প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির বিকল্প পথে শিক্ষার বিস্তার, প্রকৃতিকে ব্যবহার করে নানা প্রকৌশল উদ্ভাবন, পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র, উপজাতিদের অধিকার আন্দোলনে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি বিশ্বব্যাপী। একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া এই ব্যক্তিই ভারতীয় সেনাবাহিনির জন্য তৈরি করেন শীত আটকানোর উপযোগী সৌরশক্তি-চালিত গরম তাঁবু (সোলার টেন্ট)। আজ তিনিই জাতীয় সুরক্ষা আইনে কারাবন্দি। তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সাহায্য নিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে। সোনম ওয়াংচুকের গ্রেফতারি নিয়ে এখন সরগরম জাতীয় রাজনীতি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর লাদাখে যে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে, সে হিংসায় মদতদাতা হিসেবে তাঁর নাম উঠে এসেছে। যদিও সেই ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনির গুলিতে চারজন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে একজন ছেচল্লিশ বছর বয়সী, অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী। নিহত বাকি তিনজনের বয়স কুড়ি থেকে পঁচিশ বছরের মধ্যে। তাঁদের হত্যার বিচার না করে, দেশের নিরাপত্তার নামে ওয়াংচুককে গ্রেফতার করা হল। জাতীয় সুরক্ষা আইনে গ্রেফতার হয়েছেন বলেই দীর্ঘদিন বিনা বিচারে কারাবন্দি করে রাখার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মূলত চার দফা দাবির ভিত্তিতে ওয়াংচুকের নেতৃত্বে লাদাখে চলছিল অনশন ধর্মঘট। অনশনকারী বেশ কয়েকজন অসুস্থ হওয়ার সংবাদে জনতা, বিশেষত যুবকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ সেপ্টেম্বর অনশন ধর্মঘটের পঞ্চদশ দিনে তাঁরা বিজেপির দপ্তর আক্রমণ করেন। উত্তেজনা দমনে নিরাপত্তা বাহিনি নির্বিচারে গুলি চালায় বলে অভিযোগ। ওয়াংচুক এই হিংসাত্মক ঘটনার বিরোধিতা করে সেদিনই অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের জন্যই যে যুবসমাজ ধৈর্য রাখতে পারছে না, সেই অভিযোগও করেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তিনি চিরকালই অহিংস আন্দোলনের পক্ষে। এর আগেও একাধিকবার লাদাখের পরিবেশ, উপজাতিদের সংস্কৃতি রক্ষা, লাদাখকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া, ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে অনশন করেছেন। গতবছর (২০২৪) লাদাখ থেকে পদযাত্রা করে ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর দিন দিল্লিতে আসার কর্মসূচি নিয়েছিলেন। সেই কর্মসূচি বানচাল করতে রাষ্ট্রের অতি তৎপরতা দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পরেই সরকার এবং শাসক বিজেপি ওয়াংচুককে নিশানা করে। তিনি ‘দেশদ্রোহী’, ‘বিদেশি মদতে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চাইছেন’, এমন নানা অভিযোগের বন্যা বয়ে চলেছে। কেউ তাঁকে বলছে, তিনি আমেরিকার এজেন্ট, কেউ বা বলছে, চিনের এজেন্ট। এমনকি, গ্রেফতার করার পর পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর যোগসাজশ প্রমাণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাঁর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আয় নিয়ে তদন্তে নেমেছে আয়কর দপ্তর। বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন (এফসিআরএ) লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁর পরিচালিত অসরকারি সংস্থার এফসিআরএ লাইসেন্স বাতিল করে সিবিআই তদন্ত শুরু করেছে। যদিও তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন, যেসব বিদেশি আয় নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়, সেগুলি আদৌ অনুদান নয়, বরং তা সোলার হিটার টেন্ট, কৃত্রিম হিমবাহ তৈরির প্রকৌশল জানার বিনিময়ে তাঁর সংস্থাকে রাষ্ট্রসঙ্ঘ এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের দেওয়া বেতন। তিনি অভিযোগ করেছেন, সিবিআই ভুল বুঝতে পেরে এরপর অপরাধ প্রমাণ করতে বেশ কয়েক বছরের ফাইল ঘাঁটাঘাটি শুরু করে।
