জন্য গ্রেটা দায়ী নন, দায়ী আমাদের সীমাবদ্ধতাই। সেক্ষেত্রে বলতে হবে, গ্রেটার প্রতিবাদী স্বরকে আমরাই ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারিনি।

নিবন্ধকার পেশায় বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানীমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল সায়েন্সেসের সঙ্গে যুক্ত মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.