২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ করে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য ভেঙে লাদাখকে আলাদা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা দেওয়ার পদক্ষেপকে ওয়াংচুক স্বাগত জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি চিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চিনা পণ্য বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁকেই আজ দেশের সুরক্ষা আইনে আটক করা হচ্ছে! আজকের ভারতে সরকারকে সমর্থন করার কাজে ছেদ দিলে চলে না। সরকার চায় তার প্রতি নাগরিকদের অন্ধ আনুগত্য। সরকার-বিরোধিতা রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমার্থক। ৩৭০ অনুচ্ছেদ-রদকে স্বাগত জানানো ওয়াংচুক তাই আজ রাষ্ট্রের কাছে বিপজ্জনক।
লাদাখের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি পালনের দাবিতেই ওয়াংচুকরা আন্দোলনে নেমেছেন। যে চার দফা দাবিতে তিনি অনশন শুরু করেছিলেন সেগুলি হল:
১) লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা প্রদান
২) লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্তিকরণ
৩) লাদাখের সরকারি চাকরির জন্য আলাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন
৪) লাদাখে লেহ ও কারগিল অঞ্চলের জন্য পৃথক দুটি লোকসভা কেন্দ্র গঠন (বর্তমানে লাদাখ নামে একটিই লোকসভা কেন্দ্র রয়েছে)।
লেহ অ্যাপেক্স বডি (এলএবি) ও কারগিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ) – সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলি নিয়ে গঠিত এই দুটি মঞ্চ এই চার দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করে চলেছে।
উপজাতিদের স্বশাসন, পরম্পরাগত জীবিকা, সংস্কৃতি-রক্ষার জন্য এর আগেও লাদাখে বহু আন্দোলন হয়েছে। ১৯৮৪ সালে ওয়াংচুকের বাবা সোনম ওয়াঙ্গিয়ল উপজাতিদের অধিকারের দাবিতে অনশন করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে লাদাখকে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের থেকে আলাদা করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। দাবিকে আংশিক মান্যতা দিতে ১৯৯৫ সালে ‘লাদাখ স্বশাসিত পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদ, লেহ’ এবং ২০০৩ সালে ‘লাদাখ স্বশাসিত পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদ, কারগিল’ গঠন করা হয়। দুটি পরিষদেরই নির্বাচন হয়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইশতেহারে বিজেপি লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই নির্বাচনে বিপুলভাবে জেতার পরেই জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে লাদাখকে আলাদা করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই লাদাখবাসী ভেবেছিলেন, তাঁদের দাবি অনুযায়ী স্বশাসনকে মর্যাদা দিয়ে আলাদা রাজ্য গঠিত হবে, এবং সেটি ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত হবে। সে কারণেই ওয়াংচুকরা সেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
২০২০ সালের লেহ-র স্বশাসিত পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদের নির্বাচনেও বিজেপি লাদাখকে ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই নির্বাচনে পরিষদের ২৬টি আসনের মধ্যে ১৫টি আসনে জিতে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রেখেছিল। কংগ্রেস পেয়েছিল ৯টি আসন। যদিও তার আগের ২০১৫ সালের পরিষদের ভোটে বিজেপি জিতেছিল ১৮টি আসন। মুসলমান-অধ্যুষিত কারগিলে অবশ্য বিজেপি বিশেষ সুবিধে করতে পারে না। ২০২৩ সালের কারগিলের স্বশাসিত পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদের নির্বাচনে ২৬টির মধ্যে ২২টি আসনেই জয় পেয়েছিল ন্যাশনাল কনফারেন্স ও জাতীয় কংগ্রেসের জোট। বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২টি আসন।
চার দফা দাবির কোনোটিই দেশ তথা সংবিধানবিরোধী নয়। বিজেপিও একদা এইসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তা রক্ষা না করার কারণ, আদ্যোপান্ত কর্পোরেটপুষ্ট ‘বিকশিত ভারত’ কর্মসূচি মসৃণভাবে চালানোর তাগিদ। লাদাখবাসীর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গেলে যে কর্পোরেটের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় না!
৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ করে লাদাখকে আলাদা করার পরেই সেখানে পুঁজি নির্দেশিত উন্নয়নের জোয়ার শুরু হয়েছে। সবই চলছে পুঁজি বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ভাঁওতাবাজি দিয়ে। তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে পরিবেশ-বান্ধব, টেকসই উন্নয়নের মিথ্যে গল্প। লাদাখের পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে, উপজাতিদের বাসস্থান, জীবিকাকে বিপন্ন করে চলছে উন্নয়নের সেই কর্মযজ্ঞ।
দেশবিদেশের কর্পোরেটের কাছে লাদাখকে আকর্ষণীয় করার জন্য সরকার অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে। ২০২২-২৩ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে লাদাখে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নের নামে ৬,০৬২ কোটি টাকার প্রকল্পের কথা ঘোষিত হয়। যারমধ্যে ৩,৭৫০ কোটি টাকা দেবে বিশ্বব্যাঙ্ক। এখানে বলা ভালো, করোনা অতিমারিতে লকডাউনের সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষিত প্যাকেজে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া হয়। কারণ তাদের একমাত্র লক্ষ্য, বড় কোম্পানিগুলিকেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ার নামে নানা সরকারি সুযোগ পাইয়ে দেওয়া। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর শিল্পনীতির আদেশনামা জারি করেন। যার নাম দেওয়া হয়, ‘লাদাখ সাসটেনেবল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি, ২০২২-’২৭’। শিল্পের জন্য জমি দিতে ২০২৩ সালেই ‘লাদাখ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ল্যান্ড অ্যালটমেন্ট পলিসি’ ঘোষিত হয়। অপ্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন, পর্যটন, পরিকাঠামো, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কেন্দ্রের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রক লাদাখে ২৩টি ক্ষেত্রে ৯০০ কোটি ২৫ লক্ষ ডলার পুঁজি বিনিয়োগের আহ্বান জানায়।
লাদাখে উন্নয়নের ব্র্যান্ডে একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। হিমাচল প্রদেশের সঙ্গে লাদাখের সড়ক যোগাযোগ উন্নত করতে এবং দূরত্ব কমাতে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ি সুড়ঙ্গ পথ নির্মাণের জন্য ১,৬৮১ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই শিনকুন লা টানেল পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাহাড়ি সুড়ঙ্গ পথ। গড়ে উঠছে দেশের সবচেয়ে বড় সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। ৬০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের সেই প্রকল্পে ৪৮,০০০ একর জমি নেওয়া হচ্ছে – যে জমি দীর্ঘকাল স্থানীয় উপজাতিদের পশুচারণভূমি। পরম্পরাগতভাবে ব্যবহার করা সেই চারণভূমির কাগজ উপজাতিদের নেই, তাই ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও নেই। প্রায় ৭,০০০ উপজাতি পরিবারের পশমিনা ছাগল পালনের ভবিষ্যৎ আজ প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে। গত জুলাই মাসে লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর কবিন্দর গুপ্তা সেখানে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের জন্য দিল্লিতে চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
৫৯১৪৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা-জোড়া লাদাখ প্রাকৃতিক সম্ভারে সমৃদ্ধশালী। তাকে কেন্দ্র করেই বহু প্রজন্ম ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন উপজাতিরা। তাঁদের জীবনচর্যা, সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থানের চিন্তাধারা। সেই প্রাকৃতিক সম্ভার অবাধে লুন্ঠনের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্যতম লোভনীয় নিশানা এই মালভূমি অঞ্চলের দুষ্প্রাপ্য খনি। জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক রিপোর্ট জানাচ্ছে, লাদাখে তামা ছাড়াও দুষ্প্রাপ্য খনিজ পদার্থ, মূল্যবান রত্নপাথর রয়েছে। অনেকের মতে, এখানে ইউরেনিয়ামও আছে। এইসব খনিজ সম্পদের অধিকার পেতে দেশ-বিদেশের কর্পোরেট মুখিয়ে রয়েছে। ওয়াংচুক এই সর্বগ্রাসী উন্নয়ন নীতির বিরুদ্ধেই সরব হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি লাদাখের প্রাকৃতিক সম্ভার, পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র, উপজাতিদের পরম্পরাগত জীবিকা, সংস্কৃতি রক্ষার ডাকে গড়ে ওঠা নাগরিক আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন অদক্ষ কোম্পানিকে কাজের বরাত দেওয়া নিয়েও তিনি অভিযোগ তুলেছেন। স্বশাসিত পার্বত্য পরিষদের ক্ষমতা কমানো, জনবিন্যাস বদলের বিরুদ্ধে, কর্মসংস্থানের দাবিতে আওয়াজ তুলেছেন।
সংবিধানের ২৪৪(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে পঞ্চম তফসিলভুক্ত অঞ্চলগুলিতে ভূমি-সন্তান হিসেবে আদিবাসীদের বিশেষ কিছু অধিকার রয়েছে। আদিবাসীদের স্বায়ত্তশাসন, সংস্কৃতি, আর্থিক সক্ষমতাকে রক্ষা করে তাদের সামাজিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ন্যায়বিচার দেওয়াই এই তফসিলের ঘোষিত লক্ষ্য। অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, গুজরাট, হিমাচল প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, রাজস্থান, তেলঙ্গানার আদিবাসী-অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ অঞ্চল পঞ্চম তফসিলের অন্তর্ভুক্ত। আবার ২৪৪(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে, আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরার উপজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত স্বশাসিত পরিষদ আছে। উত্তর-পূর্ব ভারত ও লাদাখে মূলত তিব্বতী-বর্মী সম্প্রদায়ের জনজাতির বাস। এইসব জনজাতির পরম্পরাগত স্বশাসন প্রণালী একস্তরীয় পরিষদ দ্বারা পরিচালিত, যার মুখ্য বা প্রধানদের আলঙ্কারিক অর্থে রাজা বলা হয়। সেই স্বশাসন প্রণালীতে ষষ্ঠ তফসিল মানানসই। লাদাখে মোট জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশের বেশি উপজাতি। ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করলে, লাদাখের জমি, প্রাকৃতিক সম্ভার, সংস্কৃতি, স্বশাসন ব্যবস্থা রক্ষায় সেখানকার উপজাতিরা বিশেষ অধিকার পাবেন।
কর্পোরেটের পরম মিত্র, আজকের কেন্দ্রীয় সরকার সেই অধিকারটাই দিতে চায় না। লাদাখ ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত হলে কর্পোরেটগুলির অবাধে জমি, প্রাকৃতিক সম্ভার লুঠে বাধা পড়বে। উন্নয়নের নামে জনবিন্যাস বদলের প্রকল্পও ধাক্কা খাবে। জম্মু-কাশ্মীরে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ও ৩৫এ ধারা রদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সেটাই ছিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলিতেও আদিবাসীদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার লঙ্ঘন করে নির্বিচারে চলছে প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন। আদিবাসীদের উচ্ছেদ করতে মাওবাদী তকমা দিয়ে নির্বিচারে তাদের হত্যাও করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় এই হত্যাপ্রকল্পের প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদীদের কখনও মাওবাদী, কখনও আর্বান নকশাল, কখনও বিদেশি মদতপুষ্ট বলে দাগিয়ে দেওয়া তো বটেই, নানা অগণতান্ত্রিক আইনবলে কারাবন্দিও করা হচ্ছে। রাজরোষে পড়ছেন সমাজকর্মীরা, সংকটের মুখে পড়ছে তাঁদের অসরকারি সংস্থাগুলি – ওয়াংচুক যার নবতম সংযোজন।
আরো পড়ুন লাদাখের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করতেই সোনম সবার চোখে ইডিয়ট
ওয়াংচুকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নাগরিক আন্দোলনের বড় কৃতিত্ব হল, এই আন্দোলন আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা ও পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনকে এক সূত্রে গাঁথতে সফল হয়েছে। আদিবাসীদের প্রজন্মগত জীবিকা, বাসভূমি আর সংস্কৃতির সঙ্গে পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্রের যে নিবিড় সম্পর্ক আছে, এই আন্দোলন তা প্রমাণ করে দিয়েছে, জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রভাবও পড়েছে। ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ বলে লোককে আর পুরনো টনিক গেলানো যাচ্ছে না। লাদাখবাসীদের আন্দোলন মূল স্রোতের রাজনীতির অঙ্গ হতে চলেছে। কর্মসংস্থানের ইস্যুকে জুড়ে দেওয়ার ফলে এই আন্দোলনে আরও জোরদার হয়েছে।
সাম্প্রতিককালে প্রতিবেশী দেশগুলির রাজনৈতিক পালাবদলে যুব সম্প্রদায়ের যে ভূমিকা, তাকে স্পষ্টতই ভয় পাচ্ছে মহাপ্রতাপশালী সরকার। লাদাখের আন্দোলনে পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠনের দাবি ও যুবসমাজের অংশগ্রহণ যে তাদের বিচলিত করেছে, তা সরকারি আচরণেই বোঝা যাচ্ছে। বিজেপি শাসিত উত্তরাখণ্ডেও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ছাত্র-যুব বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। আসামে জমি লুঠের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জনজাতি আন্দোলন করছেন। তারই মধ্যে রাহুল গান্ধী ভোট চুরির বিরুদ্ধে যুবদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের রাজনৈতিক ভাষ্যের এক বিকল্প ভাষ্য তৈরি হচ্ছে। এইসব কারণেই লাদাখের যুবসমাজের আইকন ওয়াংচুককে কারারুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়েছে।
গত জুলাই মাসে ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজিস কনফারেন্সে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ১৯৭৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলির তথ্য অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান। আন্দোলনগুলি কাদের নেতৃত্বে হয়েছে, কারা নেপথ্যে রয়েছেন, আর্থিক আয়ের উৎস কী, ইত্যাদি তথ্য অনুসন্ধানের সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে নজরদারি, খবরদারি। সরকার-বিরোধিতাকেই ‘দেশদ্রোহিতা’ বলা, বিদেশি মদতপুষ্ট বলে প্রতিবাদীদের কারারুদ্ধ করার সরকারি নীতি আগামীদিনে আরও গতিলাভ করবে। কর্পোরেট সুরক্ষাকেই জাতীয় সুরক্ষা বলে নাগরিকদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে নেমেছে সরকার। আজ বিশ্বব্যাঙ্কের মতো নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া, বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের জন্য নানা সুযোগ দেওয়ার অপর নাম দেশপ্রেম, আর এসবের বিরোধিতাই হল দেশদ্রোহিতা।
ভারতকে ধীরে ধীরে কর্পোরেটতান্ত্রিক সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত করার কাজ চলছে – যে রাষ্ট্রে ভারতীয় সেনাবাহিনির জন্য সোলার টেন্ট তৈরি করা ওয়াংচুককে জাতীয় সুরক্ষা আইনে কারাবন্দি করা হয়, প্রাক্তন সেনাকর্মীকে সাংবিধানিক অধিকার পেতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনির গুলিতে শহিদ হতে হয়। ভারতকে কর্পোরেটতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে না দেওয়ার এখন একটাই পথ – গণআন্দোলন।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








